স্মৃতি পঞ্চমে

সরোজ দরবার



ফিরে যাওয়া যাক ১৯৮৭ র কোনও একটা দিনে। গুলজার সাব একখানা কাগজ এগিয়ে দিচ্ছেন রাহুল দেব বর্মনের দিকে। পড়া শেষ। পঞ্চম বললেন, দারুণ দৃশ্য। কিন্তু দৃশ্য কোথায়! গুলজার সাব যে আস্ত একখানা গান লিখে এনেছেন। বললেন সে কথা। রাহুল তো গেলেন ক্ষেপে। এই সব গান! রেগেমেগে বললেন, এবার কবে টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে খানিকটা লেখা এনে না গুলজার তাঁকে কম্পোজ করতে দেন। কী জ্বালা! দিলেন কাগজখানা ফেলে। পাশেই বসে ছিলেন আশা ভোঁসলে। তিনি কাগজখানা কুড়িয়ে পড়তে শুরু করলেন। যত এগোলেন, তত চমকালেন। আরে এ যে চমৎকার কথা! ‘মেরা কুছ সামান/তুমহারি পাস পড়া হ্যায়...’ । প্রতি স্তবকের শেষে ‘লটা দো’ কথাটা তাঁকে পেয়ে বসল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তিনি গুনগুণ করে উঠলেন। সুরটা পঞ্চমের কানে গেল, হামিংটা আবার করতে বললেন আশাজিকে। সঙ্গে সঙ্গে করে শোনালেন আশাজি। প্রায় তৎক্ষণাৎ হারমোনিয়ামটা টেনে নিলেন পঞ্চম। মাত্র কয়েকটা মিনিট। রচনা হল সুর কিংবা ইতিহাস।
কিন্তু গল্পটা আপাতত এখানেই থামবে না। এরপর গুলজার সাব যে গানটা আনলেন, তাঁর প্রথম দুটো শব্দ ‘কাতরা কাতরা’। পঞ্চম একে বাঙালি। তার উপর অচেনা শব্দ গানে ব্যবহার করা গুলজারের নেশা। সে সবের সঙ্গে কাজ করতে করতে দিব্যি পরিচিত তিনি। একবার তো ‘ইস মোড় সে যাতি হ্যায়’ গানের ‘নসেমন’ শব্দটিকে ভেবেছিলেন কোনও এক জায়গার নাম। গুলজারই ভুল ভাঙ্গিয়ে জানিয়েছিলেন, শব্দটির অর্থ পাখির বাসা। কিন্তু তাই বলে, ‘কাতরা কাতরা!’ এ কী কোন শব্দ হল! পঞ্চম বললেন, এ শব্দ বাদ। গুলজার বললেন, বেশ তাহলে ‘সাওন ভাদো’ বা ‘বুঁদ বুঁদ’ শব্দ দুটি ব্যবহার করা যেতে পারে। রাহুলের বেশ পছন্দ হল, শুরু করলেন সুর করা। কিন্তু একটু পরেই মনে হল, দূর ছাই নতুন শব্দের একটাও যেন কাঙ্খিত ছন্দ আনতে পারছে না। সুতরাং? নাহ! ওই কাতরা কাতরাই ভালো। অলক্ষ্যে হাসলেন গুলজার।
কিন্তু রেকর্ডিংয়ের সময় আরও অদ্ভুত কান্ডকারখানা করতে লাগলেন পঞ্চম। খানিকটা রেকর্ড করান, পরক্ষণেই খানিকটা ছেড়ে দিয়ে, অন্য অংশ রেকর্ড করাচ্ছেন। আবার একটু পরে ছেড়ে যাওয়া জায়গাটা রেকর্ড করাচ্ছেন। হচ্ছেটা কী, গুলজারের প্রশ্ন। উত্তরে পঞ্চমের কটাক্ষ, যত্তসব উদ্ভট নিউজপেপার ক্লিপিংসের মতো লিরিক নিয়ে আসবে, কোনও কথা নয়। তাঁর কাজে যেন গুলজার মাথা না গলান। কিন্তু একটু পরেই গুলজার বুঝলেন, আসলে কী হচ্ছিল। যখন ভয়েস ট্র্যাক গুলোকে মিক্সিং করে ওভারল্যাপ করতে শুরু করলেন পঞ্চম। আজব কাণ্ড। দিব্যি মনে হচ্ছে, দুজন আলাদা গায়ক একই সঙ্গে গেয়েছেন। ডাবল ভয়েসের এফেক্ট তৈরি হয়ে গেল, ইউনিক তরিকায়। এবার পঞ্চমের পালটা চাল, দেখব এটাকে কেমন পিকচারাইজ করো। আমার ক্রিয়েটিভিটিকে চ্যালেঞ্জ ঠুকেছিলে, এবার দেখি এটাকে কী করে সামলাও।

দুই বন্ধুর গল্প। তবে নিছকই তো তা নয়। বন্ধুদ্বয়ের নাম যখন রাহুলদেব বর্মন ও গুলজার। দুই জিনিয়াসের গল্প মনে করতে আজ ইচ্ছে হল কেননা এক জিনিয়াসের মননে আর এক জিনিয়াস যেভাবে ধরা পড়েন, সেভাবে তাঁকে আর কোত্থাও পাওয়া যাবে না। অজস্র গুরুবন্দনা আর বিশেষণের বিদ্যুৎচমকের মাঝে মেঘে ঢাকা থেকে যাবেন হয়তো তারাটিই। তাই গুলজার সাবের একান্ত স্মৃতিচারণার মধ্যেই মেলে শুদ্ধ পঞ্চমের খোঁজ। নাহ শচীন কত্তার ছেলে নন, উস্তাদ আলি আকবর খাঁ-র শিষ্য নন, এমনকী তুমুল খ্যাতির রোসনাই ছড়ানো সুরবাহারের বাজিগরও নন, তাঁর স্মৃতিতে যাঁকে দেখতে পাই সে তো নেহাতই এক চির নাবালক। ১৯৭২ সালে যখন প্রথম কাজ করছেন একসঙ্গে, ‘পরিচয়’ ছবিতে, তখনই মাঝরাতে গুলজারের বাড়িতে হাজির পঞ্চম। সুর হয়েছে। কোন সুর? ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ...’। ঘরে বসে থাকলে আর চলে নাকি? সেই ভোররাতেই বেরিয়ে পড়লেন...দুই বন্ধু মিলে সারা শহর ঘুরতে, আর অনবরত পঞ্চম গেয়ে চললেন এই সুর। গুলজার মনে করে তাঁর পঞ্চম স্মৃতিতে লিখবেন, এই ছিল পঞ্চমের অভ্যাস। একবার সুর হয়ে যাওয়ার পর তিনি বারবার সেটিকে গুনগুন করতেন। পঞ্চম জানতেন, সুর শুধু এসে যায় না, তাকে রচনা করতে হয়। ঠিক যেভাবে শিশুকে লালন-পালন করতে হয়। বড় করে তুলতে হয়, সুরকেও গাইতে গাইতে লালন করতেন পঞ্চম। আর সেই সুর সত্যি বড় হত, এতখানি যে কয়েক দশকের সময়ের আঁচ তার গায়ে আজও তেমন পড়ে না। সুরকে তিনি প্রশ্বাসে গ্রহণ করতেন, দেখতেন সুর উঠে দাঁড়াচ্ছে...চলতে পারছে...ছুটছে...এমনকি উড়ছেও...। এই উড়ানটার নামই যে রাহুল দেব বর্মন।
যখনই মাথায় সুর আসত, গুলজাররের কাছে শব্দ চাইতেন। একজন সুরকার বরং একজন শিল্পীর গলায় সুরটি তুলিয়ে রাখতে পারতেন, সেটাই স্বাভাবিক হত। কিন্তু পঞ্চম যে আলাদা। শব্দে বসিয়ে রাখতেন সুর। যেন একটা চেহারা পেয়ে যেত গানটি। পরে শব্দ মনে পড়লেই মনে পড়ে যেত সুরটিও। সেই কবে বিমল রায়ের সেটে কোন এক ছবির গানের সুর করছিলেন বাবা শচীনদেব। তরুণ রাহুল তখন জীবনপ্রাচুর্জে ভরপুর। বারবার বাবাকে পরামর্শ দিচ্ছেন, এভাবে না হয়ে যদি ওভাবে, ওভাবে না হয়ে রদমটা যদি এভাবে হয়...। বিরক্ত শচীনকর্তা তাঁকে বাইরে যেতে বললেন, তারপর বললেন, গানের চরিত্রটাই ধরতে পারেনি ছেলেটা।
আর কী আশ্চর্জ, সেই পঞ্চমই তাঁর আজীবনের গানকে দিয়ে যাবেন এক অননুকরণীয় চরিত্র। কখনও রাগ সংগীতের তানবিস্তারে তো কখনও পশ্চিমী সঙ্গীতের ঝঙ্কারে গড়া সে চরিত্র। কখনও সে রাহুলের মতোই ছন্নছাড়া, কখনও বা আবার বাবা শচীনদেবের মতো মেজাজে বাউল। একবার তাঁর ঘরানায় ঢুকে পড়লেই চোখে পড়বে কেউবা মজে আছেন তাঁর মার্কিনদেশ থেকে আনা সিন্থেসাইজার ফ্ল্যাঙ্গারের ব্যবহারে, কেউ মগ্ন সোডার বোতল দিয়ে স্টিম এঞ্জিনের শব্দ তৈরি করায়(খুসবু ছবির ‘ও মাঝি রে’ গানে এই কাজ করেছিলেন), কেউ বা আবার মোহিত হয়ে আছেন আধুনিক কাঠামোয় তাঁর নেপালি পল্লীর সুর ব্যবহার নিয়ে।
হিন্দি গানে বিট-রিদম থেকে পশ্চিমী মেজাজের স্বদেশীকরণ ও তার ব্যবহার এই সবের পথিকৃত হিসেবে আজ তাঁর আবক্ষ মূর্তির সামনে সঙ্গীতপ্রেমীর মাথা নুয়ে আসে। শহরে একটু দূরেই তো কিশোরকুমারের মূর্তি। দুই মূর্তি মিলে হিন্দি গানের জগতে কী কান্ডটাই না করেছেন। কিন্তু আমাদের মন পড়ে থাকে ওই মানুষটার কাছে, যিনি নাকি চায়ের পেয়ালায় অনায়াসে ঠান্ডা জল মিশিয়ে দিতেন, আর তারপর তা ঘটঘট করে খেয়ে নিতেন। আরে এই মানুষটাই প্রখ্যাত সুরকার আরডি বর্মন নাকি? তবে আরও বাকি আছে, তাঁর বাড়ি থেকে কেউ যদি একটাও সিনেমা নিয়ে যেতে চান তবে রীরিমতো খাতায় নাম লিখিয়ে তবে নিয়ে যেতে দেন। একইসঙ্গে ছেলেমানুষ ও বড় মানুষ। এই দ্বৈতসত্তাই রাহুল ম্যাজিকের অন্যতম কারসাজি। সম সময় যেন এসব থেকেই একটু একটু করে চিনতে পারে তার গর্ভে প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হচ্ছেন, একজন কিংবদন্তি। আর সেই কিংবদন্তি শুধু সৃষ্টিসুখের তাগিদে কবে যেন সময়ের থেকেই অনেকখানি এগিয়ে গিয়ে লালন করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টিদের। এতখানি নিবিড় সে পরিচর্জা, এতটাই আন্তরিক সে পালন যে বন্ধুকবি - গীতিকার - পরিচালক অনায়াসে বলতে পারেন, ‘ …He handled them with rare sensitivity and the care of a loving parent. I can say that my song played like children in his house. He nourished them with love and affection. He allowed them the necessary space to grow naturally’.
গুলজার সাহেবের ব্যক্তিগত এ অনুভূতি সার্বজনীনতায় টেনে এনেও দেখি, পঞ্চম একটুও বদলাননি। তাঁর সুরকে তিনি সময় দিয়ে গেছেন, স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য। সময়ের বিছিয়ে রাখা ফরাসে তাঁর সুর খেলা করতে করতে বেড়ে উঠেছে। পঞ্চম জমানার শুরুটা ইতিহাস মনে রেখেছে, কিন্তু তার শেষটা কল্পনাতীত। আর তাই হঠাৎ ‘বদতমিজ দিল’-এর প্রিলিউড বেজে উঠলে আমরা চমকে উঠে চিনতে পারি এক টুকরো পঞ্চম, খুঁজে পাই তাঁর লিগ্যাসি। সাংগীতিক যোগত্যায় এবং মৌলিকতার নিরিখে তিনি কত বড় মাপের সংগীত পরিচালক, সে বিচার সংগীতের ইতিহাস করবে, হয়তো এতদিনে অনেকখানি করেওছে। আর করেছে বলেই জেনেছে, সময়কে অতিক্রম করে সুরকে বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় স্পেস দিতে পেরেছেন বলেই তো তিনি পঞ্চাত্তরেও জীর্ণ নন।
আসলে পঞ্চাত্তর হোক কিংবা পঁচাশি, আমরা তো জানি, প্রতি কিশোরের জমানায় শুধু বদলে যায় রুবি রায়, বদলান না রাহুলদেব বর্মন। রোদঝরা দুপুরের মতোই তাঁর রঙও তাই ফিকে হয় না।
.....................................
ঋণঃ ‘কাতরা কাতরা’, গুলজার


অলংকরণঃ তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান