সুমন, নচিকেতার প্রথম অ্যালবাম আর আমি

অভীক দত্ত


আমাদের ছোটবেলা। বাংলা গান বলতে “গুরুদক্ষিণা”-র যুগ। সেই গানই তখন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, বাংলা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলতে গেলে। আশা ভোঁসলের “উই উই উই উই, ফুল কেন লাল হয়”, “কথা হয়েছিল”... কিশোর কুমারের “তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে” পাড়া-পার্বণে বেজে চলেছে।
গানের বাজারে এক অদ্ভুত খরা এসে গেছে। বাংলা গান মৃত প্রায়। হঠাৎই সেই কোত্থেকে এক অদ্ভুত সুর এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল চারদিক। অভূতপূর্ব কথা – সুর, আর গায়কী, ভরাট গলার এক গায়ক, সুমন চট্টোপাধ্যায়... “প্রথমত আমি তোমাকে চাই”... কেঁপে উঠল চারদিক। পাড়ার চায়ের দোকানে বসে “বাংলা গান শেষ হয়ে গেছে” বলা লোকজনও আর নাক সিটকাতে পারছে না। বরং মনে মনে সবাইকেই স্বীকার করে নিতে হয়েছে এক নতুন বিপ্লব এসে গেছে বাংলার গানে। “পেটকাটি চাদিয়াল” তখন আমাদের কাছে জাতীয় সঙ্গীতের সমান জনপ্রিয়, টাউন হলে তিনি এলেন, সৌম্যদর্শন ব্যক্তি, কথা একেবারেই কম, কি বোর্ড বাজিয়ে একের পর এক গান গেয়ে গেলেন, মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনল সবাই। “ছেড়েছো তো অনেক কিছুই পুরনো সেই হাসি, সকাল বিকেল জানিয়ে দেওয়া তোমায় ভালবাসি” কিংবা “যদি ভাব কিনছ আমায় ভুল ভেবেছ”... জোরাল প্রকাশভঙ্গী গায়ে কাঁটা দেয় এখনও গানগুলি শুনলে।

“গড়িয়াহাটার মোড়, মিনি মিনি বাস বাস,
বাসের টারমিনাসে, মন মরা সারি সারি
মুখ চোখ নাক হাত, রোগা রোগা চেহারার কনডাক্টার
সব আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য।
চৌরঙ্গীর আলো এবং লোড শেডিং,
পার্ক স্ট্রীট জমকালো, কাগজে হেডিং।
আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য।
বেদম ট্র্যাফিক জ্যাম, ঠান্ডা স্যালামি হ্যাম,
চকলেট, ক্যাডবেরি, মাদার ডেয়ারী,
আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য।
বাজারের দরাদরি, রুটি ভাত তরকারি,
সা নি ধা পা মা গা রে সা মাদার টেরেসা,
আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য।
কুঁয়াশা কুয়াশা কাদা, ভোর বেলা গলা সাধা,
সারেগা রেগামা গামা গামাপা মাপাধা পাধা পাধানি ধানিসা–
আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য"।

তার একবছর পরেই দুর্গা পুজোর প্যান্ডেল থেকে বিজাতীয় বাংলা উচ্চারণে গান প্রায় উঠে গেল, যেখানেই ঠাকুর দেখতে যাই, একটাই ক্যাসেট, “এই তুমি কি আমায় ভালোবাসো? যদি না বাসো, তবে পরোয়া করি না”... “যখন আমার ঘরেতে আঁধার নেই একফোঁটা কেরোসিন, পাওনাদারের অভিশাপ শুনে জেরবার হয় বুড়োবাপ, আমি তো তখন পারব না খেতে চাইনিজ বারে চাউমিন”...
কি? কে? না জীবনমুখী বাংলা গান, গায়ক নচিকেতা, এক মুখ দাঁড়ি, অ্যাংগ্রি ইয়ং ম্যান, পরনে ফেডেড জিন্স, বাংলা গানের চাঁদ তারা, প্রেম পিরিতি টেনে রাস্তায় নামিয়ে আনলেন, “হাসপাতালের বেডে টিভি রোগীর সাথে খেলা করে শুয়োরের বাচ্চা”... স্টেজ শো দেখতে গেলাম, অবশ্য যাব কি, একা যাবার বয়স ছিল না সেটা, বাবা মার সাথে গেছি, টিকিট পেতে গলদঘর্ম, ১২০০ সিটের হলে এক্সট্রা সিট বসাতে হয়েছে, গোটা হল জুড়ে সিটির আওয়াজ, হলটাকে যেন হাতের তালুতে করে নিয়েছেন, গানের ফাঁকে ফাঁকে দুয়েকটা কথা, যেমন একটা ছিল, নীলাঞ্জনা গানের মাঝে একটা সুর ছিল, সেটা শিস দিয়ে করে দিলেন, শিসটা দেবার পর বললেন “রকে যখন শিস দিতাম আপনারা বলতেন বখাটে, আর এখন বলবেন ‘কি প্রতিভা!’” স্টেজে এসছেন গুচ্ছের হ্যান্ডস নিয়ে নয়, তখন(এখনও) একটা প্রোগ্রামে কেউ গান গাইবে মানে, কত রকম কিছু থাকে, তার ছিল কেবল একটা হারমোনিয়াম, একটা গীটার, আর তবলা, তাতেই কেঁপে উঠছে সব কিছু... “বাসে ট্রামে ওঠা দায়, বসলে লেডিস সীটে মামণিরা মনে মনে বিরক্ত হয়, কেউ বা দেয় আওয়াজ, বুড়োটা ধান্দাবাজ, মেয়েদের কোলে বসে যাচ্ছে মজায়”... “যখন আমার গানের পাখি, শুধু আমাকে দিয়ে ফাঁকি, সোনার শিকল ধরা দেয় বুকে, আমি শুন্যতা ঢাকি”। গভীর কিন্তু কত সহজ সে সব গান।
এই দুইখান ক্যাসেটের সব ক’টা গান আমার মুখস্ত ছিল, বাড়িতে কিংবা পাড়ায় ফরমায়েশ এলেই শুরু করে দিতাম, শুধু একদিন কোথায় যেন “যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে হাতে তার অভিশাপ নিয়ে চলাই জীবন” লাইনটা করার পরে চারদিক চুপ হয়ে গিয়েছিল এটা দিব্যি মনে আছে।

একজন তুমুল ইন্টেলেকচুয়াল প্রতিনিধি, আরেকজন মনে ঢিল মারা তুখোড় কথার গায়ক, বাংলা গানের স্থির জলে সুনামি এলো যেন। গুণমান কি, কে ভাল এই সব কথা তখন ভেবে দেখিনি, দেখার প্রয়োজনও পড়ে নি, একথা ঠিক, সুমন নচিকেতার থেকে হয়ত অনেক বেশি প্রতিভাবান, কিন্তু সে সময়টার জন্য এই দুজনকে ভীষণ দরকার ছিল... এটা অস্বীকার করি কিভাবে?


আপনার মতামত জানান