প্লে...

সুপ্রভাত রায়


জন্ম থেকেই আমাদের বাড়িতে কোনো টেপরেকর্ডার দেখিনি আমি। তাই খেলনাপাতির মতো কোনো গানকে নেমে আসতে দেখিনি চোখে। জেঠুদের বাড়িতে ছিল। এবং এক্কেরে পুচকেটি ছিলাম কথাটথাও ঠিক করে বলতে পারতাম না, তখন একমাত্র ওই আশ্চর্য বস্তুটিই নাকি আমার কান্না থামাতে পারত। আমি ওটার সামনে গিয়ে ‘হুয়া হুয়া বললেই আমাকে তখন ওটাই কোনো না কোনো গান চালিয়ে দিতে হত। আমি শান্ত হয়ে মাথা দোলাতাম। শুধু মায়ের মুখে না, এই গল্প পাড়াপড়শির মুখেও শুনেছি। এমন কি আমাদের পাড়ার শিলু কাকুকে কোনোদিন আমার ভালনাম বা ডাকনাম ধরে ডাকতে দেখিনি। শিলুকাকু বরাবর আমাকে হুয়া বলে ডেকে এসেছে। এই এখনও।
কিন্তু কাহানিকা ট্র্যজেডি হল আমার যখন স্কুলে পড়ার মতো বয়সটয়স হল, তখন সেই টেপ গেল খারাপ হয়ে। জেঠু আর সারাল না। ওই খারাপ স্পিকারের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে হুয়া হুয়া বলে নিজেই ছোটবেলায় নিজের পুচকেবেলাকে নকল করতাম। হুয়া সাড়া দিত না।
সার্মথ্যও ছিল না আমার মাষ্টারি করা বাবার গান শোনার যন্ত্র কেনার।
মায়ের মুখেই শোনা ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে আমার একটা ভাল ট্র্যাক রেকর্ড আছে। যে আমি নাকি মুখ ফুটে কোনোদিন কিচ্ছুটি কিনে দেওয়ার জন্য বায়না করিনি। এমনকি ঘুড়ি কেনার জন্যও পয়সা চাইতে পারতাম না। ঝাঁটার কাঠি দিয়ে খবরের কাগজ ছিঁড়ে ইয়াবড় লেজ করে সেই ঘুড়ি ওড়াতাম।
সেই আমি প্রথম যে জিনিসটির জন্য আবদার করে ছিলাম সেটি একটি টেপ। গান শুনবো বলে। এখন যেমন লোকে রাস্তা দিয়ে পেরোতে গিয়ে টিভির দোকানের সামনে খেলা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে, আমি ওই রকম কারো বাড়িতে গান চললেই চুপটি করে দাঁড়িয়ে পড়তাম রাস্তায়। সমুদা প্রতিদিন ভিক্টর ব্যানার্জীর ‘দেবতা’ সিনেমাটার ডায়লগের ক্যাসেটটা চালাত। প্রায় রোজ। ওদের জানলার নিচে ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘দেবতা’র ডায়লগ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
বাবা বলেছিল হাইস্কুলে অ্যাডমিশন টেষ্টে চান্স পেলে আমাকে একটা টেপ কিনে দেবে। পেয়েছিলাম চান্স। আর চান্স পাওয়ার এক বছর পর একটা ফিলিপ্স এর সেকেন্ড হ্যান্ড টেপ রেকর্ডার। যেটা শুধুই আমার কথা শুনবে। আমি যে গান বাজাতে চাইবো সেই গান বাজবে...এই অপূর্ব সুখের সাথে অন্য কোনো সুখের মিল খুঁজে পায়নি আমি। সেই শুরু হল আমার নিজে নিজে গান শোনা। আর তুমুল সব এক্সপেরিমেণ্ট। টইটই করে ঘুরে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গেল। দুপুরে ছুটি থাকলে আর পাঁচিল টপকে পালিয়ে যেতাম না। হালকা গান চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম শুনতে শুনতে শুনতে শুনতে। উলটে দেওয়া বি পিঠও শেষ হয়ে গেলে খটাং করে একটা শব্দ হয়ে সুইচটা উঠে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত ক্যাসেটও, আমাকে জড়িয়ে ধরে।
এক পিঠে হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে আর অন্য পিঠে আ গলে লাগ জা—এই ছিল আমার কেনা প্রথম ক্যাসেট। একা একা গিয়ে। পঁচিশ টাকা প্রিন্ট ছিল, বাইশ টাকা নিয়েছিল দোকানের দাদাটা। বলেছিলাম বাড়ি গিয়ে চলবে তো গানগুলো ? এই প্রসঙ্গে আমার অভিঞ্জতা খুব খারাপ। মেলায় কেনা যে কোনো সাধের খেলনা দেখতাম দোকানে কি সুন্দর চলে, বাড়ি এসে আর নড়েও না, চড়েও না। ভয়ে ভয়ে বাড়ি এসে চালিয়ে দিয়েছিলাম, আস্তে সাউন্ড দিয়ে। কুমার শানু গেয়ে উঠেছিল ইঁয়ুহি কাট জায়েগা সফর সাথ চলনে সে...

আপনার মতামত জানান