গানের গল্প কিংবা গল্পের গান ...

শান্তনু মৈত্র

অঙ্কনঃ তৌসিফ হক

বহু বছর আগে একটি ছোট্ট ছেলে কান্নার সময় অজান্তেই ‘পা’ সুরে কাঁদতেন বলে লোক কথা আছে, সেই সুর দেখেই অশোক কুমার তার নাম রাখেন পঞ্চম। সেই শুরু ... সত্যজিৎ রায় তার এক গল্পে লিখেছিলেন “যার নামে সুর থাকে, তার গলাতেও সুর থাকে”। সেই লিগ্যাসির সঠিক পরিবহন করেছেন ভারতীয় সুরের অন্যতম জাদুকর রাহুল দেব বর্মণ। না ছিলেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার না ব্যবহার করতেন ল্যাপটপ মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টস। সঠিক সময়ে চরিত্র এবং চিত্রায়ন অনুযায়ী শব্দের ব্যবহারের লালিত্যের অপার ক্ষমতা তিনি বহন করেছেন পিতৃদত্ত ক্ষমতায় ... কিন্তু না, কখনো কোনদিনও শচীন কর্তার সন্তান হিসেবে তাকে বাঁচতে হয়নি, কারণ তিনি নিজেই একমেবদ্বিতীয়ম এক নক্ষত্র – সুরের আকাশে এক উজ্জ্বল শুকতারা। এসব কথা ইতিহাস বলে ... কাগজের পাতা বলে, আর. ডি. বর্মণের গান শুনে বড় হওয়া বাবা কাকারা বলেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে আমি বলি নিজের কথা ... বয়স তখন আমার ১২ কি ১৩, এফ এম শুনতে শুনতে একটা গান শুনেছিলাম – “মনে পড়ে রুবি রায়, কবিতায় তোমাকে একদিন কত করে ডেকেছি” ... তখন প্রেম বুঝতাম না, ভালোবাসা বুঝতাম না। শ্রুতিনন্দন যা কিছুই ভালো লাগত ... কিন্তু এই গানের মত শ্রুতিনন্দন আর কোন কিছুই সেভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যেতে পারেনি। সেই পঞ্চম প্রীতির শুরু ... একের পর এক গান খুঁজে যাওয়া, সেগুলো দিনের পর দিন বাজিয়ে বাজিয়ে শুনে যাওয়া একটা অদ্ভুত সম্মোহনের মধ্যে কেটেছে অনেক বছর, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সুরের বিশ্বায়ন দেখেছি বারবার। আলি আকবর খান থেকে শুরু করে বব ডিলান, এলভিস প্রেসলি কিংবা এপারের অঞ্জন দত্ত থেকে শুরু করে ওপারের মাইকেল জ্যাকসন সব কিছু শুনেছি, কিন্তু কোন গান বছর দুই- তিনের বেশী খুশি করতে পারেনি, নতুন গান এসে কেড়ে নিয়েছে তার জায়গা। কিন্তু ১২ বছর বয়সে শুনে ফেলা সেই রুবী রায় এখনও জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা হয়েই আটকে আছেন। তারই কিছুদিন পর হঠাৎ শুনেছিলাম “নদীর পাড়ে উঠছে ধোঁয়া, মনে হয় কিছু হয়েছে ... কথা দিয়েছিলে তুমি যে মোরে” তখন বছর ১৫, প্রথম প্রেম হারানোর যন্ত্রণার ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়েছিল সেই গান। আগে ভাবতাম শব্দের পর সুর সৃষ্টি হয় ... সত্যি তাই হয় , কিন্তু এখন মনে হয় রাহুলদেব বর্মণ সুরে শব্দ বসিয়ে রাখতেন । বেড়াতেন এদিক সেদিক, পশ্চিমী ঘরানার ঝঙ্কার থেকে রাগ সঙ্গীতের বিস্তারে তিনি সমান ভাবে অনবদ্য। কখনো প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ... তারুণ্যের আগুন ছিটকে বেরনো সৃষ্টি কখনো বা পুরাতনী সঙ্গীতের ব্যবহার, এক লয় থেকে অন্য লয়, এক তাল থেকে অন্য তালে অবাধ বিচরণ এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতকে ভারতীয় রূপ প্রদান হয়তো তিনি ই পারেন।
একটা পুরানো জার্নালে পড়েছিলাম এক অনবদ্য সৃষ্টির কথা, কিন্তু সে সৃষ্টি তার হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফেরাতে পারেনি, কিন্তু বাপি লাহিড়ী, লক্ষীকান্ত –পেয়ারলালের ডিস্কো জমানা টপকে আবার প্রমাণ করেছিল যে পুরানো চাল সত্যিই ভাতে বাড়ে, কারণ সেই সময়ে ইজাজত(১৯৮৭) –র একটা গান আমার সবটুকু শূন্য করে দিতে পারে আজও। মোবাইলে কিছু থাকুক আর না থাকুক ... কিছু শুনি বা না শুনি, “মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পরা হ্যায়।“ গুলজার সাবের অনবদ্য শব্দ চয়ন, আশা ভোঁসলে – আর.ডি ম্যাজিক এখন চমকে দিয়ে যায় প্রত্যেকটা দিন। অসম্ভব যত্নে লালিত সুর, আর শব্দের সাথে সুরারোপিত সৃষ্টি গান কে উড়িয়ে নিয়ে যায়, এটাই বারবার প্রমাণ করে যে সুরকারের কাছে সুর ই তার এক এবং একমাত্র সন্তান। সেভাবেই রাহুলদেব বর্মণ লালন করেছেন তার প্রতিটি সুর ... বৃষ্টির রাতে জানলার কার্নিশ বেয়ে জলের শব্দের মত মিশে যায় যার সুর, তিনিই রাহুলদেব বর্মণ। কিশোর কুমার হোক কিংবা মহম্মদ রফি, আশা ভোঁসলে কিংবা অন্য কোন গায়িকা ... তাদের পারদর্শিতার থেকেও আর.ডি ম্যাজিকেই গান কে কেবল গান নয়, জীবন করে তুলেছেন ... এই ম্যাজিকটাই পঞ্চম। দম মারো দম এ চেলো এবং ড্রামের ব্যবহারে যে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন অথবা সেই পাশ্চাত্য গানের সাথে সঙ্গতি রেখে লোকগীতির যে সামঞ্জস্য তিনি বজায় রেখে সৃষ্টি করেছেন এক মেলবন্ধন। সেই সুরের জাদু শুধু আমি বা আমাদের নয় ... সকলের অজান্তেই সকলকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে চিরকাল, এবং আগামী দিনেও যাবে। বদতমিজ দিল কিংবা বলমা তে আর.ডির সুর গুলোকে নতুন ভাবে ব্যবহার হতে দেখে শ্রোতা হিসেবে অদ্ভুত আনন্দ হয় । তিনি কি সৃষ্টি করেছেন, কেমন ভাবে করেছেন কেনই বা করেছেন তার বিচার চিরকাল ইতিহাস করে এসেছে, তার মৌলিকতা চিরকাল বিচার করেছে লাখ লাখ ভারতীয় সিনেমা প্রেমী মানুষ। সুর কে সুরের মত বয়ে যেতে দিতে তিনিই পারেন... তাই ডিস্কো আর রিমিক্সের জমানাতেও তিনি অপরিহার্য। বয়সের সাথে সাথে গানের মধ্যে চলতে থাকা ফ্যান্টাসি গুলো রূপ বদলেছে খালি, রুবি রায় কে ছেড়ে কিশোরেরা ড্রিউ ব্যারিমোর কে খোঁজে, কিন্তু সুরের আড়ালে ফ্যান্টাসির লালিত্য একই থাকে। ভেঙ্গে যাওয়ার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা কিশোরী আজও মেরা কুছ সামান আঁকড়ে রাত কাটায়। পৃথিবী বদলে যায়, চাওয়া পাওয়া বদলে যায় ... কিন্তু পঞ্চম এখনও বদলে যাননি। তাই তো এতদিন ধরে তিনিই সকলের জীবনের আড়ালে অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মত বয়ে চলেছেন তিরতির করে ... আত্মার আত্মীয় হয়ে, জীবনের আড়ালে না পাওয়া অন্য জীবন হয়ে ।


আপনার মতামত জানান