‘1942:আ লাভ স্টোরি’- ফিরে আসার রূপকথা

কেয়া মুখোপাধ্যায়

আজ জন্মদিন।জন্মদিনে কি শেষ থেকে শুরু করা উচিত? কেনই বা নয়! শুরু থেকে শেষ বলেই না আবার শেষ থেকে শুরু হয়! তারপর যদি সেই শেষটা হয় ‘1942:আ লাভ স্টোরি?’তাহলে তো সেটা আসলে এক শুরুই!
প্রায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার অবস্থা থেকে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু! নিজেকে আবার নতুন করে প্রমাণ করার শুরু। সেরার শিরোপা আবার জিতে নেবার শুরু। আসমুদ্রহিমাচল-কে সুরে সুরে মাতিয়ে দেবার, দুলিয়ে দেবার শুরু।শুধু দুঃখ একটাই, সবচেয়ে অমোঘ সত্যি মৃত্যু এসে তার আগেই দাঁড়ি টেনে দিয়েছে জীবনে।তাই অসামান্য প্রত্যাবর্তনের রূপকথাটা অজানা, অদেখাই থেকে গেল তাঁর কাছে।
সঙ্গীতের পঞ্চম সুর পা। বাবার নাম শচীন আর মার নাম মীরা হলেই যে ছেলে গান নিয়ে বিপ্লব করবেন, এমন না-ই হতে পারে। কিন্তু ওই দুটি নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা যখন পদবীটি যদি হয় দেববর্মণ, তাহলে সেখানে পঞ্চম সুর এসে মিলে সঙ্গীতের এক আশ্চর্য ত্রিভুজ তৈরি করবেনই। সেটা অনিবার্য। সেটাই ঘরানা। এই অসামান্য সাঙ্গীতিক প্রতিভা বোধহয় জিনে ইম্প্রিন্টেড! তবু এই আশ্চর্য জিনিয়াসের গানের জীবন কিন্তু রূপকথার মত ছিল না আগাগোড়া! অন্তত শেষ দিকটা!
আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে তখন ডিসকো মিউজিকের রমরমা। এক সময় সুরে সুরে চমকে দেওয়া রাহুলদেব তখন সঙ্গীত জগতে প্রায় ব্রাত্য। তবু এই সব না পাওয়ার মাঝেই সুর দিলেন ‘ইজাজত’-এ। অসামান্য সেই সব সুর, আর ডির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ নিঃসন্দেহে। এই ছবির জন্যে সেরা গায়িকার পুরস্কার পেলেন আশা ভোঁসলে, সেরা সঙ্গীতকার গুলজার। আর.ডি-র ঝুলি শূন্য। আর প্যারালাল সিনেমার কাজ বলেই কমার্শিয়াল ছবিতে তার পড়তি বাজারকে সামলাতে পারল না ইজাজত।
১৯৬৬-র ‘তিসরি মঞ্জিল’ থেকে প্রতিটি প্রোডাকশনে আর.ডি-কে যিনি চেয়েছিলেন, ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ করার সময় সেই নাসির হুসেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আর.ডি-র কথা আর মনে পড়ল না তাঁর। সুভাষ ঘাই ‘রাম লখন’ ছবির সঙ্গীতের দায়িত্ব আর.ডি-কে দেবেন বলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখলেননা, ছবিটির সুরের ভার দিলেন লক্ষ্মীকান্ত - প্যারেলালদের। আর.ডি তখন নিঃসঙ্গ সম্রাট। অসুস্থও। তার মধ্যেই বিধু বিনোদ চোপড়ার 1942:আলাভ স্টোরি’ তে সুর করার প্রস্তাব এলো।
স্টুডিওতে ‘কুছ না কহো’ শোনাবেন আর.ডি। খুব ফাস্ট সুর। কুছ না কহো/ কুছ ভি না/ কহো/ সঙ্গে খুব দ্রুতে তবলাঃ ধগ ধগ তাক্/ ধগ ধগ তাক্। এভাবেই পুরো গান শেষ। বিধু বিনোদ চুপ।
আর.ডি. জিজ্ঞেস করলেন- আরে কুছ বোল!
বিধু বললেন, লেট মি ফাইন্ড মাই ওয়ার্ডস।
-আরে তেরা ফার্স্ট রিঅ্যাকশন তো বোল!
-অ্যাকচুয়েলি দাদা, একদম বুলশিট! রাবিশ!ক্র্যাপ! ইটস এন্ড অফ মিউজিক!
একে একে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন মিউ জিশিয়ানরা। চরম হতাশ বিধু বিনোদও বেরোবার জন্যে দরজার কাছে। সিল্কের লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরা আর.ডি. এগিয়ে এলেন দরজার কাছে- অ্যাম আই স্টিল ডুয়িং ইট?
-আই বিলিভ ইন ইউ। ইউ আর দ্য বেস্ট দাদা। ইউ আর ডুয়িং ইট উইথ দ্য বেস্ট অফ ইয়োর মিউজিক।
নিঃসঙ্গ সেই সময়ে ওই আস্থা আর বিশ্বাসটাই বোধহয় ম্যাজিকের কাজ করেছিল।
পরের সপ্তাহে আবারও সেই স্টুডিও। সেই মিউজিশিয়ানরা। হারমোনিয়াম বাজিয়ে সুর ধরলেন আর. ডি, বাংলায়।
‘রঙ্গিলা, রঙ্গিলা, রঙ্গিলা রে...’ আশ্চর্য এক নরম সুর।
ওটাই ফার্স্ট নোট। মুগ্ধ বিধু বিনোদ। আর.ডি. বললেন, এখনও তো গানটাই শুরু হয় নি!
সৃষ্টি হল ‘কুছ না কহো।‘ বাকিটা ইতিহাস।
‘1942: আ লাভ স্টোরি’ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন রাহুলদেব। একটার পর একটা গানে সুর করে নিজেও বুঝছিলেন এই ছবির সুরের হাত ধরে আবার রূপকথার দেশে যাবে মানুষ। ১৯৯৪ এর ১৫-ই এপ্রিল মুক্তি পেল ‘1942: আ লাভ স্টোরি’। কিন্তু স্বপ্ন দেখার মানুষটি আর নেই তখন। ১৯৯৪ এর ৩রা জানুয়ারি তাঁর স্বপ্ন দেখার অবসান হয়েছে। কিন্তু তাতে কি? এই ছবি মুক্তি পেতে তাঁর স্বপ্নটাই যে অনায়াসে সারা দেশবাসীর স্বপ্ন হয়ে উঠলো! পাশ্চাত্য রক, জ্যাজ, লাতিনো, ট্যুইস্ট-এর বিস্ময়ে মাতোয়ারা করা মানুষটির কাছ থেকে হৃদয় উদ্বেল করা সুরে ‘সময়কা ইয়ে পল, থমসা গয়া হ্যায়’ শুনে বিহ্বল সকলে! ‘দিল নে কহা চুপকে সে’-কি কোমল অথচ অমোঘ! কি নাট্যময়তা বোনা গানের নরম সুরে সুরে! এমন আশ্চর্য নীরবতা দিয়ে, ফিস-ফিস করেও প্রেমের কথা বলা যায় তাহলে! আর এক চমক ‘এক লড়কি কো দেখা’ গানে। যেমন সুর তেমনি তার পিকচারাইজেশন! কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলি! ‘রিমঝিম রিমঝিম’ তো বৃষ্টি হয়ে ঘরের ছাদ থেকে আমাদের অন্তরে ঝরে পড়ে আশ্চর্য মায়াময় সুর নিয়ে! তেমনি মুগ্ধ করে ‘রুঠ না যানা’। একটার পর একটা গানের বনাবট দেখে, সুরের মায়াময় বিস্তার দেখে মানুষ বিমুগ্ধ!শুনেছি ‘ইয়ে সফর হ্যায় কঠিন’ গানটি নাকি সুমনকে দিয়ে গাওয়াবার কথা ভেবেছিলেন রাহুলদেব। শেষ পর্যন্ত হয়নি। হলে কী হত জানি না! শিবাজী চট্টোপাধ্যায় গেয়েছিলেন, এই গানের সুরও হৃদয় কে মথিত করে। তবে শুধু সুরই নয়, সুরের পেশকারিও সত্যি অভিনব; কারণ এই গানগুলি অনেক সময়ই সংলাপধর্মী। নিঃসন্দেহে রাহুলদেবের সঙ্গীত জীবনের এক অসামান্যবাঁক 1942: আলাভ স্টোরি’, সুরারোপের ক্ষেত্রে।বিশেষজ্ঞরা কেউ ভেবে তল পান না কি করে এমন মায়াময় সুরারোপ সম্ভব হল। আবার কেউ বলেন এই সুর দিয়েই রাহুলদেবের বর্মনের সুরের ধারার একটা বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হল! রাহুলদেবের তিন নম্বর ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার, সেই সঙ্গে প্লে-ব্যাক শিল্পীরাও সেরা। ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীতের ইতিহাসে 1942: আলাভ স্টোরি’ আসলে এক ভালোবাসা আর সুরের অভিনব রূপকথা। শুধু রূপকথার নায়কটি চলে গেলেন অকা্লে। আর দেখিয়ে দিয়ে গেলেন জিনিয়াসরা ফুরিয়ে যান না, অনেক অবহেলার পরও তাঁরা ফিরে আসেন আরও একটা মাস্টারপিস নিয়ে, ফিনিক্সের মত।
গান-কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ‘গান তুমি কার’, কী বলবে সে? যাঁর কন্ঠ, না যাঁর সু্‌র নাকি ছবিতে যিনি লিপ দিলেন তাঁর? না কি এই তিনজনেরই? কিন্তু একই সঙ্গে সেই গানটি কি আমার ও নয় কিংবা আপনারও? সদ্য প্রেমে পড়া যে কিশোর গেয়ে উঠল ‘মনে পড়ে রুবি রায়’- সে তো তারই গান! কিংবা এই মাত্র একা একা রাস্তা পেরোতে গিয়ে যে যুবকটি গাইছিলেন ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’- নদীর জল কি নৌকোর দুলে ওঠা দেখতে না পেলেও, সেই মুহূর্তে ওই গানটি কি ভীষণভাবে তাঁরই নয়? কোনও বৃষ্টির সন্ধ্যেয় হাইওয়েতে ড্রাইভ করার সময় যখন আমি গুন গুন করি ‘রিমঝিম রিমঝিম’- তখন সে তো একান্তই আমার গান। আর এই তোমার, আমা্র সবার গানের আড়ালে, অলক্ষ্যে অনিবার্য সুরেলা উপস্থিতিতে পঞ্চম, একমেবাদ্বিতীয়ম্!


আপনার মতামত জানান