XOXOXOXOX

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
বৃত্তের ভেতর আরও একটা বৃত্ত রেখে দেওয়া পরিমিতির অঙ্ক... তার ছবি। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কত কিছু মনে পড়ে যায়! যেমন, একটা কমলালেবু, একটা সেদ্ধ ডিম, কাল্পনিক রেখাচিত্রে পৃথিবী... এদের সকলের প্রস্থচ্ছেদ করলে এক এক রকম পরিমিতির অঙ্ক জন্ম নেবে। ঠিক যেমন জন্ম নিতে পারে সূর্য পাটে বসলে, অথবা কোনও বাদামী অথবা গাঢ় খয়েরী এরিওলা আর তার কেন্দ্রে। আসলে, সব সময় কম্পাস থাকে না। সব বৃত্ত নিখুঁত হওয়াও জরুরি নয়। এই রকমই কাঁপা কাঁপা, দায়সারা, চলতি, নানারকম বৃত্তদের কাউকে দেখে মনে হবে ইংরিজি বর্ণমালার 'O', কাউকে দেখে মনে হবে ডিম্বাকৃতি। আর কেউ বা নেহাৎই শূন্য।
লক্ষ্য করে দেখবেন, খালি হাতে আঁকার চেষ্টায় এমন অনেক শূন্য, অনেক বৃত্ত, অনেক বড় হাতের O... যেখান থেকে আঁকা শুরু হয়েছে সেই সূচনা বিন্দু, আর যেখানে শেষে হয়েছে সেই প্রান্তীয় বিন্দু - আলদা। তার মাঝে একটা ফাঁক থেকে গেছে। যে ফাঁক উপেক্ষা করা হয়। যে ফাঁক আমরা দেখার প্রয়োজনই মনে করি না। কিন্তু এই ফাঁকটা আছে বলেই এরা বৃত্ত নয়, আমাদের জানা কোনও জ্যামিতিক আকারই নয়! তাদের সীমারেখা সম্পূর্ণ হ'তে হ'তে হয়নি... গহ্বরে (অথবা গর্ভে) প্রবেশ করেছে বাইরে থেকে আসা আলো, শূন্যতা, কিংবা এমন অনেক কিছুই... যা আমাদের সীমিত জানার বাইরে। পাতার পর পাতা রয়ে গেছে, থেকে যাবে... এমন চেহারার প্রায়-বৃত্তীয় চেহারাগুলো; যাদের ফাঁকটা আমরা দেখতেই পাচ্ছি না।

(১)

- কী বললাম শুনলে?
- হুঁ
- কিছু বললে না যে?
- হুম
- সেকি... এতক্ষণ ধরে কী বলে গেলাম?
- হুঁ
- অ্যাঁ?! এতগুলো কথা বলে গেলাম... আর তুমি টিশু পেপারে কাটাকুটি খেলে যাচ্ছো? আমি কি ফালতু?
- হুম?... কই, না তো।
এতক্ষণে মঞ্জিমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো সার্থক। চোখে স্পষ্ট বিরক্তি, ঠোঁটদুটো রাগে কাঁপছে মঞ্জিমার। এখনই আরও অনেককিছু বলবে সার্থকের কেয়ারলেসনেস, ক্যালাসনেস, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে। মোটামুটি কী কী বলতে পারে সার্থক জানে। আর একটু আগে পরিস্থিতি, বাড়ির চাপ, ভবিষ্যতের কথা, প্র্যাকটিকাল হওয়া, ফিন্যানশিয়াল ব্যাপার-স্যাপার... এই নিয়ে যা যা বলছিল - এইগুলোও সার্থকের অজানা নয়। তাই আর সোজাসুজি তাকিয়ে আগ্রহ ভরে শোনার অভিনয়টা করতে পারছিল না। বছর তিনেক হ'ল যেখানে জয়েন করেছে... জীবনের প্রথম চাকরি... সেখান থেকে বিরাট কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। বিদেশে যাওয়াও সার্থকের নাগালের বাইরে। আর মাইনে জিনিসটা একটা রাবার ব্যাণ্ড বা চিউইং গাম নয়... যে চাইলেই লম্বা হয়ে যাবে। এই কথাগুলো মঞ্জিমার অজানা নয়, না বোঝারও কথা নয়। আসলে এক একসময় সার্থক বুঝতে পারে না... এইগুলো সত্যিই কনসার্ন, না মঞ্জিমা অজুহাতগুলো পর পর তৈরী করে রেখেছে। সাজিয়ে রেখেছে... যাতে আলাদা হওয়ার কারণগুলো সার্থককে আলাদা করে জিজ্ঞেস করতে না হয়। সম্পর্ক আর চাকরিটার বয়স প্রায় এক। কলেজে জুনিয়ার হিসেবে চিনতে, সম্পর্কটা খানিক পড়ে। তাই দু'বছর 'কমিটেড' থাকার পর ফস করে 'তুমি ঠিক কী চাইছ?' জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় না সার্থকের। তেমনই ইচ্ছে হয় না - মঞ্জিমার সব কথা মন দিয়ে শুনছে, ভাবছে... এই নাটকটা করতে। শান্ত থাকে... ভীষণ শান্ত ভাবে কথাগুলো শুনে যায়। কারণ এর থেকে বেশি তাৎক্ষণিক ভাবে কিছুই করার থাকে না।

- হোয়াই আর ইউ ডুইং দিস টু মি?!
সার্থকের হাতের কাছে রাখা টিশু-পেপার স্ট্যাণ্ডটা থেকে একসঙ্গে দুটো টিশুপেপার তুলে নিয়ে নাকের কাছাকাছি মুখের অংশটা ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল মঞ্জিমা। মঞ্জিমার এই ভাবে কান্নায় ভেঙে পড়াটা দেখলে মনে হয় ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে সম্পর্কটা বাঁচানোর। ওই একা চেষ্টা করে যাচ্ছে, একদিক থেকে। আর পেরে উঠছে না। এই কান্না হ'ল ওর ভেঙে পড়া, ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার মুখে হতাশা। এই কান্নাটা দেখলে সার্থকের বিশ্বাস করতে ভাল লাগে যে মঞ্জিমা ওকে ভালবাসে, মঞ্জিমায় চায় সম্পর্কটা বাঁচুক। মঞ্জিমার পরিবারের স্ট্যাটাস, মঞ্জিমার মায়ের প্রকাশ্যে ঠিকরে বেরনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মঞ্জিমাদের ড্রাইভারের সঙ্গে আইটিতে কর্মরত চাকুরেদের তুলনা, মঞ্জিমার জন্মদিনে আমন্ত্রিত ওর বাবা'র পছন্দের ছেলেটিকে পাশে বসিয়ে খাতির করা... এইসব কিছুকে ছাপিয়ে মঞ্জিমার এই আঁকড়ে ধরে থাকার ইচ্ছে - এমনই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় সার্থকের। কিন্তু সার্থক কিছু প্রকাশ করে না। সার্থকের ব্যক্তিত্বকে ওদের অফিসের মানব-সম্পদ দপ্তরের শেখানো পদ্ধতিতে বলা হয় 'শাই অ্যাণ্ড ইন্ট্রোভার্ট'। দুটোই কর্মজীবনে উন্নতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক। সার্থক শুধু শান্ত থাকতে জানে... যখন ভীষণ ভাবে কিছু বলতে বা করতে ইচ্ছে করে, তখন দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত থাকতে পারে। অপেক্ষা করে দশাটা কেটে যাওয়ার।

- কাঁদার মত কি সত্যিই কিছু হয়েছে? মানে... এভাবে এখানে বসে কান্নাকাটি করলে কি আদৌ কোনও সলিউশন বেরোবে? বোকামো করছ কেন?
মঞ্জিমা নাক টেনে কান্নাটা আটকে নেওয়ার চেষ্টা করল। ওপর দিকে তাকিয়ে জলটা শুষে নিলো টিশ্যু কাগজে। না... চোখের সাজ বাঁচানো গেল না। রেস্তোরাঁ থেকে বেরনোর আগে একবারে ওয়াশরুমে গিয়ে ঠিক করে নিতে হবে। স্যুপ অনেকক্ষণ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। যারা মঞ্জিমার কান্না থামানো চোখের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে... তাদের সকলকেই উপেক্ষা করে সার্থক সেই সুপের ভেতর চামচটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল - "আমি আর নতুন করে কী বলব বলো তো? কী বলব... আর কী শুনব?"
- তাহ'লে আমার কোনও প্রবলেমেরই তোমার কাছে কোনও দাম নেই?
- প্রবলেম মানে তো এই রিলেশন আর তার ফিউচার, আর...
- অফকোর্স! কমিটেড যখন হয়েছি... তখন তা নিয়ে ভাবতে তো হবেই! তোমার মত নাকি!
- আচ্ছা, তোমার মা-বাবার এক্সপেক্টেশন মত যদি স্যালারি প্যাকেজ না হয়। ফ্ল্যাট বা অনসাইটের ব্যবস্থা নয়... তাহ'লে?
- তাহ'লে মানে? তুমি তো চেষ্টাই করছ না! ইউ নেভার ইভন বদার টু গিভ ইট আ ব্লাডি এফোর্ট সার্থক! ইউ নেভার ইভন ট্রাই!
- তুমি, তোমার মা-বাবা... সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে বুঝে গেলে - যে আমি কোনও চেষ্টাই করছি না?
- চেষ্টা করলে কিছু তো হ'ত! এই তো দীপ্ত, তোমার সঙ্গেই জয়েন করল। পুনে পোস্টিং। দেড় বছর হতেই চলে গেল স্টেটস-এ। সায়কও তাই। দু বছর জব করেই ক্যালিফোর্নিয়া চলে গেল, এখন সোমদত্তাও চলে যাচ্ছে। পরের বছর বিয়ে করবে ওরা। আর আমি? এখানে পড়ে আছি... কারণ তোমার কলকাতা ছাড়ার কোনও সীনই নেই!
- এখন নেই বলে কখনও হবে না...
- তাহ'লে কবে কী হবে সেই আশায় বসে থাকো! বাপিকেও আমি বলে দিই - আমাদের কবে কী হবে, প্লিজ আর জানতে চেও না তুমি!
- আর আমি যেটা জিজ্ঞেস করলাম... যদি তোমার মা-বাপি'র পছন্দ মত কিছু না হয়... দেন?
মঞ্জিমা গুম মেরে গেল প্রশ্নটা আবার শুনে। সার্থক যে টিশ্যু পেপারের ওপর কাটাকুটি খেলছিল, সেই কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল "জীবনটা বসে বসে কাটাকুটি খেলা নয় সার্থক... মা-বাপি অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমাকে বড় করেছেন, মানুষ করেছেন... আমাকে ঘিরে ওনাদের অনেক ড্রিম্‌স, এক্সপেক্টেশন্স... কোনও ড্রাস্টিক ডিসিশন...
- থাক, বোঝা গেছে। ঠিকই আছে।
বলে হেসে ফেলল সার্থক। কাটাকুটি খেলা টিশু পেপারটা ভাঁজ করে পকেট রেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলেকে হাত নেড়ে বলল "বিলটা দিয়ে দাও ভাই, এবার উঠতে হবে।"

মঞ্জিমা সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল, ব্যাগটা কাঁধে নিয়েই সোজা চলে গেল ওয়াশরুমের দিকে। এইরকম চোখ-মুখ নিয়ে বেরনো যাবে না। সার্থক ওর হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করল না। ওর মনে হচ্ছে - আজ মঞ্জিমা একটা সিদ্ধান্ত জানাতেই এসেছিল। আর একটু সরাসরি প্রসঙ্গে গেলে হয়ত কাকে নিয়ে ওর বাপি চিন্তা করছে, কেন সে সার্থকের থেকে বেশি উপযুক্ত - এটাও বলে দিতো। মোট কথা মঞ্জিমা চেষ্টা করেছিল... সার্থকের কোনও সিরিয়াসনেস নেই, কমিটমেণ্ট নেই... তাই এই বিপর্যয়। এটাই গল্প। গল্প হয়ে গেছে, এবার এখানে না বসে থাকাই ভাল। বিলটা কার্ডে না মিটিয়ে ক্যাশেই দিয়ে দিলো সার্থক। ছেলেটা চেঞ্জ নিয়ে ফিরে আসতে আসতে মঞ্জিমা টেবিলে ফিরে এসেছে। মুখটা থমথম করছে। এখনই সার্থক কিছু একটা বলতে পারে, রিয়্যাক্ট করতে পারে... হেরে যাওয়া পুরুষের ইগো যেমন আছড়ে পড়তে চায় - এমন কিছু প্রত্যাশা করছিল হয়ত। সার্থক সেই একরকম শান্ত ভাবে বলল - "তোমাকে কোথায় ড্রপ করব?" "না না, ইটস ওকে... আজ আমি একটু গড়িয়াহাটে যাবো। গাড়ি বুক করছি। তোমার পে করা হয়ে গেছে? তাহ'লে..." বলে মঞ্জিমা আড় চোখে চেঞ্জটা দেখে নিয়েই রেস্তোরাঁ থেকে বেরনোর জন্য এগিয়ে গেল।

সার্থকের স্কুটারটা রেস্তোরাঁর বাইরে ফুটপাথের ওপর দাঁড় করানো। সার্থক স্কুটারের দিকে না গিয়ে মঞ্জিমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকল, যতক্ষণ না গাড়িটা আসে। বেলা তিনটের রোদ... মঞ্জিমার মুখটা সেই রোদে গনগন করছে। যদি অপমান হয়, তার কারণটা সার্থক বুঝতে পারল না। অপমানিত সার্থকের হওয়া উচিৎ, মঞ্জিমাই আল্টিমেটাম শোনাতে এসেছিল, শুনিয়ে গেল। তাহ'লে কি ও প্রত্যাশা করেছিল - সার্থক হাতে-পায়ে ধরবে, অনুনয়-বিনয় করে সম্পর্ক-ভিক্ষা চাইবে ওর কাছে? সেটা হ'ল না বলে হেরে গেল মঞ্জিমা? মঞ্জিমা খুব একটা কথা বলছিল না... বার দুয়েক বলল "ইউ হ্যাভ ডিজঅ্যাপয়েণ্টেড মি সার্থক... ইউ হ্যাভ ডিজঅ্যাপয়েণ্টেড এভরি ওয়ান।" মনে হ'ল কান্নায় বন্ধ হয়ে আসা গলার আওয়াজ। "ডোণ্ট ব্লেম মি ফর দিস... আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।" - এটা বলার সময় গলাটা অনেকটা দৃঢ় আর স্পষ্ট শোনালেও কাঁপছিল। সার্থক কী বলবে বুঝতে পারছিল না। এই দুপুর রোদে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসবের উত্তরে কী বলা যায়, তা-ই ভেবে পাচ্ছিল না। কারণ আজকের দুপুরটার আগেও অনেকগুলো দুপুর আছে, বিকেল আছে, সন্ধে আছে... গেছে, চলে গেছে। নতুন করে কিছু বলার নেই আর। অনেক বছর আগে স্কুলের একটি মেয়ে সার্থকের ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করে অনেক কথা শুনিয়েছিল। সার্থকের সেদিন খালি মনে হচ্ছিল, মেয়েটাকে এত গুরুত্ব দেওয়াই উচিৎ হয়নি কোনও দিন। গুরুত্বটা এঞ্জয় করছে মেয়েটা। তৈরী ছিল এই কথাগুলো শোনাবে বলে। আজ এত বছর পর ঠিক সেরকম লাগছে। কিন্তু কি আশ্চর্য, একেবারেই রাগ হচ্ছে না। গাড়িটা আসার পর মঞ্জিমা যখন পাল্লা খুলে ভেতরে বসতে যাবে। তখন দরজার পাল্লাটা ধরে সার্থক বলল - "তুমি কখনও কাটাকুটি খেলেছ?" মঞ্জিমা একটু থতমত খেয়ে সার্থকের দিকে তাকিয়ে বলল "কি?", যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি। সার্থক আবার জিজ্ঞেস করল "খেলেছ কখনও? কাটাকুটি?" মঞ্জিমা ভুরু কুঁচকে সার্থকের দিকে তাকিয়ে রইল, সেটা রোদের জন্য না বিরক্তি, বোঝা গেল না। "যদি ক্রসগুলো না থাকত, কাটাগুলো না থাকত... তাহ'লে শুধু শূন্য পড়ে থাকত। শুধু শূন্য। শুধু শূন্য, অথবা শুধু ক্রস ভর্তি ঘর কী বাজে লাগত বল তো? "
ড্রাইভারটা অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে সার্থকের কথা শুনছিল। সার্থক তার দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে গাড়ির দরজাটা একটু জোরে বন্ধ করে পিছিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল "ঘরে ফিরে একটা ম্যাসেজ করে দিও।" অবশ্য মঞ্জিমার কান অবধি সেই কথাগুলো পৌঁছল কি না, তা জানতে পারল না। কাঁচের ওপারে থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।

(২)

"কী হচ্ছে কী পাপান? দেওয়ালটা এভাবে নোংরা করছ কেন? আমি কিন্তু এবার ভীষণ বকব?!"
এই ভীষণ বকুনির হুঁশিয়ারী পাপান আগেও শুনেছে। তবে আশকারার ভাগ কমতে কমতে ধমকটা এখন কড়া হচ্ছে আসতে আসতে। মা বকলেও পাপান হাসে। জিভ বার করে গাল চাটার চেষ্টা করে, অথবা জিভ উলটিয়ে ওপরে ঠোঁটে ঠেকিয়ে হাসে। হাসে... মায়ের নাগালের বাইরে সরে। কিন্তু এবারে বিরক্তি জন্মাচ্ছে শিপ্রার মনে। সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারছে না। পাপানের বাবা কিছুই বলে না। সব দায় শিপ্রার একার। আর ছেলেটা যত বয়স বাড়ছে তত অবাধ্য হয়ে উঠছে। যতই বাচ্চা হোক, এত অস্বাভাবিকতা কিসের! পাপানের খেলার ধরণ, সময় কাটানোর উপায়গুলো, এই অবাধ্য ভাবে হাসা... স্রেফ হেসে উড়িয়ে দেওয়া শিপ্রার শাসনকে - শিপ্রা মেনে নিতে পারে না। বিরক্তিটা সেখানেই। ধৈর্য হারানোর শুরুটা সেখানেই। এই ঘরে শিপ্রার কথার আর কোনও দাম নেই। ইচ্ছের দাম কোনওদিনই ছিল না। এখন শাসনেরও দাম নেই। একটা দু-তিন বছরের বাচ্চা... তার নিজের ছেলে... সেও হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে শিপ্রাকে!

অতনু একেবারেই গা করে না এসব। বলে "আরে বাচ্চাবেলা আমরা আরও বেশি বাঁদরামো করেছি! চৌবাচ্চায় হিসি করে দিতাম। পাঁচ টাকার নোট চিবিয়ে ফেলে দিয়েছি। ছাত থেকে রাস্তায় লোকের ওপর মগে করে জল ঢেলে দিতাম... তারপর..."
- থামো তুমি... আর নিজের বাঁদরামোর ইতিহাস শোনাতে হবে না! আশ্চর্য বাবা! আমি মরছি নিজের জ্বালায়... কোথায় ছেলেটাকে বারণ করবে, একটু শাসন করবে তা না...
- দূর, ও বেশি আটকাতে গেলে বেশি বেয়ারা হয়ে উঠবে। এসব ছেলেমানুষী খেয়াল... বোঝো না? দেখো এখন এসব নিয়ে মেতে আছে... ক'মাস পর...
- ওরম মনে হয়। কিচ্ছু নরমাল লাগছে না আমার। তুমি দেখতে পাচ্ছো না... সারা বাড়ি দেওয়াল জুড়ে কী করে যাচ্ছে?
- আহ্‌, আসতে বলো... মা ঘুমোচ্ছে পাশের ঘরে। উলটো বুঝবে।
- বুঝুক গে... আমি বলে দিচ্ছি তোমাকে... আমার কিন্তু একদম ভাল লাগছে না! শেষে অন্যরকম কিছু একটা...
কথাটা শেষ করতে না পেরে ঢোকে গিলে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল শিপ্রা। যেন গলা দিয়ে হাউ হাউ করে এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্নাটা বেরিয়ে আসছিল আর একটু হ'লে। প্রেসার কুকারের সিটি যেভাবে ছিটকে বেরিয়ে আসে... জমে থাকা বাষ্পকে মুক্তি দিতে। 'অন্যরকম' কথাটা শুনে অতনুরও ভুরু দু'টো কিছুক্ষণের কুঁচকে গেল। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল - "ধুর! কীই যে বলো! অন্যরকম... অন্যরকম আবার কি?! বলছি না, ও ছোটোবেলা বাচ্চারা এমন অনেকরকম করে। তোমার সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি... ধুর!"
কথাটা বলতে বলতেই ঘরে থেকে বেরিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল অতনু। একরকম পালিয়ে গেল শিপ্রার কাছ থেকে। যেমন মাঝে মাঝেই যায়... যেতে হয়।

বাথরুমের দিকে এগনোর পথে বারান্দার আলোটা জ্বালাতেই দেওয়ালগুলো চোখে পড়ল। দেওয়াল ভর্তি নানা রঙের বড় বড় গোল আঁকা। নানা মাপের, নানা রঙের, নানা রকমের গোল। পাপান এখন সার্কল, স্কোয়্যার, ট্রায়াঙ্গল - নতুন চিনছে। সেই কারণেই হয়ত এমন গোলগোল এঁকে যাচ্ছে। তবে অন্য কোনও জ্যামিতিক আকার নয়... শুধুই বৃত্ত। বারান্দা, বসার ঘর, শোয়ার ঘর, বাথরুম... এমন কি অতনুর মায়ের ঘরে ঠাকুরের সিংহাসনের কাছেও দেওয়ালে এমন নানা রকম গোল। কোনও কোনওটার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অতনু...
তিনটে বড় কালো গোল একে অপরের সঙ্গে লেপটে আছে মেঘের মত। আর তার থেকে ঝরে পড়েছে নানা রঙের ছোট ছোট গোল।
একটা গোলের ভেতর আর একটা গোল। অপটু হাতে আঁকা সমকেন্দ্রীয় বৃত্তের মত। তাদের ভেতরে সীমারেখা বরাবর ছোট ছোট লাল লাল বৃত্ত। ঠিক যেন হাঁ মুখের লাইন ধরে গোল গোল দাঁতের রেখা।
কোনও কোনও গোল হিজিবিজি রঙে ভর্তি করার চেষ্টা। কোনও কোনওটা খালি।
ওই টুকু বাচ্চা কি আর অত বুঝে, অত ভেবে কিছু করে? এসব বড় মানুষেরই মাথার চিন্তা। বাথরুমের ছিটকিনি ভেতর থেকে বন্ধ করে পাপানেরই আঁকা ক'টা ছোট-বড় গোলের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বোঝালো অতনু। আর সেই অন্য লোভটা উঁকি দিলো একবার - এমন বাচ্চারা অনেক সময় অন্যরকম প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। যাকে বলে ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস। পাপানকে স্কুলে ভর্তি করার সময় এসে যাচ্ছে।

ছেলেটা মাঝে মাঝে ঠাকুমার কাছে ঘুমোয়। অতনুর মায়ের ঘর থেকে শুধু সিলিং ফ্যানের শব্দ আসছে। দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। মাঝে মাঝে স্যাটিসফাইং কনজুগাল লাইফ জীবনের অনেক স্ট্রেস কমিয়ে দেয়। কিন্তু শিপ্রা যা কান্নাকাটি শুরু করেছে... আদৌ কোঅপারেট করবে কি না - ভাবতে ভাবতে এক একটা আলো নিভিয়ে শোয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল অতনু।

(৩)

- একটার ভেতর একটা অনেকগুলো কনসেন্ট্রিক সার্কল, আর তার ভেতর একটা বিন্দু। এটা ভাবলে ঠিক কিসের কথা মনে পড়ে বল তো?
- মমমম... টার্গেট?
- বুল্‌স আই! বাংলায় যাকে বলে - চাঁদমারি।
- হঠাৎ চাঁদমারির কথা?
- এইরকমই ইমেজগুলো কেমন একটা মোশনের হ্যালুসিনেশন তৈরী করে... লক্ষ্য করে দেখেছিস? কেমন যেন ঘুরছে... ঘুরতে ঘুরতে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে...
- হ্যাঁ, কিন্তু...
- হ্যাঁ... শুধু কতগুলো সার্কল কে একের পর এক সাজিয়ে। ভাব কি সাংঘাতিক একটা কাণ্ড করা যায়!
- কিন্তু তুই হঠাৎ এখন এসব বলছিস কেন?
- ওই আর কি... একটা সাইটে দেখলাম... বেশ অনেকগুলো অপটিকাল ইলিউশন। দেখে মনে পড়ে গেল।
- তাই বল। বুল্‌স আই কে যে বাংলায় চাঁদমারি বলে... আমি এটাই জানতাম না!
বলে হা হা করে হেসে ফেলল আলেখ্য। সার্থক হালকা মাথা নেড়ে হাত বাড়িয়ে রামের বোতলটা নিয়ে নিলো। আর একটা পেগ বানিয়ে নিলো নিজের জন্য। আলেখ্য এখনও আগেরটাই শেষ করেনি। একঢোক খেয়ে, হাতের মুঠোয় ক'টা বাদাম নাচাতে নাচাতে সার্থক বলল - "অথচ দেখ... প্রকৃতিতে এমন চাঁদমারি নেই। আছে বল? এরকম গোল, তার ভেতরে গোল... এমন একটা জিওমেট্রিক টার্গেট নেচারে আছে? কিন্তু প্রকৃতিতেও তো কত শিকারী, পাখিরা তো লক্ষ্যভেদের মতই টার্গেটের ওপর উড়ে আসে... তাহ'লে?
- তাহ'লে কি?
- তাহ'লে নেই কেন? হোয়াই? সত্যিই নেই... নাকি আমরা চিনতে পারি না?
- কে জানে... আর একটা ঢালি, মালটা এদিকে দে...
'স্ট্রেঞ্জ! তাই না?' বলতে বলতে রামের বোতলটা আলেখ্য'র দিকে গিয়ে দিলো সার্থক। 'এই যেমন ধর পদ্মপাতার মত পাতাগুলো, থালার মত গোল। জলের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে একটা সার্কুলার ওয়েভ প্যাটার্ন তৈরী হয়। তারপর ধর সূর্যমুখীর মত ফুলগুলো, এই যে ফুলের মাঝখানে ফ্লোরাল ডিস্ক। এরাও হয়ত কোনও না কোনও ভাবে টার্গেট... হ'তে পারে না?'
- পারিসও ভাই... কী সব বলে যাচ্ছিস। এত লেভেল নেই ভাই... ছাপোষা আইটি-ক্যারানী।
- এতে লেভেলের কী আছে? এগুলো তো স্কুলে থাকে...
- আর স্কুল... কলেজে কি পড়েছিলাম তা-ই মনে নেই কিছু।
- কিচ্ছু মনে নেই? কিছুই না?
- নাহ্‌! ধুস... কী হবে? চাকরি পেয়ে গেছি, মামলা খতম।
- মনে রাখবি না, কোনও কিছুরই মানে নেই... তাহ'লে এত খরচ করে পড়া কেন?
- পড়া কেন মানে? সবাই যে জন্য পড়ে... চাকরির জন্য। সবাই কি তোর মত নাকি! তোর সব মনে আছে?
আলেখ্য এক ঢোকে গ্লাসে যতটা ছিল সবটা গলায় ঢেলে দিয়ে ঠক করে খালি গ্লাসটা মেঝের ওপর রাখল। আর একটু জোরে রাখলে হয়ত ফাটল ধরে যেত কাঁচের গ্লাসে। সার্থক গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে রইল। গ্লাসের তলাটাও গোল। কোনও ফাটল ধরেনি। সেই দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করল সার্থক। তখনই কোনও উত্তর দেবে না বলেই ইচ্ছে করে জলের বোতল থেকে একটু জল খেলো। উত্তর দিলে সেটা প্রতিক্রিয়া হবে, আরও বাজে প্রতিক্রিয়া আসবে, আরও বাজে প্রতিক্রিয়া ফিরিয়ে দেবে সার্থক। জল খেয়ে কার্পেটের ওপর শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বলল 'সব... কোন জিনিসেরই বা সবটা থেকে যায়! ওই যা থাকে, যতটা থাকে। ওই নিয়েই...' সার্থকের কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা বিশ্রী আওয়াজ করে হেসে উঠল সার্থক, ঠিক পায়ু পথ দিয়ে শরীরের ভেতর জমে থাকা জৈব বায়ু সশব্দে বেরিয়ে এলে যেমন শব্দ হয়। সার্থকের কান দু'টো হঠাৎ লাল হয়ে গেল... ও বুঝতে পারলো কান দু'টো গরম হয়ে উঠেছে। মাথা তুলে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল যাতে আলেখ্যর দিকে তাকাতে না হয়। কিন্তু আলেখ্যকে এড়ানো গেল না, হাসিটা থামিয়ে বলল "এত মনে থেকেও তো পাতি বি টেক, আর সেই সাপোর্ট প্রোজেক্টে ঘষতে হচ্ছে। সালা এতদিনে একমাসের জন্যেও অনসাইট জুটল না। ভার্জিন পাসপোর্ট।" বলে আবার একই ভাবে আর একবার বিশ্রী শব্দ করে হাসল আলেখ্য। সঙ্গে সঙ্গে ডান পা'টা ছুঁড়ে উঠে পড়ল সার্থক। পায়ের কাছেই ছিল রামের বোতলটা, উলটে কার্পেটের ওপর গড়িয়ে গেল অবশিষ্ট রাম। সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না সার্থক। সোজা এগিয়ে গেল দরজার দিকে, পায়ে চটিটা গলিয়ে দরজা খুলে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। দরজাটা বন্ধ করল না, পেছন ফিরে আলেখ্যকেও দেখল না। আলেখ্যর সামনে রাখা থালাটা রামে ভাসছে... আলেখ্য হাঁ করে তাকিয়ে রইল খোলা দরজার দিকে। সার্থকের নিজের ঘর থেকেই সার্থক এমন ভাবে বেরিয়ে গেল, যেন অন্যের ঘরে বসে ছিল এতক্ষণে।

(৪)

- তোমার ড্রইং করতে ভাল লাগে?
- ডক্টর আঙ্কল কী জিজ্ঞেস করছে... বলো আঙ্কল কে? কী হ'ল?
- ইট'স ওকে... প্লিজ, আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন। আমি দেখছি তো... কি, মিঃ পাপান? ছবি আঁকতে ভাল লাগে তোমার?
ডঃ ইন্দ্রজিৎ গুপ্তর নামটা অতনুর অফিসের এক সহকর্মী সাজেস্ট করেছিল। খুবই ঘনিষ্ট সহকর্মী, নাহ'লে এই ব্যাপারে বেশি কিছু বলত না। আসলে পাপানের থেকেও বেশি অস্বাভাবিক লাগছে শিপ্রার এই রিয়্যাকশনগুলো। ছেলে যা করছে সবই অস্বাভাবিক লাগছে ওর। একটানা ফ্রাস্ট্রেটেড থাকতে থাকতে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে... আগে এমন ছিল না। অতনু বুঝতে পারছে না, কাউনসেলিংটা আসলে কার দরকার - পাপানের না শিপ্রার। কিন্তু অফিসে শিপ্রার কথাও বলতে পারলো না, পাপানের ব্যাপারেও না। শুধু একটু চেপেচুপে বলল - বাচ্চাদের কাউনসেলিং করে, এমন কেউ... পাপান আজকাল একটু বেশিই নিজের জগতে থাকে। কারও কথায় বেশি সারা দেয় না। মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলে... মনে হয় গল্প শোনাচ্ছে। অবাস্তব, অন্য জগতের গল্প। অথচ বলবে এমন করে যেন একদম এইটাই হয়েছে। ও নিজে দেখেছে। স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে... বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হবে শিগগির। এইসময় বাচ্চারা কল্পনার জগতে থাকে... ফ্যান্টাসি তো এদেরই জন্য। অথচ শিপ্রা এতটাই ইনসিকিওর্ড হয়ে পড়ছে পাপানের বিহেভিয়ারের জন্য যে অতনুকে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হ'ল। ছেলেটা ছোট, ওকে এক দুদিন কাউন্সেলিং করালে ক্ষতি নেই, অন্ততঃ শিপ্রা বুঝুক। এখনও ডঃ গুপ্ত আর শিপ্রাকে দেখতে দেখতে এই চিন্তাগুলোই করছিল অতনু। যা কথা বলার শিপ্রা বলছে। ডঃ গুপ্ত একই সঙ্গে পাপান আর শিপ্রাকে যেন অ্যানালাইজ করে যাচ্ছেন। শুধু অতনুকে কিছু জিজ্ঞেস করলে অতনু উত্তর দিচ্ছে। এই ঘরে আসার পর, এত কথা শোনার পর বুঝতে পারছে - অতটাও উদার হয়নি অতনুর মন। কাউনসেলিংকে আর সবাই যা ভাবে, অতনু তার থেকে খুব একটা আলাদা কিছু ভাবে না।
পাপান ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিলো হ্যাঁ, তারপর রঙিন পেপারওয়েট-টার চারিদিকে আঙুল বোলতে বোলাতে বলল - "আর কালার করতে, আর ছবি দেখতে।
- ভেরি গুড! আমার ফেভারিট কালার গ্রীন... তোমার?
- আমি তো সব কালারসই ইউজ করি। রেড, ব্লু, পার্পল...
- হা হা হা... আর ছবি? বার্ডস, ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল্‌স, ফিশ, সিনারি...
"না", শুধু একটা না বলে শিপ্রার দিকে তাকালো পাপান। শিপ্রা একবার ওকে আর একবা অতনু দেখল, তারপর বলল "বুঝতে পারছি না, ডাক্তার বাবু... ও কি ছবির কথা বলছে... কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।"
ডঃ গুপ্ত দেওয়ালে টাঙানো একটা পেন্টিং-এর দিকে দেখিয়ে বলল, "তাহলে কী রকম? এরকম?" পাপান সেদিকে ঘুরে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল "না না... এগুলো তো কাগজের ওপর আঁকা... এরকম না।"
- তাহ'লে কীরকম?
- উঁচুনিচু, গোল গোল, রঙিন, কথা বলে... ওড়ে... ভাসে...
- কথা বলে? ছবি কথা বলে?
শিপ্রা ফুঁপিয়ে উঠে মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে কান্নাটা আটকালো। চোখদুটো ছলছল করে উঠল। ডঃ গুপ্ত সোজা হয়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিপ্রাকে বললেন, "দেখুন, আপনারাই যদি এইরকম আপসেট হন, এইভাবে এক্সপ্রেস করে ফেলেন... তাহ'লে কেমন করে চলবে বলুন তো? " তারপর হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে পড়ে বললেন, "আচ্ছা পাপান, তুমি অ্যাকুয়ারিয়াম দেখেছ? লেট'স গো... ফ্যান্টাস্টিক একটা জিনিস দেখাই তোমাকে। এসো আমার সঙ্গে।" পাপানকে প্রায় হাত ধরে তুলে নিজের সঙ্গে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলেন ডঃ গুপ্ত। অতনু আর শিপ্রাকে শুধু ইশারা করে বললেন শান্ত হয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে। পাপানও লক্ষ্মী ছেলের মত চলে গেল, কোনও জেদ করল না। ওরা বুঝল, ডাক্তার গুপ্ত ছেলের সঙ্গে আলাদা ভাবে একটু কথা বলতে চান... যা ওদের সামনে পারছেন না। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই অতনুর দিকে ঘুরে শিপ্রা ফুঁপিয়ে উঠে বলল "ছেলেটাকে এভাবে কেন নিয়ে গেল? নিশ্চয়ই প্রবলেমটা বুঝতে পেরেছে... না গো?"
- প্রবলেম কি বুঝেছে জানি না। কিন্তু তুমি যা কান্নাকাটি করে যাচ্ছো... তাতে কিছু জিজ্ঞেস করাই মুশকিল। ওনার অসুবিধে হচ্ছিল এটা আমি বুঝতে পেরেছি।"
- আমি ওর মা... ওর মা আমি! আমার কনসার্ন থাকবেই!
- এনাদের দরকার হয় একটু নিজেদের মত করে অবজার্ভ করার, কথা বলে বোঝার চেষ্টা করার। কী করবে বলো? পাপানের মাথার মধ্যে ঠিক কী চলছে তা ওর সঙ্গে ইনটারঅ্যাক্ট না করে তো...
- বুঝেছি... সামনে আরও চ্যালেঞ্জিং সময়...
এই অবধি বলে চুপ করে গেল শিপ্রা। ব্যাগ থেকে রুমালটা বার করে মুখ-চোখ ভাল করে মুছে নিল। টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে তাকিয়ে রইল ডাক্তারের ফাঁকা চেয়ারটার দিকে। মনে হ'ল শিপ্রা একা... অতনু ঘরেই নেই।

কিছুক্ষণ পর আবার দরজার শব্দ হ'ল, ডঃ গুপ্ত ঢুকেই বললেন "ম্যাডাম... আপনার ছেলে অ্যাকুরিয়ামের মাছ দেখে দারুণ মজা পেয়েছে! একবার গিয়ে দেখুন, ডাকছে আপনাকে! গোল্ড ফিশ, অ্যাঞ্জেল ফিশ... সব আপনাকে দেখাবে!" বলে হেসে উঠলেন। অতনু জানে, শিপ্রাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার এটা একটা ব্যবস্থা। শিপ্রা একটু অবাক হয়েই একবার ডাক্তারের দিকে আর একবার অতনুর দিকে তাকালো। ডঃ গুপ্ত বললেন, "কী হ'ল মিসেস বসু? যাআআআন... পাপান ওয়েট করে আছে, আসুন দেখুন কী করছে আপনার ছেলে!" বলে দরজাটা খুলে বাইরের দিকে দেখিয়ে একটা ইঙ্গিত করল... যেন পাপান কী করছে দেখা যাচ্ছে ওখান থেকে। একটা অনিচ্ছা নিয়েই শিপ্রা উঠে গেলো দরজার দিকে, মনে হ'ল বুঝতে পেরেছে। শিপ্রা দরজার বাইরে যেতে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে দিলেন ডঃ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। তারপর পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে অতনুকে দিলেন। অতনু সেই কাগজটা খুলে তাকিয়ে আছে দেখে বললেন - "আপনার স্ত্রীয়ের সামনে কাউনসেলিং করাটা চ্যালেঞ্জিং। ইনফ্যাক্ট... "
- ইনফ্যাক্ট?
- মানে... উনি নিজেই মানসিক ভাবে খুব দুর্বল। যা বলব তাতেই বিচলিত হয়ে পড়বেন... অথচ...
- অথচ?
- অথচ... আই মিন... ব্যাপারটা অতটাও কমপ্লেক্স কিছু নয়। বাচ্চাদের এমন হয়। শিশুমনে ফ্যান্টাসি কখন কী চেহারা নেয়... একদম নরম মাটির তাল মনগুলো... বুঝলেন তো?
- হুম... তাহ'লে এখন কী করব?
কেমন একটা দিশেহারা লাগল অতনুর এই প্রশ্নটা। অতনুর নিজের কানেই প্রশ্নটা খুব হোপলেস লাগল। অনেকটা 'দেন হোয়াট নেক্সট?' এর মত।
ডঃ গুপ্ত বললেন "ওর মা'কে বলবেন সব ঠিক আছে। নাথিং ইজ রঙ উইথ দ্য কিড। বাচ্চারা এমন অনেক কিছু করে। সবাই সবটা অবজার্ভ করে না, কেউ কেউ করে। ইন ফ্যাক্ট, আমিই ওনাকে এটা বুঝিয়ে দেবো। আপনি শুধু... একটু অবজার্ভ করবেন। আর কাল সন্ধের দিকে আমাকে একটা কল করবেন প্লিজ। হয়ত আপনার সঙ্গে একটা ওয়ান টু ওয়ান অ্যাপয়েন্টমেণ্ট সেট করতে হ'তে পারে। কিছু জিনিস অবজার্ভ এবং নোট করার থাকে, রুটিন টাস্ক। আপনাকেই করতে হবে। ওরা এখনই এসে যাবে, আমি একেবারেই আপনার স্ত্রীর সামনে এই ব্যাপারগুলো ডিসকাস করতে চাই না। আর এই কাগজটা একটু সামলে রাখুন... পরে দরকার লাগতে পারে।"
বলতে বলতেই খট করে দরজা খোলার শব্দ হ'ল। পাপান একটা কাগজের নৌকোর মত কিছু হাতে নিয়ে ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ল। পেছন পেছন শিপ্রা, আজ বোধহয় এই প্রথম হাসতে দেখল ওকে অতনু।
ডঃ গুপ্তর রিসেপশনিস্ট মেয়েটি টেবিলে রাখা লিফলেট দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে নৌকোটা। সবুজ, সাদা, লাল... এই তিনটে রঙ চোখে পড়ছে। শিপ্রা ঘরে ঢুকেই অতনুর দিকে তাকালো চোখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে। অতনু কিছু বলার আগে ডঃ গুপ্ত সামলে নিয়ে বললেন "একদম কিচ্ছু চিনতে করবেন না। সব ঠিক আছে। বাচ্চারা এমন কত কিছু করে। কত রকম কেস আসে আমাদের কাছে... এগুলো খুব নর্মাল ম্যাডাম। পাপান দারুণ ইন্টেলিজেণ্ট। একটু চুপচাপ হলেও... অনেকটা রঙিন প্রাণশক্তি ওর ভেতরে খলবল করছে জ্যান্ত মাছের মত!" পাপান ততক্ষণে ডাক্তারের টেবিল থেকে একটা পেন তুলে নিয়ে নৌকার গায়ে আঁকতে শুরু করেছে। টাটকা ফুটে ওঠা দু-তিন রকমের লাল বৃত্তগুলোকে দেখতে দেখতে অতনু ওর হাতের মুঠোয় রাখা কাগজটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল... শিপ্রার নজর ওই কাগজটার ওপর পড়ার আগেই।

(৫)

- হ্যা-হ্যালো... সার্থক?
- না... আপনি কে বলছেন?
- এ-এটা তো সার্থকেরই নাম্বার? আমি মঞ্জিমা'র বাবা বলছি... মঞ্জিমা... সার্থকের বন্ধু।
- হ্যাঁ, সার্থকেরই নাম্বার... কিন্তু ও নেই। কী বলতে হবে বলুন?
- নেই মানে? কোথায় গেছে?
- আউট অফ স্টেশন... কাজে গেছে। লোকাল সিমটা আমাকে দিয়ে গেছে অ্যাক্টিভ রাখার জন্য। কেন, কিছু জানাতে হবে?
- ওর নাম্বারটা একটু দিতে পারো?
- কেন... কী হয়েছে? ডিটেল্‌স না জেনে...
- আরে কী ডিটেল্‌স ডিটেল্‌স করছ? চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেলো আমার মেয়েটার কোনও ট্রেস নেই... দীপ্তর সঙ্গেও যায়নি। এতবার ট্রাই করার পর সার্থকের নাম্বার লাগলো, সেও নেই... মিসিং কমপ্লেন...
মঞ্জিমার বাবার কথাগুলো আর শুনতে ইচ্ছে করছিল না... ফোনটা কেটে দিলো... তারপর সুইচ অফ করে দিলো সার্থক।


মঞ্জিমা নিজের ইচ্ছেতেই সার্থকের ফ্ল্যাটে এসেছে। কোথায় যাচ্ছে বাড়িতে জানায়নি। সার্থকের কাছে এলে জানায় না। ওরা মাঝে মাঝে আগেও এমন এক-দু দিন একসঙ্গে থেকেছে... বাড়িতে জানে না। জানানো হয় না। সার্থক জানে, আর্থিক কারণে হোক অথবা সার্থকের অ্যাম্বিশনহীনতা... মঞ্জিমার বাড়ির স্ট্যাড়াস মাপার যন্ত্র সার্থকের সামনে ধরলে লাল আলোটাই জ্বলবে। তাই দুজনেই আর এই নিয়ে ঝামেলা বাড়ায় না। সার্থক এও জানে, মঞ্জিমা বেছে নেবে বাপির ভাল লাগা দীপ্তকে... কারণ দীপ্ত স্টেট্‌স-এ ওয়ার্ক পারমিট আছে। অথবা দীপ্তর মত বা তার থেকেও বেটার প্রস্পেক্টের কোনও ছেলেকে। কিন্তু সার্থককে ও চাইলেই ভুলতে পারবে না। বা বলা ভাল... সার্থর অভ্যেসটা কাটিয়ে উঠতে পারবে না চট করা। এই মাঝে মাঝে একসঙ্গে থাকার অভ্যেস... বিছানায় নির্মাণ-বিনির্মাণের অভ্যেস। মঞ্জিমার ভেতরে একটা অন্য মঞ্জিমা আছে, যার কাছে সার্থক একটা নেশার মত। মধ্যবিত্ত মানসিকতার পরিবারে উচ্চাকাঙ্ক্ষা চেটে খাওয়া মনের ভেতর এমন অনেক নেশার স্পৃহা ঘুমিয়ে কিংবা ঝিমিয়ে থাকে... এটা সার্থক বুঝতে পারে। হাসে। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও অন্তরে। মঞ্জিমা যখন এই ভাবে কাউকে না জানিয়ে চলে আসে, তখন ওর বাপির ওপর, দীপ্তর ওপর করুণা হয় সার্থকের। একে নিয়ে বাইরে চলে গেলে সার্থকের থেকে দূরে যেতে পারে... কিন্তু নেশা? নেশাটা তো ঠিক সার্থককে পাওয়ার নয়। নেশাটা মঞ্জিমার নিজস্ব। ও যা চায়, তা দীপ্তর থেকে না পেলে কী করবে সেখানে? ইন্টারেস্টিং... ভেরি ইন্টারেস্টিং!

একেবারে কলেজ জীবন থেকে সার্থকের কতজন বান্ধবী ছিল তা মঞ্জিমার জানা নেই। সার্থক সে সব প্রসঙ্গেই যায় না। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা পরিণত ছেলের জীবনে সম্পর্ক আগেও এসে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। দুর্বলতাও থাকতে পারে কারও প্রতি, সফ্ট‌ কর্নার। হয়ত বা এক তরফাই। তেমন মঞ্জিমার জীবনেও কি কেউ আসেনি? নিশ্চয়ই এসেছে। ওরা দু'জনই দু'জনকে এড়িয়ে গেছে এই ব্যাপারগুলো। ওই ওপর ওপর... নিজেদের ব্যক্তিগত কথা ভাগ করে নেওয়ার বাহ্যিক খেলা। আসলে মুহূর্তের আনাচে কানাচে থেকে যাওয়া অনেক কিছুই সেভাবে বাইরে আসে না। সেসব নিয়ে টানাটানি করাও একরকম অপরিণত ব্যাপার। কেমন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামীর মত মনে হয় নিজেদের। যেন কৈফিয়ৎ দিতে হচ্ছে সম্পর্কের দোহাই দিয়ে।
এইসব কিছু কাটিয়ে দুজনে কেবল দুজনের সঙ্গে থাকতে ভাল লাগাকে গুরুত্ব দিয়েছিল, একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারাকে প্রাধান্য দিয়েছিল। কিন্তু এখন থেকে গেছে মঞ্জিমার অ্যাম্বিশন আর নেশা। সার্থকের যে কি থেকে গেল, তা ও ঠিক করে বুঝতেই পারে না। কি চায় আর কি থেকে যায়... এইটা ছোটবেলা থেকেই পদে পদে বিভ্রান্ত করেছে সার্থককে। আমাদেরও অনেক কে করে, মাঝে মাঝেই করে... তাই না?

সন্ধে নেমে গেছে বলে বাইরেটা অন্ধকার। ল্যাম্পশেড থেকে ছড়িয়ে পড়া ঝিম ধরা আলোয় হুইস্কির অর্ধেক ভর্তি বোতল, আর খালি গ্লাসগুলো দেখলে বিদেশী সিনেমার দৃশ্য মনে হয়। গ্লাসের মায়াবী শূন্যতা থেকে ফোকাস শিফট করলেই ঘুমন্ত মঞ্জিমার মুখ। ঘুমের মধ্যেও লালচে পুরু ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক করে আছে। দুপুর থেকে বিকেল অবধি তিন বার অর্গাজমের পরেও ঘুমের মধ্যে কিছু খুঁজে যাচ্ছে এখনও তন্ন তন্ন করে। নিঃশ্বাসের ওঠা পড়া অভিজ্ঞ চোখকে অনেক কিছু বলে দেয়। এভাবে বাড়িতে না বলে কোথাও চলে গেলে ওর বাড়ি থেকে ওকে ফোন করে। ফোন করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর ওকে না পেলে এক এক করে ওর পরিচিতদের। কাউকে পেলো না, এমন কখনও হয় না। ও জানে বাপি ফোন করতে পারে, মিথ্যেও তৈরী থাকে। কিন্তু জানে না, যে ফোন করেও পায়নি। আর এই ফ্ল্যাটটাও সার্থক ক'মাস আগে ভাড়া নিয়েছে... এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা মঞ্জিমার পরিবারে কারও জানা নেই।

(৬)

শিপ্রা ঘুমিয়ে পড়লে আজকাল একটু শান্ত লাগে সব কিছু। তখনই মনোযোগ দিয়ে কোনও কাজ করতে পারে অতনু। ছেলেটার থেকেও বেশি দুশ্চিন্তা হয় ওর মা'কে নিয়ে। মিছিমিছি প্যানিক করতে করতে কেমন একটা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন! অতনুরও দুশ্চিন্তা হয়, কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। স্বাভাবিক রাখতে পারে। মনের ভেতর কেউ একটা বলে... দুজনে একসঙ্গে প্যানিক করলে হবে না। বাবা-মা একটা সংসারের চালকের মত। কাউকে না কাউকে স্টিয়ারিং ধরতেই হবে। দুজনেই প্যানিক করলে দুর্ঘটনা অবধারিত!

শিপ্রা ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে, পাপান আজ শিপ্রার পাশেই... দুজনেই ঘুমে অচেতন। অতনু ঘরের আলো না জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। বসার ঘরে গিয়ে একটা চেয়ারের ওপর বসল, তারপর টর্চের আলো জ্বালিয়ে পকেট থেকে কাগজটা বার করল... ডঃ গুপ্তর দেওয়া কাগজটা। এর আগেও দেখেছে। একা থাকলে, মাঝে মাঝে উলটে পালটে দেখে... বোঝার চেষ্টা করে ছবিটার মধ্যে কী এমন আছে? পাপানের আঁকা ছবি। সেদিন ডঃ গুপ্তর সঙ্গে অ্যাকুয়ারিয়ামের সামনে দাঁড়িয়েছিল, ওইটুকু সময়ের মধ্যেই পাপানকে দিয়ে ডাক্তার আঁকিয়ে নিয়েছেন। পাপান এঁকেওছে! ওই অল্প সময়ের মধ্যেই। ডঃ গুপ্ত নাকি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন পাপানের অ্যাকুয়ারিয়াম দেখে বা মাছ দেখে আঁকতে ইচ্ছে করছে কি না। টর্চের আলোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে যাচ্ছিল অতনু - পাতা জুড়ে একটা বৃত্ত। নিখুঁত নয়, খালি হাতের বৃত্ত, যার দুটো প্রান্ত মেলে নি... বৃত্তের ব্যাসও সব দিকে সমান নয়। তবে বোঝা যায়, একটা বড় মাপের গোলই আঁকতে চেয়েছে পাপান। অথচ অতনুর খুব ভাল মনে আছে, ওয়েটিং রুমে রাখা মাঝারি মাপের অ্যাকুয়ারিয়ামটি লম্বা চারকোণা, যাকে বলে কিউবয়েডাল... মোটেই গোল নয়। তার ভেতর বিভিন্ন মাপের অনেকগুলো বৃত্ত - মাঝারি, ছোট, আরও ছোট, খুব ছোট। সব থেকে ছোটগুলো নুড়ি-পাথর... নিচের দিকে। মাঝারি আর ছোটগুলো ভাসতে ভাসতে ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে.. বুদবুদ। আর তাদের মাঝে মাঝেই ভেসে যাচ্ছে মাছ। মাছগুলো গোল নয়। একদম মাছেরই মত। পাখনা, ল্যাজ... অপটু হাতে আঁকা হলেও মাছ বলে ভালই চেনা যায়। মাছের আঁশের জায়গায় ক্রস ক্রস করা... যেমন কাটাকুটি খেলায় এক্স এর মত ক্রস বসে, সেরকম। তিনটেই মাছ। একটা মাছের মুখ থেকে গোল গোল বুদবুদ উঠে যাচ্ছে। একটা মাছের মুখ থেকে ক্রস উঠে যাচ্ছে। আর একটা মাছের মুখ থেকে গোল আর ক্রস দুটোই। এইটাই সব থেকে অদ্ভুত লাগে অতনুর। ও বুঝতে পারে না, পাপান কেন এমন এঁকেছে। ডাক্তার গুপ্ত কি বুঝেছেন, বা বুঝতে চাইছেন বলেই রেখে দিতে বলেছেন ছবিটা? আবার কিছু আঁকতে বলবেন কিছুদিন পর?

অতনুরও বাতিকের মত হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে আঁকা কাগজটা দেখা... বোঝার চেষ্টা করা। এও কি একরকম প্যানিক? ডঃ গুপ্তর সঙ্গে ফোনে কথা হয়... চেম্বারে বসেও কথা হয়েছে দু'বার। উনি কেবল নজর রাখতে বলেছেন, এবং ওনাকে খুঁটিনাটি জানাতে বলেছেন। মূল মন্ত্রই হ'ল পাপানের সঙ্গে একদম স্বাভাবিক থাকা, ও যা করছে করতে দেওয়া... যতক্ষণ না অস্বাভাবিক রকম আচরণ করে কিংবা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পাপান ভায়োলেণ্ট হয় না, অ্যাংকসাইটির লক্ষণ নেই, চুপচাপই নিজের মনে থাকে। স্কুলের পড়া পড়ে, টিভি দেখে... আর খাতা পেন্সিল কিংবা রঙ পেলে আঁকে... আগের মত দেওয়ালে আর আঁকে না অত। কমিয়ে দিয়েছে। অতনু ঠিক করেছে এবারে দেওয়ালগুলো নতুন রঙ করাবে, যাতে দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলোও বিদায় হয়। এই ছবিগুলোই শিপ্রাকে আরও উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দেয়। পাপানের আঁকার খাতা, আরও যেখানে যেখানে অতনু ওকে আঁকতে দেখে... সেগুলো সকলের অজান্তেই নজরে রাখে। দরকার পড়লে ডঃ গুপ্তর কাছে এইগুলো নিয়ে যেতে হ'তে পারে। যদি উনি কিছু প্যাটার্ন বুঝতে পারেন। তবে উনি আশ্বাস দিয়েছেন... পাপানের ব্যাপারটা এমন কিছু না। চাইল্ড সাইকোলজিতে ফ্যান্টাসি, এক্সপ্রেশনিজম, ম্যাজিকাল রিয়েলিজম... এইসব অনেক শেডে ধরা পড়ে। এই যাদুবাস্তবের জগৎ ওরা নিজেরাই নির্মাণ করে, নিজেরাই বিনির্মাণ করে। কিন্তু উনি একই সঙ্গে জানতে চাইলেন, পরিবারে কোনও মানসিক ভারসাম্যহীনতা, বা মানসিক ব্যাধির পাস্ট হিস্টরি আছে কি না। যদিও রুটিন প্রশ্ন, অতনুও জানায় নি... শিপ্রার বিরানব্বই বছরের ঠাকুমা যিনি স্বামী এবং বড় মেয়ের একইদিনে মৃত্যু হওয়ার পর থেকেই নিজের মনে বিড়বিড় করেন, অতনুর কাকা যিনি একসময় বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান, তারপর অতনুর নিজের দিদি যে আজকাল খেয়ে ভুলে যায় - আসলে এদের ব্যাপারে কিছু বলতে সাহস পেলো না। এগুলো সব আলাদা ঘটনা, একে ফ্যামিলি হিস্টরির প্যাটার্ন দেওয়া যায় না। অতনু নিজেই সাত-পাঁচ ভেবে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছে। তবে পাপানের থেকেও বেশি চিন্তা শিপ্রাকে নিয়ে হচ্ছে আজকাল। ডঃ গুপ্তও দ্বিতীয়দিন দেখা করার সময় বললেন - "আপনার স্ত্রীকে সব সময় বোঝানোর চেষ্টা করবেন, পাপান একদম ঠিক আছে। উনি যেন কোনও ভাবেই নেগেটিভ কিছু চিন্তা না করেন। মায়েরা একটু বেশি ভাবেন, প্যানিক করেন... বুঝতে পারছেন তো?" এই 'বুঝতে পারছেন তো?'র মধ্যে বাড়তি জোর, আর একটা সতর্কবাণী আছে... তা উনি সরাসরি না বললেও অতনু আঁচ করতে পারছে। চিন্তাটাও সেখানেই।

(৭)

মঞ্জিমা এখনও গভীর ঘুমে... আচ্ছন্ন। হুইস্কি, গাঁজা, শিৎকার... সব নেশার ককটেল। ও কি এখানে একটা 'হঠাৎ স্বাধীনতা' খেতে আসে? ঠিক যেমন বড় রেস্তোরাঁতে একদিন গিয়ে কেউ কেউ টাকা খরচ করে পছন্দের খাবার খায়, কিংবা বুফে, গ্রিল-তন্দুর? তারা জানে - রোজ আসা হবে না, তাই যখন আসে যতটা পারে মনের খিদে মিটিয়ে নিতে চায়। যত রকম ভাবে সম্ভব। মঞ্জিমাকেও অনেকটা সেরকমই মনে হয় সার্থকের। কিছুদিন আগে দুপুরবেলা রেস্তোরাঁতে বসে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলো যে তার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরী আছে। আর এখন সন্ধেবেলা, এইভাবে নেশাতুর ঘুম। অথচ মঞ্জিমাকে কি ওর অবস্থান থেকে এতটুকু সরেছে? না। এ যেন এক অদ্ভুত খেলা। অনুনয়-বিনয় করে প্রেম-ভিক্ষার কৌশলে সার্থক একেবারেই অপটু... অথচ এইরকম একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলায় যেন ওর কাছে হারতে আসে মঞ্জিমা। প্রপেলারের মত ঘুরতে ঘুরতে সার্থকের জিভ ভেসে চলে ওর মধ্যে, মঞ্জিমার যোনি হয়ে ওঠে ঝঞ্ঝাপ্রিয়া সমুদ্র। সৈকতের চুল শক্ত করে মুঠোয় ধরে থাকে মঞ্জিমা, ভেসে থাকার চেষ্টায়।

ঝড় থেমে গেছে অনেকক্ষণ, শান্ত ঢেউ গুণছে মঞ্জিমা চোখ বন্ধ করে। ধীরে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। চাদরের নিচে নির্মোক উষ্ণতা। সার্থক কোনও রকম শব্দ না করেই হুইস্কির গেলাস দুটো ভাল করে ধুয়ে ব্যাগে ভরে নিলো। নিজের ব্যবহার করা ছোটখাটো সবই ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে। জামাকাপড় সামান্যই ছিল তাও গোছানো হয়ে গেছে। হুইস্কির বোতলে এখনও খানিকটা আছে, সেটা টয়লেটে খালি করে ফাঁকা বোতলটা ব্যাগে ভরে নিলো... রাস্তায় কোথাও নর্দমায় বা ঝোপেঝাড়ে ফেলে দিলেই হবে। ব্যবহার করা কণ্ডোমগুলো অনেক আগেই টয়লেটে ফ্লাশ করা হয়ে গেছে। আজ রাতেই মুম্বাইয়ের ফ্লাইট, সেখান থেকে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট। অফিস থেকে অনসাইট নয়... একেবারে ফ্র্যাঙ্কফুর্টেই নতুন চাকরিতে জয়েন করতে যাচ্ছে সার্থক। মঞ্জিমা জানে না। ইচ্ছে করেই জানায়নি। বাথরুম, রান্নাঘর ভাল করে দেখে নিয়ে মঞ্জিমার মোবাইল ফোনটা আর একবার অন করলো সার্থক। ফ্লাইট মোড করে দিলো। তারপর যে নতুন ফোন নম্বরটা থেকে মঞ্জিমার সঙ্গে ইদানিং কথা বলছিল, তার কনট্যাক্ট নামটা আপডেট করে লিখে দিলো 'আলেখ্য'। বাড়ির মালিককে ঐ নামটাই বলেছে ভাড়া নেওয়ার সময়। ভুল নাম, ভুল ঠিকানা, ভুল ছবি সমেত নকল পরিচয়পত্র বানানো আর তার ফটোকপি বানিয়ে কাউকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেওয়া বেশ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা... এরকম প্যালপিটিশন মেয়েদের হোস্টেলে রাতের বেলা ঢুকেও হয়নি সার্থকের। আর ফটোকপির সেই ছবি দেখেও সার্থককে চেনার উপায় নেই, এমন অবস্থা। আসলে ছবিটা ওর মত দেখতে অন্য কারও মুখের, অনেকটা রোগা আর অল্পবয়সী, একটু ভাল করে দেখলে সার্থকের রোগাবেলা মনে হ’তে পারে। তবে এই ফটোকপিতে তাও উদ্ধার করা যায় না। কনট্যাক্টে নামটা বদলে দিয়ে, বেছে বেছে পুরনো কিছু কল আর ম্যাসেজ ডিলিট করে দিলো। ম্যাসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপেরও সব কিছু মুছে দিলো সযত্নে। সার্থকের আর কোনও ট্রেস নেই ফোনে। আবার সুইচ অফ। সব কিছু মিটমাট করে ট্রলিটা দরজার কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখ পড়ে গেল দেওয়ালের দিকে। মা-বাবার ছবিটা নামানো হয়নি। এটাই সার্থকের মা-বাবার শেষ একসঙ্গে তোলা ছবি, যেখানে দু'জনেই হাসছে। সার্থক তখন স্কুলে পড়ে... ক্লাস ফাইভ... মা-বাবা'র বিবাহবার্ষিকীতে তোলা। এমন করে হাসতে আর মা'কে দেখেনি সার্থক। কেমন একটা সংশয় আর নিরাপত্তাহীনতায় একটু একটু করে ক্ষয় হয়ে গেল মানুষটা। কেন যে সার্থককে নিয়ে ভয় পেতো, বাবাকেই বা কেন এত সন্দেহ করত... কিছুতেই বুঝতে পারত না। শেষের দিকে খালি ভাবত সবাই ষড়যন্ত্র করছে... সার্থকের মা'র থেকে সব কিছু আড়ালে রেখে, সবাই এক গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে আছে! সবাই বলে অ্যাক্সিডেণ্ট, তবে সার্থক জানে... মায়ের সেদিন পা পিছলে ভারসাম্য হারায়নি, ছাতের পাঁচিলের অত ধারে দাঁড়িয়ে কারও ওইভাবে পা পিছলোতে পারে না! ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছবিটা নামিয়ে নিলো সার্থক। ট্রলির বাইরের জিপটা নিঃশব্দে খুলে তার ভেতর ঢুকিয়ে নিলো। এরপর এয়ারপোর্টে পৌঁছতে দেরি হবে। গাড়ি পাওয়াও একটা বড় কাজ। স্কুটার নিয়ে এয়ারপোর্ট যাওয়া যায় না। ওটা বাড়িতে বাবার কাছেই রেখে এসেছে, ফ্ল্যাটে আনেনি।

মঞ্জিমার হুইস্কির শেষ পেগটাতে ঘুমের ওষুধের দুটো বড়ি ছিল, এই গভীর ঘুম অন্ততঃ আরও ঘণ্টা চারেক চলবে, কিংবা তারও বেশি। কোনও আওয়াজে বা অন্য কোনও ভাবে ঘুম ভাঙলে শুরু হবে হ্যাং ওভার আর মাথা ব্যথা। যদিও, নেশার কোনও চিহ্নই আর ঘরে নেই... শুধু মঞ্জিমা আর ওর রক্তের স্রোতে বয়ে যাওয়া অবশেষ ছাড়া। আর মোবাইল ফোনের চার্জের যা অবস্থা, ততক্ষণে শেষ। চার্জার নেই ঘরে। চার্জ দেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থাও নেই। মঞ্জিমা কী ভাবে ঘর থেকে বেরনোর জন্য এদিক ওদিক হাঁতড়াচ্ছে, দরজা খোলার চেষ্টা করে প্যানিক করছে, জানলা খুলে চিৎকার করছে সাহায্যের জন্য... ঘরে তন্নতন্ন করে খাবার জল না পেয়ে রান্নাঘরে গিয়ে কলের জল খাচ্ছে... এগুলো একসঙ্গে ভেসে উঠল সার্থকের চোখের সামনে। বিভ্রান্ত, বিধ্বস্ত, হেরে যাওয়া মঞ্জিমার উলঙ্গ শরীর সারা ঘরে ছটফট করে ছুটছে বেরনোর জন্য... উলঙ্গই, কারণ ওর জামাকাপড়গুলো একবালতি জলে চুবিয়ে দিয়ে এসেছে। পরার মত আর কিছুই নেই, দরজা-জানলার পর্দা ছাড়া। এখানে খুব অল্প জামাকাপড়ই এনেছিল বাড়ি থেকে, তাও সঙ্গে করে ট্রলিতে নিয়ে নিয়েছে। পর্দা জড়িয়েও যদি মঞ্জিমা ছুটোছুটি করে... দারুণ ব্যাপার! কোনও এক তলানিতে এখনও অনুভূতির অবশেষ কিছু আছে বলেই হয়ত আরও আরও বেশি করে ঘুমের ওষুধ মেশাতে পারল না সার্থক। কিন্তু ছটফট ওকে করতেই হবে, যতক্ষণ না কেউ এসে ঘর থেকে বার করে। এইসব ভাবতে ভাবতে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করতে গেল সার্থক... আর ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে ওর বাবারকন্ঠস্বর শুনতে পেলো - "এভাবে যাস না পাপান, সারা ঘরে... চারিদিকে তোর আঁকা ছবিগুলো রয়ে গেছে।" থমকে দাঁড়ালো সার্থক, ভাল করে শোনার চেষ্টা করল, আবার শুনতে পেলো - "এটা পারফেক্ট ক্রাইম হচ্ছে না বস... পুরো ঘেঁটে আছে। বাজে কেস খাবি পুরো!"... এটা আলেখ্যর গলা! এই প্রথম একটু নার্ভাস মনে হ'ল নিজেকে। সার্থক কপালের ঘামটা মুছে দরজা খুলে ভেতরে তাকাতেই চমকে উঠল - বাবা আর আলেখ্য দুজনেই ঘরের ভেতর! একটু আগে যে চেয়ারটা খালি পড়ে ছিল... সেখানে অতনু বসে আছে, চোখে সেই পরিচিত বিষন্নতা নিয়ে, শিপ্রা চলে যাওয়ার পর শুধু এই বিষন্নতাই রেখে গেছে ওর জন্য। চারপাশে ঘরের দেওয়ালগুলো দেখতে দেখতে বলল - "রান্নাঘর, বাথরুম, শোয়ার ঘর... সব দেওয়ালে দেওয়ালে তোর আঁকা ছবিগুলো কী হবে পাপান? ওরা যে ঠিক চিনে ফেলবে?!" আর দেওয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে আছে আলেখ্য। সার্থককে এভাবে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে খাটের দিকে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল "এতদিন ধরে ইংলিশ থ্রিলার মারিয়ে এই তোর পারফেক্ট ক্রাইম?!"
ট্রলিটা বাইরেই রয়ে গেছে, কাঁধের ব্যাগটাও থপ করে মাটিতে পড়ে গেল। সার্থক ফ্যাল ফ্যাল করে খাটের দিকে তাকালো। সেখানে এখনও মঞ্জিমা নিশ্চিন্তে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। একই রকম অল্প ফাঁক করা ঠোঁট। এক পৃথিবী লাস্য ধরে আছে ওই ঠোঁটে। ঘুমের ঘোরেই চাদরটা সরতে সরতে কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। পাখার হাওয়ায় উড়ছে চাদরটা অল্প অল্প। বেরিয়ে এসেছে সার্থকের আঁকা শিল্প। মঞ্জিমার বাঁ স্তন ঘিরে একটা বৃত্ত, ডান স্তন ঘিরে একটা বৃত্ত, নাভি ঘিরে একটা বৃত্ত। তিনটে তিন রকম রঙ ব্যবহার করে... পোস্টার রঙ দিয়ে আঁকা, এতক্ষনে শুকিয়ে কামড়ে বসেছে চামড়ার ওপর। কোনওটাই নিখুঁত বৃত্ত নয়... সূচনা আর প্রান্তীয় বিন্দুরা মেলেনি। এক অনিচ্ছাকৃত প্রবেশদ্বারের মত ফাঁক থেকে গেছে। প্রায়-বৃত্তীয় চেহারাগুলোর পাকা রঙ কেমন জ্বলজ্বল করছে মঞ্জিমার নিটোল শরীরে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ওঠা-নামা করছে, যেন জীবন্ত! আর তাদের মাঝে লাল রঙে আঁকা খোপখোপের ওপর সাদা-কালো দিয়ে কাটাকুটি খেলা। মঞ্জিমা নিয়েছিল ক্রস, আর সার্থক নিয়েছিল শূন্য। ইচ্ছে করেই মঞ্জিমাকে জিততে দিয়ে, একদানেই হেরে গেছিল সার্থক।
কিন্তু অতনু, আলেখ্য... এরা তো কেউ তখন ঘরের কোথাও ছিল না?!

আপনার মতামত জানান