সেদিন দু’জনে

ঋষি সৌরক


অনেকটা অন্ধকার তখন ঝুপ করে নেমে এসেছে গ্রামের রাস্তায় । বদলে যাওয়া এতটাই স্বাভাবিক যে মাঝেমধ্যে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় এই আঠারো বছর পরেও। রতন নেমে এলো লাল সুড়কির পথ ছেড়ে । অন্ধকার কি মোক্ষম আর স্থির এখানে, ঘোর লেগে যায় ! সেই পুরানো রথতলা – আচোয়ালমাড়ি বের করে থাকা রথের ঘূণকাঠচাকা, ঝুলে পড়া ইঁট , বয়স্ক সব গাছ । একটু ভেতরের দিকে একটা দীঘি আছে, দুর্গাপুজোর পরে ওখানে ভাসান হয় । ক্লান্ত রতন সেই দীঘির পাড়ে একটা বিরাট অশ্বত্থ গাছের নীচে এসে দাঁড়ায় । নানা প্রাবল্যে ভেসে আসছে শঙ্খধ্বনি । দুর্গাদালানের মঙ্গল-আরতি-ঘণ্টা । ঘামের মৃদু গন্ধ সংলগ্ন বাতাসে । কাছাকাছি যেসব ঘরগুলো চোখে পড়ে সবকটা কাঁচামাটির, এগুলো গ্রামের নীচুশ্রেণীর মানুষদের বাড়ি-ঘর । ওদের তুলসীথানে জ্বলে উঠেছে সন্ধেপ্রদীপ । স্মৃতি কতখন দাঁড় করিয়ে রাখে,জানা নেই । অন্ধকার ক্রমশ ঘুঁচিয়ে দিচ্ছে পার্থক্য । গাছ-গাছালির ডাল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে দীঘির জলে । ওই যে টুপটাপ টুপটাপ শব্দ । একটা হাওয়া কিরকম অপ্রিয় সত্যের মত ছুঁয়ে যায়, রতনের নাভি থেকে উঠে আসে তোলপাড় অনুসন্ধান। অনতিদূরে দুজন,মনোযোগ দিয়ে কি যেন খুঁজছে সামনের ঝোপে। ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয় রতন, তার মত দেখতে কেউ নয়। খুব একটা এখানে কেউ আসে না – তবু গা করে না সে । এখানেই কাছে-পিঠে কোন একটা গাছের যেন বদনাম আছে । সেটাতে দাগ এঁকে দিয়েছে গ্রামের মানুষ । অন্ধকারে সেসব চোখেই পড়ে না রতনের । ঘাসলতাগুল্মশুকনোপাতা র ভেতর দিয়ে সরসর সরসর কি যেন সরে যায়। একদিন এখান থেকেই ঘরে ফেরার তাড়া ছিলো – ছিলো শলা-পরামর্শের গোপন ঠেক – কত একা একা দুপুর খোলাপিঠ কেটে যেত । গাছের গায়ে ঠেস দেওয়া থাকতো বাইসাইকেল । রতন অনুভব করে সেই অন্ধকার সেই অন্ধকারের মধ্যে ভেসে বেড়ানো সাঁইসাঁই গুলো । একটা চাবি হারিয়ে গেছিল কবে এখানেই ঠিক এখানেই – তারপর কত খোঁজাখুঁজি কত মনস্তাপ দোষারোপ ... তালাভাঙ্গাও একটা কৌশল বাইসাইকেল কে ইচ্ছে করেই জানায় নি রতন,বাইসাইকেলটাও জানায়নি কেন ও গোলাপি। সেই বয়েসে অন্যের থেকে বেশী জানা মানে একধাপ আগে থাকা । অন্ধকার এখন এতটা গাঢ় যে আরো অন্ধকার হলেও বোঝার উপায় নেই । গ্রামের শেষ শাঁখটি বেজে উঠলো সাইরেনের মতো ।

জল কাটার আওয়াজ ভেসে আসছে

আপনার মতামত জানান