শত সহস্র ফ্রিকোয়েন্সিতে বেজে চলেছে শ্রুতিদের এনসেম্বল

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী


ছোটবেলায় পাড়ার পার্কে যখন খেলতে যেতাম আমি আর আমার মেঘলা জামার বন্ধুরা, দোলনা, ঢেঁউ কুচ কুচ, মেরি গো রাউন্ড-এর দিন ছিল তখন। আরও ছিল লুকোচুরি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ছু কিতকিত, কুমিরডাঙা আর চোর-পুলিশ... কু থেকে ধাপ্পা’র মধ্যে আজকের পৃথিবীর ধাপ্পাবাজির বদলে অদ্ভুত একটা সারল্যের নিশ্চিন্তি ছিল। স্কুল থেকে ফিরে আকাশ মেঘলা দেখলে তখন একদিকে মন ভালো হত, আর একদিকে খেলার জন্য মনকেমন। কোনওমতে বিকেলটা বৃষ্টিবিহীন থেকে খেলার শেষে সন্ধের মুখে মেঘলা আকাশে বৃষ্টি নামলে ছিল মাথায় হাত রেখে ছুট্টে রেস করে বাড়ি ফিরে আসা।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে গলির মুখ থেকেই শুনতে পেতাম আমাদের গানের ঘরে বাবা রেওয়াজ করছে – মল্লার। গৌড়, ধুলিয়া, মেঘ না মিঁয়া কি মল্লার তা তখনও অত স্পষ্টভাবে শিখিনি, তবে মল্লারের রঙ চিনতে শিখে গেছিলাম খুব ছোট্ট বেলাতেই। দৌড়ে বাড়ি ঢুকে কোনওমতে গা - মাথা মুছে ভেজা জামাকাপড়টা পাল্টেই গানের ঘরে গিয়ে বসে পড়তাম। শুদ্ধ মধ্যম, কোমল গান্ধার, আর দুই নিষাদের খেলা তখন আমার সবুজ পার্কের আস্তে আস্তে আস্তে থেমে আসা দোলনা, ঢেঁউ কুচ কুচ আর মেরি গো রাউন্ডের আওয়াজেও মল্লারের স্বর শুনতে পেত। ওদের গতিময়তার মধ্যেও যে একটা সুর রয়ে গিয়েছে কোথাও! পড়তে বসার কথা ভুলে গিয়ে আমার ভেতরে তখন তানাবানা বুনছে মল্লার। বাবা (পন্ডিত মানস চক্রবর্তী) হয়ত হঠাৎ পাশাপাশি গেয়ে উঠলেন দুটি রাগ – গৌড় মল্লার আর মিয়াঁ কি মল্লার – কোথায় ওরা আলাদা আর কোথায় ওরা এক, এক লহমায় বোঝানো হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে বাবার মুখে শুনতাম ওদের দর্শনের কথাও। সৃষ্টির, রূপের, রসের, যাপনের দর্শন। জীবনানন্দের বোধ কবিতাটি বাবার খুব প্রিয় ছিল। শেখাতে শেখাতে অজস্রবার এই কবিতাটি মুখস্থ পাঠ করতে শুনেছি আমি বাবাকে। তখনও কবিতার ট্রান্স আমায় গ্রাস করেনি। শুনতে শুনতে ঘোর লেগে যেত, বাবা বলতেন, “যে চাষা মাঠে চাষ করছে, যে চাষী-বৌ ধান কুড়োচ্ছে, যে কামার লোহা পিটিয়ে কাস্তে গড়ছে, যে মুদি পসরা সাজাচ্ছে – আকাশ মেঘে ছেয়ে এলে তার মনে যে ভাব জাগে, আমি মেঘ গেয়ে যদি সেই ভাব না জাগাতে পারি, আমার ভেতরে মল্লারের যে বোধ তা যদি তার ভেতরে সঞ্চারিত না করতে পারি, আমার গান, গান হয়ে উঠলনা তাহলে।” এ বড় শক্ত কথা আবার এর থেকে সহজ কথা আর নেই। সঙ্গীত সর্বময় হয়ে আছে, শুধু তাকে ভেতরে নিয়ে আসার অপেক্ষা। ওই ছোটবেলার দোলনা থেকে আজকের মিনিবাসের হর্ন, ধোসাওয়ালার টুং টাং তাওয়ার শব্দ, গরমে পুড়তে থাকা পিচরাস্তায় সরবতওয়ালার জলতরঙ্গ, সারাদিনের শেষে ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ঢোকার মুখে যখন সবাই সদর গেটের আগল খোলে তখন এমনকি রাত্রে নিজের বালিশটিতে মাথা ছুঁইয়ে সর্বাগ্রে যে বুকের ধুকপুকুনিটা শুনতে পাই তাও সুরে-লয়ে বাঁধা।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঘরে জন্মেছি, তাই চিরকাল সুরের মধ্যে থাকা। তবু যে ধ্বনি সুর নয় তাও এই মহাবিশ্বের কোনও না কোনও খানে সুর হয়ে ওঠে বলে আমার মনে হয়েছে সবসময়। উত্তর ভারতীর শাস্ত্রীয় এবং উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছি, তবু আমার খুব ছোট বেলায় বাবাই আমাকে ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ এর রেকর্ড শুনিয়েছিল, ইউরোপ ট্যুর থেকে ফেরার সময় একবার নিয়ে এসেছিল আমার জন্যে বারবারা স্ট্রেইসান্ড এর ‘ইয়েন্টল’ আর আমি যখন হাইস্কুলে, চোদ্দ বছরের জন্মদিনে এনে দিল ইয়ানি’র “ট্রিবিউট” অ্যালবামটা। এগুলো আলাদা করে মনে আছে কারণ, এইসব দিনগুলোতে একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল আমার সঙ্গীতের ধারণা, ছড়িয়ে যাচ্ছিল, পরস্পর জড়িয়ে যাচ্ছিল আমার শিল্পভাবনার পরিধিগুলো। রাতের পর রাত কেটে যেত পাশাপাশি ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, ডি ভি পালুস্কার, ওয়াহিদ খাঁ আমির খাঁ সাহেব, করিম খাঁ সাহেব , দাদা রবিশঙ্করজি , আলি আকবর খাঁ দাদাসাহেব, নিখিল জেঠু (বন্দ্যোপাধ্যায়)-এর সাথে সাথে বাখ, বেথোভেন, কারপেন্টার্স, বারবারা স্ট্রেইসান্ড, বনি এম আরও অনেকের সাথে পরে বব ডিলান, জোন বেজ, জন ডেনভার, ঈগলস থেকে পিঙ্ক ফ্লয়েড পর্য্যন্ত শুনতে শুনতে। ইয়ানি শুনতাম আর ভাবতাম এই অজস্র রকমের মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট যা এই পৃথিবীরই কাঠ, পাথর, ধাতু, মৃত জন্তু জানোয়ারের হাড় আরো না জানি কত কি দিয়ে তৈরী, এসব মানুষ কেমন ভাবেই না বানিয়েছে। এখনও পৃথিবীজুড়ে চলেছে দিনরাত আরো আবিষ্কারের খেলা, সুর থেকে সুরে, শ্রুতি থেকে শ্রুতিতে যাতায়াত। আর এইসব শোনার পাশাপাশি ছিল আমাদের বাংলা ও হিন্দি ছবি গান, বেসিক ডিস্কের গান। সেটা ছিল একটা আলাদা শিক্ষার জায়গা, ভাললাগারও বটে। সত্যি বলতে কি আমার অর্ধেকের বেশি জীবন কেটেছে বিভিন্ন ধরনের মিউজিক শুনতে শুনতে। ছেলেবেলায় অংক করতাম পর্য্যন্ত গান শুনতে শুনতে। আর এখনও আমার দিনের অধিকাংশ সময় কাটে গান বা ইন্সট্রুমেন্টাল শুনতে শুনতে। অসম্ভব নির্ভরশীল আমি সঙ্গীতের উপর।
হাই স্কুলের শেষের দিকে, যাকে লোকে টিন এজ বলে, সে সময়ে যখন কবিতার ভূত চাপল ঘাড়ে, কিছুদিন যেতে না যেতেই বুঝলাম এ আরেক দোসর এসে জুটল। আরেক সর্বনাশের মূল সাপ্টে ধরল আমায়। আবার এই দুই মূলই ধরে রইল আমার যাপনের গাছটাকে মাটির সঙ্গে আষ্টে। দেশ-বিদেশের কবিতা, সাহিত্য, ছবি, সঙ্গীত নিয়েই ভরে উঠল আমার সকাল থেকে মধ্যরাত। আর তাই নিয়ে চলত বাবার সাথে নিরন্তর আলোচনা। বন্ধুদের সাথে আড্ডা। সে সময়গুলো ছিল আবিষ্কারের। প্রতিটি অনুভূতি থেকে উপলব্ধীর আবিষ্কার। বিভিন্ন ভাষাগুলির মধ্যেও একটা আলাদা সুর রয়ে গিয়েছে বুঝতে পারলাম— এখনও যখন উর্দু শেরগুলো পড়ি অথবা ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ পদ্য, অনুবাদের পাশাপাশি মূল পড়তে গিয়েও একই অনুভব হয় আমার। যেই সময়ের কথা বলছিলাম সেই সময়েই আমার সেজ মাসির ছেলে, আমার মাসতুতো দাদা, বাপ্পাইদা (তপন ভট্টাচার্য্য) গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ঠিক করল সাউন্ড এঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। এস আর এফ টি আই তখন সদ্য সদ্য শুরু হয়েছে কলকাতায়, ও সেখানে পড়তে ঢুকল। আর সেই শুরু হল আমার আরেকটা বিষয় নিয়ে জানা যেটা এখন সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হয়ে উঠেছে পারফর্মিং আর্ট এর রেন্ডিশন এর ক্ষেত্রে। ওর কাছে যে কত কিছু জেনেছি, আর মিলিয়ে দেখেছি যে বাবা শেখানোর সময় যা যা বলত সঙ্গীতের আদিসূত্রের বিষয়ে তা চাকতিতে চাকতিতে সম্পূর্ণ মিলে গেছে! আসলে সঙ্গীত তো কেউ সৃষ্টি করেনা, সঙ্গীত প্রকৃতির আদি থেকেই প্রকৃতির মধ্যেই বিরাজ করছে! ইটস অলওয়েজ দেয়ার! উই হ্যাভ টু ফীল ইট!
কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিকসে মাস্টার্স করছি যখন একটা অদ্ভুত অ্যাসোসিয়েশন তৈরী হয়েছিল আমাদের বন্ধুদের। আমি, সঞ্চারী, সোনাই, অঙ্গন, সৌম্য, পৌলমী, ইন্দ্র, অভিজিত, পার্থ, রাজশেখর সব্বাই মিলে অনুষ্ঠান, গান-বাজনা, ক্যান্টিনে তীব্র আলোড়ন! মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে এসে পড়তেন আমাদের প্রফেসর অজিত চৌধুরী! তাঁকে তখন একটার পর একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন থেকে মহীনের ঘোড়াগুলি পর্য্যন্ত শোনাতে হত! সে এক লম্বা বৈঠক, সৌম্য আর অঙ্গন নিরলস গীটার বাজিয়ে যেত আমার সঙ্গে, সে এক মজার সময়! তার অনেক পরে এখনও নিজে যখন গান বাঁধি বা স্টুডিওয় গাই মাঝে মাঝে সেই দোলনার ধীরে ধীরে থেমে আসার সুরটা শুনতে পাই, মনোটোনাস একলা বেহালাবাদকের ছড় টানার মত সে আমাকে শান্ত করে দেয়।
তাই আজকে যখন ওয়র্ল্ড মিউজিক ডে উপলক্ষে চারিদিকে এত চেঁচামেচি, সোশাল মিডিয়ায় এত স্টেটাস মেসেজের ভীড়, একটু নির্জনতা খুঁজি – সেই লালনের কথাই মনে পড়ছে, সেই রবি ঠাকুরের গানই মনে পড়ে যায় “আমি কান পেতে রই ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে বারে বারে / কোন্‌ গোপনবাসীর কান্নাহাসির গোপন কথা শুনিবারে— বারে বারে ॥“ আসলে সঙ্গীত যার ভেতরে আছে, সে সর্বত্রই তাকে শুনতে পায়, মায় দেখতে পর্য্যন্ত পায়, আর যার ভেতরে নেই সে সারাজীবন খুঁজলেও হাজার চিৎকারের পরেও তাকে খুঁজে পায়না কখনও। কবিতার আখর থেকে গানের মখরতায় নিয়ে যায় যে পথ তার ধারের নিয়ন আলোগুলি সঙ্গীত, ছবির রং-যাপন থেকে ছায়াছবির সূক্ষ্মতায় নিয়ে যায় যে জাহাজের নাবিক তার বুকের ওই ধুকপুকুনিটা সঙ্গীত। এই মহাবিশ্বে মহাকাশে প্রতিটি গ্রহাণুর জন্মলগ্নে বিস্ফোরণের স্পন্দনে শত সহস্র ফ্রিকোয়েন্সিতে বেজে চলেছে শ্রুতিদের এনসেম্বল। অনুভূতিতে যাকে পাওয়া যায় বুদ্ধিতে তার ব্যাখ্যা চলে না। লেখা শেষ হয়ে এলো, কথা ফুরালো না তাই বাবারই লেখা একটা কবিতা দিয়ে শেষ কে শুরুতে নিয়ে যাই –

এত চ্যাঁচামেচি কেন, এ কি গান?
চুপ করো, শব্দ কোরো না
কন্ঠ দাও, শ্রুতি-নন্দন করো সেচনে
স্বর ঘিরে সুরে সুরে সঞ্চারো শ্রুতি – শাখা-মর্মর
সা বলো, সা বলো!
মদ্য, মাংস, বদান্য বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন
শিল্পের কাছে-দূরে তীব্র শব্দে আয়ুর পতন – ঝড় – আহ!
থামো, শব্দ কোরো না কোলাহল, শোনো স্তব্ধের আলোড়ন
ধীরে জাগে বুঝি সুর
দূর ছায়াদ্বীপ-সঙ্গীত
মনে পড়ে সন্ধিকাল... গুরুকুল...
পাখির ডানার নিচে স্বর রেখে বাবা বলতেন –
বলো সা, সা বলো খোকা, জাগো
ভ্রুমধ্যে চিৎ করো ভোর


আপনার মতামত জানান