আহ্বান

গৌতম চট্টোপাধ্যায়
বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একটা গন্ধ পাচ্ছে সমীর। গোলাপ ও চন্দন মিশানো স্নায়ু দুর্বল করা এক মিষ্টি গন্ধ। খুব সম্ভব, ধূপকাঠির। সারাদিন খাটাখাটনির পর বিকেলের পড়ন্ত রোদে এই অদ্ভুত প্রেমের মাদকতা বড়ই আরামদায়ক। আজকাল আর অই অফিসে তার ঠিক ভাল লাগেনা। কম্পিউটারের খটখটানি শুনতে শুনতে কানটা একেবারে পচে গেছে। তার উপর আবার বসের খ্যাকানি। এই তো সেদিন তাকে ডেকে বললো, “শোনো সমীর, আজকের মধ্যেই যেন কোম্পানির ফাইলটা তৈরি হয়ে যায়। কাল client meeting,যদি না হয়, তাহলে তো বুঝতেই পারছো। ” সরকারি চাকরি সে এখনও পায়নি, তাই ভরসা বলতে এই প্রাইভেট ফার্ম। সেটাও যদি হাতছাড়া হয়, তাহলে একপ্রকার যে রাস্তায় নামতে হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই অতি কষ্টে, ভিতরের গুমরে থাকা রাগ কে চেপে রেখে সারাদিন কাজ করেছিল সে। ছাড়া পায় সেই রাত আটটায়, বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা, তারপর আর কিছু মনে নেই।

আচ্ছা, কেউ কি তাকে ডাকছে? আর এই সুবাস কি তারই মাত্রাস্বরূপ? এসো...এসো... আরো কাছে...আরো...আরো......। বিছানায় উঠে বসে সমীর। সে শুয়ে থাকতে পারছে না আর বা বলা ভালো কোন এক আকুতি, কোন এক মায়া আস্তে আস্তে চেপে ধরছে তাকে। যার মুঠো বন্ধ, যার হাতে মুক্তি নেই। তাকে বিশ্রাম নিতে দিচ্ছে না। বিছানা ছেড়ে উঠে বসে সমীর, পায়ে চটি গলিয়ে এগিয়ে চলে গন্ধটা কে অনুসরণ করে।

বাড়িটা যে খুব একটা বড়, তাও কিন্তু নয়। ছোট্ট একটা ঘর, সামনে খোলা বারান্দা আর একটা ঠাকুর ঘর। সামনে খোলা বারান্দা, দক্ষিণ মুখো। ওপর তলা বলে দুপুরে একটু কষ্ট হয় ঠিকই কিন্তু গরমের বিকেলে এ যেন এক স্বর্গ রাজ্য। তবে বেশিরভাগ দুপুরটাই সে বাইরে থাকে বলে খুব একটা অসুবিধা হয়না সমীরের। সকালে বেরোয়, ফেরে সেই রাতে, পরদিন সকাল না হতেই আবার শুরু ঘোড়দৌড়। তাই একলা বিছানা ও নিশুতি রাত তার শয্যাসঙ্গিনী।

সমীর এসে দাড়ালো সামনের খোলা বারান্দায়। এইখানে গন্ধটা সবথেকে প্রখর। বাইরে এখনো আলো আছে তবে তা তেজহীন। সমীরেরে চোখ যায় বারান্দার এক কোণে প্রায় অবহেলায় পড়ে থাকা ছোট্ট ঠাকুরঘরটার দিকে। ঠিক সামনেই দুটো ধূপকাঠি জ্বলছে আর সান্ধ্য হাওয়ায় তারই সুবাসে উন্মত্ত হয়েছে সারা শরীর।
-“কখন জ্বালালাম!! কখন দিলাম ঠাকুর কে?” নিজের মন কে প্রশ্ন করে সমীর। সত্যিই তো, আজ অফিসের হাফ ডে করে এই কিছুক্ষণ আগেই তো ফিরেছে সে। তারপর, কখন আবার......। তাহলে কি, গা ধুয়ে এসে......!! কে জানে...এই সব ভাবতে ভাবতে পকেট থেকে একটা ফ্লেক বের করে ধরায় সমীর। এতে ক্লান্তি দূর হয়, মাথাটা থাকে পরিষ্কার।
-“ তুমি এখনও সিগারেট খাও!!”
এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর, ঠিক সমীরের পাশেই; মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ। তার এই একলা ঘরে কোন নারীর যে আগমন ঘটেছে তা বেশ বুঝতে পারছে সে। তার নিশ্বাস পরছে, সে শুনতে পারছে তার শব্দ। এই গলা তার খুব চেনা, এই গন্ধ তার পরিচয়, তবু কিছুতেই মনে পরছেনা যেন। ভাবনা আসছে, তবে সে এক দলা পাকানো মাংসপিণ্ড।
শান্ত স্বরে সমীর জিজ্ঞেস করল, “কে?”
-“আমায় চিনতে পারছো না!”
এইবার তার আর কোন সন্দেহ নেই। শ্রী...হ্যা, এই সে... সে স্বর, সেই ব্যাকুলতা। তার শ্রী আজ ফিরে এসেছে। তবে এত বছর পর!! একটু যেন অভিমানই হল তার।
-“তুই এসেছিস!!তুই!! এত বছর কোথায় ছিলি আমায় ছেড়ে?”
-“আমি সবসময়ই তো তোমার সাথেই আছি।”
-“ফালতু বকিস না!! তুই জানিস কিভাবে কাটছে দিনগুলো তোকে ছাড়া। তোকে কতদিন দেখিনি... কতটা কষ্ট হয়, সেটা কি বুঝিস তুই!!”
এর কোন উত্তর না দিয়ে শ্রী বলে, “আজ সারাদিন তো কিছু পেটে পরেনি। পারলে একবার রান্নাঘরে যেও।”
এই কথা যেন কানেই পৌছায় না সমীরের। এতদিন পর সে তার বান্ধবী কে কাছে পেয়েছে; উন্মত্ত সমীর প্রশ্ন করে, “ভালবাসিস আমায়?”
শ্রী চুপ।
-“কিরে, উত্তর দে! ভালবাসিস আমায়?”
ওপার থেকে শুধু একটাই শব্দ, “জানিনা।”
-“একবার তোকে দেখব, কতটা সুন্দর হয়েছিস তুই!! একবার সুইচটা অন কর না মা......,” বলেই থেমে যায় সমীর। এবার তার সব কিছু মনে পরেছে, পুরো ঘটনাটা। শ্রী... মানে শ্রীতমা... শ্রীতমা রায়। কলেজ থেকেই প্রেম, প্রথম কিছুদিন অবশ্য ঝুলিয়ে রেখেছিল তারাপর সায় দিতে আর দ্বিধা করেনি। কিন্তু তারপরের ঘটনা মনে পরায় সে চমকে উঠলো। একদিন টিউশন পড়িয়ে ফেরার সময় কিছু মদ্যপ যুবক শ্রীতমা কে চেপে ধরে...... সালটা ২০১১। চোখ বন্ধ করে ফেলে সমীর, চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সেদিন সে কিছুই করতে পারেনি।

আলো জ্বলে উঠলো, তারপর ফিরে এল বাস্তব।।



আপনার মতামত জানান