দীর্ঘশ্বাসের এপার ওপার

রাণা পাল


১।
একা একা দৃশ্যটি উপভোগ করেছি বলে মনে কোন অস্বস্তি হয় নি। আমার সাথে যদি কোন সাথী থাকত, তবে সে তার মতন দেখত, আমি আমার মতন দেখেছি।
তবে হ্যাঁ, এই দৃশ্য দেখে যে আনন্দ হয়েছে, তা মুখ ফুটে কারও কাছে প্রকাশ করতে পারি নি। তার জন্যই তো এই লেখা।
তাও লিখতে বসে দেখলাম, ঘটনাটা খুবই ছোট। আর যখনকার ব্যাপার তখনই ভাল লাগে। পরে এর উৎকর্ষতা কমে যায়।
দৃশ্যটা হল, দড়ির ঝুলানো সাঁকো থেকে ঝুঁকে আমি দেখলাম, স্বচ্ছ জলের মধ্যে দুটো মাছ খেলা করছে। আমি ওদের নীলাভ পিঠদুটো দেখতে পেয়েছিলাম। আমার কি ভাল যে লেগেছিল।
হঠাৎ মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় এটাই। আর দৃশ্য উপভোগ করা যেহেতু চোখের ব্যাপার তাই কান দিয়ে তাই উপলব্ধি করা যায় না, কাউকে বলে কি হবে?
এইটুকু লিখে পাপড়ি খাতা থেকে মুখ তুলে টাইমপিসটা দেখল। এখন রাত সাড়ে এগারোটা।
ঘরের আবহাওয়া বাতানুকুল। যন্ত্রটির মৃদু আওয়াজ ঘরের মধ্যে একঘেয়ে আবহ সৃষ্টি করেছে।
পাপড়ির পরনে একটি ঢোলা সাদা রঙের টিশার্ট। নরম বিছানায় উপুর হয়ে, বুকে বালিশ চেপে ডায়েরি লিখছে সে। এ তার প্রতিদিনের রাতের ঘুমোতে যাবার আগের রুটিন। পাপড়ি আবার তাড়াতাড়ি কলমটা শক্ত করে ধরে লিখতে শুরু করল।
এখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। আচ্ছা মাছদুটো এখন কি করছে? হয়ত ঘন শ্যাওলার নীচে পাশাপাশি চুপ করে ঘুমোচ্ছে। তাদের চোখ দুটো ড্যাব ড্যাব করে খোলা।
আবার লেখা থামাল পাপড়ি। এই যাঃ, আমি কি সব ভুলভাল লিখে যাচ্ছি। কথাটা খুব আস্তে আস্তে বলে জিভ কাটল পাপড়ি। আমি তো একা ছিলাম না!

২।
তিনতলায় একটাই ঘর। অতনুর নিজস্ব। তবে ঘরটির চেয়েও ঘরটির সামনে ছড়ানো ছাদটা অনেক বেশি প্রিয় অতনুর। রাতে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে, একটা সিগারেট ধরিয়ে, সেই ছাদের আলসের পাশে এসে দাঁড়ায় সে। তার পরনে একটা জংলা ছাপা বারমুডা প্যান্ট।
মাথার ওপর অন্ধকার আকাশ। আজ আকাশে চাঁদ নেই। আছে ছড়ানো, ছিটানো কয়েকটি তারা। সেই স্বচ্ছ আলোতেই যেন ঝিকিয়ে উঠল অতনুর নগ্ন বুক পিঠ।
আজ বেশ গরম। একটাও গাছের পাতা নড়ছে না। সেদিকে খেয়াল নেই অতনুর। অন্যমনস্কভাবে
টানা সিগারেটের এলোমেলো ধোঁয়ার মত তার মন ছুটে যায় আজ বিকেলের দিকে।
আমি আর পাপড়ি আজ বিকেলে পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ, ও আমাকে ডেকে দুটো মাছ দেখিয়ে বলেছিল, কি সুন্দর নাঃ!
দুটো সাধারন মাছ,ওতে কি দেখার আছে।
পাপড়ি একবারও আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার একটুও ভাল লাগছে না। তবুও ভদ্রতা করার জন্য দেঁতো হাসি হেসে বললাম, হ্যাঁ কি সুন্দর।
আমার মুখ থেকে ওর চোখ সরে যেতেই গম্ভীর হয়ে গেলাম। পাপড়িকে এতদিন পরে কাছে পেয়েও বোধহয় পেলাম না।

আপনার মতামত জানান