ছাদের সিঁড়ি

সৌরাংশু


আজ জাকির চলে যাচ্ছে। জাকির- প্রফেসর জাকির হুসেন। ভাষাতত্ত্বের প্রফেসর জাকির হুসেন। আমার প্রফেসর জাকির হুসেন। আমার জাকির। ছাদের সিঁড়িটা প্রাণপণে ডাকছে আমায়, কিন্তু যেতে গিয়ে যেন ধীরে ধীরে দু হাত ভর্তি বালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। কি বলব, কিই বা বলতে পারি? সমাজ ধর্ম সংস্কার সব চুলোয় গেলেও পনেরোটা বছরের পার্থক্য কি দিয়েই বা মুছব! সিঁড়ির নীচের অন্ধকারটাকে আঁকড়ে ধরে বুকের ভিতরের তারা গুনতে থাকি! গত দুটো বছর আমি যে কি পেয়েছি কি করে বোঝাবো! এক পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের মোড়কে গত দুটো বছরে আমার স্বপ্নের সিঁড়ি এঁকেছি ওই ছাদের সিঁড়ি বেয়ে কার্ণিশ ছুঁয়ে। কেউ জানে নি, কেউ বোঝে নি! জাকিরও কি বুঝেছে কখনো! না বললেও কি কিছু বলার বাকি থেকে যায়? শুধু ছাদের সিঁড়ির দরজাটা আমার ভিজে যাওয়া চোখের, হুতাশ ভরা বুকের, মাটিতে না পড়া পায়ের সঙ্কেত লিখে রেখেছে পুরনো হয়ে যাওয়া কাঠের অন্দরে অন্দরে।
মা ডাক দিল হঠাৎ, “অনু খেয়ে যা।” আমি ছুটে চলে গেলাম বাথরুমের ভিতরে নিঃশব্দে উপুড় করে দিলাম আমার না বলা অভিমান, আমার বুক জোড়া সবটুকু বেসিনের কোলে। মা আবার ডাকল, “কি হয়েছে রে অনু?” উত্তর ছিল না কোন। কিন্তু মায়েরা বোধহয় সব জানে সব বোঝে! মিনিট পাঁচেক পরে বেরিয়ে এলাম খাবার টেবিলে, মা কিছু বলল না! চুপচাপ লুচি আলুচচ্চড়িটা সাজিয়ে দিয়ে মাথার উপর হাত রাখল খালি। ধোঁয়া ওঠা আলুচচ্চড়ির আর ফুলকো ফুলকো লুচির আড়ালে আমার ভেঙে যাওয়া স্বপ্নটাকে লুকিয়ে নিয়ে চুপচাপ মুখে তুলতে রাখলাম। মা উলটো দিকে গিয়ে বসল চুপচাপ। খাওয়া শেষ হয়ে উঠে যাবার সময় খালি আমার দিকে নরম করে হেসে বলল, “সব গল্প কি মনের মত হয় রে পাগলি? যা ছাদে একবার ওকে বিদায় জানিয়ে দিয়ে আয়!” জড়িয়ে ধরলাম- মাও- মমতায় মাখামাখি মুহুর্তগুলোর কাঁধের উপর দিয়ে ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছাদের সিঁড়িটাকে আবার দেখতে পেলাম স্পষ্ট! ছাদের সিঁড়িটা ডাকছে আমায়- আজ জাকির চলে যাচ্ছে। আমার জাকির!

আপনার মতামত জানান