ভুল বুঝে তুমি চলে গেছো...

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


হিন্দি গানের সঙ্গে পরিচয়টা বোধহয় হিন্দি সিনেমার সূত্রেই ঘটে। টিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখতে দেখতে সেই সিনেমার মাঝে শুরু হওয়া গান, অথবা হিন্দি সিনেমার গান হচ্ছে এমন কোনও অনুষ্ঠান। তারপর হয়ত, গানের প্রতি একটা ভাল লাগা থেকে সেই গান শোনা। কিংবা বলা যায় গান শুনতে ভাল লাগাকে প্রাধান্য দিয়ে গানের অস্তিত্বটাকে পৃথক করে দেওয়া, মনে একটা আলাদা জায়গা দেওয়া। আর সকলের কথা হলফ করে বলতে পারিনা, কিন্তু এই হিন্দি গান, বা হিন্দি সিনেমার গানের সঙ্গে আমার পরিচয় একদম ছোটবেলা টিভিতে দেখা হিন্দি সিনেমার মধ্যে দিয়েই। আর তাও প্রথম সাদাকালো টিভিতে দেখা ‘হিন্দি সিনেমা’ শাম্মী কাপুরের ‘রাজকুমার’ – নকল দাড়ি পড়া রাজকুমার-রূপী শাম্মি কাপুর কখনও ঘোড়ার পিঠে, কখনও গাড়িতে করে ‘জানেওয়ালো জারা হোঁশিয়ার...’ করতে করতে যাচ্ছে। সেই অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গীর জন্য হোক, গান বা অভিনয়ের মধ্যে অদ্ভুত কৌতুকপূর্ণ আচরণের জন্য হোক শাম্মি কাপুরকে দিব্যি লেগেছিল, এবং এর পরে টিভিতে সিনেমা হ’লে তাকেই খুঁজতাম। চার বছরও বয়স হয়নি, নাম জানতাম না... চিনতাম ‘পাগলা’ নামে। যাই হোক, এই শাম্মি কাপুরেরই ‘তীসরি মনজিল’ সিনেমার একটি লাড়েলাপ্পা গান ছিল ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালি জানে জাঁহা...’ যে গানটি চললে চুপ করে বসে থাকা যায় না, অন্ততঃ চার-পাঁচ বছরের ‘আমি’টা থাকতো না চুপচাপ বসে। একদিন, এই গানটিই টিভিতে চলছিল, কিন্তু গানের মাঝে মাঝে একজন চশমা পরা, মাথায় ক্যাপ পরা লোক এসে বেশ হাত-পা নেড়ে অনেক কিছু বলছিল। শাম্মী কাপুরের গানের মাঝে এমন কথাবার্তা ভাল লাগছিল না, সকলে মন দিয়ে শুনছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম ‘লোকটা কে? অমন করছে কেন?’ মা বলল, ‘আর ডি বর্মন’, আমি বললাম ‘সে কে?’ মা বলল ‘ওরেব্বা... বিশাল মিউজিক ডিরেক্টর... এস ডি বর্মনের ছেলে।’ আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু একেবারেই পাত্তা পাইনি। শুধু এটুকু বুঝেছিলাম, এই ব্যক্তি শাম্মি কাপুরের ওই গানের সুর দিয়েছিলো... এবং কিভাবে কি করেছিলো সেই সব বোঝাচ্ছিল।


প্রত্যেকেরই কিংবদন্তীর সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে প্রথম পরিচয় হয়, তা সে সব সময়েই খুব রোম্যাণ্টিক বা নাটকীয় হ’তে হবে এ কারও মাথার দিব্যি নেই। রাহুল দেব বর্মন নামক কিংবদন্তী কে চেনা এই ভাবেই, দূরদর্শনের অনুষ্ঠানে তীসরি মঞ্জিল-এর গানের রেকর্ডিং-এর রোমন্থন শুনতে শুনতে... যা কাকতালীয় ভাবেই, ওনার জীবনের একটা বিশাল ‘টার্নিং-পয়েণ্ট’ বা ‘বিগ ব্রেক’ ও বলা চলে। এই প্রথম সিনেমা দেখা, প্রথম হিন্দি গান, শাম্মি কাপুর... এত কথা মোটেই আমার ছেলেবেলার গপ্পো শোনানোর জন্য নয়। ঠিক সেই ষাটের দশকে ফিরতে হবে, যেখানে মেকিং অফ আ লিজেণ্ড এর শুরু... কিংবদন্তী আর ডি বর্মন! সেই সময় শাম্মি কাপুরের ছবি মানেই মন মাতানো গান আর গানের চিত্রনাট্যতে শাম্মী কাপুরের নাচ। একদম হিন্দি সিনেমার এলভিস প্রিস্‌লি। শাম্মি কাপুরের গান মানেই শংকর-জয়কিষেণ আর মহম্মদ রফি! এগুলো একদম সুপারহিট ফর্মুলা, হিট হবেই ছবি! সেইরকম অবস্থায় হঠাৎ তীসরি মঞ্জিলের সুরকার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলেন রাহুল দেব বর্মন। রাজ কাপুরের মত অভিনেতার তখন বিশাল প্রতাপ। শংকর-জয়কিষেণ, না হ’লে লক্ষীকান্ত পেয়ারেলাল (তখন উঠছেন) জুটি ওনার খুব কাছের। তাদের উপেক্ষা করে রাজ কাপুরের ভাইয়ের ছবিতে বিজয় আনন্দ - নাসির হুসেন সুযোগ দিলেন শচীন দেব বর্মনের ছেলেকে (হয়ত শচীন কত্তা আনন্দ ভাইদের ঘনিষ্ট ছিলেন বলেই)। তিসরী মঞ্জিলের আগে কিংবদন্তী সুরকার এবং গায়ক শচীন দেব বর্মনের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন, কিছু ছায়াছবিতে নিজে সুরকার হিসেবে কাজ করেছিলেন... কিন্তু নাসির হুসেন ব্যানারের এই সিনেমা ছিল ‘রিয়েল বিগ ডিল’! অনেকেই মানসিক ভাবে মেনে নিতে পারেনি শংকর-জয়কিষেণ ছাড়া অন্য কারও সুরে শাম্মি কাপুরের সিনেমার গান হবে। শোনা যায়, শাম্মি কাপুর নিজেই প্রথমে অফার একদম বাতিল করে দিয়েছিলেন, সুরকার নতুন কেউ শুনে। এবং বলেছেন, আগের গান ঠিক হোক, তারপর এসো। এরকম একাধিক প্রতিকূলতার কথা তৎকালীন অনেকেই একাধিক বার বলেছেন। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জটাই আর ডি বর্মন গ্রহণ করলেন। তারপর তো ইতিহাস। শংকর-জয়কিষেণ ছাড়াই বিজয় আনন্দের তীসরি মনজিল শাম্মী কাপুরের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘মিউজিকাল - ব্লকবাস্টার’। সেই সময়ের একদম প্রতিষ্ঠিত কম্বিনেশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই বড় মাঠে আত্মপ্রকাশ করলেন এক কিংবদন্তী... একেবারে স্রোতের বিপরীতমুখে। তীসরি মন্‌জিলের গানের প্রতিটি কম্পোজিশন মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায়... কোথায় যেন একটা প্রতিষ্ঠিত শংকর-জয়কিষেণ ঘড়ানার ছোঁয়া যেটা শাম্মী কাপুরের ইমেজকে গ্লোরিফাই করে, তবু কোথাও আবার একটা নতুনত্ব যা শংকর-জয়কিষেণের থেকে একেবারে আলাদা। যেন একটা প্রত্যক্ষ ভুরু নাচানো – ‘ওই খেলাটা আমিও জানি, এবং চাইলে আরও ভালো করে করে খেলতে পারি!’ এখন সেই সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়লে বুঝতে পারি, কেন সেদিন অত উত্তেজিত ভাবে সকলকে বোঝাচ্ছিলেন তীসরি মন্‌জিলের অভিজ্ঞতার কথা। কত বড় প্রাপ্তি ছিলো ওই ব্রেক-থ্রু ওনার জীবনে। সেই বিজয় আনন্দ-নাসির হুসেনের হাত ধরেই সে বছর হিন্দী সিনেমা পেয়েছিল ভবিষ্যতের এক কিংবদন্তী সংগীতকার, এবং গায়ক... রাহুল দেব বর্মন, ওরফে আর ডি বর্মন, ওরফে পঞ্চমদা কে।


প্রথমে শচীন দেব বর্মন এবং পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র রাহুল দেব বর্মন যে সংগীত জগতে ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন, এতো কারও অজানা নয়। দশকের পর দশকে তাদের সৃষ্টি করা কালজয়ী গানে ধরা আছে। কখনও নিজের গলায়, কখনও প্রবাদ প্রতিম রফি সাহেব, কিশোর কুমার, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে... কে নেই! এই নিয়ে আলোচনা বিস্তর হয়েছে, শুধু গানের পর গানে, সিনেমার পর সিনেমা, আর গল্পের পর গল্প চলে আসবে সব শিল্পীদের অভিজ্ঞতার, এক বর্ণময় বিচিত্র গাথা সার্থক সাধনার। সুতরাং, রাহুল দেব বর্মনের মিউজিকাল কেরিয়ার আর তাঁর ব্যাতিক্রমী প্রতিভা নিয়ে নতুন করে আর কি বা বলার থাকে। শুধু বলতে পারি, ওনার সৃষ্ট সুর বা গানের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে, যখনই হিন্দি সিনেমা শুরু হ’ত, নাম দেখানোর সময় লক্ষ্য করতাম সুরকার কে... ‘Music - R D Burman’ লেখা থাকলে, সেই সিনেমা দেখতেই হবে... শুধু গানগুলো শোনার জন্য! যাই সৃষ্টি করেছেন তাই অমর, যাই ছুঁয়েছেন তাই সোনা। যেমন গানের সুর, সেরকমই তাঁর ইন্টারলিউড বা প্রিলিউড নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সেইরকমই চরম মুনশিয়ানার ছাপ টাইট্‌ল ট্র্যাক অথবা আবাহসংগীতে। সারা দেশ আচ্ছন্ন হয়ে থেকেছে ওনার ‘এক সে বাড়কার এক’ সৃষ্টিতে, ওনার বিশ্বমানের প্রতিভার জাদুতে। আর এক বাঙালি কিংবদন্তী সলিল চৌধুরী ছাড়া ওনার মত এক্সটেন্সিভ পরীক্ষামূলক কাজ সেই সময় দাঁড়িয়ে আর কেউ করেছিল বলে তো মনে হয় না। ওনার সহকর্মীদের সাক্ষাৎকারগুলিতে সেই সব কম্পোজিশন তৈরীর ঘটনা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। চিরুনির দাঁড় দিয়ে সুর তৈরী করা হয়েছে (পড়োসন), গিটারের অব্যবহৃত অংশে চামচ দিয়ে টান মেরে সুর সৃষ্টি করা হয়ছে (শালিমারের টাইট্‌ল ট্র্যাক), সোডার বোতলে ফুঁ দিয়ে সুর তোলা (শোলে), এমন কি গলায় জল নিয়ে গার্গল করে চলচ্চিত্রের রোমাঞ্চকর দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক সৃষ্টি করা হয়েছে (সত্তে পে সত্তা)... আরও যে কত কিছু তা বলে শেষ করা যায় না! এমন কি এও শোনা যায়, একবার রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মীদের ধর্মঘট চলাকালীন একটি ছবির গান রেকর্ড করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তখন কিছু বিশ্বস্ত সংগীত শিল্পীদের নিয়ে নিজের মত আয়োজন করেই কাজ করেছিলেন স্বল্প ব্যবস্থায়। খুব অল্প বাদ্যযন্ত্র, এবং তাই দিয়েই নানা ভাবে সুর সৃষ্টি করে। গানটি শুনলে অবাক হবেন – ‘হাম দোনো দো প্রেমী, দুনিয়া ছোড় চলে...” (গানের মধ্যে ট্রেন চলার এফেক্টও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে সৃষ্টি!)


অর্কেস্ট্রেশন খুব নিখুঁত ভাবে পরিচালনা করার দক্ষতা বড় সংগীতকারদের থাকে... শচীন দেব বর্মনের ছিল, শংকর-জয়কিষেণের ছিল, আর সলিল চৌধুরী তো ঈশ্বর! কিন্তু বার বার একটা নতুন কিছু তুলে ধরার এই প্রয়াস। পাশ্চাত্য আর প্রাচ্য দু’ধরণের সংগীত চর্চার খুঁটিনাটি বিষয়ে ওয়াকিবহাল থেকে, তাদের নিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করা (ফিউশন নয়), যার মধ্যে সম্পূর্ণ অরিজিনালিটি থাকবে, যা শ্রোতারা পায়েনি আগে কখনও... এমন সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কর সাধুবাদ না করে কি থাকা যায়? একদিকে যেমন ‘মেরে নেয়না সাওয়ান ভাদো’ কিংবা ‘চিঙ্গারী কই ভড়কে’... আর একদিকে তেমন ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’, ‘তুম কেয়া জানো, মোহব্বৎ ক্যায়া হ্যায়’। বাংলার লোকগীতি থেকে ক্যারিবিয়ান ক্যালিপ্‌সো... কি বিস্তৃত বিচরণ ক্ষেত্র! কোনও ডিজিটাল মিক্সিং নয়, অত্যাধুনিক সফ্‌টওয়ার বা কম্পিউটারের সাহায্যে ওভারল্যাপ, টিউনিং, ফিল্টারিং-এর তো প্রশ্নই ওঠে না... কেবল অসাধারণ মিউজিকাল অ্যারেঞ্জমেণ্ট এবং একের পর এক অভিনবত্ব এনে বার বার চমকে দিয়েছেন শ্রোতাদের, যা বার বার শুনে আজও আমরা মুগ্ধ হই। আক্ষরিক অর্থেই যাকে বলে সময়ের থেকে আলোকবর্ষ দূরে এগিয়ে কিছু ভাবার ক্ষমতা এবং তাকে প্রয়োগ করার ক্ষমতা। প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হ’লে, তার থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করে নেওয়া, যা সুযোগ থাকলেও অত সহজে করা সম্ভব নয়। বিস্ময়-সুরকার আর ডি বর্মনের জাদুর ছোঁয়া... সেই সব গানেরই রিমেক, রিমিক্স, ডিজে নাইট, পার্টি-মিক্স হয়ে চলেছে এখনও। আধুনিক সিনেমার অনেক সুরকারের কম্পোজিশনে মাঝে মধ্যেই ওনার সিগনেচার বিট্‌স, অথবা থ্রোট সিঙ্গিং কিংবা ইটারলিউডগুলোর স্পষ্ট উপস্থিতি দেখতে পাই। নিজের অনুপস্থিতিতে একটা এমন লিগাসি রেখে গেছেন, যেখানে তাঁর প্রতিবিম্ব বার বার ফুটে উঠবে। ঠিক যেমন মহানায়ক উত্তম কুমার একাধিক বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে ‘গুরু’ হয়ে আছেন, সেই ভাবে সংগীত অনুরাগীদের কাছে ‘গুরু’ হয়ে আছেন এই সদা হাস্যময় প্রাণবন্ত মানুষটি। ওনার লাইভ শো দেখার জন্য মানুষের ভিড় উপচে পড়ত শুনেছি, এখনও সেই সব রেকর্ডিং-এর ভিডিও দেখলে আন্দাজ করা যায় কিশোর কুমারের মতই এই মানুষটির কণ্ঠে একটা গান শোনার জন্য কি ধরণের উন্মাদনা ছিল শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে। হৃদরোগজনিত অসুস্থতার কারণে অবশ্য একসময় মঞ্চে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছিল, গানের মাঝে রোরিং, গ্রাউলিং, হেভি থ্রোট সিঙ্গিং শরীরের পক্ষে ক্ষতি কারক হয়ে উঠছে, তা নিজেও বুঝেছিলেন। তবু তাঁর মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ বাংলা সিনেমার গানে শোনা যেতো – “সজনী গো প্রেমের কথা, প্রেমের ব্যথা... বোঝে বল কয়ে জনা?”


অথচ এমন একজন প্রতিভাবান শিল্পীর স্বীকৃতির জায়গাটা তাকিয়ে দেখলে, প্রায় কিছুই নেই। ভারতবর্ষর সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র এবং সংগীত জগৎ একেবারেই এই অসামান্য প্রতিভাকে তাঁর যোগ্য সম্মানটুকু দেন নি। সেই ঘটনার বিষদে গেলে, দেখা যাবে অবস্থাটা কতটা করুণ ছিল। কতটা বঞ্চনার মধ্যেই একের পর এক অসাধারণ সৃষ্টি করে গেছেন, শুধু ভাল কিছু করার আনন্দে। এখন বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞেস করলে সকলে এক সাথে মাথা নেড়ে বক্তৃতা দেন – ‘সত্তরের দশকে তো আর ডি-কিশোর রাজ করেছিল পুরো!’ কিন্তু ভালো করে সত্তরের দশকটা তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একের পর এক সিনেমায় অসাধারণ সুর দিলেও ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড একটিও জোটেনি রাহুল দেব বর্মনের। বার বার মনোনীত হয়েছেন, কিন্তু পুরস্কার তুলে নিয়ে গেছে অন্য কেউ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ্মীকান্ত - পেয়ারেলাল। পরিসংখ্যান দেখলে আশ্চর্য (এবং বিরক্ত) না হয়ে থাকা যায় না - অমর প্রেম, নমক হারাম, আঁধি, হিন্দি সিনেমার মাইলস্টোন এইসব ছবির গানগুলিতে দেওয়া অনবদ্য সুরও ওনাকে একটা ফিল্মফেয়ার (যা কিনা হিন্দি সিনেমার জগতে সবথেকে আলোচিত পুরস্কার) দিতে পারেনি। একি শুধুই অন্য কেউ ওনার থেকেও ভাল কাজ করছিল বলে? কি জানি, আমার এটা মেনে নিতে কষ্টই হয়। এবং অনেক বিশেষজ্ঞই এতে বলিউডি লবি’র গন্ধ পান আজও। তবে বঞ্চনার এখানেই শেষ নয়। ফিল্মফেয়ার প্রসঙ্গে বলা যায় – ১৯৮৩ এবং ১৯৮৪ সালে পর পর দু’বছর শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে পুরস্কৃত হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। বরং নজরে পড়ে, এরপর পুরো আশির দশক জুড়ে ওনাকে আর বড় ব্যানারে ভাল ছবিতে কাজ করতেই সে ভাবে আর দেখা যায় নি। অথচ সাধারণ মানের সুর দিয়েও কারও ইশারায় অন্য কেউ খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করছেন। মাঝারি মাপের অথবা অতি সাধারণ মানের ছবিগুলিও আজ মনে রাখা হয়েছে শুধু ওনার সুর দেওয়া গানগুলির জন্যই। ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে। স্পষ্ট নাম করেই বলা যায়, মনমোহন দেসাইয়ের মত পরিচালকদের লবি বেশ কিছু ক্ষেত্রে সচেষ্ট ছিলেন এই প্রয়াসে। যেন বেছে বেছে ওনাকে সরিয়ে রাখারই একটা অভিসন্ধি চলত, আর সর্বত্র লক্ষ্মীকান্ত - পেয়ারেলালের জয়জয়কার (অতি সাধারণ মানের গানের জন্যেও)। পরিচালক সুভাষ ঘাই ‘রাম লখন’ ছবি’র জন্য ওনার কাছে গিয়েও লক্ষ্মীকান্ত - পেয়ারেলাল কে সাইন করান সংগীত - পরিচালক হিসেবে। এ ছিলো আর ডি বর্মনের জীবনে এক চরম অপমান এবং হতাশার অধ্যায়। অবস্থা ক্রমে এতটাই খারাপ হতে থাকে, যে বোম্বের মায়া কাটিয়ে তাকে বেশি করে কাজ করতে দেখা যায় বাংলা সিনেমাতে। বাংলা সিনেমার গানের মান এমনিতেই তখন নিম্নগামী। তার মধ্যে কিশোর কুমারের আকস্মিক জীবনাবসান আরও বড় ধাক্কা ছিল। রাহুল দেব বর্মনের মত প্রতিভাবান মানুষকে যে ঠিক কতটা কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছিল, তা অনুভব করি যখন দেখি পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর ‘নবাব’ সিনেমার গানগুলির সুরকার রাহুল দেব বর্মন (গানগুলি এবং সিনেমাটি যাদের মনে আছে, তারা নিশ্চয়ই বুঝবেন)। ফিরে আসার একটা শেষ সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁকে সেই সুযোগ দিয়েছিলেন পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া। ‘১৯৪২ আ লাভ স্টোরি’ ছবিটির সংগীত পরিচালকের দায়িত্বে জোরালো প্রত্যাবর্তন করতে চলেছিলেন ‘আর ডি দ্য লিভিং লিজেণ্ড’। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক ভাবে ভেতর ভেতর খান খান হয়ে যাওয়া মানুষটা তার আগেই সুরলোকে চলে গেলেন। ‘১৯৪২ আ লাভ স্টোরি’ সিনেমা হিসেবে তেমন সারা না ফেললেও তার গানগুলো হয়ে গেল সুপারহিট... বছরের সব থেকে বেশি বিকৃত গানের ক্যাসেট (হয়ত প্রয়াত আর ডি’র নাম ভাঙিয়েই) এবং এই সিনেমার সংগীতই ওনাকে এনে দিলো জীবনের শেষ ফিল্মফেয়ার... মরণোত্তর। আর সব থেকে নিদারুণ পরিহাস হয়ত এই, ওনার মৃত্যুর পরেই ফিল্ম ফেয়ার শুরু করল ওনার নামে নতুন পুরস্কার – আর ডি বর্মন অ্যাওয়ার্ড, বছরের সব থেকে প্রতিভাবান সংগীত পরিচালককে স্বীকৃত করার জন্য। ১৯৯৪ সালে তা প্রথম বারের জন্য পেলেন এ আর রহমান।


ভারতবর্ষে বঞ্চিত প্রতিভার তালিকা খুব একটা ছোট নয়, আর বাঙালিদের মধ্যে তো সে তালিকা আরোই দীর্ঘ। ইতিহাসের পাতা উলটে পেছন ফিরে চাইলে হৃদয় ভারাক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু প্রাপ্তি নেই। সেই তালিকাতেই আরও একটি নাম কিংবদন্তী সংগীতকার রাহুল দেব বর্মন। ওনাকে নিয়ে চর্চা অনেকই হয়েছে, হবেও। ওনার সৃষ্টি করা সংগীতকে পুঁজি করেই অনেক গায়ক-গায়িকা সুনাম অর্জন করেছেন এবং করবেন। ওনার দেখনো পথ অনুসরণ করেই প্রতিষ্ঠালাভ করবেন অনেক সংগীত-পরিচালক। কিন্তু, ওই নির্লিপ্ত উজ্জ্বল হাসির আড়লেই চাপা দীর্ঘশ্বাসটা যেন ওনার হাই পিচ্‌ সুরের কোনও গানের সুরে চাপা পড়ে যায়। কিংবদন্তীদের জন্মদিন তো উৎসবেরই মত। তাঁদের কাজ, তাঁদের জীবন এবং জীবন-দর্শন কে স্মরণ করে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য। তাই আজকের এই পরিণতি-প্রবন, স্বীকৃতি-প্রবন সৃষ্টিশীলতার ভিড়ে এই আর ডি’র মত জাদুকর এবং তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নীরব লড়াইয়ের কথা বেশি করে মনে পড়ে। উনি দেখেছেন কি ভাবে জোরালো লবি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, কি ভাবে ওনাকে কথা দিয়েও কথা রাখেননি অনেক চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিচালক। তবুও একের পর এক... কি হিন্দি, কি বাংলা... সুর অথবা আবাহসংগীতে তাঁর অবদান স্তব্ধ হয়নি। দু-তিন দশক পরে, এখন সেসব গান বা সুর শুনলে বোঝা সম্ভবই নয় - কি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং দিনের পর দিন মানসিক চাপ নিজের মনের মধ্যে সমাহিত রেখে একাগ্র ভাবে ভাল কাজ করে গেছেন। ওনার সঙ্গে কাজ করে সমস্ত প্রবাদ-প্রতিম শিল্পীরা এখনও নিজেদের ধন্য মনে করেন। ‘পঞ্চমদা’-র সঙ্গে রেকর্ডিং-এর অভিজ্ঞতা মনে করার সঙ্গে সঙ্গে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে তাঁদের মুখে। ওনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করা সংগীতশিল্পীরা এখনও একসাথে ওনার সৃষ্ট কম্পোসিশনগুলো নিয়ে কনসার্ট করেন। ওনার সহকারী এবং সহশিল্পীবৃন্দ এখনও পঞ্চমদার স্মৃতি এবং সুরকে বুকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন। সেই স্মৃতির মধ্যেই যেন তাদের অস্তিত্ব, বাকি দিনগুলি বেঁচে থাকার আনন্দ। কিছু বছর আগেও, এক বেসরকারী খবরের চ্যানেলের কাছে রাহুল দেব বর্মনের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে ওনার প্রধান সহকারী মনোহরি দাদার (মনোহরি সিং) কিংবা গিটারবাদক ভানু গুপ্তর চোখে জল এসে যায়। আসলে সব স্বীকৃতি, প্রাপ্তি, হিসেব-নিকেশের উর্দ্ধেই কেউ কেউ থেকে যান, সবার মনের কাছে, সবার প্রাণের মানুষ হয়ে... যাকে আমরা অতি সাধারণ প্রাণরা কোনওদিনও ঠিক চিনতে পারব না। শুধু সেই নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য দেখব আর সেই আলোয়ে মনেরও কিছুটা আলোকিত হয়ে উঠবে বার বার। এইভাবে বোধহয় ক্ষণজন্মা প্রতিভারা সকলের মাঝে থেকে যেতে পারেন। শরীর বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও, সেই শারীরিক অনুপস্থিতি কে ভুলিয়ে দেয় তাদের অবিনশ্বর সৃষ্টি। তার মধ্যেই নিশ্চিত থেকে যায় স্রষ্টার অস্তিত্ব, একেই হয়ত বলে আত্মা, যার বিনাশ নেই। রাহুল দেব বর্মনের সুরের জাদু সেইভাবেই থেকে গেছে সকলের মাঝে। নিঃসন্দেহে তাঁর সৃষ্ট সংগীতের মধ্যেই তাঁর আত্মা বিরাজ করছে। তাঁর সুর দেওয়া গানের মূর্ছনাই মনের মাঝে বলে –


তেরে বিনা জিন্দেগী কি সে কোই
শিকোয়া, তো নেহি...


আর কোথাও যেন সেই সুরের মাঝেই উত্তর শুনতে পাই –

রাস্তা রোক রহি হ্যায়
থোড়ি জান হ্যায় বাকি
জানে টুটে দিল মেঁ
ক্যায়া আরমান হ্যায় বাকি
জানে ভি দে অ্যায় দিল...

আপনার মতামত জানান