দেবদ্রোহী

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী
প্রকাণ্ড একটা কাঁচের দরজা ঠেলে এক তরুণ প্রহরী ভয়ে ভয়ে রাজপুরোহিতের একান্ত কক্ষে ঢুকল। রাজপুরোহিত বশিষ্ঠ তাঁর লাল মখমলে মোড়া বিশাল আরাম কেদারায় বসে আছেন যেন এক পাথরের মূর্তি, চোখ দুটো কালো চশমায় ঢাকা থাকায় বোঝার উপায় নেই যে আদৌ জেগে আছেন কিনা, শরীরের সাধারণ কম্পন বা বক্ষের সামান্য ওঠানামাটুকুও বোঝা যাচ্ছে না। প্রহরী অবশ্য জানে যে বশিষ্ঠ শুধু জেগেই নেই, তাকে লক্ষও করছেন পুরোপুরি, নিঃশব্দে তার বক্তব্যের অপেক্ষা করছেন। রাজপুরোহিতের দপ্তরের সকলেই জানে যে এই একটা লোকই পুরো রাষ্ট্র আপন বুদ্ধিবলে চালনা করছেন; দিনের বেলা কেন, উনি রাতেও ঘুমোন না। “আমার অনুপ্রবেশ মার্জনা করুন গুরুদেব। নীচে আপনার এক দর্শনার্থী এসেছে, সে বড়োই অবাধ্য। বারে বারে তাকে বারণ করা সত্ত্বেও সে আপনার সাথে একান্তে বাক্যালাপের সংকল্প ত্যাগ করছে না কিছুতেই, তার নাকি আপনার সাথে খুবই গোপন গুরুতর কিছু কথা আছে যা সে কিছুতেই অন্য কারোর সমক্ষে বলবে না এবং আপনার দর্শন লাভ না করা অবধি সে এই স্থানও পরিত্যাগ করবে না। তাকে ফিরে গিয়ে কী জানাব প্রভু?” “অপরিচিত মানব আমার দর্শনার্থী! তুমি এই দণ্ডে তাকে আমার নিকটে নিয়ে এস।” বশিষ্ঠের সাদা ভ্রুযুগল ঈষৎ কুঁচকে গেল। কী এমন বিশেষ কথা থাকতে পারে একজন সাধারণ মানুষের তাঁর সাথে?

প্রহরীর পিছে পিছে যে ব্যক্তি রাজপুরোহিতের কক্ষে ধীর পায়ে এসে ঢুকল তাকে প্রায় যুবকই বলা চলে দেহের বলিষ্ঠ গড়ন আর ত্বকের মসৃণতা দেখে, যদিও মাথার প্রায় প্রতিটা চুলই সাদা হয়ে গেছে। প্রহরীকে হাত নেড়ে চলে যাবার ইঙ্গিত করে বশিষ্ঠ নবাগতকে তাঁর মুখোমুখি রাখা চারটি চেয়ার দেখিয়ে স্মিত কণ্ঠে বললেন, “বসতে আজ্ঞা হোক। এবার শোনা যাক তোমার সেই একান্ত গোপন কুলমন্ত্র যা অন্যের অগোচরে কানে কানে নিতে হয়।” কথাটা বলে নিজেই দাড়ির ফাঁকে মৃদু হাসলেন, এই সহৃদয় ব্যবহারে দর্শনার্থী তাঁর সাথে মন খুলে কথা বলবে। যুবক সবুজ রঙের চেয়ারটা টেনে নিতেই তিনি বুঝলেন যে সে বর্ণে বৈশ্য। যুবক যথোচিত ভক্তি দেখিয়ে করজোড়ে বলল, “প্রণাম হই মহর্ষি। আমার নাম চার্বাক। আমি রাষ্ট্রের কলাবিভাগের গোপন গবেষণা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এক তুচ্ছ কর্মচারী। আজ দশ বৎসর কাল নিবিষ্ট গবেষণার পর আমি যা জানতে পেরেছি তাতে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ধর্মীয় ধ্যানধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটবে আশা রাখি। আমার ঔদ্ধত্য মার্জনা করবেন প্রভু, কিন্তু আমার আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করেই আমি আপনার শরণার্থী হয়েছি। এই আবিষ্কারের কথা অন্য কারোর সাথে আলোচনা করা হয়ত সঙ্গত হবে না ভেবেই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আমি অবশ্যই জানি আপনার কাঁধে পুরো রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে, বিশ্বাস করুন প্রভু, আপনার সম্মুখীন হওয়ার চিন্তাতেই আপনার এই দীন সেবকের হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, তবু আমি যে নিরুপায়। একবার যদি কষ্ট স্বীকার করে আমার বক্তব্য প্রকাশ করার সুযোগ দেন তো বাধিত হই।”

বশিষ্ঠ অন্যমনস্ক ভাবে তাঁর ধবধবে সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, “যুবক, তোমার বিনয়পূর্ণ শিষ্ট বচনে আমি প্রীত হয়েছি। এবার অহেতুক স্তুতিবাক্য রেখে বল তোমার বক্তব্য। তবে মনে রেখ যে ব্রহ্মাণ্ডে সর্বাধিক মূল্যবান কিন্তু স্বর্ণ বা কোনও রত্ন, এমনকি স্যমন্তক মণিও নয়, সময়।” “জানি গুরুদেব। আমি আর অধিক সময় নষ্ট না করে বক্তব্যে প্রবেশ করি। আমার আবিষ্কারের গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করার জন্য পৃথিবীর ধ্বংস প্রাপ্তির পরবর্তী ইতিহাস একবার স্মরণ করতে হবে প্রভু। আপনার নগণ্য সেবক হিসেবে সামান্য কিছু বাক্যে ইতিহাসের সেই রূপরেখা তুলে ধরার একটা প্রয়াস করছি। সকলেই জানে সূর্যদেব ও বরুণদেবের অভিশাপে আজ থেকে প্রায় ত্রিশত বর্ষ পূর্বে পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণী লোপ পায়। ক্রোধে সূর্যদেবের তেজ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রাণীর দেহে সৃষ্ট হয় তেজস্ক্রিয় ক্ষত, বরুণদেবের রোষে গ্রাম-নগর নিমজ্জিত হয় সমুদ্র বক্ষে। স্বল্পসংখ্যক কিছু মানব বনে অথবা গিরিকন্দরে আত্মগোপন করে কোনোমতে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিছু কাল পরে খাদ্যাভাব দেখা দিলে প্রাপ্তবয়স্করা অনেক আলোচনার পরে নিজেদের প্রাণত্যাগ করে কিছু শিশুকে জীবিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যাতে সেই শিশুরা আবার ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়তে পারে। সেদিনের নিতান্ত শিশু আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরাই পরবর্তীকালে তিল তিল করে আবার এই তিলোত্তমা সভ্যতা গড়ে তোলেন। তবে মানবের সামনে কোনও সুনির্দিষ্ট আদর্শ না থাকায় নব সভ্যতার সেই আদিম প্রভাতে মাৎস্যন্যায়ের সৃষ্টি হয়। ক্ষমতা দখলের লোভে এবং প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিদারুণ অন্তঃকলহে মানব সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা আবার হ্রাস পেতে শুরু করে। অবশেষে আজ থেকে সার্ধ-শত বর্ষ পূর্বে আদি পিতা মনু এক প্রাচীন ভগ্ন পরিত্যক্ত জ্ঞানমন্দির থেকে প্রথম আবিষ্কার করেন অপৌরুষেয় পুরুষসুক্তের লিপি। তাঁর সেই ধর্মপ্রবর্তনকারী আবিষ্কারকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে সেই দিবস থেকে মন্বাব্দ গণনা শুরু হয়। ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাচীন জ্ঞানমন্দির থেকে আবিষ্কৃত হতে থাকে ধ্বংসপূর্বে আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের লিখিত বা অঙ্কিত বা প্রক্ষিপ্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে আমরা যেমন ধ্বংসপূর্ব পৃথিবীর অত্যুন্নত সভ্যতার কথা জানতে পারি, তেমনই অতি বলশালী সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাদের এবং অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের কথাও জানতে পারি। জানা যায় মানব ব্যবহৃত অকল্পনীয় উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার কথা, এমনকি দানবীয় বা আশ্চর্য সব প্রাণীর কথা। দুঃখের বিষয় যে পৃথিবী ধবংসের সাথেই আমাদের সেসব প্রাচীন প্রযুক্তি, পুরাণোল্লিখিত জানোয়ার এবং মানবের দেবতাপ্রদত্ত ক্ষমতা লোপ পায়। এখন আর মানব পূর্বের ন্যায় উড্ডয়ন ক্ষমতা, ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা, দেহের আকার-আয়তন পরিবর্তন বা দেবসদৃশ শারীরিক শক্তি প্রভৃতির অধিকারী নয় যেমনটি আমরা ইতিহাসে পাই। তবে এও সঠিক যে প্রাপ্ত ইতিহাসই, বিশেষত চলমান ইতিহাস, ধবংসোত্তর পৃথিবীতে দ্রুত সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে প্রভূত সহায়তা করেছে, ইতিহাসের যথাসম্ভব অনুকরণ করেই আজকের সভ্যতা গড়ে উঠেছে। দৈব ইতিহাসের বাইরে কিছু সাধারণ সামাজিক ইতিহাস পাওয়া গেলেও তাদের ধর্মীয় মূল্য না থাকবার কারণে সাধারণের হিতের কথা ভেবেই রাষ্ট্রপিতারা সেগুলোর পঠন বা প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আদি পিতা মনু বেদ-স্মৃতি-পুরাণ থেকে শ্লোক উদ্ধার করে প্রমাণ করেন যে তৎকালীন পৃথিবীতে কলিযুগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, মানবসম্প্রদায় ধর্ম পরিত্যাগ করে অধর্মের পথে চালিত হওয়ায় সূর্যদেব ও বরুণদেবের ক্রোধে পৃথিবীর বিনষ্টিসাধন হয়েছিল। আদি পিতা তাই নব্যগঠিত সভ্যতাকে ধ্বংসের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রে ধর্মের বিধান প্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্দশ মন্বাব্দ থেকে তাই চতুর্বর্ণবিভেদ মান্য করা—”

“তোমার প্রতিটি বাক্য যথার্থ, তবে এই সকল তথ্য তো বর্তমানে যেকোনো শিশুপাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থেই পাওয়া যায়। এই সর্বজনবিদিত সত্যগুলো আমাকে পুনরায় শোনাবার অর্থ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।” —সামান্য অধৈর্য হয়েই বশিষ্ঠ চার্বাকের কথার মাঝে মন্তব্য করলেন। “আর কয়েক দণ্ড দয়া করে যদি ধৈর্য ধরেন প্রভু। আমার ভূমিকাটুকু সমাপ্তির পথে এসে গেছে এবার। প্রাথমিক ভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত ইতিহাস থেকে মূলত দুই শ্রেণীর দেবতাদের কথা জানা যায়। একদল দেবতা প্রতিষ্ঠিত হন বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্য থেকে— যেমন দেবরাজ ইন্দ্র, অগ্নি, সূর্য, বরুণ প্রভৃতি এবং অপরদলের উল্লেখ পাওয়া যায় চলমান ইতিহাসের দৃশ্য দেখে, যাদের নাম জানা যায় না। কোন শ্রেণীর দেবতা অধিক শক্তিশালী এই প্রশ্নে মানব জাতি দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল মানব বৈদিক দেবতাদের আরাধনা করতে শুরু করে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের নেতৃত্বে; আর একটা বেশ বড় দল মহামান্য পার্শ্বনাথের প্রভাবে বৈদিক দেবতাদেরকে খর্ব করে অনামা দেবগণের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়। যদিও বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্য পড়লেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে প্রথম শ্রেণীর দেবতারাই অনেক অনেক গুণে অধিক ক্ষমতাশালী, তবে প্রাচীন সাহিত্য আজো অধিকাংশ মানবের বোধের বাইরে এবং পবিত্র দেবভাষার ওপর যথার্থ অধিকার মুষ্টিমেয় মানবেরই কেবল আছে। চলমান দৃশ্য যেহেতু সর্বজনের বোধগম্য, তাই চলমান ইতিহাস দেখে অনেকেরই ধারণা হয় যে এতে দর্শিত দেবতারাই অধিক বলশালী। তাছাড়া এই মতের সমর্থকদের বক্তব্য হল যে চলমান ইতিহাস যেহেতু সাহিত্য বা চিত্র— কোনও কলামাধ্যমের দ্বারাই রক্ষিত হয়নি, তাই এগুলো স্বয়ং দেবতাদের সৃষ্ট। তেত্রিশ মন্বাব্দে মহান ভাষাবিদ পাণিনি চলমান ইতিহাসের ভাষা বিশ্লেষণ করে দাবী করেন যে এই দুই শ্রেণীর দেবতাদের ভাষা যেহেতু পৃথক, সুতরাং তাঁরা দুই ভিন্ন স্বর্গের অধিবাসী। প্রায় সকলেই তখন তাঁর বক্তব্য হেসে উড়িয়ে দেয়। ক্রুদ্ধ অপমানিত পাণিনি তখন থেকে আর কখনো জনসমক্ষে কোনও বিচার ঘোষণা করেননি। যদিও শোনা যায় যে তিনি আমৃত্যু ভাষাতত্ত্বের বিশ্লেষণ করে দেবতাদের উৎপত্তি আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অনেকে এটাও দাবী করতে থাকেন যে চলমান ইতিহাসের দেবতারা প্রকৃতপক্ষে পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত অসুর সম্প্রদায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলমান ইতিহাসের ভাষা আজ পর্যন্ত উদ্ধার না হওয়ায় এবিষয়ে কোনও স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আজো সম্ভবপর হয়নি।” “আমারও ধারণা ওই দ্বিতীয় শ্রেণীর দেবতারা প্রকৃতপক্ষে দেবতাই নয়, দেবতাদের শত্রু অসুর, ওরাও কিন্তু অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী ছিল, শুধুমাত্র ধর্মপথে চালিত না হওয়ায় অবশেষে দেবতাদের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়। ওদের ভাষা দুর্বোধ্য এবং আমি নিজে চলমান ইতিহাসের বহু নিদর্শন একাধিকবার দেখেও তাতে চতুর্বর্ণের কোনও ইঙ্গিতই পাইনি। চতুর্বর্ণপ্রথা না থাকলে ধর্মরক্ষা অসম্ভব।” আবার বশিষ্ঠ সামান্য উত্তেজিত হয়ে কথার মাঝেই নিজে মন্তব্য করে ফেললেন।

চার্বাক একদৃষ্টে রাজপুরোহিতের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন ওনার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করছিল। যদিও ওই কালো চশমার আড়ালে এই প্রাজ্ঞ ভূয়োদর্শী বৃদ্ধের মনোভাব বোঝা প্রায় অসাধ্য। একটুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল, যেন নিজের মধ্যেই একটা দারুণ দ্বন্দ্ব চলছে তার, অবশেষে সে মনস্থির করে ফেলল। “গুরুদেব, এবার আমি আমার ব্যক্তিগত ধারণার কথা বলছি, অবধান করুন। আমি সম্পূর্ণ অবগত আছি যে হঠাৎ আমার ধারণা শুনলে আমায় উন্মাদ বলে মনে হতে পারে, তবে আমি যথাযোগ্য যুক্তিপ্রমাণ সহকারে নিজ বক্তব্য সমর্থনের চেষ্টা করব। আজ থেকে দশ বর্ষ আগে আমি কলাবিভাগে যোগদান করি— বৈশ্যদের জন্য নির্দিষ্ট ত্রিশটি জীবিকার মধ্যে চারুকলার প্রতিই আমার আকর্ষণ ছিল সর্বাধিক। কলাবিভাগের গোপন গবেষণা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হওয়ায় সকল প্রকার শিল্পকলার নমুনা আমি দীর্ঘকাল ধরে অধ্যয়নের সুযোগ পাই। ঠিক চারুকলার অন্তর্গত না হলেও পৃথক বিভাগের অভাবে চলমান ইতিহাসে নিদর্শনগুলোও আমাদের দপ্তরেরই একটি নির্দিষ্ট কক্ষে রাখা হত, সেগুলোও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবার সুযোগ আমার ঘটেছে। ধ্বংসপূর্বের বিভিন্ন জ্ঞানমন্দির থেকে উদ্ধার করা প্রচুর প্রাচীন পুস্তক পাঠ করে আমার চিন্তায় আসে যে সাহিত্য, চিত্র, সঙ্গীত প্রভৃতি কলাগুলির সংমিশ্রণ সম্ভবপর কিনা, যদিও সঙ্গীত নামক শিল্পকলার সামান্য কিছু নিদর্শন প্রচলিত থাকায় একে অনেকেই প্রকৃত চারুকলা রূপে স্বীকৃতি দিতে চান না। তাছাড়া কয়েকটি জীর্ণ পুস্তকে নৃত্য এবং নাট্য শব্দ দুটির উল্লেখ পাই একাধিকবার, আমার ধারণা ওগুলো অধুনালুপ্ত কোনও শিল্পকলা হতে পারে। লুপ্ত শিল্পের পুনরাবিষ্কার এবং বর্তমানে বিদ্যমান কলাগুলির একত্র যোগসাধনের চিন্তা আমার সমগ্র ধ্যানজ্ঞানমন অধিকার করে ফেলে। যতই কল্পনা করি ততই মনের ভেতর নিশ্চিত হই যে বিভিন্ন ললিতকলার যোগসাধন অবশ্যই সম্ভব, তবে তার জন্য অসাধারণ প্রতিভাশালী মানবের প্রয়োজন। আর সঠিক পদ্ধতিতে নিবিড় অনুসন্ধান চালালে অধুনালুপ্ত কোনও শিল্পকলার নিদর্শন পাওয়াও অসম্ভব নয়। আমি একাগ্রভাবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন নমুনার মধ্যে আমার প্রশ্নদুটির সমাধান সন্ধান করতে থাকি। রাতের পর রাত দপ্তরেই কাটিয়ে অন্যের অলক্ষে এমন কিছু নমুনা অধ্যয়ন করতে থাকি যা মানবকে কলুষিত করবার অভিযোগে নিষিদ্ধ করে বিশেষ গোপন কক্ষে জমা রাখা আছে, যদি এই অজানা নমুনাগুলির মধ্য থেকে নতুন কোনও সূত্র মেলে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে সে সকল নিষিদ্ধ শিল্পকলা আসলে কারোর চিত্ত দূষিত করে না প্রভু, কেবল মানবের মনে ধর্মভাব না জাগিয়ে অন্যরকম এক অনির্বচনীয় আনন্দের আস্বাদ এনে দেয়। গুরুর কাছে স্বীকার করতে বাধা নেই যে এমনকি এই পাপ চিন্তাও কখনো মনে এসেছে যে শিল্পকলার একমাত্র উদ্দেশ্য দেবগণ ও পূর্বপুরুষদের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করাই নয়, এর বাইরেও হয়ত কোনও বৃহত্তর উদ্দেশ্য রয়েছে। হে মহর্ষি, আপনার নিশ্চয় স্মরণে আছে যে ন্যূ নাধিক পঞ্চ বর্ষ পূর্বে সমুদ্র নিকটবর্তী কল্পলতা নগরের ধ্বংসাবশেষের ভেতর যে জ্ঞানমন্দির আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্ববৃহৎ জ্ঞানমন্দির, তার বিশদ অনুসন্ধানের দায়িত্ব ছিল আমার কর্মবিভাগের ওপর, স্বভাবতই আমি অনুসন্ধানকারী দলের একজন সদস্য হিসেবে সেই স্থলে উপস্থিত ছিলাম। এখন স্বীকার করতেই অপরাধবোধ জাগছে যে আমি সেসময় এক অতি গর্হিত কাজ করে ফেলি। আমার দায়িত্ব ছিল ওই স্থান হতে প্রাপ্ত সকল ইতিহাস গ্রন্থের সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা। একটি অর্বাচীন বাঙ্গালা ভাষায় লেখা পুস্তক সেই সময় আমার হাতে আসে যাতে চলচ্চিত্র নামের সম্পূর্ণ নতুন সম্ভাব্য একটি শিল্পকলার গঠনকৌশলের বিস্তৃত বিবরণ লক্ষ করি। সে পুস্তক তালিকাভুক্ত না করে আমি সেটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখে দিই নিভৃতে গবেষণার জন্য। জানি এ অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য, শুধু এইমাত্র বলতে পারি যে কেবল একান্তে বসে নতুন শিল্পের অধ্যয়ন করা ছাড়া অন্য কোনও অসদ্অভিপ্রায় আমার ছিল না। কাল রাতেই আমার এত কালের চিন্তা আর সেই অপহৃত পুস্তকলব্ধ জ্ঞান দিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে এসেছি যে এ যাবৎ আবিষ্কৃত সকল প্রক্ষিপ্ত চলমান ইতিহাস আসলে পূর্বপুরুষদের দ্বারা সংকলিত কোনও প্রকৃত ইতিহাস নয়— নিছকই একটি অনাবিষ্কৃত যৌগিক শিল্পকলার প্রদর্শন যার মূল উদ্দেশ্য ধর্মপ্রচার নয়, অপরের চিত্তবিনোদনহেতু কিছু সাধারণ ব্যক্তির দেবরূপধারণ করে নাট্যকলার অভ্যাস। এই লুপ্ত শিল্পের নামই হল চলচ্চিত্র।” “অসম্ভব কথা বলছ তুমি, বাতুল যুবক! মানবের প্রাচীন ইতিহাস ভ্রান্ত হতে পারে না! পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞ বিশ্লেষণকে তুমি নিছক অনুমানের বশে খণ্ডন করতে পার না!” -এই প্রথম বশিষ্ঠ আত্মসংযম পুরোপুরি হারিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন। বিগত ছত্রিশ বছরে তাঁর রাজপুরোহিত হবার সময় থেকে আজ অবধি কেউ এই ঋষিসুলভ বৃদ্ধকে উঁচু গলায় কথা বলতে শোনেনি। “যুবক, তুমি জানো যে তোমার ধারণা কিয়দংশেও সত্য হলে তার দীর্ঘকালীন ফলশ্রুতি কী হতে পারে? আর তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বললে ধর্মপ্রতিষ্ঠাবিরোধী এই অনৃতভাষণের দণ্ড কী?” “হে মহর্ষি, আপনি সর্বদ্রষ্টা, সর্বশাস্ত্রজ্ঞানী। আপনার বিবেচনার জন্য আমি আপনার কাছেই সেই পুস্তক নিয়ে এসেছি। পুস্তকটি দেখে আপনি স্বয়ং বিবেচনা করুন প্রভু।” চার্বাক শান্ত ভাবে, ধীরে ধীরে কথাগুলো উচ্চারণ করল। বশিষ্ট এতক্ষণ চার্বাকের হাতের লম্বাটে বইটা লক্ষ করেন নি, কালো রঙের একটা মোড়কে জড়ানো ছিল বলেই হয়ত। তিনি নিজের ডান হাতখানি বাড়িয়ে দিলেন চার্বাকের দিকে, সেও কোনও কথা না বলে স্পর্শ বাঁচিয়ে তাঁর হাতে বইটা তুলে দিল।

এক প্রহর পরে বশিষ্ঠ বইটার বিভিন্ন পাতা উল্টেপাল্টে বারবার দেখে কী যেন ভাবছিলেন, যেন কোনও স্থির সিদ্ধান্তে তিনি আসি আসি করেও পৌঁছতে পারছেন না। বিরাট একটা আয়তাকার টেবিলের উল্টো দিকে বসে চার্বাক নির্লিপ্তভাবে তাঁর মুখের প্রতিটি ভাব লক্ষ করছিল। অবশেষে বইটা বন্ধ করে, চোখ থেকে কালো চশমাটা খুলে তিনি চার্বাকের চোখে চোখ রাখলেন। এই প্রথম চার্বাক একটু নড়েচড়ে বসল, বৃদ্ধের চাউনিতে কী একটা যেন ছিল, তাঁর চোখের মণি সমুদ্রের মত গাঢ় নীল, আর তাতে যেন সমুদ্রের তলদেশের নিশ্চল প্রশান্তি। চার্বাকের একটু একটু ঘুম পাচ্ছিল সেই দৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে। “যুবক, সত্যই তোমার আবিষ্কার যুগান্তকারী। আদি পিতা কর্তৃক অপৌরুষেয় শ্রুতি আবিষ্কারের ন্যায় গুরুত্ব তোমার এই মূল্যবান প্রাপ্তির। আজ প্রমাণিত হল যে বৈদিক দেবতারাই সত্য, বেদই অভ্রান্ত, অন্য সব ভ্রান্ত। আমার ধারণাই সঠিক হল যে চলমান ইতিহাসের দেবতারা প্রকৃত দেবতাই নন। এই পুস্তকের কথা কি অন্য কাউকে বলেছ? এই অমূল্য সাক্ষ্য কোনও দুর্জনের হস্তগত হলে কিন্তু সর্বনাশ হবে।” পুরোহিতের গলার স্বর কেমন ঘুমপাড়ানি গানের মত সুরেলা আর ফিসফিসে হয়ে এল।

চার্বাককে নিজের কাঁচে মোড়া কক্ষে একা বসিয়ে রেখে তিনি পার্শ্ববর্তী একটা ছোট অন্ধকার কক্ষে ঢুকলেন, এটা তাঁর গোপন মন্ত্রণাকক্ষ। দুধসাদা টেলিফোনের কথাভাগটা যখন তুলে কানে লাগালেন, তখন দেখা গেল তাঁর হাতটা উত্তেজনায় সামান্য কাঁপছে। শশব্যস্তে কয়েকটা সংখ্যানির্দিষ্ট বোতাম টিপে তিনি অনুচ্চ স্বরে বললেন, “বৎস সুদাস, আমি মহাপুরোহিত বশিষ্ঠ বলছি। আমি যা বলতে চলেছি তা স্থির চিত্তে অবধান কর।”

রাজপুরোহিতের কক্ষে একদল সশস্ত্র প্রহরী প্রবেশ করায় তাদের পায়ের শব্দে চার্বাকের ক্ষণিকের তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে গেল। প্রধান সেনানী এসে প্রথমেই তার হাতের কালো মোড়কটা নিঃশব্দে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ওই সুবিশাল নবতলবিশিষ্ট অট্টালিকা থেকে বের করে একটা বিরাট লম্বা কালো স্বয়ংক্রিয় যানে বসাল যার সামনের দিকের উজ্জ্বল মসৃণ ডালার ওপর একটা গাভীর মাথার ছোট্ট প্রতীকী মূর্তি রয়েছে। তার দুপাশে দুজন প্রহরী এসে বসলে সেই দ্রুতগতি যান চলতে শুরু করল। এতগুলো ঘটনা ঘটে গেল একটি শব্দও খরচ না করে, চার্বাকের মুখ থেকেও কোনও কথা বেরোচ্ছিল না, হয়ত আকস্মিক বিস্ময়ে সে সাময়িকভাবে হতবাক হয়ে গেছিল।

সেনানী রাজপুরোহিতের গোপন কক্ষে এসে গোল টেবিলটার ওপর একটা কালো কাগজে মোড়া আয়তাকার কী একটা বস্তু রেখেই সাথে সাথে বেরিয়ে গেল। এই ছোট্ট কক্ষটা এখন আর পুরোপুরি অন্ধকার নয়, ঘরের এক কোণে হোমাগ্নি জ্বালানো হয়েছে। বশিষ্ট সেই অপবিত্র বইখানি অগ্নিদেবকে সমর্পণ করলেন ধীর পদক্ষেপে। অন্তরে তিনি জানেন যে ওই যুবকের দাবী সত্য, কিন্তু এও জানেন যে এই সত্য গ্রহণ করার মত মানসিক যোগ্যতা বর্তমান কালের মানবের নেই। দেবতাদের অস্তিত্ব একবার অপ্রমাণ হয়ে গেলে স্থিতি ভেঙে পড়বে, মানবজাতি আবার ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। আদি পিতা নিশ্চিতভাবে বুঝেছিলেন যে একমাত্র ধর্মভাব আর দৈব অভিশাপের ভীতিই মূর্খ আর লোভী মানবসম্প্রদায়কে পারস্পরিক হানাহানির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই তিনি অনেক চিন্তার পরে বেদের বিধান প্রচার করেন এবং যে সকল কলা নিদর্শন দৈবকে অস্বীকার করতে প্ররোচনা জোগাতে পারে বা মানবের মনে মুক্ত চিন্তার জন্ম দিতে পারে সেগুলোকে পতিত ঘোষণা করে সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করেন। কোনও নতুন শিল্পকলার নিদর্শন আবিষ্কৃত হলে প্রথমেই রাজকীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কলাবিভাগ সেগুলো খুঁটিয়ে বিচার করে এবং সম্ভাব্য যেকোনো বিপজ্জনক আবিষ্কার কঠোর প্রহরার মধ্যে গোপন কক্ষে স্তূপীকৃত করা হয়, যাতে কোনোভাবেই সেগুলো সাধারণের নাগালের মধ্যে না আসে। আজ যদি যুবকের আবিষ্কারের কথা জনসমক্ষে চলে আসে তবে আদি পিতার সমস্ত পরিশ্রম ও পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। একবার সাধারণের মনে চলমান ইতিহাসের দেবতাদের নিয়ে সন্দেহ প্রবেশ করলে ভবিষ্যতে হয়ত বৈদিক দেবতাদেরও মান্য করবে না কেউ। নাহ্, বৃদ্ধ আর ভাবতে পারছিলেন না। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষের মহান স্বপ্নকে ধূলিসাৎ হতে দিতে পারেন না চোখের সামনে। তবে সত্যের সাধক বশিষ্ঠের বুকে আজ থেকে এক ক্ষত রয়ে গেল চিরকালের জন্য, গলায় আপাত বিজয়ীর মাল্যত ধারণ করেও তিনি নিজে জানেন যে এই বৈজয়ন্তী মালা আদতে সত্যরূপী বৈষ্ণবাস্ত্রের পরিবর্তিত রূপ মাত্র। রাজপুরোহিতের মন আজ বড় অশান্ত। এই বদ্ধ কক্ষে তিনি সারারাত তপস্যায় বসবেন আজ, আত্মশুদ্ধি করতে।

চার্বাক একটা নাতিদীর্ঘ কুঠুরিতে একা বসে ছিল যার তিন দিকে নিরেট পাথরের দেওয়াল আর সামনে ইস্পাতের শক্ত গরাদ। হঠাৎ গরাদের সামনে এক গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহী মধ্যবয়সী পুরুষ নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালেন, যাকে দেখলে বলে দেবার প্রয়োজন নেই যে তিনি কোনও উচ্চবংশীয় অভিজাত রাজপুরুষ, যার ক্ষিপ্র চলাফেরা আর দেহভঙ্গিমার আভিজাত্য দেখে কেবল শার্দূলের উপমাই মনে আসে। “বৎস চার্বাক! আমার নাম সুদাস।” চার্বাক মুখ তুলে চাইল সেই পুরুষের দিকে। এক অনির্বচনীয় শ্রদ্ধায় হাত দুটো নিজেরই অজান্তে জড়ো হয়ে গেল বুকের কাছে এসে। “বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি।/ তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।।” সেই অপরিচিত পুরুষের উদাত্ত জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত শ্লোক সেই ক্ষুদ্র কক্ষের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ছিল। আবার স্থির নিষ্কম্প কণ্ঠে তিনি বললেন, “বৎস, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ধর্মভ্রষ্টতার অপরাধে তোমার অন্তরে বাসকারী অবিনশ্বর আত্মাকে এই জীর্ণ শরীর মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। চিরন্তন অজর অমর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তোমার অন্তিম ইচ্ছা পূর্ণ করা হবে, একমাত্র মুক্তিলাভ ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু ইচ্ছা কর। নির্ভয়ে বল বৎস, কী তোমার মনের শেষ আকাঙ্ক্ষা?” চার্বাক চোখের জল কোনোক্রমে রোধ করে ভক্তিগদগদস্বরে বলে উঠল, “রাজনকে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম, তাঁর দেবদুর্লভ কণ্ঠ শোনার সৌভাগ্য হল, তিনি আমার সাথে একান্তে বাক্যবিনিময় করলেন, এই তো আমার কাছে অকল্পনীয়! তবে রাজনের এত প্রশ্রয় পেয়ে আমার আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে গেছে। দেবতা, আমি দেহত্যাগ করবার আগে কলাবিভাগের একটি পৃথক কক্ষে রক্ষিত চলমান ইতিহাসের পঞ্চশত তেত্রিশ সংখ্যক নিদর্শন একবার দেখতে ইচ্ছা করি।” “তোমার মনোবাঞ্ছা শীঘ্রই পূর্ণ হবে বৎস। দেবতারা তোমার চিত্তকে অভয় প্রদান করুন, তোমার আত্মা শান্তি পাক, প্রার্থনা করি পরবর্তী জন্মে তুমি নিষ্কলুষ ধার্মিক ব্রাহ্মণরূপে জন্মলাভ কর।” সুদাস ধীর পদক্ষেপে চলে গেলেন।

মৃত্যুর দুই প্রহর আগে সেই বদ্ধ কুঠুরিতে বসে চার্বাক তন্ময় হয়ে ইতিপূর্বে একাধিকবার দেখা চলমান ইতিহাসের এক পরিচিত নিদর্শন দেখছিল। তার সামনে ধ্বংসপূর্ব যুগের একটা ক্ষুদ্রাকৃতি গোলাকার যন্ত্র রাখা আছে, যার থেকে একটা সূক্ষ্ম অথচ তীব্র লাল আলোর রেখা উলটোদিকের পাথরের দেওয়ালে পড়েছে। দেওয়ালে দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র গুম্ফধারী একটি খর্বকায় পুরুষকে, যার পোশাক অকিঞ্চিৎকর, দেহের তুলনায় নিতান্তই বিসদৃশ মাপের; ঠোঁটের কোণে সবসময় আলতো একটু দুষ্টু হাসি যেন লেগেই রয়েছে। হাতে একটা ছড়ি আর মাথায় একটা গোলাকার টুপি নিয়ে তিনি বিদ্যুদ্বেগে অদ্ভুত যুক্তিহীন সব কাণ্ড ঘটিয়েই চলেছেন; কোনো ক্লান্তি নেই, চিন্তা নেই, শঙ্কা নেই, বিষাদ নেই। ইনি কি মানবজাতির কোনও প্রাচীন পূর্বপুরুষ, নাকি কোনও দেবতা? চার্বাক মনে মনে ভাবছিল যে দেবতা না হলে কেউ কেবল আপন উপস্থিতি দিয়েই মানবের মনে এত অনাবিল প্রশান্তি কীভাবে সৃষ্টি করতে পারে! একা ঘরে বসে চার্বাক, তার মৃত্যুলগ্ন উপস্থিতপ্রায়, প্রক্ষিপ্ত ইতিহাস দেখতে দেখতে হেসে উঠছিল বারবার, আর হাসির জেরে নিজেরই অজান্তে তার দুচোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল।

আপনার মতামত জানান