রাহুল দেব বর্মণ : একটি প্রথম ও শেষ ঘটনা

অনুপম মুখোপাধ্যায়

রাহুল দেব বর্মণ। এই নাম ভারতীয় পপ সঙ্গীতের শেষ নাম। ভারতীয় জনপ্রিয় সঙ্গীতেরও শেষ নাম। এ আর রহমান মোটেই সেটা নন। রাহুল দেব বর্মণের গান এ আর রহমানের তুলনায় অনেক বেশি লোক পছন্দ আজ হয়তো করেন না, কিন্তু তাঁর আবেদন অনেক বেশি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে। বাপ্পি লাহিড়ি তাঁর দরিদ্র সংস্করণ মাত্র। আর তারপরে যারা এসেছেন, তাঁদের নাম পাশাপাশি উচ্চারণ করার প্রয়োজন বোধ করছি না।
এই সঙ্গীতকারকে নিয়ে কিছু মিথ তো আছেই। তাদের একটা হল তাঁর প্রতিভার মিথ। যেমন বলা হয় শিশু রাহুলই নাকি ‘পেয়াসা’ ছবির ‘শর যো তেরা চকরায়ে...’ গানটির সঙ্গীতকার, শচীন দেব বর্মণ নন। তথ্যটা মিথ্যে বলছি না। সেটা হতেই পারে। হলে অবাক হওয়ারও কিছুই নেই। তবে এই ধরণের মিথ অনেকটা পিকাসো বা দালির ছেলেবেলায় অসাধারণ আঁকার ক্ষমতা, বা রবি ঠাকুরের ‘আমসত্ব দুধে ফেলি’-র কিংবদন্তির সঙ্গে মিলে যায়। যেন বোঝানো হয় আর ডি বর্মণের ভবিষ্যতে আর ডি না হয়ে গত্যন্তর ছিল না। তিনি নিজের প্রতিভার কাছে বলিপ্রদত্ত। সেটা সম্ভবত নয়। প্রতিভার কথা বলে এই সঙ্গীতকারকে অন্যান্য বিরাট কিংবদন্তি শিল্পীর মতোই খাটো করা হয়, অবিচারের মুখোমুখি করা হয়। পিকাসো বা আর ডি মোটেই চাইল্ড প্রডিজি নন। তাঁদের ছেলেবেলার কাজ শুধু এটাই বুঝিয়ে দেয় যে তাঁরা ওই বিশেষ কাজটিই ভবিষ্যতে করতে পছন্দ করবেন। মোটেই মুদি দোকান দেবেন না, শিক্ষক বা ডেন্টিস্ট হবেন না।
প্রতিভার ধারণা একজন ব্যক্তিকে ছোট করে দেয়। অনেককটা পিতৃসূত্রে পাওয়া সিংহাসনের মতো ব্যাপার। সেটা যুধিষ্ঠির বা দুর্যোধনের মাথাব্যথা। কর্ণের নয়। আমার প্রিয় চরিত্র কর্ণ। আমার আগ্রহ জন্মসূত্রে পাওয়া প্রতিভা নয়, কর্মসূত্রে অর্জিত সামর্থ্য। আমার এই ব্যক্তিগত বকবকানি আশা করি আপনাদের রাগিয়ে দিচ্ছে না।
আর, শুধু প্রতিভা নিয়ে কথা বললে আশির দশকে আর ডি-র ফুরিয়ে আসাটা আমরা কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? এক মহাপ্রতিভা কি কখনও ফুরিয়ে যান? শেষে আবার দপ করে জ্বলে ওঠেন? তিনি তো এক স্থির বা অস্থির শিখা নন, এক মহাপ্রতিভা এক অনির্বাণ অগ্নিকুন্ড। এবং সেই অগ্নিকুন্ড একটা রূপকথা মাত্র।
মোটেই ক্ষণজন্মা প্রতিভা নয়, শুধু অসম্ভব সচেতন একজন সুরকার ছিলেন এই লোকটি। সারা পৃথিবীতে নিজের উপাদান তিনি খুঁজে নিতে পেরেছিলেন। এর ফলে আর ডি স্বয়ং এক ঘরাণা। নিজেই শুরু, নিজেই শেষ। কোনো উত্তরাধিকারী হবে না, অনুকরণকারী হতে পারে।
কিন্তু তাঁকে একজন আধুনিক সুরকার বলা চলে না। আধুনিকের ধারণার সঙ্গে তাঁর গান যায় না। আর ডি-র সুর তাঁর আবহ অধুনান্তিকের। তাঁর পিতা এস ডি-র সঙ্গে আর ডি-র পার্থক্যটা শুধু প্রজন্মের নয়, একটা দর্শনের।
আর ডি-র সঙ্গে আপনি আবহমান ভারতীয় সঙ্গীতকে অবিমিশ্রভাবে মেলাতে পারবেন না। পাশ্চাত্যের কোনো ঘরানার সঙ্গেও না। উত্তর-উপনিবেশের ছাপ তাঁর সর্বাঙ্গে। এক হাইব্রিড আবহাওয়ায় আমরা প্রবেশ করি যখন তাঁর গান শুনি। সেই আবহাওয়ার সবচেয়ে সার্থক উদাহরণ বলতে পারি ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণা’ সিনেমাটি। দেব আনন্দের চেয়ে ভাল করে আর ডি-কে কেউ হয়তো ব্যবহার করেননি বলে আমার বিশ্বাস। আর তাঁর দশক ছিল একান্তভাবেই সত্তরের দশক। সত্তরের দশকই হল গত শতাব্দীর সেই ঠুনকো কিন্তু ভেঙ্গে বহুদূর ছড়িয়ে পড়া কালখন্ড, যেখানে অধুনান্তিকের প্রকাশ সবচেয়ে বেশি ছিল, কিন্তু কেউ শনাক্ত করেননি।
আর ডি বর্মনকে দর্শন দিয়ে বোঝার চেষ্টা হয়তো এবার আমাদের করা জরুরি। তাঁকে বুঝতে পারলে একটা পরিসরকে আমরা অনেকটাই বুঝে ফেলতে পারব। এখনও আমরা সেই পরিসরে বাঁচছি, এবং শুনছি।
আর ডি বর্মণ একটি প্রথম ও শেষ ঘটনা। আবার বলছি, এ আর রহমান নন। এ আর রহমানকে দর্শন দিয়ে বোঝার সুযোগ নেই। তিনি শুধুই একজন সুরস্রষ্টা।
আর ডি নিছক সুরের লোক নন। তিনি তাঁর পরিসরের প্রতিনিধি।

আপনার মতামত জানান