চাঁদ, কইমাছ আর একটা মানুষ

শুভ্রদীপ চৌধুরী
ভুবন পরনের লুঙ্গিটা মালকোচা বেঁধে নেমে পড়ল মন্ডলদের পুকুরে। সে বিকেল থেকে অপেক্ষা করছিল জুতসই অন্ধকারের। এক সময় বিকেল ব্যাঙাচির লেজের মত খসে পড়লে আবছা অন্ধকারে কলমিলতার ঝোপের নীচে জংলী মাছেদের জন্য তার হাত নিশপিশ করে উঠল। এর আগে বহুবার ওই ঝোপের নীচে সে মাগুর, কই, সাটি ধরেছে। আজ যে করেই হোক খুব তাড়াতাড়ি কিছু চাই। একটু পরেই চাঁদ উঠবে।
কোমর সমান জলের ভিতর উবু হয়ে বসল। লুঙ্গি ফুলে উঠল। বুদ বুদ করে শব্দ হল। যতটা কম শব্দ হয় এমন করে সে জংলী মাছের খোঁট খুঁজতে লাগল। আরেকটু এগিয়ে গেল গলা জলে, এদিকটা পাঁক কম, অনেকটা খটখটে জমি। ডুব দিল সে। হাতের ছোঁয়া লাগল মাছের পিছল শরীরে, আবার ডুব দিল সে। দু’হাত দিয়ে একটু একটু করে মাছেদের ঘর খুঁজতে খুঁজতে সে ভাবছিল সন্ধের পর সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে ঘরফেরা মাছেদের সে কখন তুলে নিতে পারবে। যদিও তার হাতের চেটোর নীচে কেউ এলো না। কতবার কানোচ মাছের কাঁটা ফুটেছে তার ইয়ত্তা নেই। কোমরে জালের কাঠি আছে কিছুক্ষণ ধরে থাকলে ব্যাথা কমে যাবে। পিঠের পাশ দিয়ে একটা বড় মাছ চলে গেল।
এ পুকুর ভাগের। মন্ডলদের তিন ভাইয়ের, ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যাও আছে। এখন লিজ চলছে। তিন বছরের জন্য নিয়েছে পাশের গাঁয়ের একজন। জাল ফেলেছে ঠিকঠাক খবর দিলে নগদ একশো টাকা। পুকুরে বড়শি ফেলেছে খবর দিলে নগদ সত্তর। এছাড়া টহলদারি তো আছেই। তিনবিঘা জলার এই পুকুর থেকে বছরে দেড় লাখ টাকা আসে। পাহারা দেয় জলিল। রাত বাড়লে সে তিন ব্যাটারি টর্চ আর এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে এসে বসে পুকুর পাড়ে। একেকদিন একেকটা সময় পর্যন্ত সে বসে থাকে। গত দু’দিন তক্কে তক্কে থেকেও জলিলের জন্য ভুবনকে চলে যেতে হয়েছে। এ নিয়ে তার সাত মাসের পোয়াতি বউটা কম খোঁটা দেয় নি। আজ খানমান তো কাল ওল, যা মন চায় তার খাওয়ার আবদার দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছিল। কদিন ধরে টানা বলে যাচ্ছে, মাছ আনবা, মাছ।
এখন কেবল নামছে বর্ষা। মাঠের কাজ শুরু হতে দিন পনেরো বাকি। গেরস্তরা এখনও কেউ আসেনি তার কাছে। কাজ জুটলে সে ভেবেছিল সস্তায় পাঙ্গাস নয়তো তেলাপিয়া কিনে আনবে এক হাটবারে। দেখতে দেখতে রবি ও বৃহস্পতি দুটো হাটই চলে গেল। রেশনের চাল ঝাড়াই করতে করতে তার বউ সোহাগী বিড়বিড় করছিল, মুরোদ নাই মাছ আনবার। কোন্ শখ-আহ্লাদটা পূরণ হইছে এতদিনে? সপ্তাহে একবেলা মাছও জোটে না! সোহাগীর কথা ভুবনের গায়ে শুয়োপোকার মত হাঁটে।
ভুবন আরো এগিয়ে গেল, এটা পুকুরটার মাঝখান। দেড় মানুষ সমান জলে সে ডুব দিল। হাতে লাগল জলের সামান্য ধাক্কা। এসবে বোঝা যায় ঠিক জায়গায় আসা হয়েছে। হয়ত এটা তাদের পাড়ার মত মাছেদের একটা পাড়া। সবচেয়ে শান্ত কিংবা ক্লান্ত মাছটিকে এখন তার চাই। নরম মাটির উপরে তার হাত দু’খানা চেপে চেপে এগিয়ে যেতেই ছুঁয়ে গেল একটা মাছের মাথা। তড়িৎ গতিতে দু’হাতের থাবার জাল বানিয়ে ফেলল সে। হ্যাঁ, পেয়েছে সে। একটা কই মাছ। প্রথম মাছ বলেই মাছটার মাথা ধরে ভেসে উঠল। এ মাছ লুঙ্গির কোছায় রাখা যাবে না। কই মাছ বলে কথা। মাঝখানে চলে এসেছে, তাই পাড়ে ফিরে যাবার চিন্তাটাকে সে একদম পাত্তা দিল না। তবে লুঙ্গির কোছায় কই মাছের খোঁচা খাওয়ার ইচ্ছেও তার নাই। মাছটাকে দাঁত দিয়ে চেপে রাখার সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নিয়ে ফেলল। তাছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। দাঁত দিয়ে চেপে ধরল মাছটা। ঠোঁটের কাছটা জ্বলতে লাগল।
ওই অবস্থায় আবার ডুব দিল সে। মাছটা অনেকটা শান্ত হয়ে দাঁতের ফাঁকে ছিল বলে সে আরাম করে নিজের কাজটা করতে লাগল। একেক সময় দমে টান পড়াতে ভুস্ করে মাথা তুলে দেখল আকাশে ম্লান একখানা চাঁদ উঠেছে। তার থেকে নেমে এসেছে নীলচে আলোর চাদর। জলের উপরে সেই আলো ভাসছে, হামা দিচ্ছে যেন। ভুবন হাপুস নয়নে দেখছিল পাড়ের সজনে গাছের ডালগুলো জোছনায় ভিজে চকচক করছে। আর আকাশে মস্ত মেঘের একটা ওড়না চাঁদটাকে ঢেকে দিতে আসছে। এই ঢেকে ফেলল চাঁদের আলো। আবার উঠে দেখল অন্ধকার ফিরে এসেছে। মাছটা তার মুখে স্থির হয়ে আছে। হয়ত মরে গেছে, হয়ত সেও নিশ্চিত হয়েছে তার জীবন নিয়ে। ধীরে ধীরে মেঘের ওড়নাটা সরে গেলে আবার আলো এসে পড়ল সবখানে। কোথাও কম কোথাও বেশী নয়। জলের উপরে কাঁপছিল চাঁদ। সে এ’সব দেখছিল আর ভাবছিল আর কয়েকটা মাছ পেলে তার শুকনো খিটমিটে বউটার মুখ কাঁচা হরতকির চেয়েও চকচকে হয়ে উঠবে।
চাঁদটা তার ছড়িয়ে দেওয়া ঢেউয়ের তালে তালে ভাসছিল। ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ভুবন। আকাশে ছুটে আসছিল একটা ঘন কালো রাগী ষাঁড়। ওই ষাঁড়টা কি, দেড় বছর আগে যেটা হরিশ আর জলিল মাঝরাতে তুলে পাচার করেছিল! সবাই জানে তবু কেউ বলে না। সেই ষাঁড়টা? মিশমিশে কালো একটা তাগড়া মেঘ কিংবা ষাঁড় এগিয়ে এলো চাঁদের কাছে। চাঁদটা ধীরে ধীরে নিভে এলো আর চাঁদের ভেতরে ছিটেফোঁটা অন্ধকার সোহাগীর বসন্তের এবড়ো খেবড়ো করা মুখটার মত দুখী দুখী হয়ে গেল। ঠিক এই রকম মুহূর্তে নিজের সমস্ত শক্তি জাহির করে জেগে উঠল কই মাছটি। ভুবনের দু’পাটি দাঁতের চাপ ঠেলে সে মুখের ভিতরে ঢুকে গেল। এতটাই দ্রুত যে ভুবন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাছটা তার পিঠের পাখনা দিয়ে ফালাফালা করে দিল তার জিভ। গুম ধরা নীরব পরিবেশে ফিট রোগীর মত আছাড় খেয়ে পড়ল ভুবন। মাছটার লেজ ধরে টানতে লাগল। আটকে গেছে। কিছুতেই বেরিয়ে আসছে না আর। নিজের রক্তের আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল মুখময়। মাছটা আরো একটু নেমে গেল কি? প্রাণপনে টানতে লাগল, যেন শেষ সময়। মাছটাও হয়ত তাই ভাবছে। কানকোটা বসিয়ে দিয়েছে আলজিভের ওপরে। ঠিক সে সময় তিন ব্যাটারি টর্চের আলো এগিয়ে এলো পুকুরের দিকে। চাঁদ এখন ঢাকা।
ভুবন কলমিলতার ঝোপের দিকে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল। মাঝখানে এসে পড়েছে টর্চের আলো। যতটা সম্ভব শান্ত থাকা যায়। আলোটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। আরো জঙ্গলে ঢুকে গেল সে। কিছুতেই ধরা দেয়া যাবে না। ভুবন মাহাতো মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে শহিদ যোগেন মাহাতো তাকে ক্ষমা করবে না। টানা উনিশ বছর ধরে যোগেন মাহাতোর জন্য তার বাপ আর সে কম লড়াই করেনি। তার ঠাকুর্দা যোগেন মাহাতো মরেছিল জোতদারের গুলিতে, তেভাগা চেয়ে। রেকর্ডে এ’সব নাই। কৌশল্যার পেটে ছিল একখান আট মাসের ছাওয়াল। সেও মরেছে। সেই কষ্টটার কথা মনে করতে লাগল। তার মতই কি ছটফট করেছিল তারা? কৌশল্যার পরিবারের বছর তিনেক আগেও ভাতা আসতো। এখন আসে না। মাসে মাসে এই ছ’শো টাকার জন্য তারা এখনো লড়াই করে যাচ্ছে।
মাছটা কিছুতেই বেরোচ্ছে না। জলিল টের পেয়েছে কিছু? লাইটের ফোকাস কেন পুকুর থেকে উঠছে না? মাছটাকে এখন টানলেই মুখ ভরে যাচ্ছে রক্তে। দাঁতের ফাঁকফোকর দিয়ে রক্ত পড়ছে উপচে। নিশ্চিত মৃত্যু ওই মিশমিশে ষাঁড়ের মত ঝাপিয়ে পড়েছে। বাপের কাছে শুনেছিল ঠাকুর্দা যোগেন মাহাতোর ডান চোখের ভেতর দিয়ে গুলি মাথার পেছন দিয়ে বের হওয়ার সময় মাথাটাকে চটকে দিয়েছিল। সেই কষ্টটার সঙ্গে আবার নিজেকে মেলালো। শহিদ কৌশল্যার কথা, যশোদার কথা মনে পড়ছিল আর টানছিল মাছটাকে। মাছটা যতই নড়ছিল ততই সমস্ত লোমকূপ থেকে ঠেলে উঠছিল কষ্ট। সোহাগীর ম্লান মুখখানা মনে পড়ছিল। ভরা পেটটার কথা মনে পড়ছিল। আর ভেতর থেকে ঝটফট করতে থাকা মাছটাকে প্রাণপনে টানছিল।
বিকেলের পেঁয়াজ পান্তা দলা পাকিয়ে বিদ্যুৎ বেগে উঠে এলো গলা দিয়ে আর এতক্ষণের বহু চেষ্টার ফসল হয়ে মাছটা যেন উবে গেল মুখ থেকে। মুখে জমে উঠতে লাগল রক্ত। মনে হতে লাগল সে একটা রক্তের পুকুরে ভেসে বেড়ানো সামান্য মানুষ।
এক বুক রক্তের ভেতরে জীবনের সব চেয়ে কষ্টের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে সে দেখল চাঁদটার উপর থেকে সেই ষাঁড়টা সরে যাচ্ছে। চাঁদের পাশে হলদে আলোর ছটা, জলে ভাসছে রূপোর থালা। শহিদ বাড়ির নাতি মাছ চুরি করবে, এর চেয়ে মরণ ভালো। পানের পিকের মত তাচ্ছিল্যে পিচ করে রক্ত ফেললো। কিছুতেই রক্ত আসা বন্ধ হচ্ছে না। চাঁদটা এত আলো দিয়েছে, কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। জলিল নিশ্চয় ফিরে গেছে ওর ঘরে। রেডিও থেকে গান ভেসে আসছে। মুখের ভেতরে জল নিয়ে কুলিকুচি করল ভুবন। আরো জ্বলছে... মাথা তুলবার সমস্ত শক্তি সে খরচ করে ফেলেছে। আবার একটু একটু করে তার দিকে এগিয়ে আসছে চাঁদ। হাওয়া লাগা পান পাতার মত কাঁপছে তার শরীর। হেঁচকি উঠছে, রক্ত উঠছে। ফুরফুরে হাওয়া লাগছে তার গরম মাথায়। ধীরে ধীরে ঢেউয়ে নাচতে নাচতে চাঁদটা এলো তার বুকের কাছে। এখন তার কোথাও যাবার নেই,কোথাও থেকে ভেসে আসছে খুব চেনা সুর। মনে হচ্ছে খুব কাছেই কেউ তার নাম ধরে ডাকছে, ভুবনা, ও ভুব-না না। শক্তি ফিরে আসছে শরীরে, উঠে আসবে সে।
ঝড়ে কোমর ভাঙা গাছের মত নুয়ে থাকতে থাকতে সে দেখল চাঁদটা। এক্কেবারে সদ্য বেচে আসা কাঁসার থালার মত। থালাটাতে লেখাছিল যোগেন মাহাতো।বেচে টাকা পকেটে নিয়ে ফেরার সময় তার মনে হয়েছিল কে যেন হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। থালাটা বেচে দিতে পারল সে!
আবার টর্চের রেখা ফিরে এল পুকুরে। ঘুরছে আলোটা। জলিল আবার এসেছে। সে নিশ্চয় কিছু বুঝতে পেরেছে। তবে ধরা পড়ে যাবে সে! জলে ভাসা চাঁদটার গায়ে লেখাটা এবার সে দেখতে পেল।বেশ কায়দা করে লেখা যোগেন মাহাতো। চাঁদ নয় কাঁসার থালাটা ফিরে এসেছে। সাহস ফিরে এসেছে।
থালাটাকে বুকে নিয়ে ডুব দিল ভুবন মাহাতো।


আপনার মতামত জানান