তর্পণ

সরোজ দরবার
যেদিন ডাকাত পড়ল, রতু সামন্তর ছেলেটা দাবার বেড়া ধরে দাঁড়িয়েছিল। বছর তিনেক বয়স। কাঁথা গায়ে ঘুমোচ্ছিল। মায়ের কান্না শুনে উঠে এসেছে। এর আগে সে ডাকাতি দেখেনি।
তার বাপও দেখেনি। পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে এই প্রথম। গামছায় মুখ বাঁধা জন ছয় লোক। হাতে লাঠি। খিড়কির দরজা ভেঙে ঢুকেছে। তাকে আর বউকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধেছে। ছেলেটাকে কিছু বলেনি।
কিন্তু কারা এরা? রতু সামন্ত বিরাট বড়লোক তো নয়। জমি-জিরেত, বাস্তু পুকুর যেমন থাকে সেরকমই। উপরি বলতে ইদানিং সে বন্ধকির কারবার ধরেছিল। তাও অনেকদিনই তো হল। তবে চটা সুদে নয়। এমনিতে লোকে তার কাছে জিনিস বাঁধা দিতেও তাই ভয় পায় না। কেউ কি মনে মনে ফুঁসছিল! কদিন আগেই কুঞ্জ নায়েকের বউয়ের একজোড়া বালা বাজেয়াপ্ত করেছে। সুদই দেয় না। আসল তো কোন ছাড়! অনেকবার সতর্ক করেছে রতু। শেষমেশ ব্যবসার ধর্ম পালন। তবে মুখেই শুধু বলেছিল, টাকা পেলে ফেরতই দিয়ে দিত রতু। তাহলে কি কুঞ্জই...!
তবে রতুর কাছে হাত পেতে কেউ ফিরে তো যায়নি, তা গয়না বাঁধা দিয়ে হলেও। কাজ তো মিটেছে। ডাকাতির খবরে সবাই তাই এমন ভাব করল যেন বেজায় দুঃখিত হয়েছে। কিন্তু হকের ধনই বা ছাড়ে কী করে! যার যা বাঁধা ছিল, এখন তা রতুরই ফেরত দেওয়ার পালা। দিনকয়েক মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াল সে। সবে পুজো ফুরিয়েছে। বাতাসে হিম মিশছে। খালি গা শিরশির করে। কাঁধের গামছাটা গায়ে ফেলে নেয় রতু। তার মনে পড়ে ডাকাতদের মুখ বাঁধা গামছাগুলোর কথা। খুব চেনা লাগে। যারা জন খাটে, হাফবেলায় এসে গেরস্থের বাড়ি থেকে মুড়ি বেঁধে নিয়ে যায়। এক রেক মুড়ি- বাঁধা হিসেব। সঙ্গে পেঁয়াজ, ভেলি গুড়। এক একদিন আলুর চপ। বেতের ছোট ঝুড়ি উপুড় করে তার বউ তো কতদিন জনেদের গামছায় মুড়ি ঢেলে দিয়েছে। গিঁট দিয়ে পুঁটুলি বেঁধে কাঁধে ফেলে তারা যে যার ঘরে ফিরে গেছে। রতুর মনে হয়, গামছাগুলো যেন সে আগে দেখেছে। অবশ্য ভুলও হতে পারে। সবই তো হাটে কেনা গামছা। ছাপগুলোও তাই এক। তবে রতুর বারবার মনে হতে থাকে, ডাকাত যেন চেনা চেনা। নইলে খিড়কির দরজার কবজাটা যে আলগা ছিল তা বাইরের লোক জানবে কী করে! চেনা কেউ না বললে তো জানা অসম্ভব।
এই সব ভাবে আর দিন দুই পুকুরধারে ঘুরে বেড়ায় রতু। পানাপুকুর। ঢিল মারে। পানা সরে। আবার ঘিরে ধরে। পাড়ার জ্যেঠি, কাকিরা বলল, রতু বাবা, গুমরে থাকিসনি। যা হওয়ার হয়ে গেছে। রতুর চোখের সামনে শুধু চেনা গামছাগুলো উড়তে থাকে। কথাগুলো এ-কান দিয়ে ঢুকে ও-কান দিয়ে বেরোয়। রতুর মগজে যেন কিছুই ঢুকছে না। সে দেখে পুকুরে ফেলা পালার উপর মাছরাঙা বসে আছে। তখন পড়তি দুপুর। একটা চুনো মাছ ভেসে উঠতেই ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেল মেহগনির ডালে। বাঁশঝাড়টা সেই শুনশান। হাওয়ায় কোঁচ কোঁচ আওয়াজ। রতুরা ছোটবেলায় ভাবত, ভূতে দোল খায়। একটু বড় হয়ে দেখেছে, কিচ্ছু নেই। দু-চারটে নেউল শুধু ঘুরে বেড়ায়। দেখে রতু। প্রাণভরে দেখে। দেখতেই থাকে। কোথাও কিছু বদলায়নি। সব আগের মতোই আছে।
রতুর বউ বলে, এরম করে চলবে নাকি? রতু ঘাড় নেড়ে বলে, না চলবে না। ‘তাহলে কী করবে?’ রতু গম্ভীর হয়ে বলে, ভাবছি।
ভাবাভাবির বিশেষ কিছু ছিল না। গাঁ-গঞ্জে ডাকাতি হয়। লোকে সামলেও ওঠে। কালীমন্দিরে পুজো মানত করে। তারপর সব ঠিক হয়ে যায়। রতু তবু বিস্তর ভাবল। তারপর জমি-জিরেত যা ছিল বেচে দিল। সেই টাকায় লোকের পাওনা মেটাল। সকলেই খুশি। কেউ কেউ শুধু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ও রতু তোর তাহলে চলবে কী করে? রতু বলল, ভাবছি। সন্ধেবেলায় আটচালায় সবাই বসে বলল, রতু ছেলেটা খাঁটি। নইলে সব বেচে এভাবে কেউ ধার শোধ করে? ডাকাতির কথা তো কেউ আর হাত গুনে জানতে পারে না! ঠিক হল, বাবা বুড়োশিবের নামে যে জমি আছে, তার খানিকটা রতুকে চাষ করতে দিতে হবে। সেবায়েত বেজায় গাঁই-গুঁই করল। কিন্তু জমি তো তার নয়। দেবতার। ঠিক হল, রতুও একপালা সেবার ভার নেবে। রতু কিছু বলল না, গম্ভীর হয়ে বসে থাকল।
সেই রাতেই রতু গাঁ ছাড়ল। তখন অনেক রাত। জনমনিষ্যি জেগে নেই। রতুর বউ মুখে আঁচল দিয়ে কাঁদছিল। রতুর ছেলেটা শুধু আস্তে আস্তে জানতে চাইল, আমরা আর ফিরবনি?
চাপা স্বরে রতু বলল, ভাবছি।

২)
রতুর গল্প এরপর আমরা আর জানি না। সত্যি বলতে, রতু সামন্তকে আমাদের বয়সি অনেকে দেখেওনি। অষ্টআশি সাল বোধহয়, যখন রতু গ্রাম ছেড়েছিল। আমাদের অনেকের তখন জন্মই হয়নি। রুতুর বাড়ি দিনে দিনে পোড়ো বাড়ি হয়ে উঠেছিল। ছেলেপুলেরা খেলতে গেলে মা-ঠাকুমারা বকাবকি করত। বলত, ভূতের বাড়ি ওটা। নইলে জলজ্যান্ত তিনটে লোক উধাও হয়ে যায়! কেউ বলত, ডাকাতরা বোধহয় আবার এসে কেটে কুঁচিয়ে চাপা দিয়ে গেছে ওদের। বয়স্করা মাথা নেড়ে বলত, তালাটা তাহলে কে দিল? বয়স্করাই জবাব দিত, ডাকাতরাই হবে। রতু সামন্ত দিনে দিনে এক হেঁয়ালি হয়ে উঠল।
এদিকে গ্রামের সরু খাল দিয়েও কম জল তো গড়ায় না। দেখতে দেখতে একদিন অর্ধেক গ্রামে কারেন্ট চলে এল। মণ্ডলদের বাড়িতে টিভি ঢুকল। ‘জননী’ দেখতে সবাই ওদের বাড়ি ভিড় করছে। মণ্ডলদের দুই শরিকে বিস্তর ঝামেলা। তবু ছোট তরফের বউমা বড় শরিকের বাড়ি যেত। আর বড় জা একটাও কথা না বলে তার দিকে পিঁড়ি ঠেলে দিত। দিনকয়েক যাবার পর সে নিজেই পিঁড়ি টেনে বসতে শুরু করে দিল। ঝগড়া, ঝামেলা তবু টিভি এসে মিলমিশ করে দিল।
এই এতকিছু যখন হচ্ছে, তখন রতুদের ভূতের বাড়ি প্রতি বর্ষায় খানিকটা করে ধসে যাচ্ছে। নামেই দরজায় তালা ঝুলছে। উপরে টালির চাল পুরো নেমে গেছে। চাইলেই বাড়ির ভিতর ঢোকা যায়। নাটা কালু নাকি ওখানেই ক’দিন লুকিয়ে ছিল। সে এক কাণ্ড বটে! পঞ্চায়েতের মাথায় বহুদিন ধরেই সুবল বসাকের একচ্ছত্র রাজত্ব। তাদের পার্টিই তখন রাজ্যে। লোকে ভোট দেওয়ার সময় আগাপাশতলা কিছু তাই ভাবতও না। কিন্তু তলে তলে অন্য দলের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। কমল ডাক্তারের সৌজন্যে। কমল একে ডাক্তার, তায় গাঁয়ের অসুখ বিসুখে ওই একজনই ভরসা। ফলে লোকে একটু একটু ঢলছিল। এরমধ্যে একদিন কলেজ মাঠে বড় নেত্রী এলেন। গাঁয়ের সবাই ঝেঁটিয়ে ভাষণ শুনতে গেল। তারপর ফিরে বলাবলি শুরু করল, এটা হচ্ছে না কেন? ওটা নেই কেন? কমল রোগীর নাড়ি ধরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে আর মুখে বলে, সত্যি আপনারাই বলুন, নেই কেন? ওই পার্টি এতদিন ধরে করলটা কী? লোকে বলাবলি শুরু করতেই ভুরু কুঁচকে গেল সুবলের। তারপর একদিন অন্য গ্রামের কল থেকে ফিরছিল ডাক্তার। ভরদুপুরে তাকে সাইকেল থেকে নামিয়ে মেরে ঠ্যাং ভেঙে, মাথা ফাটিয়ে দিল নাটা কালু। সে যে সুবলের লোক তা সবাই জানে। পুলিশ এসছিল। তবে কালুকে খুঁজে পেল না। লোকে পরে বলাবলি করল, ওই রতুর ঘরেই গা ঢাকা দিয়েছে হারামজাদা। কমল ডাক্তার সে যাত্রা বেঁচেই গেল। আর পরের ভোটে ম্যাজিকের মতো জিতে গেল। তখনও রাজ্যে পরিবর্তন হয়নি।
তারপর অনেক এদিক ওদিক হল। ‘জননী’ও ততদিনে শেষ হয়ে গেছে। গোটা পাড়ায় একটা টিভির দিন ফুরিয়ে গেল। ঘরে ঘরে বোকাবাক্স। লোকজন যে যার ঘরে বন্দি হয়ে গেল। বাঁকাচোরা অ্যান্টেনা সরিয়ে ডিস অ্যান্টেনা ঢুকল। পা পা করে একদিন মোবাইলও চলে এল। সবই এল। তবে অনেককে চলে যেতে হল। গ্রাম ছেড়ে বেশিরভাগ ছেলে তখন শহরে যাচ্ছে। হয় পড়তে, নয় ছোটখাট চাকরি করতে। তারা হপ্তায় হপ্তায় দেশে ফেরে। আর গ্রামে একটু একটু করে শহর ঢোকে। গ্রামের চেহারা বদলায়। কিন্তু সবাইকে সে ঠাঁই দিতে পারে না। তাই কিছু আধুনিক উদ্বাস্তুর জন্ম হয়। এদের সঙ্গে গোড়ার দিকে গ্রামের যোগ থাকে। শহরে বসেও এরা গ্রামেই থাকে মনে মনে। এরকম যারা ছিল, তারা একদিন খবর পেল রতু সামন্ত মরে গেছে।
৩)
মোবাইলে মোবাইলে গ্রাম থেকে যে বিস্ময় সংবাদ শহরে পৌঁছেছিল গল্পে গল্পে, তা এরকম-
একদিন গ্রামের লোক দেখে পোলের ধারে একটা পেল্লায় চার চাকা। এল কে? কেউ চেনে না। এদিকে রতুর ভিটেয় নড়াচড়া। ভূত কি দেহ ধরল নাকি? তল্লাশ করে জানা গেল, ফিরেছে নীতু সামন্ত। রতুর ছেলে।
-বলিস কীরে, তুই রতুর ব্যাটা?
-আজ্ঞে জ্যাঠা।
-তা এতকাল বাদে? রতু কই?
-আসবে কী! বাবা আর আছে নাকি!
-সে কী! এত অল্প বয়সে...! আর তোর মা?
- মা-ও গেল।
-কী কাণ্ড! তা তুই কি মনে করে?
-এলাম। বাপের ভিটে তো। দেখি কিছু হিল্লে হয় কিনা।
-তা এখন থাকবি নাকি?
রতুর ছেলে বলল, ভাবছি। বুড়োদের কৌতূহল তাতে মিটলেও ছেলে ছোকরারা ধরে বসল। এত সহজে তারা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না। সেই তিন বছরে হাফ প্যান্টুল বেলায় যে গ্রাম ছেড়েছে, তার কী এমন পিরীত উথলে উঠল! সুতরাং,
-বস, মতলবটা খোলসা করো দিকি?
-মতলব, কীসের মতলব?
-বলি, এদ্দিন বাদে এলে কী করতে?
-তাহলে খুলেই বলি...
ছেলে ছোকরাদের মুখে জয়োল্লাস। ঠিক ধরেছিল, পেটে পেটে মতলব আছে। রতুর ছেলে বলল, ‘ভেবেছিলাম সব বেচে দিয়ে চলে যাব। মরার আগে বাবা বলেছিল, ভিটেয় একটা মন্দির করতে। ভাবলাম, করব না, মরার পর কে আর দেখছে? কিন্তু এখানে আসা ইস্তক কিছুতেই আর যেতে পারছি না। হিন্দুর ছেলে তো। মনটা খচখচ করছে। ভাবলাম, বাবার আত্মার যদি গতি-টতি না হয়। আর বাবা বলেছিল, গ্রামের লোকেদের একেবারে ভুলে যেন না যাই। পারলে মধ্যে মধ্যে আসতে বলেছিল। তাই আসা।’
অনেকের দীর্ঘশ্বাস পড়ল। মহাপ্রস্থানের পর সকলেই নায়ক হয়ে ওঠে। সে নেতাজি হোক বা রতু সামন্ত। গ্রামের লোকেদের কাছে রতুর মাহাত্ম্য কম কিছু নয়। বিশেষ করে টাকা ফিরিয়ে উধাও হওয়ার মতো ঘটনায়। গল্পে গল্পে তা বেড়েছে। সেই রতুর ছেলে এসেছে তার বাপের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে। আহা রে! দীর্ঘশ্বাস বেশ জোরেই পড়ল। মণ্ডলদের বাড়িতেই রতুর ছেলে থাকছিল ক’দিন। আস্তে আস্তে একটা ঘর তৈরি শুরু হল। রতু আর ওর বউয়ের মন্দির হচ্ছে পাশাপাশি। নীতুর ইচ্ছে, বাপের ভিটে বেচবে না। শহর থেকে এসে মাঝেমধ্যে থাকবে। সকলে বলল, আহা থাকুক, বংশে বাতিটা তো জ্বলুক।
শহর থেকে যারা দেশে ফেরে, তারা রতুর ছেলের সঙ্গে নিজেদের আইডেন্টিফাই করতে পারল। আধুনিক উদ্বাস্তু সমস্যা। শুনে নীতু হাসে। আলাপ করতে যারা আসে, তারাও হাসে। বলে, তা কলকাতায় থাকেন কোথায়?
-ওই যাদবপুরের দিকে।
-প্রপার যাদবপুর? এইট বি-র কাছে?
-আরে না না। এখানে কেউ বুঝতে পারছে না তাই যাদবপুর বলতে হচ্ছে। আসলে সোনারপুরে।
-ওহো। ওই হল। সোনারপুরে কোথায়?
-ওই স্টেশন থেকে একটু যেতে হয় আর কি!
-তা চাকরি করেন তো?
-না না, চাকরি কোথায় দাদা। ওই এটা ওটা ব্যবসা করে চলছে।
-ওরকম বলছেন কেন? ভাল চললেই ভাল। তা জ্যাঠামশাইয়ের কী হয়েছিল?
-টিবি। এখান থেকে গিয়ে গায়ে গতরে খাটত। রিক্সাও টেনেছে। শরীরটা ভেঙে যাচ্ছিল। তারপর তো চলেই গেল। মা শোকেতাপে ক’দিন বাদেই গেল।
সকলেই চুকচুক করল। কী সংসার ছিল! কী করুণ হাল হল! সিগারেট জ্বলে একে একে। রতুর ছেলেই খাওয়ায়। ধোঁয়া ছেড়ে কাঁধে হাত রেখে কেউ কেউ বলে, তা এবার বিয়ে-থা করো। গ্রাম থেকেই নাহয় ব্যবস্থা হবে। পাড়ার সবাই আছে তো।
রতুর ছেলে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, ভাবছি।
এরমধ্যেই গ্রামের ছোকরারা এল। বলে, নীতুদা, আমাদের তো চাকরি বাকরি নেই। পড়েশুনে কে আর ইটভাটায় যাবে বলো? তোমার ব্যবসায় কিছু গতি হয় না?
-এই এতজনের?
সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। নীতু হেসে বলে, আচ্ছা পরেরবার এসে দেখছি কী করা যায়।
এবার বয়স্করা ধরে। ‘ও বাবা নীতু, তুই তো উন্নতি করিছিস। তোর বাপ সজ্জন ছিল। উপর থেকে আশীর্বাদ করেছে। দেখ না বাবা, আমাদের অবস্থাটা যদি ফেরে।’
নীতু বলে, জ্যাঠা, আমি কী করব বলো? তোমাদের সবাইকে দেওয়ার মতো টাকা আমার নেই।
কাকা-জ্যাঠারা জিভ চুকচুক করে বলে, আরে রাম, তা বলিনি। তবু যদি কিছু পারিস। গাঁয়ের তো সেই একই অবস্থা। শুধু চাট্টি টিভি আর ফোন ঢুকেছে। নীতু বলল, বেশ সন্ধের দিকে এসোখ’ন। কাল তো আছি। একটু গুছিয়ে গল্প করা যাবে।
সন্ধেয় নীতুর বাড়ি ভিড় জমে। চা-মুড়ি খাওয়া হয়। দিন কাটে। নীতু মাসে একবার করে এসে ঘুরে যায়। গ্রামে তার বেশ নামডাক।
*** **** *****
এইসব গল্পে তারপর আর বিশেষ কিছু হয় না। নীতু ক্রমে চেনা লোক হয়ে গেল। পাড়ার বিস্ময় কমল। সে শহরে থাকে। গ্রামে এলে লোকে সন্ধেয় তার বাড়ি ভিড় করে। দেখা হলে ঘাড় নেড়ে হেসে বলে, ভাল আছ তো? ব্যস ওই পর্যন্তই। তারপর একদিন খবর রটে। প্রথমে শহরে, তারপর গ্রামে, গোটা রাজ্যেই। জনে জনে কথা হয়-
-তোমরাও রেখেছিলে নাকি?
-রেখেছিলাম তো...
-ফেরত পেতে?
-গোড়ায় বেশ ভাল টাকা দিত। হ্যাঁ, তা দু-তিনবার তো পেয়েছি।
-তো কত রেখেছিলে?
-সর্বস্ব রে সর্বস্ব। বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গাঁট কেটে নিয়ে গেল।
শহরের সঙ্গে ফোনে কথা হল গ্রামের,
-আর কিছু রইল না রে খোকা...
-একেবারে ঘটিবাটি চাঁটি করে নিয়ে গেল বাবা। সব্বার গেছে?
-গোটা গ্রাম উজাড়।
-দিনে ডাকাতি, হে ভগবান, কেন যে ওই ডাকাতকে বিশ্বাস... বাপের ঘরে ডাকাতির বদলা এমন করে নিতে হয় রে...
ঘরে ঘরে কান্না। আওয়াজ বাড়ে। রতুর ছেলে চাকরি দিতে পারেনি। তবে টাকার ডিম পাড়ার একটা ব্যবস্থা করেছিল। তার কথামতো জমানো টাকা প্রায় সকলেই রেখেছিল এক সংস্থায়। ভুইফোঁড়। তবে বছর বছর ভাল ফেরতও আসছিল। সংসারের হাল ফিরছিল। প্রাণভরে রতুর ছেলেকে আশীর্বাদ করেছিল সকলে। তারপর একদিন সংস্থার ঘরে তালা। কোটি কোটি টাকা প্রতারণা। তোলপাড় রাজ্যে। আর ছোট্ট গ্রামের লোক তো সংস্থা চেনেনি, বিশ্বাস করেছিল শুধু রতুর ছেলেকে। সুতরাং ফের কথা জমে মুখে মুখে-
-তা মালটা গেল কোথায়?
-পালিয়েছে। ঘরে তালা।
-ছবি দিয়ে পুলিশের কাছে জানালে হয় না?
-সে তো যেতেই হবে, ছবি আছে নাকি?
-আছে নিশ্চয়ই ছেলে ছোকরাদের মোবাইলে, নাহলে শুধু নামেই ডায়রি।
-আচ্ছা নামটা সত্যি তো?
-কে জানে, তা তো কেউ জানে না। ওই নামেই তো মনে হয় ডাকত ওর মা-বাপ।
-আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না, শহরে গিয়ে যদি ধরা যায়?
-বেশ গেলেই হয়, সবাই মিলে যাওয়া যাবে, কিন্তু থাকে কোথায়?
-ওই তো সোনারপুরে।
-সোনারপুরে কোথায়?
- বলে তো ছিল, স্টেশন থেকে যেতে হয় আর কি...
-কোনদিকে?
-কোনদিকে!

কোনদিকে যাবে সকলে? ডান? বাঁ? দিগ্বিদিকে চাপা কান্না ওঠে। কিন্তু কেউ দিক জানে না।





আপনার মতামত জানান