গানের ভুবন , প্রাণের ভুবন

ঈশানী রায়চৌধুরী

আমার খুব আফশোস ! কত কিন্নরকণ্ঠ কিন্নরকন্ঠী মানুষজন দেখি , অথচ আমি ..গান গাইতে গেলেই হাঁড়িচাচা লজ্জা পেয়ে যাবে ! অগত্যা আমার শুধুই ওই যাকে বলে "চানঘরে গান "| তবে গাইতে অপারগ বলে তো আর ভালোবাসতে অক্ষমতা নেই | তাই মনের আনন্দে নির্লজ্জের মতো গানকে ভালোবেসে এসেছি সেই কোন ভুলে-যাওয়া শিশুকাল থেকে | গান আমার জন অরণ্যে , বিজন ঘরের বাতায়নে , চিলেকোঠার গোঁসাঘরে , সুয্যি -ডোবা গোলাপী জলের ঝিলের পারে , আমার অভিমানে আর আহ্লাদে , অনুরাগে অথবা অসহায়তায় | গান সপাটে এসে আছড়ে পড়ে কখনও ; বুকের গভীরে | কখনও বা টেরও পাই না কোন ক্ষতমুখ থেকে অঝোর রক্তপাত | ব্যথা লাগে না | কোনো বোধই তো নেই ব্যথার | অথচ চোখের কুল ছাপিয়ে দু'টি গাল ভেসে যায় জলে | আবার আনন্দও আছে | আনন্দের জন্যই আনন্দ | আবার যন্ত্রণাতেও আনন্দ | কোন অলৌকিক মন্ত্রবলে যে দু:খ আর সুখ এভাবে হাত ধরাধরি করে চলে ...আজও বুঝলাম না !

আমার মনে হয় জীবন আর গান..কেমন যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ | সূচনা বা স্থায়ীতে রহস্যময়তার বাতাবরণ...না জানি কী আছে এতে ! অন্তে বা আভোগে নিশ্চয়তা ...মৃত্যু বা সমাপ্তি | আর মধ্যবর্তী সময়টিকে দু'ভাগে ভাগ করি যদি... প্রথমভাগে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া...নতুন আলোয়... যৌবন এবং অন্তরা | তারপর তাকে এক পরিপূর্ণতা দেওয়া..মধ্যবয়স এবং সঞ্চারী |

সুর এবং গান হল রং আর তুলি.....ছবি এঁকে যায় নিস্তব্ধতার অনন্ত ক্যানভাসে | এই সুরের মূর্ছনা নিখিল ব্রহ্মাণ্ডে সঞ্চারিত করে আত্মা , মনকে করে সোনালি ডানার দুরন্ত পক্ষিরাজ ঘোড়া , কল্পনাকে নিয়ে যায় দিগন্ত পেরিয়ে অনেক দূরে..আর জীবনকে দেয় অমৃতকুম্ভের সন্ধান |

গান মানে কি শুধুই সুরে গাঁথা কিছু বর্ণমালা ? আমার মনে হয় , না | গান হল সুরে গাঁথা শব্দগুলির পরস্পরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নৈ:শব্দ্যের মধুরিমা | আনন্দ , বিষাদ , অশ্রু , শোক ,হাসি ...এই সব ক'টি অনুভবে প্রাণসঞ্চারী বীজমন্ত্রটি হল সুর বা গান ...যা আমাকে নিয়ে যায় অনায়াস মসৃণতায়..এক অন্য ভুবনে | আমি তখন এই পৃথিবীর নির্মম বাস্তবকে দেখি পরিচিত বৃত্তের পরিসীমার বাইরে দাঁড়িয়ে | নির্মেঘ আকাশ , বরফ ঢাকা পাহাড়...তাতে পিছলে যাচ্ছে রোদ্দুররেখা , অনেক নীচে নীলনয়না সুন্দরীর চোখের তারার মতোই টলটলে নীল জলের সরোবর, অরণ্যের সবুজ অন্ধকার ...নির্জনতা..আমি ..আর আমার প্রাণের ভুবন , আমার গানের ভুবন |

আমি স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকি | ভুলে যাই আমি সেভাবে গান গাইতেই পারি না | হয়ত বেসুর , বেতাল | আমি তখন নদীর স্রোতের মত গানের স্রোত জড়িয়ে নিই শরীরে , মনে | সেই আমার আবরণ এবং আভরণও বটে | গানের সমেরা আমার কালো চুলের দীঘল বেণীটিকে সাজায় সোনা রুপোর ফুলে , গানের বর্ণমালা যেন চন্দনলেখা | সঙ্গীত আমায় তিলোত্তমা করে তোলে | আমার আত্মা অবগাহন করে ভোরের শিশিরে , রাতের চন্দ্রমায় | আমি চুপ করি বসে থাকি | নিষ্কম্প | উন্মাদিনী |

ধুয়ে মুছে যায় সমস্ত কালিমা এবং ম্লানিমা | আমার চারিদিকে এক জ্যোতির্বলয় | চিত্তশুদ্ধির | অনেক অনেক দু:খ আর যন্ত্রণা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি আর স্থৈর্য আমায় আপ্লুত করে | আমি অনুভব করি , বেঁচে আছি..এবং কী প্রবলভাবে বেঁচে আছি ! সেই মুহূর্তে আবার জীবনকে নতুন করে খুব খুব ভালোবেসে ফেলি |

গান আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই
দ্রুত অনিবার্যতায়
এক ছায়া ছায়া হিমেল স্বর্গগঙ্গার দিকে
আমার পায়ের নীচে ধূসর মায়াবী কুয়াশা
আমি রুপোলি ডানায় ভর করে পরী হয়ে উড়ে যাই
মিশে যাই তারাদের ভীড়ে
আমার বুক ভ'রে শুধুই সুগন্ধি সুবাতাস
আমায় ঘিরে লুকোচুরি খেলে দিনান্তের মেঘ ও পাখিরা
আমি আলগোছে ছুঁয়ে থাকি আলো
আর সেই সাথে যত অনুভব
আমার বুকের মধ্যে থিরথির করে কাঁপে ছোট্ট একটা হলুদ-বসন্ত পাখি
আকাশের আয়নায় নিজেকে দেখি আমি
আর প্রতিদিন নতুন করে দাঁড়াই ঠিক এইভাবেই
নিজের সামনে ...
নিজেকে খুঁজে নিতে |

আপনার মতামত জানান