আমার গানবেলা

তুষ্টি ভট্টাচার্য


গানের কথা মনে হলেই আমার সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা মনে পড়ে । বাড়িতে একটা হারমোনিয়াম ছিল , সেখানেই মাকে অনেক সাধ্যসাধনা করে সারেগামা শেখা । শিখেই মনে হল এভাবে নয় , মা তো আর এর চেয়ে বেশি কিছু পারে না , একজন গানের দিদিমণি চাই । তা গেল সে একদিন ঢিপঢিপ বুক নিয়ে এক দিদিমণির কাছে খাতা টাতা নিয়ে । কি জানি কি গান শেখায় তাকে ! শুকনো মুখে বসে ছিল কিছুক্ষণ , অবশেষে ডাক পড়ল তার । দিদিমণি জিজ্ঞেস করলেন – সারেগামা জানো ? ঢক করে ঘাড় নেড়ে দিল সে । তাহলে গেয়ে দেখাও । বসে পড়ল হারমোনিয়াম নিয়ে । দরকারের চেয়েও খোলা গলায় সারেগামা গেয়ে শুনিয়ে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । ভাবল , দিদিমণি বুঝি খুব খুশি হবেন । যদিও গাওয়ার সময়ে সে দেখেছিল , বড় বড় দিদিরা খুকখুক খিকখিক করে কেন যেন হাসছিল , আর দিদিমণির ঠোঁটের ডগায়ও এক চিলতে হাসি ঝুলঝুল করছিল । দিদিমণি এবার গম্ভীর মুখে বললেন , তুমি বেলো বাজাতে গিয়ে অমন উঠে পড়ছ কেন ? বাঁ হাত অত জোরে জোরে নাড়ছ কেন ? সে কোনো উত্তর দিতে পারেনি সেদিন । মুখ চুন করে বাড়ি ফিরে মাকে কান্না গলায় নিয়ে বলেছিল - কি করব বল , দিদিমণির অত বড় হারমোনিয়ামের বেলো পর্যন্ত আমার হাত পৌঁছয় নি যে ! আমি আর ওই দিদিমণির কাছে কোনোদিন যাবো না ।
এরপর বাড়িতেই গানের মাস্টারমশাই এলো । সারেগামা থেকে শুরু হল , এ...রি মায়ী ...... , তারপর মাষ্টারমশাইকে হাতেপায়ে ধরে প্রথম গান তোলা , তাও সরগম দেখে না , মাস্টারমশাই হাতে ধরে রিড বাজিয়ে বাজিয়ে তুলে দিলেন , আলো আমার আলো ওগো ... আহ ! সেই দিনের আনন্দর সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না বোধহয় । মেয়েটি বড় হতে লাগল , তালিম চললেও তার গলা চলল না সেভাবে । উঁচুতে উঠলেই তার গলা চিরে যায় , টনসিলের সমস্যা । একটার পর একটা পরীক্ষা দিতে লাগল আর ভাবল , যাক গান শেখা হল বটে তার ! ক্লাসিকাল , রবীন্দ্রসংগীত শিখে ফেলেছে সে , আর কি চাই তার ? তখন টেপ রেকর্ডার , ক্যাসেটে একদিন শুনছিল কণিকা ... আমার সকল নিয়ে বসে আছি ... আমার সক... ল , এই খানে এসে সে থমকে গেল , বারবার রিউইন্ড করে শুনল ...সক......ল ... সেদিনই হয়ত চেতনায় প্রথম গান বেজে উঠল । আজও কান খাড়া করলে শুনতে পায় সেই সক......ল। সেই শুরু পাগলের মত গান শোনা । এই তো কয়েকদিন আগে যশোধরাদি লিখলেন , আআআআআবাআআর এসেছে আষাঢ় , সেই বিপুল ঢ এ শুন্য র নিয়ে । সেই দেবব্রতর গলায় , সে যে চমকে বেড়ায় শুনে গায়ে কেন যে কাঁটা দিত ! চমকে যেত মন ওই উচ্চারণে । এরপর কি নয় , আর কোনটা নয় ! সন্ধ্যেবেলার বিনাকা গীতমালা থেকে রবিবারের দুপুরে বোরোলিনের আসর । রেডিও জকি নামটা তখন চালু হয় নি । বিনাকা গীতমালার সেই ঘোষকের নাম এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না যে কেন ছাই ! কি যে টান ছিল ওই গলায় আর কি যে মিষ্টি মিষ্টি গান বাজানো হত ! নদীয়া কি পার নামের একটি হিট হিন্দি সিনেমার গান তখন তার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল । সেই সময়ে বাড়ন্ত বয়সের সেই
মেয়েটি ওই গানগুলোর মধ্যে কি করে যেন প্রেমকে ছুঁয়ে ফেলেছিল । আর বোরোলিনের সংসারের শ্রাবন্তীকে কেউ ভুলতে পেরেছে আজ অবধি ? কি ছিল তার গলায় ? কি যাদু ? সেই ছোট চুলের শ্রাবন্তী প্রথম পপ গানের ধারণা দিয়েছিল তাকে ।
বাংলা , হিন্দী আধুনিক গান ঢুঁড়ে ফেলে চলল সে মাইকেল জ্যাকসন , ম্যাডনা , এলটন জন ছুঁয়ে ক্লাসিকে । তখন ওয়াকম্যান এসে গেছে , অতএব মাথায় হেডফোন গুঁজে পড়াশুনো করতেও আর অসুবিধে রইল না । কলেজের দোরগোড়ায় একদিন আচমকাই হুড়মুড় করে গিটার নিয়ে এক গানওলা হাজির হলেন । ব্যাস সেই শুরু পাগলামীর । প্রতিটি ক্যাসেট রিলিসের সাথে সাথে গান মুখস্থ করে ফেলা... প্রতিটা চলনে বলনে শুধু সুমন সুমন আর সুমন । কোনো এক বইমেলায় দেখা – প্রথম দেখা তাঁর সাথে , তাঁরই বই কিনতে গিয়ে সই নেওয়া , হাত মেলানো ... কোনোরকমে স্টলের বাইরে পালিয়ে এসে নিজের কাঁপুনি থামানো ...... ফাংশানে যাওয়া এসব স্বপ্নের মত লাগে এখন এই বয়সে এসে । মনে পড়ে , সেই সুমন ম্যানিয়ার বেশ কিছুদিন পরে , যখন উনি কবীর সুমন , এক ফাংশানে সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে ডুয়েট গাইছিলেন । ওনার এক সৎ ইচ্ছের কথা বলেছিলেন সেদিন , তাঁর ইচ্ছে ছিল বাংলা গানের জগতে আবার ডুয়েট চালু হোক । কিন্তু পাবলিক তো পাবলিকই । বারে বারে অনুরোধ আসতে লাগল , তোমাকে চাই , পেটকাটি চাঁদিয়াল , পাগল এসব গানের জন্য । হতাশ শিল্পী সেদিন মেজাজ হারালেন । সাবিনা চলে গেলেন স্টেজ থেকে আর তিনি একা বসে বসে দর্শকদের সব অনুরোধ রেখে চললেন যন্ত্রের মত । কান্না চেপেছিল সেই মেয়ে তখন শিল্পীর অসহায়তা দেখে । আরও একটি পুরোনো দৃশ্য ফ্ল্যাশ ব্যাকে তার মনে চলে এসেছিল । একটা ছোট্ট মেয়ে , যার হাত পৌঁছোতো না বেলো পর্যন্ত , উঠে উঠে দুলে দুলে হারমোনিয়ামের বেলো বাজিয়ে তারস্বরে সারেগামা করছে ! প্রাণে গান নাই , তাই যে মিছে রবি ঠাকুর মূর্তি গড়া !
একদিন বেড়াতে গিয়ে এক “রক”বাজ কবির সাথে আলাপ হল তার । কবিতার ভূত সেই ঢুকিয়ে দিয়ে গেল মাথায় আর বাংলা ব্যান্ড । দক্ষিণ কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় তখন গান গেয়ে বেড়ায় ক্যাকটাস । হাজির হয়ে গেল সে একবার নজরুল মঞ্চে । সেই “রক”বাজ কবির বর্ণনার সাথে মিলিয়ে দেখে নিল সিধু , পটাকে । মুহুর্তে ওরা তার আপন হয়ে গেল । এরপর রূপংকর , রূপম ইসলাম , অনুপম ... এদিকে শ্রীকান্ত আচার্য্য তো ওদিকে লোপামুদ্রা , ইন্দ্রানী । কখনও মান্না দের কাছে ফিরে যাওয়া , কিম্বা মোহন সিং বা পন্ডির অজয় চক্রবর্ত্তি । এই তো আবার কয়েক বছর আগে সেই ক্যাকটাস শো করতে এলো তার নিজের পাড়ায় । তখনও সিধু , পটা এক জায়গায় । গিয়ে দেখল সে সেই লম্বা চুলো ছেলেটির যেন বয়স বাড়ে নি একটুও , সিধুর গালে পেটে বেশ চর্বি আর পটা আরও হ্যান্ডসাম । সেদিনের কনকনে শীতের রাতে দর্শকদের ঘাম ছুটে গেছিল ওদের গানের সাথে পা মেলাতে গিয়ে । ছেলে মেয়েদের আলাদা আসনের ব্যবস্থা ভেঙে গেছিল সেদিন , আছড়ে পড়ছিল ভিড় স্টেজের সামনে । সে কেবল কেন জানি যেতে পারে নি সামনে । আর সেটাই কাল হয়েছিল বুঝি । অনেকটা দূরে একা দাঁড়িয়ে শুনছিল , দেখছিল । হঠাৎ চমকে শুনলো সিধুর গলায় , হেই ইউ , তুমি আসবে না ? হাত নেড়ে “না” বলেছিল তখন । আর সেই মুহুর্তে গান ধরেছিল ওরা – শুধু তুমি এলে... না ! লজ্জা পাওয়ার বয়সটা তখন পিছনে ফেলে এসেছে , তবু নিজেকে একটা কিম্ভূতকিমাকার বস্তু বলে মনে হচ্ছিল । তবে আবার ভিড়ের চাপে কখন যে সে স্টেজের কাছে চলে গেছে খেয়াল করে নি । গানের ফাঁকে ফাঁকে ওরা হাত মেলাচ্ছিল দর্শকদের সাথে , সেই সময়েই আবার চোখ পড়েছিল ওর ওপর এবং আবারো প্রশ্ন , আসবে না বলেছিলে যে ? প্রশ্ন শুনেই টুক করে পালিয়ে বেঁচেছিল সেবার সেই যাত্রা । শোয়ের শেষে ওদের কারুর জ্যাকেট ছুঁড়ে দেওয়া আর সেই জ্যাকেট একটি মেয়ের হাতিয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার গল্প শুনেছিল পরে ।
এখন গান ওসব পাগলামো জুড়ে নেই তার । স্থির পরিণত জীবনে গান লেগে আছে প্রতিটি টুকিটাকিতে । এক একদিন ঘুম থেকে উঠে কোনো এক গানের লাইনে বিদ্ধ হয় সে । সারাদিন ওই গানের কয়েকটি লাইন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তাকে , রীতিমত ছেলেখেলা করে তার সাথে , কিছুতেই পেছন ছাড়ে না । একেকদিন গান আসে ঘুম থেকে উঠে প্রথম চায়ের কাপে চামচ নাড়ার সাথে সাথে কবিতার হাত ধরে । বেশিরভাগ সময়েই বাথরুম সিংগার হয়ে যায় ও আর সবার মত । কলের জল পড়ার শব্দকে ঝর্ণার মত লাগে , শাওয়ারের জলকে মনে করে বৃষ্টি ! গান এসে নদীর মত ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে , কয়েক মুহুর্তের জন্য যদিও । রাতে বাড়ির সব শব্দ নিভে গেলে গান এসে কোল আলো করে বসে তার , ফিসফিস করে ঘুম পাড়ায় তাকে , মায়ের ঘুম পাড়ানি গানের মত । গান জুড়ে থাকে তার প্রতিদিনে , সুখের দিনে , দুঃখের দিনে , আয়েশের দিনে , হতাশার দিনে । আজ নাকি বিশ্ব সঙ্গীত দিবস ! খুব অদ্ভুত লাগে তার এই দিনের নামকরণ টরন দেখে । গানের আবার দিনক্ষণ হয় নাকি !

আপনার মতামত জানান