নট আউট

সৈকত মুখোপাধ্যায়


অনেক্ষণ এপাশ -ওপাশ করেও ঘুম এল না অনিন্দ্যর .. বিছানাটা যেন সদ্য সেঁকা পাউরুটির মত খরখর করছে , আসলে স্ট্যাটাস বজায় রাখতে ফ্ল্যাট বাড়ির যত ওপরে উঠতে হয় , এই গ্রীষ্মকালে সূর্যদেবের সাথে ততোই যেন পাড়াতুতো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিকেল ৪ টে বাজার সাথে সাথেই আবাসনের সামনে ৩ কাঠা সবুজে, ফ্ল্যাটের বাচ্ছা ছেলে গুলো উইকেট পুঁততে শুরু করেছে। শহরের আই.পি.এল জ্বরে ওরাও খেলার সময়টা কিছুটা এগিয়ে এনেছে। অগত্যা ভাত ঘুমের রণে ভঙ্গ দিয়ে অনিন্দ্যও চারতলার বারান্দায় চেয়ার টেনে বসলো।

কৌশিকদার বড় ছেলেটা ক্রমাগত এ.বি ডিভিলিয়ার্স এর মত রিভার্স সুইপ প্রাকটিস করে চলেছে ,অনিন্দ্য ও একদিন এভাবে রাহুল দ্রাবিড় কে নকল করতো। স্নান করার আগে দরজার খিল নিয়ে দড়িতে পিং পং বল ঝুলিয়ে প্র্যাকটিস করতো চিলেকোঠার ঘরে। তখনও ভাত ঘুম ফাঁকি দিয়ে চোখ বন্ধ করে জেগে থাকত বিকেল ৪ টে বাজার অপেক্ষায়। পপাই এর সাইকেলের তিনবার বেল শোনা মাত্রই মা কে ডিঙিয়ে চুপিচুপি খাট থেকে নেমে এসে দরজা ভেজিয়ে, গলির শেষ মাথায় 'দাদুর মাঠে ' দৌড় দিত।

হাফ -প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরার পর, সন্ধ্যেবেলা কোচিং থেকে ফেরার পথে এই মাঠেই তার প্রথম চুমু। তারপর আসতে আসতে খেলা বন্ধ হয়েছে ... কচুপাতার জঙ্গলে ঢেকেছে 'দাদুর মাঠ। 'কলেজে পড়ার সময়, ছাদে উঠে লুকিয়ে সিগারেট টানার ফাঁকে মাঝে মাঝেই সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত ওই মাঠটার সবুজ জঙ্গলের দিকে। ছাদের উত্তর দিক থেকে পুরোটা দেখা যেত মাঠের।

তারপর কলেজের গন্ডি পেরোনোর মুখে হঠাত বাবার চলে যাওয়া ... ক্যাম্পাসিং এ একটা চাকরি জুটিয়ে ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করলেও , তখন দেবলীনার সাথে সম্পর্কটা নিয়ে মায়ের সাথে বেশ মন কষাকষি চলছিল অনিন্দ্যর। দেবলীনার নাক উঁচু স্বভাবটা নিয়ে খুব আপত্তি ছিল মায়ের।যদিও শেষমেষ রাজি হয়েছিল বিয়েতে।

বিয়ের পর বছর দেড়েক নানা ধরনের সাংসারিক ঠোকাঠুকি মধ্যস্থতা করে বেশ সামাল দিয়ে আসছিল সে। কিন্তু ওই দাদুর মাঠে ফ্ল্যাট ওঠার খবরটা শুনে , আর দেবলীনার চাপাচাপি তে সবদিক বিবেচনা করেই , চারতলার দক্ষিণ মুখো ফ্ল্যাটটা বুকিং করে সে। কিছুটা সুবিধাই হয়েছিল মায়ের কাছ থেকে বেশি দূরেও যেতে হয় নি তাকে কিম্বা নিজের পাড়া-প্রতিবেশীর চেনা পরিবেশ ছেড়ে, দক্ষিনের জানলা দিয়ে তাকালেই দেখা যেত তাদের বাড়ির ছাদে মায়ের সাদা শাড়ি মেলা । এরপর দেবলীনা আর কোনোদিন পুরোনো বাড়িতে ফিরে যেতে চায় নি।

এর বছর তিনেক পর মা চলে যেতেই, বাড়িটা ক্রমশ অবহেলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে থাকলো .. অফিস সামলে ওদিকটার দেখভাল করা বেশ কষ্ট সাধ্য হয়ে উঠেছিল অনিন্দ্যর কাছে , তাছাড়া ও বাড়িতে আর কে ই বা থাকবে ... তাই চেনাজানা এক প্রোমোটারের কাছে ১৮ লাখ টাকায় বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছিল সে।

আজ বাড়িতে অনিন্দ্য একাই , গত রাত্রে দেবলীনাকে নার্সিং হোমে ভর্তি করিয়েছে। ডেলিভারী ডেটের আগেই দেবলীনার পেইন উঠেছিল , তাই গতকাল ডাক্তারবাবু ফোনে নার্সিং হোমে আডমিট করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আজ সন্ধ্যে ৭ টা নাগাদ ওনারা সময় দিয়েছেন।

সিগারেটের বাক্স খুঁজতে চেয়ার থেকে উঠে ঘরে ঢোকে অনিন্দ্য , হঠাত দক্ষিনের খোলা জানলাটা দিয়ে বাইরে দিয়ে চোখ চলে যায় তার ... কতগুলো মানুষ বড় হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে শুরু করেছে তার পুরনো বাড়িটাকে , আর কয়েকজন মাথায় করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই ভাঙা ইঁট ... লাল ধুলোয় ঢেকে গেছে চারদিক ...

আসতে আসতে জানলাটা বন্ধ করে দেয় অনিন্দ্য।

আপনার মতামত জানান