ভাগাড়

অভীক দত্ত

লোডশেডিং হয়েছে। বেশ গরম।
তবু ঘুম থেকে উঠেই হৃদয়ের আজ মাংস খেতে ইচ্ছা করল। গত কয়েক দিন ধরে চিত্রা এক শাকপাতা গিলিয়ে যাচ্ছে। হৃদয়ের মন মেজাজ ঠিক নেই।
খাট থেকে নেমে বারান্দায় বসে বিড়ি ধরিয়ে রাস্তার দিকে মুখ করে বসল হৃদয়। ডাক্তার নাথ বিড়ি সিগারেট খেতে বারণ করেছেন। মাঝে মাঝেই ভয়ংকর কাশি শুরু হয়, জ্বর চলে আসে। চিত্রা সব প্যাকেট ধরে ফেলে দিয়েছিল। খাটের তলায় কায়দা করে এক প্যাকেট রেখে দিয়েছিল হৃদয়। চিত্রা বাজারে গেছে। ফিরতে ফিরতে শেষ হয়ে যাবে।
দাসেদের বাড়ি থেকে বিশ্রী ঝগড়ার শব্দ ভেসে আসছে, প্রায়ই লাগে শাশুড়ি বউমায়। এখন শোনা যাচ্ছে বউমা চেঁচাচ্ছে “তুই ভাতারখাকী মাগী”, আর শাশুড়ি তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। শাশুড়ি কী বলছে মনে দিয়ে শুনতে চেষ্টা করল হৃদয়। শোনা গেল না। মলিনার গলাটা বরাবরই এরকম। বিয়ের পর যখন এসেছিল প্রথম প্রথম ভারি চুপচাপ থাকত। ক’দিন পরে শুরু হল শাশুড়ির সঙ্গে। সময় কেটে যায়, গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়, সেই মলিনাই এখন বউমার সঙ্গে ঝগড়া করে।
হৃদয়ের হঠাৎ মনে পড়ে গেল মলিনা তপনের বিয়েতে বরযাত্রী গেছিল সে। মলিনাদের বাড়িতে মুরগীর মাংস খাইয়েছিল। লাল লাল ঝোল, বরযাত্রীদের জন্য যা চাই মাংস। খেয়েওছিল হৃদয়। প্রাণ ভরে। সকাল থেকে মনটা মাংস মাংস করছিল বলেই হয়ত হৃদয়ের জিভে জল চলে এল। বিড়িতেও অনাসক্তি দেখা দিল।
জানলা দিয়ে বিড়িটা ফেলে সে চুপচাপ উবু হয়ে বারান্দার মাটির মেঝেতে বসে রইল। বারান্দাতেই দড়িতে রমেনের জামা কাপড় ঝুলছে। শনিবার আসার কথা। রমেন এখনও বিয়ে করে নি। করবেও না মনে হয়। হৃদয় খুশিই হয় মনে মনে। ছেলে কারখানায় ঢুকেছে কয়েক বছর হল। মোটামুটি যা রোজগার করে তাদের চলে যায়। চাকরি পেতেও ইউনিয়ন ধরতে হয়েছিল। হৃদয়ের যেটুকু সঞ্চয় ছিল ওখানেই চলে গেছে। রমেনের পাঠানো টাকাতেই সংসার চলে। মাসের পনেরোর পরে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। সে বিয়ে করা মানেই তো আবার এক নতুন ঝঞ্ঝাট। চিত্রা তো আর মলিনার মত না। বউমা চেঁচামেচি করলে কিছুই বলবে না। একা একা কেঁদে ভাসাবে।
দাসবাড়ির ঝগড়ার তেজ কমেছে। হৃদয় উঠল, টিউবওয়েল থেকে জল নিয়ে ভাল করে মুখ ধুয়ে হাতপাখা নিয়ে ঘরে গিয়ে বসল। গরম পড়ছে। আগে এরকম গরম পড়ত না। আজকাল যেন আরও জাকিয়ে পড়ছে। দাসবাড়ির এসির আউটডোরটা তাদের বাড়ির দিকে করা। রান্না ঘরে গরম হাওয়া আসে। হৃদয় মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল ওরা কানে নেয় নি। তাদের মত অকিঞ্চিৎকর মানুষদের কথা কেউ কানে নেয় না।
বাইরের গেট খোলার শব্দ পেল হৃদয়। চিত্রা এসেছে। বাজার করে এসে চিত্রা আগে ঘরে ঢোকে না। ভাল করে মুখ হাত পা ধুয়ে শাড়ি পালটে তারপরে ঢোকে। হৃদয় আবার বারান্দায় গিয়ে বসল, চিত্রাকে ব্যাজার মুখে বলল “কী রাঁধবে আজ?”
চিত্রা বলল “পাট শাক, ডাল”।
হৃদয় একটু ইতস্তত করে বলল “মাংস খেতে ইচ্ছা করছে”।
চিত্রা হৃদয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার টিউবওয়েলে ব্যস্ত হয়ে গেল “মাসের শেষ”।
হৃদয় একটু হাসবার চেষ্টা করল “খোদাবক্সের দোকানে গিয়ে আমার নাম বলতে”।
চিত্রা বলল “তুমি যাও। আমি পারব না। ধার চাইতে পারি না আমি”।
দাসেদের বাড়ির স্তিমিত হয়ে যাওয়া ঝগড়া আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে।
হৃদয় বলল “তুমি রাগ করবে না তো মাংস আনলে?”
চিত্রা বলল “নিয়ে এসো। তবে দেরী কোর না। তোমার তো আবার বাজারে গেলে আড্ডায় বসে যাওয়া স্বভাব। রসুন আদাও লাগবে”।
হৃদয় ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল, “না না, দেখো তাড়াতাড়ি চলে আসব”।
তড়িঘড়ি বাথরুম সেরে হৃদয় ফতুয়া আর ধুতি পরে ব্যাগ নিয়ে রওনা দিল। বাজার বাড়ি থেকে মিনিট দশেক। তবু রোদের তীব্রতায় এই দূরত্বই অসহ্য মনে হচ্ছিল হৃদয়ের।
খানিকটা হেঁটে খানিকটা জিরিয়ে অধীরের দেখা মিলল, অধীর ভ্যান নিয়ে বাজারের দিকেই যাচ্ছিল, বলল “যাবেন নাকি?”
হৃদয় বলল “টাকা পরের মাসে পাবি কিন্তু”।
অধীর হেসে বলল “হয়েছে হয়েছে, উঠুন তো। টাকার চিন্তা করতে হবে না”।
হৃদয় প্রসন্ন মনে অধীরের ভ্যানে উঠল, অধীরের গা থেকে ঘামের গন্ধ ভেসে আসছে। বেশ ঘেমেছে ছেলেটা। হৃদয় বলল “সকাল থেকে খুব খাটনি যাচ্ছে নাকি রে?”
অধীর বলল “হ্যাঁ, স্টেশনে গেছিলাম, আর যা গরম”।
হৃদয় বলল “তা যা বলেছিস। গরম ঠিক আছে, লোডশেডিংও কম জ্বালাচ্ছে না”।
অধীর বলল “আমার আর লোডশেডিং। সারাদিন তো এই চলছে। বাজারে গিয়েই হয়ত আবার একটা আলমারি ডেলিভারী দিতে দৌড়ব শ্রমজীবি কলোনিতে”।
হৃদয় বলল “জল খাস ঠিক করে। নইলে বড় বিপদে পড়বি”।
অধীর বলল “কিচ্ছু হবে না খুড়ো, যতক্ষণ খাটতে পারব, গরম গায়ে লাগবে না”।
বাজারে এসে গেছিল ভ্যান। মাংসের দোকান বাজারের ভেতরের দিকে। হৃদয় নেমে পড়ল। বাজারে সকালের ভিড়। তাড়া আছে সবারই। হৃদয় রহিমের দোকানের সামনে উপস্থিত হল।
রহিম ব্যস্ত কসাই। সারাক্ষণ মাংস বেচে চলেছে। মুরগী খাসী দুটোই রাখে।
হৃদয়কে দেখে বলল “কী হল তোমার? বহুদিন দেখা পাই না? বাজার আসো না?”
হৃদয় বলল “শরীর খারাপ হয়েছিল খুব। তোর খবর কী?”
রহিম বলল “খবর ভাল না, বাজার মন্দা”।
হৃদয় অবাক হয়ে বলল “বাজার মন্দা কীসের জন্য আবার? কী হল?”
রহিম বলল “এখন কি আর আগের দিন আছে গো, অনেক ঝামেলা। মল হয়েছে বাজারের পাশে”।
হৃদয় বলল “সে নতুন কী?”
রহিম বলল “সেখানে তো সবই পাওয়া যায়। মাছ মাংস শাক সবজি, সুন্দর প্যাকেট করা। ঠ্যাং চাইলে ঠ্যাং দিচ্ছে, সিনা চাইলে সিনা, লোকে আর আমাদের কাছে আসবে কেন?”
হৃদয় বলল “আসবে না কেন? তুই তো তাজা তাজা কেটে দিচ্ছিস”।
রহিম বলল “লোকে সে বোঝে না, লোকের সময় কম এখন, বাজারে ঘুরে ঘুরে দরদাম করে জিনিস কেনার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক ছাদের তলায় ঠান্ডা ঘরে সবাই সব জিনিস পেয়ে গেলে গরমে পুড়তে পুড়তে আমার দোকানে কেন আসবে কিনতে? ওরা দামটাও তো আমার থেকে কমেই দিচ্ছে”।
হৃদয় বলল “কী করে?”
রহিম বলল “বড় মাঠে খেলছে। বড় পোল্ট্রি থেকে নিয়ে আসছে মাল। ওদের কি এক জায়গাতেই চাষ শুধু?”
হৃদয় বলল “বড় পোল্ট্রি মানে?”
রহিম বলল “সে তুমি বুঝবে না, মাল যত বেশি হয় প্রফিট তত বেশি হয় না? যাক গে, তোমার কী লাগবে বল”।
হৃদয় বলল “শ পাঁচেক মুরগীর মাংস দে, টাকা পরের মাসে পাবি”।
রহিম বলল “সে দিও, শ পাঁচেক কেন, এক কিলো নিয়ে যাও”।
হৃদয় বলল “কে খাবে? ও তো মাংস খেতেই পারে না, আর আমি কত খাব?”
রহিম বলল “আচ্ছা, শ পাঁচেকই নাও। দাঁড়াও কেটে দিচ্ছি”।
মুরগী কাটার সময়টা হৃদয় চোখ বন্ধ করে থাকে। এত বয়স হল তবু ব্যাপারটা সহ্য করা যায় না।
এ এক অদ্ভুত খাদ্য খাদকের সম্পর্ক। মাংস খেতে গিয়ে বোঝা যাচ্ছে প্রাণীকে মেরেই এ মাংস আসছে, তবু সামনা সামনি দেখতে গেলে কেমন যেন গা গুলিয়ে ওঠে।
দক্ষ হাতে জবাই করে রহিম মাংসটা হৃদয়ের আনা ব্যাগে ভরে বলল “সত্তর টাকা হল”।
হৃদয় বলল “মনে রাখিস”।
রহিম বলল “তুমি রেখো তাহলেই হবে”।
হৃদয় মাংস নিয়ে নিতাইয়ের দোকান থেকে আদা রসুন কিনে বাড়ির রওনা হল। রাস্তা তেতেছে বেশ রোদের তাপে। হৃদয়ের হঠাৎ দমকা কাশিটা এল।
কাশতে কাশতে রাস্তাতেই এক দলা থুতু ফেলল সে। এক ছটাক রক্ত লেগে আছে থুতুতে। সভয়ে সেদিকে তাকিয়ে হৃদয় হাঁটার গতি বাড়াল।
বাড়ি পৌঁছে বারান্দায় ব্যাগ রেখে বসল হৃদয়। হাঁফ ধরছে বড্ড।
চিত্রা ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। হৃদয় টিউবওয়েল থেকে অনেকটা জল নিয়ে খেল।
কারেন্ট এসেছে। দাসবাড়ির এসি চালু হয়েছে। রান্নাঘর গরম হচ্ছে। চিত্রা মাংস ধুয়ে আলু পেঁয়াজ কাটতে বসেছে।
হৃদয় শুল ঘরে গিয়ে। কাশি আসছে আবার। সেই বিচ্ছিরি দমকা কাশি। হৃদয় খুক খুক করে কাশতে লাগল। সকালে বিড়ি খাওয়াটা বড় ভুল হয়ে গেছে। না খেলেই ভাল হত। সম্ভবত জ্বর আসছে।
দাস বাড়ির ছোট মেয়েটা এসেছে। ফোন এসেছে সম্ভবত।
চিত্রাকে ফোন দিয়ে কৌতূহলী চোখে তাদের ঘর দোর দেখছে। মেয়েটা ভারি মিষ্টি। হৃদয়ের ইচ্ছা করে মেয়েটাকে কিছু কিনে দিতে কিন্তু টাকা থাকে না।
হৃদয়ের কাশি হচ্ছিল, এর মধ্যেই চিত্রার আর্তনাদ কানে এল। কোন মতে উঠে তড়িঘড়ি রান্নাঘরে গেল, বলল “কী হয়েছে?”
চিত্রার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কাঁপতে কাঁপতে বলল “রমেনকে নাকি পুলিশে ধরেছে, ওদের কারখানা থেকে সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে, কী সব পচা মাংসের কারবার হত নাকি ওখানে”।
হৃদয় ফ্যালফ্যাল করে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকল। দাসবাড়ির ছোটমেয়েটা কলকল করে বলল “ফোনটা দাও, মা বলেছে ফোন রাখলেই বাড়ি চলে যেতে”।
চিত্রা কোনমতে ফোনটা দিল মেয়েটাকে। মেয়েটা চলে গেল।
চিত্রা চুপচাপ কাঁদছিল। চিত্রা এভাবেই কাঁদে।
হৃদয় বলল “কে ফোন করেছিল?”
চিত্রা বলল “রমেনই। জেলে কার থেকে ফোন জোগাড় করেছে...”
হৃদয় কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে বসে থেকে বলল “সত্তর টাকা রহিম পাবে... লিখে রেখো তো”...

আপনার মতামত জানান