কার শেড

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

কার শেডের দিকে এমনিতেই বেশি রাত হয়ে গেলে কেউ যায় না। তার ওপর আজ সন্ধে থেকে তুমুল বৃষ্টি।
বড় জাংশান, রাত একটাতেও স্টেশনে লোক থাকে। প্যাসেঞ্জারদের ছুটোছুটি, ঝিমুনি আর চাওয়ালাদের হাঁক। কিন্তু এইসব কিছুই শুধু ওই জাংশান আর স্টেশনের বাইরের কিছুটা জুড়ে। স্টেশন থেকে যত দূরে সরে যাই, তত যেন অন্ধকার নিশুতি রাত কালো জিভ দিয়ে চেটে নেয় সব কিছু। রাত একটার সময় শেষ প্যাসেঞ্জার ট্রেনটা হল্ট করে। তারপর আর একটা রিকশা পর্যন্ত ডিউটি দেয়না মাইরি! চায়ের দোকানগুলো ঝাঁপ নামিয়ে দেয়। দূরে, লাইনের ওইদিকটা ওয়াগন ব্রেকারদের ভয় ছিল আগে। তারপর হুটহাট কাটা পড়েছিল বেশ কয়েকটা। সেই থেকে নানারকম ভয়। হজমুখ্যু লোক বলে নয়, শহর থেকে আসা বাবুরাও একটু সামলে চলে। রাত বিরেতে কেউ স্টেশনের ধারে কাছে আসতে চায়না খুব দরকার না পড়লে। রাত একটা বেজে গেলে স্টেশনে কেউ আসে না। স্টেশন থেকে কেউ যায়ও না। আবার সেই ভোর সাড়ে চারটে। মাঝের সময়টা জাংশানের ছুটি। সারাদিন পর একটা ঘুম দিয়ে নেওয়ার সময়। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হুশ করে চলে যাওয়া এক্সপ্রেসগুলোও সেই ঘুম ভাঙাতে পারবে না। যদিও বা সিগনালের জন্য কোনও হতভাগা ট্রেনকে একটু দাঁড়াতে হয় - চাদর টেনে ঢাকা এই জাংশানের মুখ, আর বেরিয়ে থাকা পায়ের বুড়ো আঙুল দেখলে তার মায়া হবে।

স্টেশনটা নিঝুম হয়ে যায় রাত একটার পর। আর এই কার শেড, স্টেশন থেকে দূরে। তার ওপর এমন বাদলা রাত। নেশা ভাঙ করতেও কেউ আসে এদিকে?!
স্টেশনে আজকে তেমন কিছুই জুটল না। এত অল্প লোকের মাঝে এর তার পকেট হাঁতড়ানো খুব ঝক্কির কাজ। একটু কনুইয়ের ঢুঁশো দিয়ে চলে যেতেও কিছু লোকের জটলা লাগে, তাও পেলাম না কোথাও। এমন বৃষ্টির জন্যেই বোধহয় আজ লোকজন কম। তার ওপর লোকগুলোও হয়ে গেছে সেয়ানা। সাত-পাঁচ কথায় কেউ বেব্‌ভুল হয়ে থাকে না। হাতের আঙুলের ফাঁকে ঝোলাটা প্যাকেটটা ঢিলে হয়েও থাকে না। মোবাইলটা, পার্সটা যে তুলবো... তারও আজকাল বেশি ভরসা পাই না। কার্ড দেবে লক করে। আর মোবাইল চোর-বাজারে দেওয়া অনেক হ্যাপা, লাভও থাকে না। খাটনি সার। আর এতকাল এই লাইনে থেকে হঠাৎ করে ওই মুলোটা কলাটার মত ছিঁচকেমি করতেও মনটা কেমন খুঁত খুঁত করে। খুব বড় দাঁও না হোক, গুরুর আশীর্বাদে হপ্তায় চলে যাওয়ার মত কিছু ম্যানেজ করে নিতাম আশপাশের তিন-চারটে স্টেশন মিলিয়ে। অল্পবয়সে অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল। নিজের দল... বড় দাঁও। তারপর দেখলাম ওসব আমাদের মত গোলা পায়রাদের জন্য নয়! বেশি ডানা ঝাপটালে ক্যাঁক করে কে কবে ধরে সাবার করে দেবে... গুরু ঠিকই বলত, 'আসলে সবই মায়া, যতটুকু সয় ততটুকু রয়!' কিন্তু আজ সালা মনটা একদম খিঁচড়ে গেল। বিকেল থেকে এদিক ওদিক করে গেলাম, এক্কেরে কিস্যু লাভ হ'ল না। খুবই অমঙ্গলে দিন। নইলে এমন রাত অবধি খালি হাতে পড়ে থাকতে হয়? তার ওপর এই কুচুক্কুরে বৃষ্টি!

--- --- ---

কার শেডটা এককালে বেশ কায়দা মেরেই বানিয়েছিল। কিন্তু তারপর কোথা থেকে কী হ'ল, আর আগের মত ব্যবহার হ'ত না। দেখভালের অভাবে ভোগে গেল। দু'স্টেশন পর বড় জাংশানের কার শেডটাই এখন ব্যবহার হয়। এটার হয়ে গেছে। আগে একটা দুটো বাতিল আর বেকল হওয়া ইঞ্জিন, বেওয়ারিশ বগি পড়ে থাকত কাছাকাছি সাইডলাইন হয়ে। এখন তাও থাকে না। কার শেডের খাঁচাটা পড়ে আছে - শ্যাওলা, আগাছা, সাপ-খোপ, জং-মরচে নিয়ে। ওই কার শেডের ভেতর থেকে আলো আসতে দেখেই চমকে উঠেছিলাম। এত বছর ধরে এ লাইনে আছি, এত রাতে কার শেডের ধারে কাছে কেউ যায় না। সেখানে এমন আবছা আলো দেখে শুধু চমকে নয়, একেবারে থমকে গেলাম। মনে হ'ল আলোটা যেন কাঁপছে, তার সাথে ছায়াও কাঁপছে... ওই আগুনের শিখায় যেমন হয়। মোমবাতি, হ্যারিকেন, কাঠকুটো জ্বালিয়ে আগুন... যাই হোক; কিন্তু ঝড়-জলের রাতে? ভাবলাম, চুলোর কাটিয়ে দিই। ওই সাপখোপের মাঝে কার শেডে কে কী লটঘট করতে ঢুকেছে! ওইসবের মধ্যে গিয়ে আর এই তেতো দিনের পিত্তি চটকাবো না। মা কালীর দিব্যি একদম মুখ ফিরিয়ে চলেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মেয়েমানুষের গলা শুনে বুকটা ধক করে উঠল! স্পষ্ট শুনলাম, কার শেডের দিক থেকেই আওয়াজটা এলো। কোনও মেয়েমানুষ কথা বলছে। না শুধু কথা বলছে না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! মিথ্যে কথা বলব না, রাতবিরেতে হঠাৎ করে মেয়েমানুষের গলা পেলে একটু মন উচাটন হয়। অল্পবয়সে মাঝে মাঝে ওদিক পাড়াতে যাওয়ারও অভ্যেস ছিল। এই লাইনের কাছাকাছি কে কখন আসে, তাও জানতাম। কিন্তু সেই সময় যে মনের ফুরুৎ ফুরুৎ ছিল, তা সব কিছু ওই মাথার চুলের মতই মরে হেজে গেছে এখন। সব কেমন পানসে ঠেকে। ওরাও দেখলে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে দেবে। কী দরকার! কিন্তু ও মাগীদের... অ্যাল্‌ল্‌, মাফ করবেন... মানে ওদেরও রাত বিরেতে ওই কার শেডের ভেতর সেঁদনোর ইচ্ছে হবে না। এদিকে বৃষ্টিটারও থামার নেই। সন্ধের মত অত ঝাঁইঝাপ্পর না হলেও এখনও পড়ছে টিপটিপ করে। দূরে এখনও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আবার ঝাপটা দিয়ে ফিরে এলো বলে। এমনিতেই কাকভেজা হচ্ছি, এবার পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি এদিক থেকে পাতলা হওয়াই মঙ্গল। কিন্তু ওই কার শেডের কাঁপা কাঁপা হলুদ আলো, মেয়েমানুষের কান্না, যেন পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিলো। সাত-পাঁচ ভাবারও ইচ্ছে হ'ল না। ভিজে ঘাস, ভেজা আগাছা, শিরশির করা ঠাণ্ডা রেললাইন... সব পার করে কার শেডের দিকে এগিয়ে গেলাম ওই আলোর দিকে তাকিয়ে।

নাহ্‌, কার শেডের ভেতরে ঢোকার সাহস কিছুতেই হ'ল না। আর আলোটাও সামনা সামনি গিয়ে দেখার জোর পেলাম না বুকে। হ্যাঁ, আমার ভাল রকম ভয়ডর আছে। ওই বড় জোর উঁকিঝুঁকি দিয়ে চেষ্টা করতে পারি। এদিকটা টিনের বেড়া, ঝোপঝাড়ের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকলে কেউই টের পাবে না। তাও কেমন অদ্ভুত গা শিরশির করছিল। আসলে, নিজেই কখনও এই কার শেডের দিকে এমন ঘুটঘুটে রাতে কস্মিনকালেও আসিনি। এমনিতেই ভিজে গেছি, হাওয়া দিলে শিরশির করছে... হাতেপায়ে জল সপসপ। সেই জন্যে? নাকি এই নিশুত রাতে কার শেডে এমন আলো; ওই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাটা মনে হল থেমে গেছে... মেয়েমানুষের গলায় কেউ কথা বলছে এখন খুব নিচু গলায় - মিনমিন করে।
- 'এখন কী হবে মিলনদা? আর তো ট্রেন নেই! কোথায় যাব?'
ট্রেন ধরতে এসেছে? তাহলে স্টেশনে না থেকে এখেনে কেন? জয় মা বলে জং ধরা টিনের ফাঁক দিয়ে একটা উঁকি দিলাম। ভেবেছিলাম হাড় হিম করা কিছু দেখে জমে যাব, হাত-পায়ের আঙুলগুলো শিঁটিয়ে গেছিল। কিন্তু নাহ্‌ ঠিক তেমন কিছুই না... আবার 'তেমন কিছু'ও বটে। দেখলাম একটা অল্পবয়সী মেয়ে বসে আছে, বুঝলাম সে-ই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। শাড়ী, খোলা চুল আর শরীরের যতটা বোঝা যায়, তার থেকেই বোঝা যাচ্ছে এটা মেয়ে, আর অল্পবয়সী। আর তার সামনে মাথা নিচু করে বসে একটা লোক। এই মালটাই তাহলে মিলনদা, যে মেয়েটাকে ভাগিয়ে এনেছে! এই বৃষ্টির মধ্যে কার শেডের নিচে এইভাবে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে বসে আছে কী করে মালদুটো? কেউ থাকে নাকি এভাবে? হাতের টর্চটা নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে, আর অল্পঅল্প দোলাচ্ছে টর্চটা। তাই জন্যেই হয়ত দূর থেকে এমন লাগছিল, আলো কাঁপছে। সালা টর্চ জ্বালিয়েছে আবার! জ্বালাবে না? সাপখোপের ভয়ে ফাটছে! কিন্তু এতক্ষণে কারও নজরে পড়ল না কেন? টর্চের আলো দেখলে তো রেল ইয়ার্ডের কারও না কারও ঠিক নজরে যাবে। এসে আচ্ছা করে গাদন দেবে দুটোকে এত রাতে এইখানে বসে লুল্লুরি করার জন্য! গাঁজাখোর, চুল্লুখোর, সাট্টাবাজ, স্মাগলার... কেউ এতরাতে এদিকে আসে না। সখ কত! কিন্তু 'নজরে পড়ল না কেন?', এইটা মাথায় ঘুরতেই থাকল মশার মত পোঁ পোঁ করতে করতে। একবার ভাবলাম 'ছিঁড়ুক গে, আমারও ছেঁড়া যায়... নিজের কাজে যাই।' কিন্তু এদের দু'জনকে দেখার পর ওখান থেকে আর নড়তে ইচ্ছে করল না। এই যে মশারা জ্বালাচ্ছে, এই যে আমার পায়ের পাতার ওপর দিয়ে একটা বোরা সাপ চলে যেতে পারে, কিংবা এদের দেখতে গিয়ে রেল পুলিসের হাতে আমিই খালি পেটে ক্যালানি খেতে পারি - এইসব চিন্তাগুলো করতে করতেই ওদের দেখে গেলাম টিনের ফুটোয় চোখ রেখে। মেয়েটা তখনও ফুঁপিয়ে যাচ্ছে, কান্না থেমে গেলেও মাঝে মাঝে হেঁচকি তোলার মত কাঁপা কাঁপা শ্বাস নিচছে। লোকটা একই ভাবে মাথা নিচু করে বসে। আগাছার পাতা ছিঁড়ছে, টর্চ দোলাচ্ছে। টর্চটা নিচের দিক করে ঝোলানো। হেব্বি চালু, যাতে কম আলো হয়। তবে ওই আলোতে যতটুকু দেখতে পেলাম, ভদ্দরঘরের ছেলে-মেয়ে বলেই মনে হ'ল। তবে লোকটা মেয়েটার থেকে বড়। মেয়েটা বোধহয় কলেজে টলেজে পড়ে। নির্ঘাৎ ব্যাটা ছাত্রী ফুসলিয়ে পালাচ্ছে! তবে আর যাই হোক, এই কার শেডের ভেতরে ফষ্টিনষ্টি করতে তো আসেনি এত রাতে... এসব ভদ্দরলোকের আবার রুচি-টুচি থাকে। ক্লাস মারায়। এরা কার শেডে এসে আঁচল সরিয়ে ব্লাউজে মুখ ঘষবে না। আর এত রাতে তো কখনওই না! তাহ'লে... তাহ'লে স্টেশনে ট্রেন নেই বলে এখানে আসতে গেল কেন?
-'কিছু বলছ না কেন তুমি? আমি কি পাগল? একাই কথা বলে যাব?'
- 'আহ্‌! দেখলি এখন ট্রেন নেই। যা হওয়ার কাল সকালেই...'
- 'কাল সকালে? সারা রাতে এই ভাবে পড়ে থাকব? সব্বাই বাবাকে চেনে... আমার মুখ চেনে। সকালে যে দেখবে সেই চিনে যাবে... '
- 'চিনলে চিনবে!'
-' চিনলে চিনবে? বাহ্‌! চমৎকার! এমনিতেই এই ভাবে পালিয়ে যাচ্ছি তোমার সঙ্গে। এতক্ষণে বাড়ি থেকে হয়ত খোঁজও শুরু হয়ে গেছে। কাল সকালে থানা পুলিস হবে। তার ওপর তুমি...'
- 'আসতে কথা বল... আসতে!'
- 'আসতেই বলছি। ফিসফাস করেই সব কিছু চলা ভাল। তোমার মত লোকের জন্য ফিসফাসই ঠিক। এতদিন ঠেলে ঠেলেও কোনও ভাবে কিছু করতে পারলে না। চাকরিটা পেলেও একটা কথা ছিল। কিচ্ছু নেই, কোনও শিওরিটি নেই... তাও কোনওদিন কিচ্ছু বলিনি!'
- 'শিওরিটি নেই তো আছিস কেন? চলে যা... '
- 'চলে যাবো! এখন একথা বলছ মিলনদা?! দু মাস পিরিয়ড মিস্‌ হয়েছে... ডাক্তার দেখাতেও ভয় করছে। আর এখন বলছ চলে যা...'
সত্যিই কাউকে নিয়ে পালানোর ইচ্ছে থাকলে এমন রাতে কার শেডের ভেতর বসে কেউ ভ্যানতারা করে নাকি? কথাবার্তা শুনে বেশ ভজকট কেস লাগল। মেয়েটা ভালরকম কেস খেয়েছে, আর লোকটা ঘুঘু মাল। এতক্ষণ মাথা নিচু করেই একটা দুটো কথা বলছিল লোকটা। এমন মাথা নিচু করে আমাকেও থাকতে হয়, যখন ধরাটরা পড়ে যাই কালেভদ্রে। বা ডিউটিতে থাকা পুলিসের কেউ হঠাৎ করে ডেকে কিছু জিজ্ঞেস করে। মনে হচ্ছিল দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে সহ্য করছে। হঠাৎ মাথা তুলে মেয়েটার দিকে তাকাল, তারপর হাতের টর্চটা গদাম করে বসিয়ে দিলো মেয়েটার মাথায়! মারার সময় টর্চের আলোটা সোজা চোখের ওপর পড়েছিল। মেয়েটা চমকে উঠে তাকিয়েছিল লোকটার দিকে, কেমন অবিশ্বাস নিয়ে চমকে ওঠা চোখ! তারপর লাইনের ওপর আগাছায় লুটিয়ে পড়ল। টর্চটা নিভল না, তখনও লোকটার হাতে শক্ত করে ধরা। লোকটার হাত কাঁপছে। টেনশন, প্রথমবার কাউকে খুন করতে গেলে এমন হয়। আমি দেখেছি। মেয়েটার ভিজে শরীরটার ওপর টর্চের আলো পড়ছে। শাড়ীর আঁচল লাইনের ওপর লুটিয়ে। ভিজে বুক, ভিজে কোমর দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল আমার বুকটা; শিরশির করে উঠল তলপেটের নিচে। অভাগারা পায় না, যারা পায় তারা পাপোষের মত পা পুঁছে চলে যায়। এমন জিনিসকে এই ভাবে সাবার করে দিলো?! এই প্রথম লোকটার ওপর রাগ হ'ল... হেব্বি রাগ।

লাশ আমি আগেও দেখেছি। তাজা লাশ, বাসি লাশ। গলা কাটা বডি। চটের বস্তায় রাখা টুকরো। খুনও হ'তে দেখেছি। এসব দেখলে আমার বুকের ভেতর কিছু খাবিটাবি খায় না। মাথা ঘোরে না, বমি আসে না, গলাও শুকিয়ে যায় না। ছুরি, গুলি এইসব খরচ না করে স্রেফ মাথায় মেরে অজ্ঞান করে তারপর লাশটা রেল-লাইনের ওপর রেখে যাওয়া পুরনো খেলা। অ্যাক্সিডেন্ট বলে নিয়ে যাবে পুলিস। যদি বডি'র চেনাজানা কেউ সেই নিয়ে ধস্তাধস্তি করে তবেই মামলা এগোবে নাহলে চুপচাপ ফেলো ঝাঁপ। এই ঝানু মালও হয়ত এখন লাসটা নিয়ে রেললাইনের দিকে যাবে। একা একাই এই বৃষ্টির মধ্যে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাবে এই কচি বডিটা। মরেনি, তবে রাতের এক্সপ্রেসটা এলে মরবে। এই হারামিটা বসে বসে দেখবে যে ট্রেন গেল, বডি কাটল, তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে। সব দেখেছি... চেনা আছে! ঘড়ি-টড়ির পাট কোনকালে চুকে গেছে। স্টেশনের ঘড়ি দেখে সময় বুঝি, এখন কত রাত হ'ল কে জানে... হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যে এক্সপ্রেসটা আসারও সময় হয়ে যাবে। লোকটা মেয়েটার ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখল, তারপর মেয়েটারই শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছে উঠে দাঁড়ালো, কোমরে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইল নিচের দিকে। এইবার আমি টুক করে টিনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম, কোনও রকম নাটক না মারিয়ে সোজা বললাম 'হাত লাগবে?' লোকটা চমকে এদিকে তাকালো, যেদিকে আমি আছি। আমার দিকে কোনও আলো ছিল না, একদম নিকষ অন্ধকার বললেই চলে। বোধহয় বুঝতে পারল না, আমি ঠিক কে বা কি। থমকে গেছে দেখে আবার দু পা এগিয়ে গিয়ে বললাম 'মরে তো নি... শ্বাস চলছে। রেললাইনের ওপর গিয়ে ফেলতে হবে জ্ঞান ফেরার আগে। তাই বলছি... একা পারবেন? না হাত লাগবে?' আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা দৌড় দিলো উলটো দিকে। এমন আনারি মাল জম্মে দেখিনি, সত্যিই প্রথমবার মানুষ মারছে। নাহ'লে এইভাবে কেউ আধমড়া লাশ ফেলে পালায়?! 'আরে আরে... এভাবে ফেলে যাবেন না, কেলেঙ্কারী হবে!' বলে আমিও দৌড় দিলুম। অন্ধকার রাতেও আমার চোখ আর পা ঠিক থাকে... সবই গুরুর মহিমা! একদম সামনে এসে দাঁড়ালাম লোকটার। আমাকে ঠেলা মেরে সরাতে গিয়ে টাল খেয়ে পড়ে গেল। অন্ধকারেও দেখলাম, চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে... যেমন ভয় পেলে হয়, হেব্বি রকম ভয় পেলে। 'এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি পুলিস-ফুলিস কিস্যু না! চলুন ধরাধরি করে চ্যাংদোলা করে লাইনে শুইয়ে দিই। একখুনি ট্রেন এলো বলে...' লোকটা কোনওরকম হ্যাঁচরপ্যাঁচর করে উঠে লাইন ধরে আবার দৌড়। যাচ্ছে কোনদিকে?! সোজা লাইন ধরে পাগলে দৌড়োয়, আবার হোঁচট খাবে অন্ধকারে। পালানোরই দরকার তো সাইডে পালা... লাইন থেকে বেরিয়ে পাশে খানাখন্দ ঝোপঝার দিয়ে পালা। এ যে একেবারে তাল কানার মত খাবি খেতে খেতে দৌড়চ্ছে অন্ধকারে, তার ওপর আবার বৃষ্টি। ওই ওই... আবার বিদ্যুৎ চমকালো। মেয়েটার এখনই জ্ঞান ফিরে আসতে পারে, যা মেঘ ডাকছে। ট্রেনটাও এসে চলে যাবে। কি যে করি! নিরুপায় হয়ে আমাকেও ছুটতে হ'ল। আবার দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, 'মাথায় কি ছিট আছে? দম নেই তো এসব লাইনে নামা কেন ভাই? আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে আপনার পেছন পেছন সারা রাত দৌড়ে বেড়াব?!' লোকটা আবার থমকে দাঁড়ালো, কয়েক পা পেছনে হেঁটে আবার টাল খেয়ে লাইনের ওপর পড়ল। তারপর কোনও রকমে লাইন ধরে উঠে আবার দৌড়। যেদিক থেকে এসেছে সেইদিকেই ছুটতে শুরু করল আবার। কার শেডের দিকে।
এদিকে সিগন্যাল সবুজ হয়েছে, রেললাইন কাঁপছে। এক্সপ্রেসটা ধাঁ করে এসে চলে যাবে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। এই কার শেডের কাছাকাছি একটা লাইন দিয়েই যাবে। এ যেন ফুটবল খেলার মত অবস্থা, আমি এই হাফ থেকে ওই হাফ ছুটে যাচ্ছি। না ছুটলেই হয়। সারাদিন কিছু জোটেনি। ম্যাদামারা দিন। তাই জন্যেই রাতদুপুরে এমন খোরাক পেয়ে চনমনে হয়ে গেল মনটা? আবার দৌড় দিলাম, এবার আর সামনে না গিয়ে পাশে এসেই ছুটতে ছুটতে বললাম 'আরে ট্রেনটা এসে পড়বে এখনই। চটপট লাইনে বডিটা ফেলুন নইলে অন্য রাস্তা ভাবতে হবে। সে অনেক হ্যাঙ্গাম। জ্ঞান ফিরে এলে পথে বসবেন!' লোকটা হাঁফাতে হাঁফাতে আমার দিকে একবার তাকিয়েই ছিটকে 'না!' বলে একটা চিৎকার করে পাশের লাইনে ঝাঁপ দিলো... আর টাল রাখতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ল। আর ঠিক তখনই অনাচ্ছিষ্টি কাণ্ডটা ঘটে গেল! এক্সপ্রেস ট্রেনটা আসবি তো আয়, একেবারে ওই লাইনের ওপর দিয়ে ঝনাৎঝন করে এসে চলে গেল। আআআআ করে চিৎকার, বডি একেবারে কচুকাটা। ট্রেনটা স্পীড কমাতে কমাতে স্টেশন ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে থামল। স্টেশনে সবার ঘুম চটকে গেল, ট্রেনের ভেতর যারা ঘুমোচ্ছিল তাদেরও কাঁচা ঘুমের দফা শেষ। স্টেশনে রেল পুলিসের বিহারী কনেস্টোবল হুইসিল দিচ্ছে। হই হই রই রই কাণ্ড!
আমি কী করব ভেবে না পেয়ে সবার আগে গা ঢাকা দিলাম। ওই কার শেডের দিকেই সরে পড়লাম চটপট। টর্চটা তখনও জ্বলছে। মেয়েটার তখনও জ্ঞান ফেরেনি, কিন্তু আঁচল সরে যাওয়া বুকটা ওঠা নামা করছে। নাহ্‌, একেবারেই ছুঁতে ইচ্ছে হ'ল না, বরং কেমন যেন মায়া হ'ল। পেটে বাচ্চা এসে গেছে বলছিল... এহ! এখন এ বাড়ি ফিরবে কী করে? নাকি আবার নিজেও লাইনে ঝাঁপাবে আশেপাশে কাউকে না পেয়ে?! একবার ভাবলাম টর্চটা পুট করে নিভিয়ে দিই... আর একবার মনে হ'ল - না, বরং টর্চের আলোটা নিয়ে একটু দোলাই ওপরে তুলে। কারও নজরে পড়লে যদি এদিকে আসে। কিছুক্ষুণ দোনোমোনো করে ভাবলাম... ধুৎ! যা করব তাতেই উলটো বিপত্তি হবে। যে যার ভাগ্যে বাঁচে, যে যার ভাগ্যে খায়। ও মেয়ের বাঁচার থাকলে জ্ঞান হ'লে ঠিক বাড়ি ফিরবে। এই হারামিটা অক্কা পেয়েছে সেই খবরও পেয়ে যাবে। টর্চের ঘা খেয়েছিল সেটাও মনে থাকবে। আমি আর কতটা দেখেছি? তার আগে যে এর আরও কি কি ঘটে আছে... মরুক গে!

আসলে বিশ্বাস করুন, আমি চাইলেও মেয়েটার কিছু উপকারে আসতে পারতাম না। উলটো বিপত্তিই হ'ত। লোকটাকেও তো আমি ট্রেনের সামনে ঠেলিনি, নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে লাফালো ওইভাবে। আমারই ভুল, সেই কত বছর আগে এমন এক দুর্যোগের রাতে এই কার শেডেরই ধারের লাইনে বডিটা দু'টুকরো হয়েছিল, ভুলে যাই। হ্যাঁ হ্যাঁ, খুনই... তবে পুলিসের কথা জিজ্ঞেস করে লজ্জা দেবেন না। মাথাটা ধর থেকে আলাদা হয়ে গেছিল। তাই মাঝে মাঝে মাথা সমেৎ দেখা যায়, মাঝে মাঝে মাথা ছাড়া। এমন বৃষ্টির রাতে মাথাটা দেখা যায় না, শুধু কাঁধ অবধি। আগে মনে থাকলে গা ঢাকা দিয়েই থাকতাম। ও'সব হেল্প টেল্পের চক্করেও জড়াতাম না। কী যে হ'ল... বেব্‌ভুল হয়ে হেল্প করতে নেমে সব্বোনাশ ঘটালাম!
আর ওই স্টেশনে ছোঁক ছোঁক করা... ওটা স্বভাব, মরলেও যায় না। গুরুর হাত মাথায় ছিল, বেঁচে থাকতেও তেজ দৌড়তাম... এখনও তেজ হাওয়ায় ভাসি। মাঝে মাঝে এর ওর পকেট থেকে সুরৎ করে কিছু বার না করে নিলে মন টা খারাপ হয়ে যায়। কেমন গা ম্যাজম্যাজ করে। আছি না ছিলাম, সেটাও ভুলে যাই। এই যা। কিন্তু দেখুন... আমি আবার বলছি, ট্রেনটা যে অত কাছে এসে পড়েছিল... আমি কিন্তু সত্যিই দেখিনি! বিশ্বাস হচ্ছে না... না?

আপনার মতামত জানান