ওরিগামি

মৃগাঙ্ক মজুমদার
শেষ ভাঁজটা বাকি তার পরই দেখা যাবে কি দাঁড়াল ব্যাপারটা। অনেক কষ্টে অনেক ভাঁজের পর আজ এই যায়গায় এনে ফেলেছে ব্যাপারটাকে। এই ভাঁজ সে ভাঁজ না একেবারে ফুটবলের পরিভাষায় বলে ‘বডি ফেইন্ট’ করে অন্য মোচড়ে প্রতিপক্ষের সবকিছুকে বদলে দেওয়া।

সাদামাটা ভাবেই শুরু হয়েছিল জীবনটা একেবারে ঝামেলা ঝঞ্জাটবিহীন। মানে ঝঞ্ঝাটকে সেই ভাবে কাছে ঘেঁসতে দিত না। তার ভিতর থেকেই নির্বিকার প্রতিরোধ উঠে আসত। এই মুহূর্তে আসি যাই মাইনে পাই টাইপের একটা চাকরি, চাকরি থেকে ফিরে খানিক আড্ডা তার পর খানিক টিভির পর্দায় চোখ তার পরেই চোখ বোজা আর পরের দিন সেই এক ই নিয়ম। দিব্যি চলছিল ১০ কাঠা জমির ওপরে বাগানঘেরা দোতলা বাড়ি তার পেছনে আর সামনে মাঠ আর ডানদিকে পুকুর। পুকুরটা পূবমুখী হওয়ায় সকালে রোদের ছায়া পড়ে গাছের ফাঁক দিয়ে,। আধা শহরের বুকে সবুজের জোরালো উপস্থিতি। এমনিতে বিজলীবাতি থেকে ইন্টারনেট সবেরই উপাদান আছে তাও গা না করেই চলতে থাকে জীবন। ছোটবেলার প্রথম যে ভাঁজটা পড়েছিল সেটার দাগ এখনো আছে কিন্তু সে পাত্তা দেয় না। তবুও মাঝে মাঝে দাগটা সবার মাঝে জ্বলজ্বল করে জানায় তার উপস্থিতি। তার মার একা একা সব মুখ বুজে সয়ে তাকে ধীরে ধীরে বড় করে তোলা। বাবা চলে গিয়েছিল অনেক আগেই। না জীবন ছেড়ে চলে যায় নি। মাকে পোয়াতি করে চলে গিয়েছিল। কোথায় কেউই জানে না। এরপর যা হয় সবই হওয়ার চেষ্টায় ছিল, যেমন তার মাকে অন্য সমত্থ পুরুষের ক্রমাগত চাউনি আর হাতছানি সহ্য করে যাওয়া। সম্পত্তির দখল নেওয়ার জন্য নানারকমের লোভ দেখানো ইত্যাদি ইত্যাদি। মা পড়াশোনা করা জঙ্গী আর জেদী মহিলা তাই প্রায় ডানাকাটা সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও কারোর হালেই পানি এলনা। খালি অহনের ঝকঝকে মনে প্রথম ভাঁজটা সেই সময়ে পড়েছিল যখন সে সব জানতে আর বুঝতে শিখল তার চারপাশে তার মা কে নিয়ে কি চলছে আর মা হেলাভরে তার প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। আর তার পরেই বয়স নামের সংখ্যাগুলো অহনের কাছে কোনোরকমের মানেই বয়ে নিয়ে আসত না।

জীবনকে অবহেলা ভরে দেখাটা মার কাছ থেকেই শিখেছিল অহন। সারাক্ষণই একটা নির্বিকার নিরাসক্ত ভাব, কিন্তু ভিতরে মারাত্মক জেদ। এমনিতে চাহিদা বিশেষ নেই, গড়পড়তা সাধারন মানুষের মত বেড়ে উঠেছিল জীবন। এইভাবেই প্রায় স্কুলের গন্ডিটা পেরিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই দ্বিতীয় ভাঁজটা পড়ল। একটা মেয়েকে ভালোলাগতে শুরু করল অকারণেই। নিজেই অবাক হচ্ছিল নিজের ওপরে। এমনিতে তো কোনো কথাবার্তা নেই।অহনের সাথে একসাথে পড়েও না, বয়স কত বোঝা যায় না একটু ছোট কি বড় কি আসে যায়, বয়সের সাথে অহনের সম্পর্ক অনেক দিনই চুকে বুকে গিয়েছে। এটা আর কেউই তেমন টের পায় না। অহন জানে তার বয়স গোনার বয়স পেরিয়ে গিয়েছে – কত হবে আগেকার দিনের হিসেবে বললে চার কুড়ি নাকি ছয় কুড়ি! সেসব নিয়ে ভাবা তাই সময়ের অপচয়। মেয়েটার দিনলিপিও মুখস্থ না অহনের। যাওয়া আসার পথে চোখে পড়ে। বাবা মা এর সাথে থাকে একটা দোকান চালায় ফুটপাথের ওপরে, একদিকে ফলের রস অন্যদিকে সামান্য মণিহারীর জিনিসপত্র আশেপাশের লোকেরা বলে নন্টে মুদির গুমটি। মেয়েটার নাম অবধি জানত না। আর জানার চেষ্টাও করে নি। ভাললাগা তো জানান দিয়ে সবসময়ে আসে না। তাই যখন একেবারে এল, তখন অহনের ভিতর কোথাও একটা অন্যরকম মোচড় দিতে লাগল। এই মোচড়ের বাড়া কমার উপর ঝামেলাহীন জীবনে অনেকরকমের চাপ তৈরী করতে লাগল। চোখের দিকে তাকান মানেই অনেক কথা এক সাথে বলা কওয়া আর একটা শব্দ না বলেও অনেক খানি পথ হাঁটা। মনে মনে তখনই প্রায় সারাজীবন একসাথে চলার কথা ভেবে ফেলল আর একসময় জানিয়েও ফেলল। সেইসময়ের চোখটা অহনের আজও মনে পড়ে কারন জানানোর মাস তিনেক পরেই একদিন বোর্ডের শেষ পরীক্ষা দিতে যাবার সময় গুমটির সামনে জটলা দেখল কিন্তু তাকে দেখল না তাই নির্বিকার মনটাকে আগলে পরীক্ষার হলে মন দিয়ে লিখে ফিরেছিল। আর সেইদিনই সন্ধ্যায় জানল একসাথে চারজন মিলে গুমটির ভিতরথেকে তুলে নিয়ে খাবলে খুবলে খেয়ে গলার নলীটা হ্যাঁচকা মেরে নাকি টেনে নিতে চেয়েছিল। দ্বিতীয় ভাঁজটা ঠিক তখনই পড়েছিল।


তৃতীয় ভাঁজের জন্য বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল অহনকে। নিজের ভিতর থেকে বেরোতে চাইত না আর মা বেশি ঘাঁটাত না। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে তাতে বেশি গা ঘামাত না কিন্তু তার মধ্যেও জেদের বশে করে চলা পড়াশোনার ফল এতটাই ভাল হতে লাগল যে বাকিরা তাকে নির্বিকার থাকতে দিত না আর অহনও নিজের করা খাতার পর খাতা ভরা উত্তরের প্রস্তুতি অকাতরে বিলিয়ে দিত। কিন্তু তার ফলে অহনের প্রত্যেকবার প্রথম হওয়াটা কেউই আটকাতে পারত না। আর অহন একবারের জন্যও মঞ্চে উঠে কোনো পুরস্কার নিল না। কোথায় একটা জেদ কুরে কুরে আরো শক্ত আর নির্বিকার করে দিচ্ছিল।গতানুগতিকতাক ে লক্ষ্য বানিয়ে সে বাকিদের দিনের পর দিন আরো সামান্য বানিয়ে দিচ্ছিল তাতে বাকিদের ভিতরে উত্তাপ বাড়লেও অহন নিজে কাঁধে ঝোলা নিয়ে চরতে বেড়িয়ে পড়ত। এমন কোনদিকে যেখানে মনের আর সমাজের পারদের ওঠানামার প্রভাব পড়ে না। সেই রকম একদিন সময়ের সীমা ছাড়িয়ে সীমাহীন ঘোরাঘুরির পর ফিরে এসে দেখল এলাকার সীমানা জুড়ে গাছেরা সব শহুরে বহুতল হয়ে গিয়েছে আর বহুতলগুলো পাতা খাওয়া শুঁয়োপোকার মত ভিতরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অহনের মনে হল এই শুঁয়োগুলো কোনোদিনই প্রজাপতি হবে না হয়ত এরা শুঁয়োই না। লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া গাড়ি। খোপে খোপে ভরা সব জীবন্ত লাশ। ভাঁজ খেয়ে অহনের আকারটা আবার বদলাল।

এর পর একের পর এক নানারকমের ভাঁজের পর ভাঁজ মুড়তে মুড়তে জীবনের পরিসর গুটিয়ে যাচ্ছিল আর কখন কোন রূপে আসবে সবার সামনে সেটা তার নিজের কাছেও পরিস্কার ছিল না। কোনদিকে সে এগোতে চাইছিল নাকি তাকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তার বোঝার ইচ্ছে অনেকদিনই হারিয়েছিল অহন। শুরুটা এখন অস্পষ্ট তাই ১০ কাঠা জমির সীমানা ধরে তার জগৎ বেশী ঘোরাফেরা করে আজকাল সে লোকজনের সাথে আড্ডা মারে সেটা তার মনের ওপর অনেক ভাঁজের ফসল এখন সে জানে ঠিক কি ভাবে দেখতে পারবে নিজেকে। মাঝে মাঝে বুঁদির কেল্লার কুম্ভ লাগে নিজেকে, মা চলে যাওয়ার পর এটা আরো বেড়েছে। নির্বিকারে ঝরে পড়ছে সবাই, তাই অহন মার স্মৃতি থেকে বেঁচে যাওয়া কিছু মূহুর্ত নিয়ে লড়াই এর প্রস্তুতি নিয়েছে। এখন খালি শেষ ভাঁজটার অপেক্ষা, অনেক দিন ধরে ভেবে ভেবে এই খানে নিয়ে এসেছে। এবারের টান আগুনে টান। ওরিগামির একের পর এক ভাঁজে যে ভাবে একদিন অহনের মা অনেক কিছুর শেখানোর মাঝে ড্রাগন তৈরী করা শিখিয়েছিল এখন সেই আগুনমুখো ড্রাগনের সময় এসেছে। এমনিতে নিরাসক্ত থাকলেও তারই মত বেশ কিছু নিরাসক্তকে একে একে খুঁজে বার করেছে সে এলাকার মধ্যে আর বাইরে।

তবে এই শেষ ভাঁজের প্রয়োজনটা এসেছিল যখন গেরুয়া, সবুজ, নীল, সব রঙ গুলো ধার্মিক হয়ে একের পর এক দাঙ্গা মিছিল হয়ে শামিল হচ্ছিল আর কংক্রীটের বস্তিতে কিলবিল করতে থাকা কেন্নোর মত মানুষেরা জায়গা খুঁজছিল শরণার্থী হওয়ার বা মাটিতে মুখ গোঁজার ঠিক তখনই আরো একটা আগুনের দরকার খুঁজে নিয়েছিল অহন । নিজেকে আগুনপাখি না বানিয়ে আগুনঝরানো ড্রাগন বানানোর। অনেক দিনের জমানো নিরাসক্তিগুলো লাভার হয়ে গিয়েছে আস্তে আস্তে। ওরিগামির শেষ ভাঁজেটাই চমকে দেয় এবারেও দেবে, প্রতিরোধের দেওয়াল নয় এবারে পালটা দেওয়ার পালা..

আপনার মতামত জানান