পরিপূরক

পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়



তিন বছর পর এবারের দুর্গাপুজোতে কলকাতা এসেছে মোহর। মাস্টার্স করার জন্য অকল্যান্ড চলে যাওয়ার পর, ও এখন ওখানেই সেট্লড। অন্য কোম্পানী জয়েন করবে বলে, চাকরী ছেড়েছে|আর এই ব্রেকে , কিছুদিনের জন্য নিজের লোকেদের কাছে ঘুরতে এসেছে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে ঢাক আর মাইকে বেজে চলা হানি সিংহের গানের বিচিত্র এক ম্যাশ-আপ। একবার বুক ভরে পুজো-পুজো গন্ধটা নিয়ে, আবার পাশ ফিরে শুল ও। রিচার্ড অনেকগুলো মেসেজ পাঠিয়েছে ওকে, বেশীরভাগই বিরহমূলক। খুব মিস করছে বেচারা মোহরকে, প্রায় দুবছরের সম্পর্ক ওদের। ওর এখানে আসার একটা কারণ বাবা-মাকে এইব্যাপারে জানানোও বটে। রিচার্ডকে একটা ভয়েস-নোট পাঠিয়ে উঠে পড়ল ও।
বেলা এগারোটা নাগাদ পাড়ার বারোয়ারীতে এসে দাঁড়ালো মোহর, ছোটোবেলার স্মৃতিদের হাতছানি চারদিকে| কমলারঙের একটা সালোয়ার আর অল্প প্রসাধনে সকলের নজর কেড়ে নিচ্ছিল ও। পরিচিতদের সাথে ভদ্রতামূলক আলাপ সেরে, পূজোর জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো মোহর। ছোটবেলায় বাবা কোলে করে পুজো দেখাতে নিয়ে আসতেন, সেই থেকে কখন যে এটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে, ও নিজেই জানেনা। "মোহরদি! কবে এলে কলকাতায়? কি সুন্দর লাগছে তোমায়!" এক কিশোরীর হার্দিক উচ্ছাসে চমকে উঠে, পিছনে তাকায় মোহর।
"পিউ?" একটু যেন চিনতে সময় লাগে ওর।
"যাক্! চিনতে পারলে তাহলে," হেসে ওঠে পিউ।
"ওমা! কত বড় হয়ে গেছিসরে তুই? আমি ভালো আছি। তোর কি খবর? বাড়ির সবাই?"
"সব ভালো। আচ্ছা, আমি এখন যাই, বন্ধুদের সাথে বেরোতে হবে| বিকেলে আসবে তো? তখন দেখা হবে,” হাত নেড়ে চলে গেল পিউ।
পাশাপাশিই বাড়ি ওদের। ছোটোবেলায় মোহরের খুব ন্যাওটা ছিল পিউ, বাড়ি আসতো ওর সঙ্গে খেলা করতে। মোহরও যেতো, তবে ওর আরও একটা কারণ ছিল ওদের বাড়ি যাওয়ার। পিউয়ের দাদা, দিগন্ত। ছ’ফুট লম্বা, চওড়া ছাতি, ব্যায়াম করা পেটা চেহারা, হালকা দাড়ি আর চোখে মোটাফ্রেমের চশমা। পাঞ্জাবী পড়ে, ব্যাগ ঝুলিয়ে দিগন্তদা যখন কলেজ যেত, মোহরের মনে কালবৈশাখীর ঝড় উঠত। মেধাবী ছাত্র হিসেবে পাড়ার সব বাচ্চাদের আদর্শ ছিল দিগন্ত, কিন্তু সকলকে অবাক করে উচ্চমাধ্যমিকে প্রায় নব্বই শতাংশ নম্বর পাওয়ার পরও বাঙলা নিয়ে প্রেসিডেন্সীতে ভর্তি হয়েছিল ও। মোহর যখন কলকাতা ছাড়ে, তখন নামী পত্রপত্রিকাগুলোয় সদ্য সদ্য লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করেছে দিগন্ত রায়ের।
দিগন্তদার সাথে মোহরের প্রথম কথা হয় ওর ষোলো বছরের জন্মদিনের দিন। পিউয়ের মুখে ওর জন্মদিনের কথা শুনে দশমিনিটের মধ্যে একটা রঙিন কাগজে কবিতা লিখে ওকে দিয়েছল দিগন্তদা আর বলেছিল, "ভালো থাকিস।" ভালোবাসা- ভালোলাগা- আনন্দ- উচ্ছাস -ভয় -শ্রদ্ধা- লজ্জা মেশানো এক অপূর্ব অনুভূতিতে আপ্লুত মোহর ছোট্ট একটা "থ্যাঙ্ক ইউ" বলে দৌড়ে পালিয়ে এসেছিল সেদিন, পিছন থেকে শুনতে পাচ্ছিল দিগন্তদার প্রাণখোলা হাসি। বাড়ি এসে, ঘর বন্ধ করে, কাগজটা খুলেছিল ও,
"ষোড়শী,
মেঘলাদিনের রোদের আভাসের মতো প্রার্থিত হও,
গ্রীষ্মের দু’পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি ছড়িয়ে দিও নিজের পরিপার্শ্বে।
বাস্তব হোক সব স্বপ্ন, পূর্ণ হোক সব ইচ্ছে,
জীবনের প্রত্যেকদিন যেন দোল উৎসবের মতো রঙিন হয়ে ওঠে।
সবাইতো দেবী হতে চায়, তুমি বরং মানবী হয়ে উঠ॥
-দিগন্ত"
প্লাবন কাকে বলে, সেদিন তা নিজের মনের অবস্থা দেখে প্রথম বুঝেছিল মোহর। তারপর থেকে বহুবার বাঙলা বুঝতে বা পড়তে যাওয়ার অছিলায় দিগন্ত রায়ের কাছে গেছে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী মোহর চ্যাটার্জ্জী। কঠিন কঠিন বিষয় জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিত দিগন্তদা। মাস্টারমশাই যখন বোঝাতে বোঝাতে হারিয়ে গেছে প্রিয় বিষয়ের গভীরে, ছাত্রী শুধু অবাক হয়েছে তাঁর ঔদ্ধত্যহীন পান্ডিত্যে। মোহরের ঘরে ধীরে ধীরে পাওলো কোহেলো, জে. কে. রাওলিংদের পাশে জায়গা করে নিয়েছিলেন বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়রা। অকল্যান্ড চলে যাওয়ার পর এসব প্রায় ভুলতেই বসেছিল ও, আজ পিউ নামক এক দমকা হাওয়া যেন হঠাৎ স্মৃতির অনেকগুলো দরজা খুলে দিয়ে গেলো।
সন্ধ্যাবেলা মায়ের সাথে একবার মাসীর বাড়ি ঢুঁ মেরে এল মোহর। ফিরে এসে ক্যাব থেকে নেমে সোজা মন্ডপে গেল ও, অস্টমীর অঞ্জলীর সময় জানতে। সপ্তমীর সন্ধ্যারতি চলছে তখন, স্বর্গীয় এক পরিবেশ বারোয়ারী জুড়ে। "মোহর, না?" পাশে এসে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলার চোখে অকৃত্রিম আবেগ।
"অতসী কাকিমা! কেমন আছ?"
"পিউ বলছিল যে তুই এসেছিস, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি দেখা মিলে যাবে ভাবতে পারিনি। চল আমার সঙ্গে, তোর প্রিয় পোস্তর বড়া রান্না করেছি আজ। এখনও ভালোবাসিস তো?"
"পোস্তর বড়া! তোমার মনে আছে?"
"মনে থাকবে না কেন রে পাগলী? অতো বুড়োও হইনি এখনও," মোহরের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন অতসী রায়।
রুটি, পোস্তর বড়ার ডালনা আর মিষ্টি দিয়ে কাকিমা বসিয়ে দিয়েছেন মোহরকে, তাও আবার পিউয়ের কড়া তদারকিতে। আগ্রহ নিয়ে দুজনে শুনছে অকল্যান্ডের কথা। বারান্দার একদম শেষপ্রান্তের ঘরটা থেকে ভেসে আসছে রেডিও-র আওয়াজ। "কাকু কেমন আছেন?" জানতে চাইল মোহর।
"ভালো," হাসলো পিউ, "দুর্গাপুরে পোস্টেড এখন। আর জানোই তো, পুজোর সময় বাবারা ছুটি পায় না।"
"হ্যাঁ! আর দিগন্তদা?" খানিক কাঁপা গলায় জিগ্গেস করল মোহর।
"ও আছে, ওর মতো," দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন কাকিমা।
"কাল অঞ্জলী দিতে যাবেতো? দেখা পেলেও পেতে পারো তখন," বিষণ্ণ হাসল পিউ|
বাড়ি ফিরে, মায়ের আলমারি খুলে কালকের জন্য শাড়ি সিলেক্ট করছিল মোহর। সুখদুঃখের গল্প হল খানিক মায়েমেয়েতে। ও পিউদের বাড়ি গেছিল শুনে স্বগতোক্তির সুরে মা বললেন, "দিগন্তটার সাথে যে ভগবান কি করলেন!"
"কেন? কি হয়েছে ওর?"
"তুই চলে যাবার মাসখানেক পর হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যায়। তারপর প্রায় একবছর পর একদিন ফিরে আসে। হুইলচেয়ারে চড়ে।"
"মানে?"
"হ্যাঁ রে, দিগন্তকে তখন চেনা দায়, ও যেন কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিল। শেষে অনেক সাধ্য-সাধনার পর জানা গেল, ও নাকি শান্তিনিকেতনের কাছে কোন গ্রামে বাউলসঙ্গীত শিখতে গেছিল, সেখানেই নাকি একদিন লরির সাথে...। যাই হোক, থাক সে কথা। যা, ঘুমিয়ে পড় তুই। কাল আবার সকাল সকাল উঠতে হবে।"
গলার কাছে যেন একটা দলা পাকিয়ে আসছিল মোহরের, কষ্ট হচ্ছিল খুব। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই অবাধ্য চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। এ.সি. বন্ধ করে দিয়ে পূর্বদিকের জানলাটা খুলে দিল ও। ও’বাড়ির জানলার ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তবে রেডিয়োর যান্ত্রিক কন্ঠে ভেসে আসছে, "আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে...|"
অষ্টমীর সকালে হলুদ ইক্কতে বেশ মোহময়ী লাগছিল মোহরকে। অঞ্জলি দেওয়ার নির্ধারিত সময় সাড়ে ন’টা হলেও, সকাল আটটার মধ্যেই বারোয়ারীতে চলে এসেছে ও, অজানা এক উত্তেজনায়। হাতে হাতে করে দিচ্ছে পুজোর জোগাড় কিন্তু বারবার চোখ চলে যাচ্ছে গেটের দিকে। সওয়া ন’টা নাগাদ, পিউ ঢুকল দিগন্তদাকে নিয়ে। বেশ রোগা হয়ে গেছে কিশোরী মোহরের স্বপ্নপুরুষ, গালে দাড়ি একইরকম থাকলেও, মোটাফ্রেমের বদলে চোখে জায়গা করে নিয়েছে রিমলেস চশমা, ধূসর হতে শুরু করেছে ঘন কালো চুল। সাদা রঙের পায়জামা-পাঞ্জাবী পরিহিত মানুষটির চাহনিতে স্পষ্ট জেদ আর ঠোঁটের কোণে অসহায় হাসি। সবাইকে সাবধানে পাশ কাটিয়ে, একদম সামনে গিয়ে, একটু কোণা করে হুইলচেয়ার থামালো পিউ। থামের আড়াল থেকে এসব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল মোহর, দিগন্ত এখনও ওকে দেখেনি। যতোটা সম্ভব স্বাভাবিক থেকে দিগন্তর সামনে এসে দাঁড়ালো ও, "কেমন আছো, দিগন্তদা?"
"তুই?" বড় অসহায় শোনালো দিগন্তর গলাটা কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল ও, "অবশেষে মনে পড়ল তাহলে কলকাতার কথা?"
"কেমন আছো, বললেনা তো?"
"যেমন দেখছিস! এসব কথা পাড়ার যে কারোর কাছে জানতে চাইবি, তোকে আমার থেকেও ভাল করে বলে দেবে। আমরা অন্য কথা বলি?"
"লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছ এখনও?"
"ওই টুকটাক," মৃদু হাসলো দিগন্ত।
"দারুণ লিখতে তুমি! ওটা ছেড়োনা প্লিজ্।"
"হুম্। ওই দেখ ঠাকুরমশাই গঙ্গাজল দিচ্ছেন, অঞ্জলিটা দিয়ে ফেলি," প্রসঙ্গ এড়াতে যেন একটু বেশীই আগ্রহী দিগন্ত। মোহরও আর উৎসাহ না দেখিয়ে, হাত পেতে দাঁড়ালো।
প্রথম ব্যাচের অঞ্জলি শেষ হওয়ার পর, দ্বিতীয় ব্যাচের ভীড় জমতে শুরু করেছে। দিগন্তদাকে এবার এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে, কিন্তু পিউকে দেখতে পাচ্ছেনা মোহর। এদিকে ও বেচারাও বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে, নিজেই চেয়ারটা ঘোরানোর চেষ্টা করছে| কোনো উপায় না দেখে, মোহর নিজেই এগিয়ে গিয়ে ধরল চেয়ারটা। অনভ্যস্ত হাতে, অতি সন্তর্পণে, ধীরে ধীরে বের করে নিয়ে আসল দিগন্তদাকে। "বাড়ি যাবে তো এবার? পিউটা যে কোথায় চলে গেল! ওর নম্বরটা বল, ফোন করে দেখি," ব্যাগ থেকে ফোন বের করে মোহর।
"তোর বুঝি আমায় বাড়ি দিয়ে আসতে খুব কষ্ট হবে?" খুব স্বাভাবিক ভাবে বলা দিগন্তদার কথাটা মূহুর্তে ঝাপসা করে দিল মোহরের চোখ।
"না। মানে, আমি তো ঠিক অভ্যস্ত নই...," উত্তর হাতড়াতে চেষ্টা করে মোহর।
"আমারই কি আর অভ্যাস ছিল রে!"
জলভরা চোখে চেয়ারটা ঠেলতে শুরু করল মোহর আর দিগন্তও হালকা হাতে মুছে নিল গালবেয়ে নেমে যাওয়া অবাধ্য অশ্রুধারা।
দিগন্তকে ঘরে ঢুকিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মোহর। ঘরটা অবিকল একইরকম আছে, খাট আর টেবিলের ওপর অগোছালোভাবে কাগজ ছড়ানো আর আলমারিভর্তি বই। আলমারির সংখ্যাটা বেড়েছে কেবল, আগে দুটো ছিল আর এখন পাঁচটা। "একইরকম আছো তুমি, দিগন্তদা!" নিজের ভালোলাগা লোকাতে পারলনা মোহর।
"তুই বুঝি বদলে গেছিস, মোহর? আর বুঝি ইচ্ছে করেনা এই দাদাটার কাছে সমাস পড়তে আসতে?"
"পরীক্ষাতো কবেই হয়ে গেছে আমার!" একটুখানি কেঁপে গেল মোহরের গলা।
"শুধু পরীক্ষার পড়া পড়তে আসতিস তুই আমার কাছে? বহুব্রীহি আর দ্বিগু তোর সিলেবাসে ছিলনা অথচ আমার কাছে তিনবার বুঝতে এসেছিলি।"
"তুমি বুঝতে?"
"তোর থেকে পাঁচ বছরের বড় আমি," গমগমিয়ে হেসে উঠল দিগন্ত।
"ওসব ছোটোবেলার পাগলামী ছিল," হাসার চেষ্টা করে মোহর।
"বড় হয়ে গেলেই বুঝি সব মিথ্যে হয়ে যায়?"
"আমি বরং উঠি আজ। তুমি রিল্যাক্স কর। আসি," ঝড়ের দ্রুততায় ঘর থেকে বেরিয়ে এল মোহর। ওকে দেখতে পেয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অতসী কাকিমা। আলতো হেসে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, "অনেকদিন পর ছেলেটার হাসির আওয়াজ শুনলাম আজ। আবার আসিসরে মা।" মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে ও| দিগন্তদার ঘর থেকে ভেসে আসছে, "কোন পুরাতন প্রাণের টানে...।"
নবমীর দিন আর বাড়ি থেকে বেরোয়নি মোহর। অন্যসব কাজের মাঝে একবার দিগন্ত রায়ের নামটাও ইন্টারনেটে সার্চ করেছিল, রেজাল্ট হিসেবে যা কিছু লেখা এল, সেসব ও কলকাতা থাকাকালীনই লেখা। অজানা কোনো নতুন কথা পাওয়া গেল না, তার মানে দিগন্তদা লেখা ছেড়ে দিয়েছে| খারাপ লাগল মোহরের। রাতে খাবার টেবিলে মাকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করলে, মা জানালেন যে দিগন্তদা ছোটোখাটো লেখালাখির কাজই করে। রাতে রিচার্ডের বায়নায় ওর সাথে স্কাইপে বসেছিল মোহর, কিন্তু কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজেকে। রাতে শোওয়ার আগে ব্যাগ থেকে নতুন গল্পের বইটা বের করল মোহর, ওর সবথেকে পছন্দের লেখক প্রান্তিকের লেখা। যখনই প্রান্তিকের কোন বই বেরোয়, অনলাইনে কিনে নেয় ও। অদ্ভুত একটা শান্তি আছে লেখাগুলোয়। মনখারাপের এই দিনগুলোয় প্রান্তিকই ওর একমাত্র সঙ্গী।
পুরোহিতমশাই ঘট নাড়িয়ে দিয়েছেন দুপুরবেলায়, কিন্তু প্রতিমা এখনও রয়ে গেছে মন্ডপে। কেউই আর আজকাল দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দেয়না। পিউ এসেছে নীচে, মায়ের কাছ থেকে নাড়ু বানানো শিখছে। বাড়ি যাবার সময় মোহরকে সাথে করে নিয়ে যাবে, অতসী কাকিমার তলব। দিগন্তদাকে সরিটাও বলে আসবে ও এই ফাঁকে। আগের দিন যেভাবে হঠাৎ করে বেড়িয়ে এসেছিল, সেটাকে অভদ্রতাই বলে। বিজয়ার উপহার হিসেবে দিগন্তদার জন্য প্রান্তিকের বইটা নিয়ে যাবে। আজ দুপুরেই ওটা শেষ করেছে ও, অসাধারণ লিখেছে প্রান্তিক| দিগন্তদার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।
ঢোকার সাথে সাথেই লুচি, আলুর দম, ছোলার ডাল আর অনেকরকম মিষ্টি দিয়ে ওকে বসিয়ে দিয়েছেন অতসী কাকিমা। ছোটোবেলার স্মৃতি খুব বেশী করে ফিরে আসছে মোহরের মনে। খাবার পর দিগন্তদার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো ও। দরজায় টোকা দেবার আগেই ভেতর থেকে ভেসে এল, "শুভ বিজয়া, ভেতরে আয়।" দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দাঁড়ালো মোহর, খাটের ওপর বসে কবিতার বই পড়ছে দিগন্তদা।
"শুভ বিজয়া। তোমার জন্য একটা বই এনেছিলাম," প্রান্তিকের বইটা দিগন্তদার দিকে এগিয়ে দিল ও।
"তুই বাংলা বই পড়িস?"
"অবশ্যই পড়ি। প্রান্তিক আমার মোস্ট ফেভারিট।"
"এটা পড়েছিস?"
"হুম্। আজ দুপুরেই শেষ হল।"
"কাকে বেশী ভালোলাগলো? কেয়া না কাঁকন?"
"তোমার পড়া এটা?" লজ্জায় পড়ে গেল মোহর।
"ওই আলমারিটা একটু খুলতে পারবি?" দরজার পাশের আলমারিটা দেখালো দিগন্ত। চাবি ঘুরিয়ে আলমারিটা খুলল মোহর। ওপরের দু’টো তাক ভর্তি প্রান্তিকের বই। "ওসব না। তুই নীচের তাকটা দেখ|" দিগন্তদার কথা অনুসরণ করে নীচের তাকটায় হাত দিতেই অনেকগুলো কপিরাইট দেখতে পেল ও। সবগুলোরই লেখক প্রান্তিক। "তার মানে? তুমিই প্রান্তিক?" সবকিছু কেমন ওলোটপালট হয়ে যাচ্ছিল মোহরের।
"তোর তাই মনে হলে, তাই!" হাসল দিগন্ত।
"হঠাৎ প্রান্তিক হতে ইচ্ছা হল কেন, দিগন্ততে কি খারাপ ছিল?" মোহরের গলায় তীব্র অভিমান।
"কাঁদছিস কেন রে, পাগলী? আসলে ওই দুর্ঘটনাটার পর, সবাই কেমন দয়ার চোখে দেখতে শুরু করেছিল। লেখার প্রশংসায় আসা চিঠির বদলে আসতে শুরু করল সমবেদনার চিঠি। পাবলিশার্সরাও কেমন এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল। সেই সময় পার্থিব পাবলিকেশনসের মালিক এই সাজেশনটা দেন," একটু থামল দিগন্ত, "প্রান্তিককে কেউ চেনেনা, ওর কোন ঠিকানা নেই, ওর কোন ছবি নেই। বছরে বড়জোর দুটো উপন্যাস আর প্রান্তিক বেস্ট-সেলার। অন্যদিকে দিগন্ত রায়ের পুরোনো বইগুলো ছ’মাসে-ন’মাসে একটা বিক্রী হয় ঠিকই কিন্তু ওকে কেউ মনে রাখেনি।"
"কেন এমন করলে দিগন্তদা? কেন আবার কালবৈশাখীর ঝড় তুললে?"
"আগে যখন হেঁটে যেতাম, ছোট্ট মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতো। তারপর সে একদিন দূরে চলে গেল আর আমি ঘটনাচক্রে হাঁটার ক্ষমতা হারালাম। তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে কিছুতো করতেই হত!"
"কেন গিয়েছিলে ওখানে? ওখানে গিয়েই তো...," দিগন্তর পায়ের কাছে বসে পড়ল মোহর।
"কপালের লেখা কি আর স্থান-কাল-পাত্র মানে? যা হওয়ার, তা হতই।"
"নাও হতে পারতো। কেন গিয়েছিলে?"
"যাওয়ার আগে পিউকে বলেছিলি যে তোর মাটির গান ভালো লাগে," ফোঁপাতে থাকা মোহরের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল দিগন্ত।
"আমি একটা ভুল করে ফেলেছি, দিগন্তদা। ভীষণ বড় ভুল," বেশ কয়েক মিনিট পর বলে উঠল মোহর।
"না, কোন ভুল করিসনি। এ হৃদয় দেওয়া-নেওয়ার খেলা থেকে ভগবান শিবও পার পাননি, আমরা তো রক্ত মাংসের মনিষ্যি মাত্র," হেসে ওঠে দিগন্ত।
"আমায় ভালোবাসো, দিগন্তদা?"
"বাসি..."
"ভাগ করে নেবে আমার সাথে বাকি জীবনটা?"
"না!," মোহরের মাথা থেকে হাতটা তুলে নিল দিগন্ত, “জীবনের মলাটে অন্ধকার ভাগ করে নেওয়ার মতো স্বার্থপর হতে পারবো না আমি।”
"তুমি ভুল ভাবছ...।"
"তুই বরং বাড়ি যা মোহর, নয়তো আমরা দুজনেই বাস্তব বুদ্ধি হারিয়ে ফেলব," চশমাটা খুলে চোখ বন্ধ করল দিগন্ত। দিগন্তদার গলায় কিছু একটা ছিল, যা মোহরকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করল| চক্রব্যূহ একেই বলে বোধ হয়। কোনমতে কাকিমা আর পিউকে “আসছি” বলে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ও।দিগন্তর ঘর থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’,
"...মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই-
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।..."
আজ ফিরে যাচ্ছে মোহর। এয়ারপোর্টে বসে বসে এ’কদিনের স্মৃতিচারণ করছিল ও। এবারের কলকাতা ভ্রমণ অনেক বড় করে দিয়েছে ওকে, মোহর এখন অনেক পরিণত। অকল্যান্ড গিয়ে অনেক বড় একটা কাজ আছে ওর| রিচার্ডকে বলতে হবে, এই সম্পর্কে থাকা ওর পক্ষে আর সম্ভব না। রিচার্ড খুব ভালো একজন মানুষ, ওকে ঠকাতে পারবে না মোহর। ও যে রিচার্ডকে ভালোবাসে না, এটা এতদিন বুঝতেই পারেনি। প্রেম আর ভালোবাসার মধ্যে ফারাক করতে পারেনি ও। দিগন্তকে ভালোবাসে ও, কিন্তু না ওদের মধ্যে প্রেম নেই। ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে, উঠে পড়ল মোহর। আবার কবে কলকাতা আসা হবে ঠিক নেই, তবে ও জানে প্রান্তিকের বইগুলো নিয়ে ভালোভাবেই দিন কাটবে ওর। নাই বা কাটলো জীবন দিগন্তদার সাথে, প্রান্তিককে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না ওর কাছ থেকে। ধীরে ধীরে হাঁটছে মোহর, কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে, "এটা গল্প হলেই পারতো, পাতা একটা আধটা পড়তাম...।"

আপনার মতামত জানান