বিনোদবাবুর প্ল্যান

বংপেন
বিনোদবাবুর মোবাইলে ব্যাঙ্ক থেকে এস – এম – এস এলো ঠিক বিকেল চারটেয়। একলাখ তিরিশ হাজার ক্রেডিট হয়ে গেছে। প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে টাকা তোলার রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন একসপ্তাহ আগে; প্রসেস হয়ে ব্যাঙ্কে এলো আজ। ক্যানিংয়ের দেড় কাঠা জমি বেচা দুলাখ টাকা আগেই ঢুকে গেছে।
ডালহৌসির পাশে অকল্যান্ড রোডের কোনের এক সরকারি অফিসের জুনিয়র ক্লার্ক বিনোদবাবু; এত টাকা এক সাথে আগে কখনও দেখেননি তিনি। গলা শুকিয়ে আসছিল। আনন্দে। ঘরে রয়েছে কড়কড়ে আরও চুয়াত্তর হাজার টাকা; ক্যাশ; দেরাজে। মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু হাওয়া; কেয়ার অফ কর্মকার জুয়েলারি।
***
- ব্রেজিল? বলেন কি মশায়?
- আমি অবিশ্যি ব্রাজিলই বলি
- না মানে রে নিজেতো...
- রে নয় রায়।
- যাকগে, স্ট্রেট টু সাও পাওলো ? আপনার ট্যাঁকের জোর আছে মশাই। যদিও আপনাকে দেখে ঠিক তেমন মনে হয় না। নয়তো এই ভর-দুপুরে মিনিবাসে...
- ঠিকই ধরেছেন। ট্যাঁকের জোর নেই। সখের জোর আছে। প্যাশন আছে।
- নিজে খেলতেন নাকি কখনও ?
- মেদিনীপুরকে রিপ্রেজেন্ট করেছি।
- ট্যুর প্ল্যান কিরকম ?
- নয় দিন থাকা।
- নয় দিন?
- অ্যাট রামকৃষ্ণ মিশন। কন্ট্যাক্ট ছিল। মিনিমাল খাওয়া - দাওয়া। ডর্মিটরিতে থাকা। ফ্রিতে। এক প্রতিবেশীর বেলুড় মঠে একটু ইয়ে আছে। তিনি ম্যানেজ করে দিয়েছেন। আমার খরচ বলতে প্লেনের টিকিট আর ম্যাচের টিকিট। যদিও সামান্য গ্রুপ ম্যাচ। তাও হোম-টিমের নয়। তবু বেজায় খরচ। আমার সমস্ত সেভিংস্ই... নেহাত সংসারে একলা মানুষ...
- ও তাই বলুন, বিয়ে থা করেননি। আমি তাই ভাবি। আরে সেদিন শখ করে গড়িয়াহাট থেকে একটা বাটিকের লুঙ্গি কিনলাম। তাতে গিন্নী সে কি রোয়াব ঝাড়লে। ওয়েস্ট অফ মানি বলে এমন ভার্বাল ঝ্যাঁটা – পেটা করলে...

মিনিবাসে আলপট্কা আড্ডা জমিয়ে নিতে বিনোদবাবুর জুড়ি নেই।
***
ইডেনের কাছে এসে মিনিবাস আটকে গেল। সামনে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে নিশ্চয়ই। এমনিতেই ভিসা অফিসের কাজ মিটিয়ে অফিস ফিরতে প্রায় বেলা শেষ হয়ে গেল। তারপর এই গরমে পনেরো মিনিট বাসে বসে থেকে বিরক্তি এসে গেল বিনোদবাবুর। এখান থেকে তাঁর অফিস মাত্র সাত মিনিটের হাঁটাপথ। নেমে পড়লেন বাস থেকে। ব্রেজিল না ব্রাজিল; ভাবতে ভাবতে দিব্যি হাঁটা শুরু করলেন।
ইডেন ঘেঁষা রাস্তায় জনসমুদ্র। প্রচুর পুলিশ। অস্থির মনে হল চারপাশ। কলকাতার আইপিএল দল জিতেছে। তাঁদের বিজয়োৎসব হওয়ার কথা আজ। তাই হচ্ছে হয়তো। বেগুনী জার্সির ছড়াছড়ি চতুর্দিকে। বিনোদবাবু এসব নাচনকোঁদনে গুটিয়ে আসেন। এমনিতেই ক্রিকেটভক্ত তিনি কোনদিনই নন। আর আই-পি-এল ব্যাপারটা তাঁর মিনিবাস – ঠেলা জীবনে তিনি কিছুতেই আঁটতে পারেন না; তাই এড়িয়ে চলেন। তবে বিরক্তি আসলেও এই ভিড় বাঁচিয়ে চলার উপায় নেই। রাস্তা জুড়ে মানুষ। উদ্ভ্রান্ত মানুষ। করবো লড়বো সুরে নিজেদের কাল্পনিক কাছা ভাসিয়ে দেওয়া মানুষ। শাহরুখ – খানবাবু এসেছেন বোধহয় ইডেনে, কলকাতা ক্রিকেট দলের মালিক বলে কথা। শাহরুখ বাবুকে ঘিরে পাবলিকের উন্মাদনা যে দেখবার মত, এটা বেশ জানেন বিনোদবাবু। বিনোদবাবু এটাও জানেন যে যে শাহরুখবাবু কলকাতা উচ্চারণ করতে পারেন না।
***
বিনোদবাবু বুঝে উঠবার আগেই ঘটে গেল পুরো ব্যাপারটা। ভিড় আচমকা দৌড়তে আরম্ভ করলে; যে যেদিকে পারলো। আর আচমকা শুরু হল পুলিশের বেধড়ক লাঠি। ঘোড় – পুলিশ – দল ছড়িয়ে পড়লে ভিড়ের মধ্যে। সপাং সপ মার।
বিনোদবাবু বুঝে উঠবার আগেই একটা বেপরোয়া পুলিশি লাঠি তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়ে চলে গেল। ফিনকি দেওয়া রক্ত। শার্ট ভিজে সপসপ। বিনোদবাবুর সামান্য কান্না পেল; মায়ের হাতের বালা জোড়ার কথা মনেএলো । না বেচলেই ভালো হত।
***
চোট মোক্ষমই ছিল। একটা অপারেশনও করাতে হল বিনোদবাবুর ব্রেনে। আড়াই লাখ টাকা সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। তবে ব্রাজিল – বিশ্বকাপ ফান্ড থেকে যেটুকু টাকা বেচে রইলো তা দিয়ে বোধহয় পরের আই – পি – এলে প্রত্যেক ইডেন – ম্যাচই দেখতে পারবেন বিনোদবাবু। এই ভালো। এই নিশ্চিন্দি।
শিক্ষা হয়েছে এটাই বড় কথা। জন – গন – মন ভুলতে পারেন, বাপের নাম গুলিয়ে ফেলতে পারেন, কিন্তু করব – লড়ব – জিতবর মস্তিকে কাঁচকলা দেখানোর ভুল বিনোদবাবু আর এ জীবনে ফের করবেন না।

আপনার মতামত জানান