গানের ভিতর দিয়ে যখন...

কেয়া মুখোপাধ্যায়


তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি। দুপুরবেলা আমাকে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা ব্যর্থ করে মা-জেঠিমারা যখন বিশ্রাম নেন, তখন গোটা বাড়ি আমার দখলে। ওইরকম এক দুপুরে ছবি আঁকার সাধের পেন্সিলটি ভেঙ্গে যেতে, বাবার টেবিলের ড্রয়ারে খুঁজে দেখছিলাম তার বদলে ভালো পেন পাওয়া যায় কিনা। চোখে পড়ল একটা সোনালী চ্যাপ্টা বাক্স চাপা দেওয়া অনেকগুলো সুন্দর নীল রঙা চিঠি। অপার কৌতূহল। খুলে সাজিয়ে ফেললাম টেবিলে। কয়েকটায় লেখা আর কয়েকটায় কি অদ্ভুত সব ছবি আর কত সব চিহ্ন আঁকা চিঠি জুড়ে। মজা লাগল খুব। কাগজ পেন্সিল নিয়ে আমিও ওইরকম কিছু আঁকতে বসে গেলুম। এর পরের ঘটনা আঁচ করা কঠিন নয়। প্রায় দক্ষ-যজ্ঞ বাড়িতে। অনেকগুলো অপরাধ আমার। সন্ধ্যেবেলা বাবা ফিরতে অপরাধীকে পেশ করা হল। কি আশ্চর্য, বাবা কিন্তু একটুও বকলেন না! বরং বললেন, আরো আছে এই রকম, দেখবে? বলে বইয়ের আলমারি থেকে নামিয়ে আনলেন কয়েকটা বই- তাতেও ওই রকম ছবি আর চিহ্ন। বাবা বললেন- মিউজিক্যাল নোটেশন, ওই ছবি দিয়ে সুর বোঝানো হয়। বইতে আছে, কিন্তু চিঠিতে কেন? তখন শুনলাম এক অন্য গল্প। বাবারা কয়েক বন্ধু মিলে একসঙ্গে গীটার শিখতেন প্রখ্যাত সুজিত নাথের কাছে। আজ হয়তো সুজিত নাথের নাম অনেকে জানেন না, কিন্তু বাংলার সঙ্গীত জগতে হাওয়াইয়ান গীটারে সুর তোলার প্রাণ পুরুষ এই সুজিত নাথ। স্টীল গীটারকে বাংলার সঙ্গীত মহলে প্রথম পরিচিত করেন সুজিত নাথ। ধুতি আর স্ট্রাইপ দেওয়া বাংলা শার্ট পরে নাইলন স্ট্রিং গীটারের স্ট্র্যাপ বুকে বেঁধে সুর তুলতেন, অসাধারণ পিয়ানো বাজাতেন আর দুর্দান্ত অরকেস্ট্রেশন করতেন। আকাশবাণীর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সুজিত নাথের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র আর বাবার প্রিয় বন্ধুটি যখন তাঁর অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্যে ঘুরছিলেন কখনো লন্ডন কি কখনো ভিয়েনায়, তখন সময় পেলেই যেসব সুর করতেন- পাছে ঘোরাঘুরিতে হারিয়ে যায়, চিঠিতে নোটেশন করে পাঠিয়ে দিতেন বন্ধুদের কাছে। বাবার সেই বন্ধুটি কাজী অনিরুদ্ধ। আমার জন্মের অনেক বছর আগেই তিনি চলে গিয়েছিলেন। চলে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা, এক অনবদ্য সঙ্গীত ধারার স্রষ্টা কাজী নজরুলও। শুধু স্মৃতি হয়ে সেইসব সঙ্গীত সৃষ্টির মুহূর্তগুলো ধরা থেকে গিয়েছিল ওই সব চিঠিতে।
সেদিন বাবা তাঁর অ্যাকাওস্টিক আর ইলেকট্রিক গীটার দু’টোতে হাত ছুঁইয়ে ছিলেন অনেক দিনের পরে, আমার সঙ্গে। সেদিনই গানের হাত ধরেছিলাম বাবার সঙ্গে।
আমার এক কাকাকে আমি কখনও দেখিনি, শুধু তাঁর গল্প শুনেছি। পেশায় আর্কিটেক্ট ছিলেন আর চমৎকার গান গাইতেন। খুব তরুণ বয়সে, অকালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। স্মৃতি হিসেবে রয়েগিয়েছিল বিরাট এক ড্রয়িং বোর্ড, টি-স্ক্যোয়ার, তে-কোণা স্কেল, অনেক ট্রেসিং পেপার আর কালো রেক্সিনে বাঁধানো, সোনার জলে নাম লেখা একটি গীতবিতান। রবীন্দ্র রচনাবলী বইয়ের আলমারিতে তোলা থাকে। কিন্তু এই গীতবিতানটি সকলের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে। শুনেছি গরমকালে সন্ধ্যেবেলা তিনতলার ছাদে গানের আসর বসতো। দাদু গাইতেন ধ্রুপদ, খেয়াল; আর কাকা গাইতেন তাঁর প্রিয় রবীন্দ্রনাথের গান।
সেইসব দিনগুলো আমি দেখিনি, শুধু গল্প শুনেছি। আর দেখেছি ওই গীতবিতানে কিছু গানের পাশে তারা চিহ্ন। বাবা বলতেন সেইগুলো ছিল কাকার সবচেয়ে প্রিয় গান। তখন আমি স্কুলে পড়ি। হঠাৎ হঠাৎ রবি ঠাকুরের এক একটা গানের কলি মনে দোলা দিয়ে যায়, সারাদিন সেই গানটাই গুন গুন করি আর তারপর ছুটে যাই ওই গীতবিতানের কাছে- পুরো গানটি পড়তে, হয়তো বা বোঝার চেষ্টা করতে; আর সেইসঙ্গে খুঁজে দেখতে সেই গানটি কাকারও প্রিয় ছিল কিনা! বেশির ভাগ সময়েই মিলে যেত। কি আশ্চর্য! এই গানটাও মিলে গেল! তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি- মিলিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। যাঁকে কখনও দেখিনি, যাঁর ভালো-লাগা স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে শুধু ওই তারা চিহ্নতে, তাঁর সঙ্গে আমার ভাবনা আর ভালো-লাগাকে মিলিয়ে দিয়েছেন তিনি, এক সুরে বেঁধে দিয়েছেন।

ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানি গানের থেকেও মায়ের কাছে বেশি শুনেছি রবি ঠাকুরের গান। এটা ওটা সংসারের নানা কাজের মাঝে গুন গুন করে করে মায়ের গাওয়া রবি ঠাকুরের গান আমিও গাইবার চেষ্টা করতাম। সেইসঙ্গে ছিল অগুন্তি লং-প্লেয়িং রেকর্ড। ছোটবেলা জুড়ে ছিল দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সাগর সেন, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান, তার সঙ্গে শ্যামা, শাপমোচন গীতিনাট্যে আশ্চর্য মুগ্ধতা; ছিল নজরুল গীতি, অতুলপ্রসাদ আর রজনীকান্তের গানও। আর ছিল বেসিক ডিস্কের নানা দুর্দান্ত গান। সেখানেও মুগ্ধতা রোম্যান্টিক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে, আর দারুণ স্মার্ট মান্না দের গায়কীতে। আর এক জনের কথা না বললেই নয়, সলিল চৌধুরী। কি দারুণ সব গান! একদিন হঠাৎ তাঁর গানে একটা নতুন শব্দ আবিষ্কার করলাম, যে শব্দ আমি বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ, মানিক কি তারাশঙ্কর- তাঁর পূর্বসূরি স্টলওয়ার্টদের কারোর লেখায় পাইনি- ‘আমি শুধু “তুষারিত” গতিহীন ধারা!’ ফ্রোজেন বোঝাতে বাংলা এই শব্দ আর কেউ ব্যবহার করেননি তার আগে! বাংলা কি হিন্দি- কি আশ্চর্য সব গান আর সুর করে গেছেন তিনি। রানার থেকে পাল্কীর গান, ছড়ার গান- উপহার পেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেছি। তারপর আর একটু বড়ো তখন, দাদা রাগ-সঙ্গীত শেখেন, আর আমি না বুঝেই শুনি বড়ে গোলাম আলি, উস্তাদ আমীর খান, উস্তাদ আবদুল করিম খান। একসময় ওয়ার্ল্ড মিউজিকের সঙ্গে পরিচয়ও বাবার হাত ধরেই। ছুটির দিনে ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তো বাখের ব্রান্ডেনবার্গ আর গোল্ডবার্গ, মোৎসার্টের সিম্ফোনী ফর্টি কি পিয়ানো কনসার্টো ২১, অথবা ভিভাল্ডির ফোর সীজনস্।
এইভাবে মায়ের খালি গলায় গাওয়া রবি ঠাকুরের গানে, বাবার গীটারের রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল কি পাশ্চাত্য-সুরে, আর অগুন্তি লং-প্লেয়িং রেকর্ডের দেশী আর বিদেশী সংগীতের মূর্ছনায় আমার বড়ো হওয়া।

তারপর একদিন এক বিস্ফোরণ! ক্লাসের পর আড্ডায় এক বন্ধু গাইল-‘নাগরিক ক্লান্তিতে তোমাকে চাই/ এক ফোঁটা শান্তিতে তোমাকে চাই/ বহুদূর হেঁটে এসে তোমাকে চাই/ এ জীবন ভালবেসে তোমাকে চাই।’ কে লিখেছেন, কে গেয়েছেন এমন গান? সেই প্রথম পরিচয় গানওয়ালা সুমনের সঙ্গে। ‘তোমাকে চাই’ এক ঝড়ের মত এসে আমাকে জিতে নিল। আমাকে নয়, আমদের প্রজন্মকেই। ওই এক ক্যাসেট সারাদিন বাজতে থাকে, অঙ্ক কষার সময়েও। বাড়ির কাছেই গিরিশ মঞ্চে অনুষ্ঠান, গিয়ে দেখি প্রায় বাঘের মত গোটা মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটা লোক; কখনো গীটার, কখনো অর্গান, কখনো কী-বোর্ড- আর তার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অনবদ্য এক এক খানা গান! আজও মুগ্ধতা তাঁর সৃষ্টিতে।

এরপর গিয়ে পড়েছিলাম আর এক গানের পৃথিবীতে। আকাশবাণীর এফ.এম.চ্যানেলের রেডিও জকি হয়ে প্রথম যখন মিউজিক আর্কাইভের বিশাল ঘরটায় ঢুকলাম অনুষ্ঠানের জন্যে ভালো-লাগা গান বেছে নিতে- সে এক আশ্চর্য শিহরণ! ২০০৪ এর ১৩ই মার্চ যখন প্রয়াত হলেন উস্তাদ বিলায়েৎ খান- সেই রাতে দশটা থেকে বারোটা বাজিয়েছিলাম তাঁর অসামান্য সব সৃষ্টি। সে রাতে উস্তাদজী সম্পর্কে বলেছিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, উস্তাদ রাশিদ খান। সে দিনটা ছিল গভীর দু;খের আবার এক অর্থে আমার পরম সৌভাগ্যেরও। আকাশবাণীর সঙ্গে তাঁর মত-বিরোধে তিনি ‘ব্রাত্য’ হওয়ায়, বহু বছর আকাশবাণীতে বাজেনি যে সব সুর, সেই সব সুর শোনাতে পেরেছিলাম শ্রোতাদের।

গান তো প্রাণের আনন্দের। তার জন্যে আলাদা কোন দিন হয় নাকি? বড়ে গোলাম আলি খাঁ নাকি বলতেন- ‘গানে মে রহো’- গানেই থাকা, গানেই যাপন। তবু আজ ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে বলে শুভেচ্ছা পাঠানো হয়, প্রতিদিনের গুন গুন করাটা আজ হয়তো একটু হলেও স্পেশ্যাল- আজ দিনটা কোথাও একটু আলাদা আর সেই সব ভাবতে গিয়েই মনে মনে বলি-

‘গান তুমি হও গরম কালের সন্ধে বেলার হাওয়া
অনেক পুড়ে যাওয়ার পরে খানিক বেঁচে যাওয়া
গান তুমি হও বিশ্রী গরম ভুলিয়ে দেয়া বৃষ্টি
সজীবতার ভরসা দেয়া সফল অনাসৃষ্টি

গান তুমি হও বরষা শেষের নীল আকাশের আশা
মেঘের শাসন ঘুচিয়ে দেয়া আলোর ভালবাসা
গান তুমি হও বাংলাদেশের আকাশ শরৎ কালের
এই আকালেও দোলাও আমায় তোমার তালে তালে’





আপনার মতামত জানান