জার্নি

রেনেসাঁ
ফালাকাটা আর এনজেপি র মাঝখানে একটা ছোট স্টেশন। হবে একটা কিছু নাম। সেখানে আমাদের কামরার দরজা খুলে একটা বুড়ো উঠল খুব কষ্ট করে। বুড়োটার একটা চোখ কানা মনে হল। বেশ চাঙা বুড়োটা। কোঁচকানো হাতখানা জোড় করে কাঁপা গলায় বলল - "নমষ্কার!"

ট্রেনের বাকিরা একটু বিরক্তই হল মনে হয়, আমি তো হলাম। সবাই যাচ্ছে যার যার মত। কারো সাথে কারো কথা বলার ইচ্ছে নেই, পরিচয়ের প্রয়োজন নেই, তার মাঝখানে ঠিক আপদের মত এই উড়ে এসে জুড়ে বসা কানা বুড়ো।

তীক্ষ্ণ নজর করে একটা ফাঁকা সিটে এসে বসল বুড়ো, হাত দুখানা রাখল হাড্ডিসার হাঁটুর ওপরে আর দন্তহীন মুখে হাসল সহৃদয় হাসি।

আমার পাশে বসা ছেলেটা জিজ্ঞেস করলে - "অনেক দূর যাবেন নাকি, দাদু?"
সাগ্রহেই জবাব দিলে বুড়োটা - "না, না, এখান থেকে কেবল তিনটে স্টেশন। যাচ্ছি আমার নাতনির মেয়ের বিয়েতে..."

মিনিট কয়েক যেতে না যেতেই বুড়োটা প্রচন্ড উৎসাহে শোনাতে শুরু করলে তার কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গত করে চলল ট্রেনের চাকার শব্দ। আর গল্পের তালে তালে বুড়োটা দুলতে লাগল বাদলা দিনে ঝড়ে ভাঙা ডালের মত।

বললে, "আমরা সেসময়ের লোকেরা ভারি শক্ত ছিলাম। আমাকেই ধরো না কেন, আমার ৮ টা ছেলে, ৪ টা মেয়ে আর নাতিনাতনী যে কত তা আমিই জানি না।"

এক মহিলা নাক মুখ সিঁটকে একটা বিকট ভঙ্গি করলেন। আমার মা আর বাবা হাসছিলেন মুখ চিপে।

"চোখ নষ্ট হল কি করে? ও, সে গেছে অনেকদিন আগে। আমি তখন বাচ্চাই। ক্ষেতের মাটি খুঁড়ছিল বাপ- মাটি খোঁড়ার সময় বাপের কোদাল থেকে একটা পাথর ছুটে এসে সোজা লাগল আমার বাম চোখে। তখন ডাক্তার কত দূরে, সকলে গরম রুটির সেঁক লাগিয়ে দিতে বললে। বিকেলে বৈদ্যবাড়ি থেকে
ওষুধ লাগালাম। কাজ হল না। চোখ গেল। আমরা কি বুদ্ধুর মত জীবন কাটাতাম। হ্যাঁ, বুদ্ধুরই মত, তবু হয়ত লোকের প্রাণে দয়ামায়া তখন একটু বেশি ছিল, কি বল?

গভীর ভাঁজ পড়া, চামড়া ঝোলা একচক্ষু মুখ। এই মুহুর্তে সে মুখটার ওপর কেমন একটা সেয়ানা সেয়ানা ভাব ফুটে উঠল যেন সে জিতেছে।

"আমি যত দিন বাঁচলাম, তত দিন বাঁচার পর মানুষ জন সম্পর্কে সোজাসুজি কথা বলার একটা হক আসে, তাই না?"

যেন কাউকে ধমক দিচ্ছে এমনি ভঙ্গিতে সে একটা গাঢ় রঙের বাঁকা আঙুল তুললে গম্ভীরভাবে।

"মানুষ জন সম্পর্কে দুটো কথা শোনাই...."

সবাই অস্বস্তি দেখাচ্ছে। কেউ বা মোবাইল খুঁটছে অন্যমনষ্কতার বাহানা দেখাতে। একটা সুন্দর দেখতে জোয়ান ছেলে তো নেমেই গেল উপরের বাঙ্ক থেকে। অথচ বুড়ো চুপ করছে না। যেন ভারি সুখের রুপকথা বলছে ভাব করে সে বলেই চলল-
"আমি যখন তেরো, তখন বাপ মারা গেল। বাপ আমাকে এই সম্পত্তিটুকুই দিয়ে গেছিল, আমাদের বাড়িখানা আর জমিটুকু বিকিয়ে দিয়েছিল দেনার দায়ে। তা এই ভাবেই তো আমি দিন কাটাতে লাগলাম, সম্বল একটি চোখ, দুটো হাত, দুটো পা, যেখানে কাজ জোটে সেখানেই যাই, খাটি...কষ্ট বটে, কিন্তু, জোয়ান বয়স কি আর কষ্ট দেখে ভয় পায়, নাকি বল?

"আমার বয়স যখন উনিশ, তখন দেখা সেই মেয়েটির সঙ্গে যে ভালবাসা আমার। আমার মত গরিব ছিল মেয়েটি, থাকত নিজের অসুস্থ বুড়ি মায়ের সাথে। দেখতে তেমন সুন্দরী ছিল না,কিন্তু মনে দয়ামায়া ছিল।"

"সে মেয়ে তো মানে না। শেষে ওর মা মারা গেল যেদিন বিকেলে ওকে জিগালাম - "বিয়ে করবি?" ও খুব রাগ দেখিয়ে বলল - খাওয়াবি কী?

কথাটা নায্য। আমার কিছু ছিল না। কিন্তু পীরিত হলে জোয়ান মেয়ে আর ছেলের আর চাই কী? জানেন তো
পীরিতের কাছে অন্য চাহিদা কত কম। আমি জেদাজেদি করে জিতলাম। মন্দিরে নিয়ে গেলাম, কদিন পরে।

মাঝখানের ওর মায়ের কাজ হওয়া পর্যন্ত সমাজের ছোকরারা আমাদের ঠাট্টা করতে লাগল, বুড়োরা নিন্দে করতে লাগল। কিন্তু যৌবন হল গে গোঁয়ার, যা বোঝে তা বুদ্ধি দিয়েই বোঝে। কাজেই দিন কেটে গেল। বিয়ে হল।"

পাশের সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেটা মুচকি হেসে বলল- তারপর দাদু? ওর মা আবার মুখ ভেঙচে ওর দিকে কটমট চোখে তাকালেন।

বুড়ো যেন আয়েশে চোখ বন্ধ করে আছে। বলছে-
"তারপরে সে আর এক কাহিনী। আমার জীবনের সেরা কাহিনী। বিয়ের দিনের ঠিক আগের দিন ভোরবেলা পাড়ার মল্লিকবাবুদের ঘরে আমি কামলা খেটেছিলাম। ভোরবেলা ও বাড়ির বড় বাবু এসে বললে যেন ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়:

"তুই গরুর পুরানো গোয়ালটা পরিষ্কার করে নিতে পারিস, কিছু খড় পেতে নিয়ে তুই আর ইরা ওখানেই থাকতে পারিস। ভাল করে গোয়ালটা পরিষ্কার করে নিতে হবে কিন্তু।"

গান গেয়ে কাজ করতে করতে দেখি ছুতোর মিস্ত্রির মেয়ে দীপ্তি দাঁড়িয়ে আছে। সে মেয়েটি আমাকে পছন্দ করত। দেখতে শুনতে তো আর খারাপ ছিলাম না আমি। কথা কইতাম না ওর সাথে। ও এসে একটা কাঠের কৃষ্ণঠাকুর দিয়ে গেল ইরার হাতে। সেই মেয়েটি যাকে অনেক আঘাত করেছি, নিজে এসে দিয়ে গেলে আমার বৌ এর হাতে উপহার।"


বুড়ো মানুষটার গালের গভীর একটা খাঁজের ওপর চিক চিক করে উঠল এক ফোঁটা আনন্দাশ্রু।

"ইরা যত হাসল পারল, আমিও, কান্না এসে গেছিল হাসতে হাসতে। মল্লিকবাড়ির বাকিরা শুধুই হাসল, কেননা, বিয়ের দিন কাঁদতে নেই- বাচ্চারা ঠাট্টা করল আমাদের। কেবল মেজগিন্নি একটু রেগে ছিল উটকো লোক দেখে। "

"সত্যি, কাউকে আপন জন বলে ডাকতে পারা যে কি দারুণ সুন্দর! যার কাছে আমার জীবনটা তামাসার ব্যাপার নয়, আমার সুখটা জুয়া খেলা নয়।"

এই বলে বুড়োটা টুপিটা দেখাল। বলল :

এই টুপিটার রঙ লাল ছিল, বাদামী হয়ে গেছে।

তিস্তা নদীও এসে গেল। সবাই যযার যযার মোবাইলে ব্যস্ত। বকবকা বুড়োটা একা একা হাসছে কি ভেবে যেন। তিস্তা নদী ঢুলছে, আবছা নিঃশ্বাস পড়ছে, নিশ্চয়ই জ্বলজ্বলে স্বপ্ন দেখছে কোন।

আপনার মতামত জানান