কন্‌সেপ্ট্‌

সুপ্রভাত রায়





অনেকক্ষন থেকে হিসিটা চেপে রেখেছে আনন্দ। এবার তলপেট বিপ্লব ডেকে ফেলবে প্রায়। কারা যেন কোরাসে ড্রাম বিট্‌স সহকারে উদোম গলায় কানে কানে গেয়ে উঠছে বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও ভাআআআআঙো। অন্যান্য দিন স্যার সাড়ে আটটা বাজলেই ছুটি দিয়ে দেন। এখন রাত পৌনে ন’টা। সালোকসংশ্লেষ বোঝানো আর শেষ হচ্ছে না স্যারের। আনন্দ’র কল্পনায় আরো বেশিবেশি একটা অন্ধকার গাছের কোণ এসে যাচ্ছে। বেগ দিয়ে উঠছে প্রকৃতির ডাক। এই স্যার এতই তিতকুটে যে, টিউশ্‌ন নিতেনিতে একটু আধটু মেয়েগুলোর দিকে তাকানোও যায় না। সবাই দু’মিনিট নীরবতা পালনের মতো মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে সারাক্ষন। সে সব নয় হল। কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না। এতটাই মেন্টালি এলোমেলো হয়ে গেছিল আনন্দ-- স্যার কখন ‘আজকে এই পর্যন্তই থাক’ বলেছেন খেয়ালই করতে পারেনি সেই সেকেন্ডটা। পাশের বন্ধুর বই গোছানো দেখে কোমা থেকে ক্রমশ ফিরেছে জলদি।তার ‘সহ্যশক্তি’ এতক্ষন রেড কার্পেটে হেঁটেটেটে অ্যাওয়ার্ড নিয়ে চলে এসেছে। তার স্পিচ দেওয়ার সময় নেই। বড্ড তাড়া। ন্যাচারাল তাড়া। কোনো রকমে হাঁইহাঁই করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে এ পকেট সে পকেট হাতড়ে তার নতুন প্রিয় সাইকেলটার চাবি খুঁজে পেয়ে আর ঢোকাতে পারছে না। তাড়াহুড়োতে তালার মুখের দরজা গ্যাছে ঘুরে। পৃথিবীর যে তিনভাগ জল, শরীর আজ প্রথম তীব্র ভাবে জানান দিচ্ছে তাকে। ঢুকে খট্‌ করে একটা শব্দ দিয়ে তালাটা খুলে গেল। আনন্দ সাইকেলটা নিয়ে দৌড়চ্ছে স্যারের বাড়ির গেট পেরনোর অপেক্ষায়। বেড়িয়েই ডান দিকে একটা গলি, একটু নিরিবিলি। আগে থেকে মাথার ম্যাপে পয়েন্টিং করা আছে তার। কোথায় সে প্রকৃতিকে তার প্রিয় জল ফিরিয়ে দেবে। সাইকেলটা স্ট্যান্ড করেই ছুট্টে গেল সে ঝোঁপের দিকে। আআআআআআঃ... এমনিতে লাজুক সে, ওমনিতেও লাজুক। এই নতুন সাইকেলও
যেন বাঁদিকে ঘোরানো ঘাড় নিয়ে দেখতে না পায় তার এই কৃতকর্ম; তাই এতটা দূরত্ব মেনটেন। স্রোত একটু স্বাভাবিক হতেই তাকালো আনন্দ ‘সাইকেলটা আছে তো ? চাবি লাগায় নি যে। মনে পড়ে গ্যাছে।
প্রায় তারই বয়সি অথবা একটু দেখতে বড় কে একটা ছেলে তার সাইকেলের সিটে চেপে এক রাউণ্ড প্যাডেল ঘুরিয়ে ফেলেছে তখন। এই এই এই এই। হিসি শেষ করে আনন্দ ছুটছে তার চুরি হয়ে যাওয়া সাইকেলের পিছন পিছন। আমার সাইকেল আমার সাইকেল চোর চোর চোর চোর বলতে বলতে। আর যে সাইকেলটা নিয়ে পালাচ্ছে সে এই স্পিচটা ছুঁড়তে ছুঁড়তে আরো দ্রুত প্যাডেল করছে, ‘আজ আর তোকে চাপাবো না...যতই তুই চোর বল...কাল সারাদিন আমাকে টানা করিয়েছিস...’ শুনতে পাচ্ছে আনন্দ সব ক’টা সেনটেন্স। গুটিকয়েক আশপাশের লোকজনও শুনতে পাচ্ছে। হেসে তাকাচ্ছে আনন্দর দিকে। আর একবার আনন্দ’র মিলিয়ে যাওয়া নতুন সাইকেলটার দিকে।

আপনার মতামত জানান