ম্যা হু খামোশ যাহা মুঝকো উহা সে শুনিয়ে

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়


ছোটবেলা কেটেছে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে ... অতএব,সেইরকম পরিবারের মেয়েদের জীবনে গান কোনো না কোনোভাবে এসেছেই ... মূলত এসেছে সেইসব গানের ইস্কুল বা মাস্টারমশাইদের কাছে পাঠিয়ে। নাহ! জন্ম যেহেতু আশির শেষ প্রান্তে ফলে ভাল বিয়ে দেওয়ার জন্য গান শেখানোর চেষ্টা কিন্তু নয় ... তবে বাড়ির মেয়ে মিষ্টি দুখানা বিনুনি ঝুলিয়ে কোকিলের মত কন্ঠে দু কলি গান শোনাবে এটা ভাবায় মন্দ কী!
আমার মা - এর পড়শোনার বিষয় এবং ভালোবাসার বিষয় গান। মামার বাড়ির প্রত্যেকে দারুণ গান গায়। তবে ছোটবেলায় মামারবাড়ি যাওয়া মানেই জলসা। কেউ আরতি তো কেউ সন্ধ্যা, কেউ হেমন্ত তো কেউ সুবীর সেন। সন্ধ্যেবেলা হার্মোনিয়াম নিয়ে বসে যাওয়া হত ... তবলা পাওয়া গেলে ভাল নইলে হাঁড়ি ডেকচিও বাজালেই হয় ... আর তার মধ্যে যদি কোনোভাবে কারেন্ট যায় তাহলে তো কথাই নেই। দমদমের জামরুল তলার পাড়ায় তখন হো – ও – ও – ও - ও করে একটা শব্দ হবে আর ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসবে আর তার মধ্যে বড় মামা গেয়ে উঠবে “নয় থাকলে আরো কিছু ক্ষণ, নয় রাখলে হাতে দুটি হাত” ... তারপরেই হয়ত মা গেয়ে উঠল “মাধবী মধুপে হল মিতালী,ওই বুঝি জীবনের মধু গীতালি” , মেজ মামা তখন অন্য মুড এ ... “ যানে উও ক্যায়সে লোগ থে জিনকে পিয়ার কো পিয়ার মিলা” ... আর ঠিক তখন-ই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ল সবুজ একটা জোনাকী ... অতএব এইসব শুনে বড় হওয়ার ফলে যেটা হয় আমারো ঠিক তাই হল ... খুব তাড়াতাড়ি প্রেম এল জীবনে ... যখন তখন গেয়ে উঠল মন “ ও আমায় খুন করেছে, ও আমায় গুণ করেছে, ও আমায় খুন করেছে গুণ করেছে ও বাঁশি” আর তারপর আলাপ না হওয়া ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে, ভিজে যাওয়া বালিশের উদ্দেশ্যে “ও –ও দয়া – আ – আ – আ - ল বিচার কর” ... প্রেম আসা যাওয়ায় এইসব পুরোনো বাংলা গানের কোন জুরি নেই। সঙ্গে আবার আছে বাবার দৌলতে শোনা গীতা দত্ত হিট “বাবুজি ধিরে চলনা ... প্যায়ার মে জারা সামহালনা” কিংবা “নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে ... চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে – এ – এ - এ।। বাতাসে – এ -এ”।। গীতা দত্তর ওই টান ... আহা! এখনো মাঝ রাতে ছাদে গেলে এই গান - ই মনে পড়ে আমার।
ক্লিফ রিচার্ড,বব ডিলান বাবার কাছে এসব শুনলেও ছোটবেলায় এরা আমার জীবনে তেমন করে ঘর বসাননি, ওরা আমার জীবনে এসছেন অনেক পরে ...... তবে সুরের আরেকটা খুব জোরদার ভূমিকা ছিল আমার জীবনে ... ভবানীপুরের পুরোনো এই চারতলা বাড়িতে পা দিলেই শোনা যেত সুর ... কাকা সেতার বাজাচ্ছে ... আমার ছোটবেলার সময়টা কাকা প্রায় সারাদিন সেতারের ঘরে থাকত ... আমি আলাদা করে সুরকে চিনতে পারতাম না ... ওটা এই বাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ... সারাদিন ওটা শুনতে শুনতে দিন কাটত,ঘুমোতাম নানারকম সুর মাথায় নিয়ে এমনকী মধ্য রাত্তিরে মা যখন আমায় বাথরুমে নিয়ে যেত ... ছোট্ট , ফ্রক পড়া আমি তখনো শুনতে পেতাম সেতারের আওয়াজ ... সেটা তাই আমার জীবনের – ই একটা অংশ ছিল ... এখনো কাকা সেতার বাজায় ... তবে সারাদিন নয় ... বিকেল থেকে ছাত্র ছাত্রীরা ভিড় করে ... তখন ভেসে আসে কাকার সেতারের আওয়াজ আর শেখানোর সরগম ... আমাদের বই - এর তাকের একটা তাক ভর্তি থাকত সরবিতান ... ঘরের কোনায় তানপুরা ... কিন্তু ক্রমশ সংসারে আটকে পরা আমার মা-র সমস্ত অভিমান হয়ত গানের ওপর - ই পড়ল ... আর তাই ... পরের দিকে ... এখনো ... মা খুব একটা আর গান গায় না ... মানুষ যা বা যাকে ভালবাসে ... তাকেই হয়ত সবচেয়ে অবহেলা করা যায় ... অধিকারে! জানি না...

দিদির জন্যই প্রথম বাড়িতে ঢোকেন অঞ্জন দত্ত , চন্দ্রবিন্দু, ভূমি,ক্যাকটাস ... শুরু হয় আমার নতুন অধ্যয় ... হাই স্কুলে ওঠার আগেই প্রিয় বন্ধু মুখস্থ হয়ে যায় আমার ... চন্দ্রবিন্দুও তখন বেশ মনে ধরেছে ... এঁচোরে পাকা হলে যা হয় আর কি । স্কুলের শেষের দিকে জীবনে খানিক জায়গা করে নেন ডেনভার,সাইমন গারাফাঙ্কেল ...
আরো পরে জীবনে আসেন যিনি তিনি এত তীব্র ভাবে আসেন যে আজ হয়ত প্রতি মুহূর্তে তার গানে বেঁচে থাকি ... অবশ্যই তার নাম সুমন ... তিনি কবীর না চট্টোপাধ্যায় তা নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না ... সুমন শুনতে শুনতে যখন সুমনের প্রেমে পড়ছি খানিক তখন আমার আলাপ হয় শ্রীজাত দা - র সঙ্গে যার জীবনে সুমন ঈশ্বর ... আমার জীবনে শ্রীজাত দার বহু চিন্তা ভাবনার - ই একটা প্রভাব আছে ... ফলে এই প্রভাব ও ডানা মেলে আরো উঁচু আকাশে ... পরবর্তী সময় যে মা্নুষটিকে আমি বিয়ে করি সেও তীব্র সুমন প্রেমিক ... ফলে জীবনে সুমন রয়ে গেলেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ... শুধু আমার জীবনেই নয় ... একপ্রকার আমার সংসারে ... আমার আশ্চর্য সব ভালবাসায় ... সুমন - ই শেখালেন “ভালবাসা শত যুদ্ধেও জেতা যায় না”... আর তাই তো শান্ত হতে পারলাম আমি ... আর্তি জানাতে পারলাম এই পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের কাছে “পায়ে পড়ি তোর প্রেমের গানটা বাজা”...
জীবন আশ্চর্য,জীবন অদ্ভুত, এত সব সুরের মধ্যে থেকেও আমি তাল , লয় , স্কেল কিছুই শিখতে পারিনি ... এমনকী ক্লাসিকালের কোনো রাগ ও না ... আমি শুধু বুঝতে পারি কোন সুরে আমার মন কেমন করে ... কোন সুরের ওঠা নামায় আমার বুকের ভিতরটা খালি হয়ে আসে ... কোন গলার আবেগে আমার আনন্দে নেচে উঠতে ইচ্ছে করে ... কিংবা কোন গানের কথায় আমার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে ... ঠিক যেভাবে জীবনের - ও কোন স্কেল ,তাল , লয় ... কিচ্ছু শিখতে পারিনি আমি ... বারে বারে গুলিয়ে গেছে সব ... ধেবরে গেছে রঙ, ওলট পালট হয়ে গেছে সুর ... আর ঠিক তখন - ই হয়ত জগজিৎ গেয়ে উঠেছেন ... “সাবকো আতা নাহি দুনিয়া কো সাজা কর জিনা”...
তবে জীবন যতবার এলোমেলো হয়ে গেছে ... গানের কাছে সুরের কাছে এক বিশাল আশ্রয় পেয়েছি আমি ... কোনো বাঁশি বা এস্রাজ বাঁচিয়ে দিয়েছে আমাকে বহু রাত্তির ... কিন্তু আমি ব্যাকরণ জানি না ... সম্পর্কের নাম না জানলে বুঝি সম্পর্কে থাকা যায় না ? আদরের নাম না জানলে বুঝি আদর করা যায় না ? কে জানে...
““Meri awaz parda hain mere chehreka
Mein hu khamosh jahan mujhko wahan se suniye”
পুনশ্চঃ ঠাকুর দেবতাকে নিয়ে আর এই লেখায় টানাটানি করলাম না।

আপনার মতামত জানান