From India, with love/ ১

অলোকপর্ণা
১৯৪৭
আমাগো মঞ্জু ছুটোবেলায় এক্কেরে অপুর দিদি দুর্গা আছিল।
সবাই তখন পালিয়ে আসছে। গরু গাই ছাগ ফেলে রেখে। বাক্স প্যাঁটরা এদিক ওদিক। উঠোনের তুলসি, জারুল, পলাশ, বাঁশ বন, আজমল খাঁর পুকুর, মজানো বিল ফেলে রেখে। মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালে শুধু আছে একটা নিরেট স্থির আকাশ, ওটাই শুধু সাথে নেওয়া গেছে।
মঞ্জুর মা কোলেরটাকে নিয়ে আর পেরে ওঠে না। তাই মাঝে মাঝে মঞ্জু ভাইকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে মায়ের কাছ থেকে। ছিনিয়ে এনে বাঁশবনের পাশে এসে বসে। ওখানে মঞ্জুর পুতুলের সংসার। বর বউ ছেলে আর মেয়ে। এই আপাতত। গত মাঘে হাত থেকে পড়ে গিয়ে বরের পা ভেঙে গেছে। তাতে কি, বর তো বরই হয়। বউয়ের আদর ওতে কমে না কি? মঞ্জু পুতুলদের সময় মত ঘুম পাড়ায়। সময় মত জাগিয়ে তোলে। মঞ্জু পুতুলদের সূর্য।
ভাই সামনে বসে থাকে। মাটি খোঁটে। মুখে দেয়। পিঁপড়ে দেখলে হাত বাড়ায়। হামা দিয়ে পিঁপড়ে ধাওয়া করে। মঞ্জু রোজ আটকায়। আজ আটকাবে না। ভাই আজ পিঁপড়ে খাবে, ধুলো খাবে। খুঁটে খুঁটে মাটিও খাবে। ভাইয়ের গলা দিয়া, বুক দিয়া সে মাটি প্যাটে যায়া পড়বে। দ্যাশের মাটি। ভাইয়ের প্যাটে এক মুঠো দ্যাশ হবে। আজ রাত ১টায় বাবা যখন সবাইকে নিয়ে ঘর ছাড়বে, ভাইয়ের পেটে পেটে দেশ চলবে মঞ্জুদের সাথে। মঞ্জু এসব ভাবে আর ভাইয়ের মুখ থেকে গড়িয়ে আসা লালা জামার কোণ দিয়ে মুছে দেয়। পুতুলদের নিয়ে চলা যাবে না। মা বলে দিয়েছে। মায়ের কথার এদিক ওদিক হয় না এই বাড়িতে। মঞ্জু ঝাপসা চোখে বর পুতুলের দিকে তাকায়। তার মাটির ভাঙা পায়ে আঙুল রাখে। আদর করার মত করে বুলিয়ে দেয়। বরের নাম সুজন। পদবী হয় সান্যাল, সুন্দরদির বরের মত, নয় রায়। বউয়ের নাম মুখে মুখে লাবন্য বললেও মনে মনে তা মঞ্জুই। ছোট ছেলে রানা, আরও ছোট মেয়ে মৌটুসি। মঞ্জু লাবন্যকে বরের পাশে শুইয়ে দেয়। রানাকে হাতের পাতায় রাখে। চুমু দেয় কপালে। পাশে ধুলো খেতে থাকা ভাইয়ের কপালেও চুমু দেয় মঞ্জু। তারপর মৌটুসিকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে। অনেকক্ষণ। কান্না পায় মঞ্জুর। গলা ব্যথা হয়ে যায়। কিন্তু কাঁদা যাবে না। মা বারন করেছে। ভাই বোনরা কষ্ট পাবে নাহলে। মৌটুসিকে নামিয়ে রেখে মঞ্জু একটু দূরে রেখে দেওয়া হাতাটা নিয়ে আসে। বাঁশ বনের পাশে মাটিতে সেই হাতা চালিয়ে দেয়। মাটি খুঁড়তে থাকে। ঘাম বেরোয়। ভাই অবাক হয়ে দেখছে দিদিকে। হাঁ করা মুখ থেকে আরও লাল গড়াচ্ছে। একটু পরে মঞ্জু হাঁফিয়ে যায়। সদ্য খোঁড়া গর্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব দ্রুত বর বউ ছেলে আর মেয়েকে সেই গর্তে চালান করে দেয়। আর সেদিকে তাকায় না। পাশে পড়ে থাকা মাটি চাপা দিতে শুরু করে। মঞ্জুর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। গাল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। মায়ের বারন শুনছে না মঞ্জুর কান্নারা। মাটি চাপা দিতে দিতে দিতে দিতে মঞ্জুর হাত অবশ হয়ে আসে। সব শেষে অবশ হাতে ভাইকে সে তুলে নেয় কোলে। জোর পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। পিছনে ফেরে না আর।
মঞ্জুর ছোটোবেলা গণকবরে শুয়ে থাকে বরিশালের মাটিতে।

২০১৮
- কি বুঝলে?
- আমার হাত পা কাঁপছে শুনে
- হুম, মাটির পুতুল মাটিতে মিশে গেছে বহুযুগ হল, তারপর তারা বোধ হয় গাছ হয়ে গেছে, জীবন যোগাচ্ছে
- হয়তো…
- অথবা যদি…!
- যদি কি?
- যদি সেই পুতুল তুমি হও! মাটি থেকে উঠে এসেছো, এত বছর পর, আমার হাতে?!
-
- মাসির কাছে নিয়ে যাবো তোমায়, ধরিয়ে দিয়ে বলবো এই নাও তোমার ছোটোবেলা
- মাসি খুশি হবেন
- হুম, খুব খুশি।




আপনার মতামত জানান