কানের থেকে মনে

ফুলমণি সরেন


সে অনেক কাল আগের কথা। মায়ের কোলে শুয়ে মেয়েটা। আর মা তাঁর বাঁ হাটু দিয়ে তাল ঠুকে ঠুকে দোল দিচ্ছেন মেয়েকে। তালটা মায়ের গাওয়া গানের কলির। কোন গান? ঢিমে তালের গান যেমন, “আধেক ঘুমে নয়ন চুমে স্বপন দিয়ে যায়” কিংবা “এই করেছ ভালো নিঠুর হে”। বাবা আপিস থেকে ফিরেছে কিনা জড়ানো গলায় দুই গানের ফাঁকে জানতে চায় মেয়ে। মা ভাবেন মেয়ে ঘুমোনোর আগে বাবা না ফেরাই ভালো। যে গানের শেষে প্রশ্ন নেই, সেই গানের শেষে নিশ্চিন্তে মেয়েকে বিছানাস্থ করে মা ফিরে যান দিনের বাকি কাজগুলোর কাছে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই মেয়েটা তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বসে পড়ে দিদিভাইয়ের পাশে। গলা সাধা হয়ে গেলে দিদিভাই কলেজ চলে যাবে। তখন আর শোনা যাবে না, “যারে যারে কাগা তু যারে কাহিঁয়া” কিংবা “জাগো মোহন প্যারে”।
মামার বাড়িতে অন্য মজা। বড়োমামার টেপ রেকর্ডারে বাজে “হাউ মেনি মাইলস আ ম্যান মাস্ট গো বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান” কিংবা ছোটোমামা শেখায়, “সারাজীবন দিল আলো সূর্য গ্রহ চাঁদ/ তোমার আশীর্বাদ হে প্রভু। তোমার আশীর্বাদ।” আশ্চর্য! মেয়েটা ইস্কুলে গিয়ে দেখল শনিবারের গানের ক্লাসে এই গানটা তার জানা! এটা ছাড়া আর যে গানটা গাওয়া হয় সেটাও অবশ্য জানা ছিল। সারা ক্লাসের সাথে গলা মেলায়, “লালঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না”।
এদিকে বড়ো একটা ইস্কুলে এসে মেয়েটা দেখল সেখানে গান দিনে একবার “হও ধর্মেতে ধীর ...”। বাড়িতে কিন্তু দিদিভাই সক্কলকে শিখিয়েছে, “শিউলিতলায় ভোরবেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লীবালা”। আর একবার ছুটির শেষে, পিসিমণির সাথে ট্রেনে চাপা মাত্রই ভেঁপুদাদা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে বলল, “শম্পাদিকে বলিস না, ‘শিউলিতলায় ভোরবেলায়’ গানের পাতাটা আমি তার ডায়রি থেকে ছিঁড়ে নিয়েছি।” কথাটা মেয়েটা ভুলেও গিয়েছিল। কিন্তু পরে একদিন দিদিভাই “গোঠের রাখাল বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন” গাইতে গাইতে গানের কথাগুলো ভুলে গেল। সারা খাতা খুঁজে গান পায় না। সামনে বসা মাস্টারমশাইয়ের মুখটা থমথম করছে ছাত্রীর অযত্ন দেখে। দিদিভাইয়ের বিপদে মেয়েটার মাথায় একটা বাল্ব জ্বলে উঠল, কিন্তু টিমটিমিয়ে। ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, “তার উলটো পিঠে কী ‘শিউলিতলায় ভোরবেলায়’ লেখা ছিল?” দিদিভাই বলল, “হতে পারে, কেন?” মেয়েটা দ্বিধাগ্রস্ত হলো, কাকে বাঁচাবে? ভেঁপুদাদাকে দিদিভাইয়ের হাত থেকে নাকি দিদিভাইকে মাস্টারমশাইয়ের বকুনির থেকে। বেশি সময় ছিল না। দিদিভাইয়ের সাথে সে রোজ থাকত, ভেঁপুদাদার সাথে দেখা হয় বছরে একবার কী দুবার। তারওপর সে আবার কবে আসবে আর বকুনি খাবে তার কোনো ঠিক নেই। তাছাড়া মামারবাড়িটা আব্দারের জায়গা বলে ভেঁপুদাদার অপরাধটা আগাম মার্জনা হয়ে যাবে বলেই মনে হলো মেয়েটার। তাই তৎক্ষণাৎ সে জানাল যে ভেঁপুদাদার কথাটা। প্রাথমিক পর্যায়ে “কেন আগে বলিস নি?” বলে ধমক জুটলেও মেয়েটাকে সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগল, “ঠিক কী হয়েছে”। মানে মেয়েটা বুঝল যে আর পাঁচজনে জানে না কিন্তু সে জানে এমন একটা ঘটনায় সে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।
সেকেন্ডারি ইস্কুলে এসে সে শুনল নানা ঋতুর রবীন্দ্রসঙ্গীত (সব থেকে বেশি বসন্তের কিংবা শরতের), রবীন্দ্রনাটকের গান, লোকসঙ্গীত (“আমপাতা লালে লাল, জামপাতা কালারে”), দেশাত্মবোধক গান যেমন “ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো” কিংবা “দুর্গমগিরি কান্তার মরু”। এদিকে নিত্য খবরের কাগজে তখন ম্যাডোনা আর মাইকেল জ্যাকসন। মামাবাড়িতে গিয়ে শোনা গেল “ডোন্ট স্টপ টিল ইউ গেট এনাফ”, “হিল দ্য ওয়ার্ল্ড”, “উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড”। তার মধ্যে ভরাট গলায় নগর বাউল গাইলেন, “তোমাকে চাই”, “হাল ছেড়ো না বন্ধু”, “দশফুট বাই দশফুট”, “পেটকাটি চাঁদিয়াল” আর পাগলা করে দিল “নীলাঞ্জনা”, “চোর”। আর অবাক সুরের “দিল হৈ ছোটা সা, ছোটি সি আশা” কিংবা “তুহি রে”।
কলেজে প্রথম দিন অরিন্দমদা নিজে গিটার বাজিয়ে গাইল, “সুইটহার্ট আয়াম সিটিং এলোন” আর “বাথরুম”। মেয়েটা হতাশ হলো তখনও গানগুলোর ক্যাসেট নেই শুনে। তবে পরিচয় হলো বাংলা ব্যান্ডের গানের সাথে। বাংলা ব্যান্ডের খোঁজে শোনা হয়ে গেল, “কথা দিয়া বন্ধু ফিরা না আইলা”, “ধাঁধার থেকেও জটিল”, “ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে” থেকে “ভালোলাগে স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে”, “ভালোবাসা মানে ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি”। মিলিউতে শুনে ফেলল, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, শিবকুমার শর্মা, ক্যাকটাস। এবং সুমন (তখন) চট্টোপাধ্যায় গাইলেন “যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা/ কত সন্তান জ্বালালো প্রেয়সী তোমার আমার চিতা।” তারপর মেস কাঁপিয়ে বেজে উঠল একদিন “কানে লেগে থাকা সেই আর্তনাদ,/ দুটো দিন থেকে গেলে পারত না।” সঙ্গে অনেকবারের শোনা “স্যুইটহার্ট” কিন্তু “বাথরুম” চন্দ্রবিন্দু-র প্রথম অ্যালবাম “আর জানি না”-তে ছিল না। পরে এলো, “ত্বকের যত্ন নিন”-এ।
এদিকে তখন দিদিভাই ভীষণ সংসারি। তাই অবসরপ্রাপ্ত বড়োজেঠুকেই শুনিয়ে দিল মেয়েটা, “নচিকেতা ঘোষ নিয়ে এতো অহঙ্কার কীসের? ‘লাল-নীল-সবুজের মেলা বসেছে’ তো ক্লিফ রিচার্ডের ‘সামার হলিডে’......।” আবার “শিবরঞ্জনীতে বাধা কি এই গানটা?” বলে দুকলি গেয়ে দিল, “ঘর সে নিকলতে হি, কুছ দূর চলতে হি”। জেঠু বললেন, “তাই তো মনে হচ্ছে।” ‘আমি যে জলসা ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়’ গুনগুন করে বললেন, “এটাও।”
এফ এম-এ তখন “ইয়াঙ্কি ডুডল”-এ ধরা পড়ছে “লালঝুঁটি কাকাতুয়া”, কিংবা জানা যাচ্ছে “মেহবুবা ও মেহবুবা”-র উৎস সঙ্গীতটি। এমটিভিতে “সাম সবেরে তেরি ইয়াদে আতি হ্যায়” বিফোরইউতে “পহেলি পহেলি বার বালিয়ে, দিল গেয়ে হার বালিয়ে, রব্বা মৈনু প্যার হো গয়া”। এসে পড়ছে “যখন নীরবে দূরে”। তারপরেই ডিজিটাল নৈপুণ্যে মেয়েকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে, “নো ম্যাটার”, “বেডল্যাম”, আর নব নব রূপে কিন্তু সুপ্রাচীন “স্মাইল, অ্যান এভার লাস্টিং স্মাইল, ক্যান ব্রিং ইউ নিয়ার টু মি... দিস ওয়ার্ল্ড হ্যাস লস্ট ইটস গ্লোরি/ লেটস স্টার্ট আ ব্র্যান্ড নিউ স্টোরি মাই লাভ/...... ইটস অনলি ওয়ার্ডস ওয়ার্ডস দ্যাট অল আই হ্যাভ টু টেক ইউর হার্ট অ্যাওয়ে।”
তাই বোধ হয় ভয়ানক দুঃখে মেয়েটা আজও গেয়ে ওঠে “আরও বেদনা, আরও বেদনা/ প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা।” কিংবা চোখের জল মুছে ফেলে গায় “আঘাত সে যে পরশ তব সেই তো পুরস্কার।” অনুপ্রেরণা পায়, “আমার এ ধুপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে/ আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো।” কিংবা “ঝড়কে আমি করব মিতে ডরব না তার ভ্রূকুটিতে” শুনে। আবার তার কাছে নৈমিত্তিকতার মানে হয়ে যায় অনুপম রায়ের “বিজলিবাতি”, অন্ড্রে রিউ-এর “ব্লু ডানিয়ুব” পরিবেশনা বা পুরিয়া আর মারোয়ার তফাত বোঝার চেষ্টায় শিখে যাওয়া যে গানটাও অঙ্কের মতোই শিখতে লাগে।


আপনার মতামত জানান