শ্যাম পুলকের তিনটি কবিতা

শ্যাম পুলক
১।
অতঃপর মানবজন্মে

ইঁদুর আমার অনেক পছন্দ। তারপরও কোনোদিন আমি ইঁদুর ভাঁজা খেয়ে দেখিনি। তবে তার পরিবর্তে বাসায় বিড়াল রেখেছি। যদিও তাকে কোনোদিন ইঁদুর ধরতে দেখিনি। সে শুধু মিঁও মিঁও করে আর দুধের অপেক্ষা করে; আর ক্লান্ত হলে যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে।


এমন নয় আমিও ঘুমিয়ে পড়তে পছন্দ করি না। কিন্তু বিড়ালের জন্মদিন কবে তা জানি না। তবে ইঁদুর আজকাল আর দেখি না। যদিও একসময় আমি নিজেও ইদুর মেরেছি। তা পছন্দ থাকা সত্তেও- ভেজে খাইনি। যদিও আজকাল আর প্লেগ হয় না। এ আমি শুনিছি প্লেগের কারণে ফারাওয়ের লিঙ্গ খসে পড়েছিল। যদিও শিবলিঙ্গের পূজায় এখনো আমি খুব আমোদিত বোধ করি। দুধ ঢেলে কতো মানুষ আজো মৈথুনের স্বাদ পায়? যদিও প্রেমিকার বুকে লিঙ্গ ঘসে তাকে গর্ভবতী করতে পারিনি। তবে তাকে অসহায় দেখার ইচ্ছে আমার কোনদিনই ছিল না। তাই যোনিতে শুক্রাণু ঢেলে দেয়া আমার কামনার মধ্যে কোনোদিন পড়েনি।

অনিচ্ছায়ও তেমন কিছু হয়ে গেলে প্রেমিকা ইদুর জন্ম দিলে কেমন হতো! যদিও সাপ জন্ম দেবার তুমুল কাহিনি প্রচলিত আছে। কিন্তু আমার কোন পুর্বপুরুষেরা ইঁদুর জন্ম দিয়েছে বলে শুনিনি। তখন কি আমি বিড়াল রেখে বাচ্চা ইঁদুরকে ভয় দেখাতাম? যদিও মানুষ ভয় দেখাতে ভালোবাসে। এমনকি আমি নিজেকেও ভয় দেখাই। অযথাই সুন্দর শরীরের নারীর কাছে যাই। তারা বলে তাদের চাই উইপোকা। উড়তে শেখা খুব দরকার। আমি তাদের শরীরে মাটি লেপটে দিতে গিয়ে ভয় পেয়ে যাই। যদিও জানি আকাশ থেকে মেঘরানীর গর্ভপাত ঘটবে। মাটি পেলে উইপোকা ঠিকই বাসা বাঁধবে।

আর নারী উড়তে শিখুক, আর না শিখুক পুরুষ তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে পছন্দ করবে। তবে নারী চায় বৃত্ত। যদিও আমি প্রেমিকাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ভালোবাসি। এর মধ্যে একটে ঘোর লাগা আনন্দ আছে। ঘুরতে থাকা প্রতি মুহুর্তে তাকে আমি ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকি। পিতামাতাকে বলেছি, আপনারা আমাকে কি নামে ডাকতেন আমি ভুলে গেছি। চেয়েছি ঐতিহ্যের প্রতিটা পালক আমার দেহ থেকে ঘসে পড়ুক। আমার প্রেমিকা অন্যের শুক্রাণু নিয়ে ইঁদুর জন্ম দিলেও আমি রাগ করবো না। সে যদি মাতৃত্ব চায় আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বন্ধিত্ব আমার ভাললাগে না। টিকে গেলে আমার বংশধরেরাও লজ্জিত হবে। যেমন আমিও আমার পুর্বপুরুষের কর্মকান্ডে লজ্জিত। যদিও বুকের ভিতর অজানা আন্দোলন- আমি সেসব ছুঁয়ে দেখিনি। কিন্তু জানি, যা অজানা মানুষ তা জানার জন্য মুখিয়ে থাকে।

২।
উইপোকাচরিত

প্রেমিকাকে আদর করে বেশ্যা ডাকলে, ও ঠিকই বেশ্যার মত করে মুখে রঙ মেখে নেয়। হাসে বেশ্যার মত, কথা বলেও বেশ্যার মত। আর আমি অচেনা নারীর প্রেমে পড়ি; মৌচাকে ঢিল না মারলেও মৌমাছি আগুন খুঁজতে এসে হুল ফুটিয়ে যায়। তবুও আমি মদ্যপ হতে মদ পান করি। জীবনের এক অসহায় ধূম্রজালে নিজেকে আবিষ্কার করেও ধূমপান করি।

কিন্তু নদী বলতে আমি কিছু চিনতে পারি না। সমুদ্রের ঢেউ আমার কোলে এসে আছড়ে পড়ে না। পর্বতের চূড়া থেকে আমি ঝাঁপিয়ে পড়েছি। কিন্তু মরিনি বলে ভেবেছি স্বপ্নে ছিলাম। যেমন আজও জীবিত বলে ভেবে নিয়েছি আমি স্বপ্নে আছি; যেমন আমার সকল বিষ প্রেমিকা শুষে নিয়েছে, খুনের প্রবল ইচ্ছে নিয়েও খুনি নই; যেমন এক অচেনা নারীর ঠোঁট কামড়ে ধরার দৃশ্যে তাকে ধর্ষণ করার অসম্ভব কামনাতেও তার কাছে যাইনি। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লজ্জিত থেকেও আমার রূপান্তর ঘটেছে। স্থবিরতা আমার ভবিষ্যৎ লুফে নিলেও আমি বদলে গেছি।

তারপর হঠাৎ উইপোকা এসেছে। ওরা ঘুমিয়ে থাকা প্রেমিকার পুরো শরীর ছেয়ে ফেলেছে। যদিও আমার প্রেমিকা মৃত্তিকা নয়। শৈশবের নেশাতুর অবহেলায় সৌন্দর্য খুঁজিনি ভেবেও আমি বৃদ্ধ নই; জেগে ওঠার অপেক্ষায় তাই নিজেকে রুখে দেইনি। যে নারীকে আর কেউ ভালবাসে না, তাকে উইপোকা খেয়ে নিয়েছি ভেবে ঘুম ভাঙাতেও যাইনি। ও ঘুমিয়ে থাক। আর বন্দিত্ব নেই জেনেই একদিন অন্য প্রেমিকাকে উইপোকায় খেয়ে নেয়ার অপেক্ষায় থাকবো।



৩।
জোঁকতত্ত্বে

কখনো নিজেকে জোঁকের কাছে সঁপে দেইনি। যদিও আমার প্রেমিকা তার প্রেমিকের কেঁচো খাওয়ার গল্প শুনিয়েছে, তবু আমি কখনো জোঁক খেয়ে দেখিনি। আমি শুধু ধরতে পারলে তার উপর লবন ঢেলে দিয়েছি। তারপর খেজুর কাটা গেঁথে কলাগাছের সাথে সেঁটে দিয়েছি। কেন করেছি তা ঠিক ধরতে না পারলেও আমি ধীরে ধীরে ঠিকই একটা নেতিবাচক চরিত্রে ঢুকে পড়েছি। শুধুমাত্র এমন নয় আমাকে বাঁচিয়ে রাখার অধিকার শুধু আমারই, আমাকে সৃষ্টির অধিকারও আমারই ছিল। আর অবশেষে আমার জন্ম হয় যদি একান্তই আমাকে টিকিয়ে রাখার জন্য, তাহলে মালথুজিয়ান থিউরির মত আমাকেও ঘৃণা করি।
আর আমি তত বৃদ্ধ নই যে নিজেকে খুন করতে চাইবো না, আত্মহত্যা করিনি বলে হতাশায় ডুবে থাকবো না। তবে একদিন পাহাড়ি মেয়ে, আমার হলুদময় প্রেমিকা বলেছিল, আমি তাকে আর না চাইলে সে সাথে সাথেই চলে যাবে, ভুলেও ফিরে তাকাবে না। এমনকি আমাকে মনে পড়ে কোনদিন তার চোখে অশ্রু আসবে না; সে ভালবাসতে জানে, বাঁধন চিনে না। যদিও আমি বুঝাতে চেয়েছিলাম কাছে আসাই যেমন শুরু নয়, চলে যাওয়া শেষ নয়; কিন্তু মুহুর্তের প্রেমই শুধু আমাকে মুক্তির স্বাদ দেয়। মৈথুন সম্পন্ন হলে আমরা যেন একে অন্যের কাছ থেকে সরে পড়ি। আবার দেখা হলে একবারেই অচেনা, অজানা আকর্ষণে নিজেদের আকর্ষণ করবো।
তবে জোঁকতত্বে মশাও রক্ত খেতে ভালোবাসে। রক্ত খেয়ে অমরত্ব সম্ভব হলে জোঁকও অমর হত। অবশ্য আমি মশাও খেয়ে দেখিনি। যদিও যে নারীর হাসি সুন্দর তাকে খুন করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু আমি শুধু তার ঠোঁটে বিছা ছেড়ে দিতে উৎসুক বোধ করি। কিন্তু কাছে গিয়ে বলি, আমার নাগরিকত্ব নিলামে বেচে দেবো। তখন অবাক হলে কানের উপর একটা চড় বসাতে ইচ্ছে করে। আর তখন ইভটিজার হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালতে গিয়ে অভিযোগ করি, আমার অপমৃত্যুর লাশটা কেন সরানো হচ্ছে? মাথা কেটে নিয়ে গেলে লিঙ্গ দেখে কি আমাকে কেউ চিনবে! আর মাথাটা কাটা যাচ্ছে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে অপমৃত্যু চাই না। তবে পাহাড়ি মেয়ে ঝর্নার কাছে আশা খুঁজেছিল। কিন্তু পাহাড় থেকে আমার ঝাঁপিয়ে পড়া কে রুখবে?

আপনার মতামত জানান