খেলা

নৈর্ঋত সোম


শহর ছোটো কি বড়, বয়স কম কি বেশি জেনে না রাখাই মঙ্গল। গিজগিজ করছে নিচু-উঁচু বাড়ি। বাড়ি, কোনোটাই খুব কিছু নিচু নয়, কোনোটাই খুব কিছু উঁচু নয়। পথিক দেখে কোনো বাড়িতেই কপাট নেই তো কোনো! জানলা নেই, দরজা নেই! ইচ্ছে মতো কোনো বাড়িতে ঢুকে পড়লেই চলছে। এই বাড়িটায়, যে ঘরে পথিক ঢুকেছিল, যে দিকে পথিক চেয়েছিল, সেখানে মাঝবয়েসী মানুষটি উনুনের তাতে বসে বসে মোম গলাচ্ছে, জমিয়ে রাখছে ছোটো-ছোটো সানকিতে। পাশে একটি শিশু, সাদা জামার উপর তার বাদামী সুতোয় ফুল-ফুল আঁকা, মোম ঢালবার আগে সানকিতে সলতে সাজিয়ে দিচ্ছে। রাঙা সানকিগুলো মোম থেকে তাপ নিয়ে নিমেষে গাঢ় হয়ে উঠছে, পথিক দেখল। সবসময়েই পথিকের জন্য ঘরে আসন বিছানো থাকে। অল্প অল্প ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল, তাই পথিক আসন টেনে নিয়ে উনুনের কাছাকাছি এসে বসল। পথিকের দিকে চেয়ে, শিশুটি মৃদু হাসে। তার কাজ আর অল্পই বাকি, এখুনি সে অবশিষ্ট সানকি ক’টায় পলতে সাজানো হয়ে গেলে ছুটি পাবে। ফিরতে যেন দেরি না হয়! রাতের জন্য বিকেলের ফুল তুলতে যেতে হবে মনে আছে? ঘাড় হেলিয়ে শিশুটি দৌড় দেয় সিঁড়ির দিকে। প্রত্যেক বাড়ির ছাদে শিশুরা নিজেদের খেলার আয়োজন করে রাখে, খুব ঘন সন্নিবিষ্ট বাড়িগুলির ছাদের মধ্যে অল্পই ফারাক। এতক্ষণে পথিক জড়তা কাটিয়ে খানিক হালকা হয়। চোখ ভরে মাঝবয়েসীকে দেখতে দেখতে একেকটা সলতে বসানো সানকি তার দিকে এগিয়ে দিতে থাকে। এখন কেন এখানে? তোমার যে আজ মুচকুন্দে যাওয়ার কথা, বলেছিলে..ওরকম তো আমি কত কিছুই বলি..না আজ তুমি এখানে আসবে একেবারেই বলোনি, আজ হাতে এত কাজ..তোমার তো রোজই কাজ, আজ আমি না হয় এমনি এসেছি। পথিক তালি দিয়ে দিয়ে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে থাকে, মাঝবয়েসী মানুষটি অযাচিত প্রাপ্তিতে উদ্বেল হয়ে ওঠায় উনুনের আঁচ বাড়িয়ে দেয়। মাঝবয়েসী জানতই পথিক আজ এখানে আসবে, সে প্রতি সকালেই ভাবে পথিক আসবে, কেবল রোজ এমনটা ভাবে বলেই যে সে জানত এমন যদিও নয়, তবু, মনে হয় যে সে জানত। অপেক্ষায় সে থাকে বলেই তার চোখে জল এলো, বর্ষার শুরুতে যেমন গ্রীষ্মের শুকিয়ে যাওয়া কূপের নাভির চারপাশ থেকে জল ঢুকতে থাকে, তার চোখের ভাঁজ-খাঁজ জলে সেভাবে ভরে যেতে লাগল, প্রয়োজনে কুয়ো থেকে তুলে নেওয়া একবাঁক জলের মতোই তা থেকে একটি জলের ফোঁটা, সে মুখ নিচু করে রেখেছিল বলে গলা মোমের কড়াইতে পড়ে ও বিস্ফোরক থেকে বিস্ফোরণ যেভাবে ছড়িয়ে যায় সেভাবে মোমের তরল ঢেউ কড়াইময় ছড়িয়ে গেল। পথিক তপ্ত মোমের আঁচ নিচ্ছিল খুব কাছ থেকে। এ'সময় ঝড় উঠে গেল। প্রাত্যহিক এই ঝড় আর কে কবেই বা ভয় করেছে? বিদ্যুৎ-জল-হাওয়ার ঝাপটে প্রতিদিন বাড়িগুলো ধুয়ে যায়, ফলে অন্ধকারে দেওয়ালগুলো আর আড়াল করতে পারে না কিছুই, দরকারও পড়ে না, পথিক কখনো রাতে থাকে না কোনো ঘরে, বাতি নিভিয়ে দিলে অন্ধকারই আড়াল হয়ে থাকে। ঝড় বিকেলের ইঙ্গিত, তাই মাঝবয়েসী শিশুটিকে ডাকতে থাকে। তাড়া দেয়। পথিক ছাদের দিকে এগোয় এবং দেখে শিশুটি অন্য একটি শিশুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমের ভান করে আছে, তাদের আজকের যে অনেক কথা সেসব সব বলা হয়ে গেছে তার মানে। পথিক আর মাঝবয়েসী রাতের জন্য বিকেলের ফুল তুলতে চলে যায়। শহরের অনেক উত্তরে বিকেলের ফুল ফোটে, শহরের সর্পিল পথ বেয়ে মাঝবয়েসী আর পথিক হেঁটে যায়। ঝড়ের হাওয়ায় ভেসে আসা গান, আলোয় ভেসে ওঠা চমক, জল বেয়ে নেমে আসা ঠাণ্ডা তাদের সাথে ছিল। খেলা ফেরত শিশুরা ছাদ থেকে ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছিল বেগুনি-হলুদ ঝোড়ো আকাশের ক্যানভাসে। শিশুদের তো মাটিতে পা রাখতে নেই, তারা ছাড়া নানা বয়েসের অগুন্তি মানুষ ভিড় করেছিল সংকীর্ণ পথে-ঘাটে। ঝড়ের সময় সকলেই ঘর ফেলে রেখে আসে। একা কেউ কেউ, কেউ কেউ দোকা। বিকেলের ফুলগুলো ঝড়ের তালে নাচছিল। অবশ্য সকলেই ফুল তুলতে আসেনি, কেউ কেউ পশ্চিমের নদীতে প্রদীপ ভাসাতেও বেরিয়েছিল। মাঝবয়েসীর কাঁধে ঝোলানো ঝুড়িতে দুজনে ফুল তুলতে থাকে। অন্য সমস্ত ফুল তুললেও কুঁচো সাদা ফুলগুলো তারা তোলে না। সাদায় সমস্ত রঙ থাকে তাই পরিপূর্ণতার এই ভীষণ প্রতীককে তারা সসম্মানে এড়িয়ে চলে। এদিকে মাঝবয়েসীর অলক্ষ্যে পথিক কিছু সাদা ফুল আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়। ঝড়ময় সান্ধ্য আকাশের গাঢ় রঙের ওপর সাদা কয়েকটি বিন্দু অবশ্যম্ভাবী এক লয় মুহূর্ত সূচিত করে, চারপাশে অনেক কিছু ঝাপসা হয়ে আসায় পথিক একটা কোনো অবলম্বন আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল— আমি কিন্তু কাল মুচকুন্দে যাব, আবার কবে আসতে পারব বলতে পারি না...

আপনার মতামত জানান