প্রসঙ্গ উপেন্দ্রকিশোর

লীলা মজুমদার
লেখাপড়া জোর করে প্রায় সবাইকেই শেখানো যায় বটে, কিন্তু লিখতে পারা, ভালো লেখা চিনতে পারা অন্যকে চেনাতে পারা সে হল আলাদা জিনিস। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন শিল্পী যে সেও অন্য সবাকার মতো যখন পৃথিবীতে আসে একেবারে খালি হাতেই আসে, সঙ্গের সাথি করে নিয়ে আসে শুধু একটুখানি পিপাসা। সে পিপাসাটাই হল সব, সাধারণ জল দিয়ে তাকে মেটানো যায় না, তার জন্য অন্যরকমের রস চাই, সুর, শব্দ, রূপ এসব নইলে তার চলে না। যারা এই পিপাসাটুকু নিয়ে জন্মায় শুধু তারাই হল শিল্পী, তারাই হয় সাহিত্যিক। আর যদি এই পিপাসাটি না থাকে তো হাজারখানা ছবি আঁকলেও সে শিল্পী হয় না, পাঁচশো বই লিখলেও সাহিত্যিক হয় না।
কেমন করে জানি মসূয়ার রায় পরিবারের ছেলে-মেয়েরা অনেকেই ওই পিপাসার একটুখানি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে যায়। তার জন্যে কোনো উপকরণও লাগে না, আপনা থেকেই কেমন এসে যায়। উপেন্দ্রকিশোরের ঠাকুরদাদা লোকনাথের ভাই ছিলেন ভোলানাথ, তিনি কথায় কথায় ছড়া কাটতেন, বাঙ্গালদেশের ভাষায় বলা এমনকিছু উঁচুদরের কবিতা নয়, তবে রসে ভরপুর। তাঁর বউদিদি কৃষ্ণমণি রান্না করছেন, উনুনের ধোঁয়া লেগে চোখ দিয়ে জল পড়ছে। তাই দেখে ভোলানাথ বললেন,
‘এক বউয়ের নাম সুদক্ষিণা, ভাত খাইন না, খাইন চীনা।
গির্ত্তাইনের নাম কৃষ্ণমণি, রানতে পড়ে চোখের পাণি !
পাগ্‌ বাইয়াতে ফুঁপানি !’
বউরা খেতে বসেছে, বাইরে থেকে কান পেতে আর শব্দ শুনে ভোলানাথ বলছেন,
‘ঘরে খাইন, বাইরে খপর,
চেপাপোড়া পানিভাত, চাপর চপর!’
একবার ভোলানাথ খাজনা করতে গেছেন কিন্তু নায়েব মশাই গায়ে তেল মাখছেন তো তেলই মাখছেন। ভোলানাথ বললেন,
‘আমি আইলাম খাজনা করতাম, নায়েব লাগাইল তেল,
আশা উমেদ যত আছিল, মার্গের তলে গেল্‌!’
শুনেই নায়েব চমকে উঠে তাড়াতাড়ি করে কাজ সেরে দিলেন।

এঁদের বংশধররা যে খেলা করতেও কবিতা করবে এ আর আশ্চর্য কী? সবাই মিলে গোল হয়ে বসে একটা জানা গল্প নিয়ে এ এক লাইন ও এক লাইন করে ছড়া গেঁথে গল্পটি শেষ করতে ভারী মজা। একদিন হল কথামালার বাঘ ও বকের গল্প। ছড়াটা এইরকমভাবে শুরু হয়েছিল -
‘একদা এক বাঘের গলায় ফুটেছিল অস্থি,
যন্ত্রনায় কিছুতেই নাহি তার স্বস্তি,
তিনদিন তিনরাত নাহি তার নিদ্রা,
সেঁক দেয়, তেল মাখে, লাগায় হরিদ্রা ...
উপেন্দ্রকিশোরও এ রস থেকে বঞ্চিত ছিলেন না, বাইরে থেকে তাকে যতই না গম্ভীর মনে হোক। বিদেশে কোথাও কাজে কি বেড়াতে গেলে মজার মজার ছবি এঁকে, পদ্যে কত চিঠি লিখতেন। একবার বিধুমুখীর ভাই সতীশ্চন্দ্রকে ময়মনসিংহ থেকে লিখেছিলেন ময়মনসিংহী
ভাষায় -
সৈত্যাদ্দা, হা হা হা,
কথাডা শুইন্যা যা,
কৈলকাত্তা বৈস্যা খা
দৈ ছানা ঘি পাঁঠা।
ময়মনসিংহ ঘোড়াড্ডিম।
দেখবার নাই, কিচ্ছু তাই,
সার্ভেণ্ট ইজ্‌ ইষ্টুপিড
রাইন্ধ্যা থোয় যাইচ্ছা তাই।’
- সতীশচন্দ্র ময়মনসিংহের উপর হাড়ে-চটা ছিলেন, সুতরাং রসটা জমেছিল ভালো! আরেকবার কোথায় নেমন্তন্ন খেয়ে ছেলে-মেয়েদের লিখেছিলেন,
মাগো আমার সুখলতা,
টুনি, মণি, খুসি তাতা,
কাল আমি খেয়েছি শোনো
কি ভয়ানক নেমতন্ন।
…. …. .… .… ….
জলে থাকে একটা জন্তু
দেখতে ভয়ানক, কিন্তু
মাছ নয় কুমীর নয়,
করাত আছে, ছুতার নয়,
লম্বা লম্বা দাড়ি রাখে,
লাঠির আগায় চোখ থাকে,
তার যে কতকগুলো পা
ঢের লোক তা জানেই না।
দুটো পাযে ছিল তার
বাপরে সে কি বলব আর!
চিমটি কাটত তা দিয়ে যদি
ছিঁড়ে নিত নাক অবধি।’

তার পাশে অবিশ্যি জন্তুটার ছবিও আঁকা ছিলো, কাজেই বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। এসব তো গেল হাসিঠাট্টার কথা, উপেন্দ্রকিশোরের ভারি ধার্মিক ও গম্ভীর একটা দিকও ছিলো, গম্ভীর কিন্তু রুক্ষ বা কর্কশ নয়। এই দিকটা প্রকাশ পেত তার সংগীতসাধনায় খুব বেশি। ওস্তাদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন, তার চর্চাও রেখেছিলেন, গান শেখাতেন, নানারকম বাজনা বাজাতেন, সেতার, পাখোয়াজ, হারমোনিয়াম, বাঁশি আর বিশেষ করে তাঁর প্রাণপ্রিয় বেহালা। বিখ্যাত সংগীত যন্ত্র ব্যবসায়ী ডোয়ার্কিন কোম্পানির পত্রিকা সঙ্গীত শিক্ষার সম্পাদনের ভারও অনেকদিন তাঁর হাতে ছিল।
অনেকগুলি ধর্মসংগীত রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে একটি ‘জাগো পুরবাসী’ এখনও প্রতিবছর সাধারণ ব্রাম্ভসমাজের মন্দিরে মাঘোৎসবের সময় সকালবেলা গাওয়া হয়। এসব গানের যেমন মধুর ভাব, তেমনি মিষ্টি ভাষা।
‘জাগো পুরবাসি, ভগবত প্রেম পিয়াসি !
আজি এ শুভদিনে কি বা বহিছে করুণা রস-মধু ধারা।
শূন্য হৃদয় লয়ে নিরাশার পথ চেয়ে, বরষ কাহার কাটিয়াছে ?
এসগো কাঙ্গালজন, আজি তব নিমন্ত্রণ, জগতের জননীর কাছে !’
এসব গানের মধ্যে ভারি সরল একটা বিশ্বাস প্রকাশ পেত, ভগবানের চরণে নিজেকে নিজেকে নিবেদন করে দিতে পারলেই আর কোনো ভয় নেই। তাঁর কাছে শুধু পূণ্যবানরাই ঠাঁই পাবে এমন কোনো কথা নেই, কে কোথায় পাপী তাপী দুঃখ অভাজন আছ, এসো, একবারটি এসে বস, কোনো দুঃখ থাকবে না। এই সরল বিশ্বাস নিয়েই তিনি জীবন কাটিয়েছিলেন, তাঁর জীবনের আনন্দময় সৃষ্টিগুলিও ভগবানের মঙ্গল বিধানে তাঁর অগাধ বিশ্বাসেরই স্বীকৃতি।
তখন দেশে জাতীয়তাবোধার একটা বান ডেকেছে, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা সুন্দর সুন্দর দেশপ্রেমের গান লিখছেন। কলকাতায় একবার দারুণ প্লেগ হল, সবাই মিলে মহা উৎসাহে সেবার কাজে লেগে গেলেন। দেশপ্রেম মানেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত। ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা দাবীর কাজ আগেই আরম্ভ হয়েছিল, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন তার এক মহাউৎসাহী পাণ্ডা। তরুণ রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার দৈন্য ঘুচোতে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, নাটোরে জাতীয় অধিবেশনে কাকেও ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে দেওয়া হবে না, এই নিয়ে মহা আন্দোলন করেছিলেন। বাঙালি পোশাক, বাংলা কথা, বাংলা সংস্কৃতি এসব জিনিসের আদর করতে সারা দেশটাকে শেখাতে লাগলেন। এসমস্ত বিষয়েই যে উপেন্দ্রকিশোরেরও সাগ্রহ সমর্থন থাকবে সে আর আশ্চর্য কী ?
দেশের সংস্কৃতি মানেই দেশের গান, গল্প, শিল্পকর্ম। উপেন্দ্রকিশোর জানতেন রামায়ণ, মহাভারত সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকলে নিজের দেশকে চিনতে কেউ আরম্ভও করতে পারে না। যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জোরে আমাদের দেশে ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিলেন, তারই প্রভাবে তিনি দেশের পুরোনো সুন্দর সুন্দর কাহিনি উদ্ধার করতে লেগে গেলেন। একে একে ‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছোটদের মহাভারত’ , এবং অনেকদিন পরে ‘মহাভারতের গল্প’ বেরুল।
তফাতটা শুধু এই, সেকালের পুরোনো মনগড়া গল্প না হয়ে, উপেন্দ্রকিশোরের কলমের জোরে সেসব হয়ে দাঁড়ালো জীবন্ত কাহিনি, অথচ মূল গল্প কোথাও এতটুকু পালটাবার কথা মনেও আনেন নি। এসব বইয়ের অর্ধেক আকর্ষণ ছিল তাদের অপূর্ব সব সাদা কালো ও রঙ্গিন ছবি। কী রাক্ষুসে সব রাক্ষস, কী রাজকীয় রাজা, কী জোরালো সব বীর, কী করুণ দুঃখিনী সীতা। পড়তে পড়তে আর ছবি দেখতে দেখতে ছোটো ছেলে-মেয়েদের প্রাণটা যেন আকুল হয়ে উঠতো। আর গল্প বলার সে কী আশ্চর্য ঢং। কোথাও একটা বাড়তি কথা নেই, রঙ চড়াবার এতটুকু চেষ্টা নেই, ন্যাকামির লেশমাত্র নেই, বুড়োমিও নেই, গুরুগিরি করবার কোনো প্রয়াস নেই, এমন নিখুঁত গল্প বলার কায়দা কম দেখা যায়।
এসব গল্প পড়লে বোঝা যায় যেকোনো গল্পই একদিনে লেখা হয় না। কাগজ-কলম নিয়ে হয়তো একদিনই বসা হল, কিন্তু তার পিছনে থাকে সারাজীবনের পর্যবেক্ষণ, মনের মধ্যে অনেকদিন ধরে তৈরী হওয়া।
তারপর আরেকটা কথাও ছিল। কী করলে বাজারে বই কাটবে ভালো, একথা মনেও স্থান পেত না, তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল, কীসে বই ভালো হবে, ছেলে-মেয়েরা শিখবে কিন্তু আনন্দের মধ্যে দিয়ে শিখবে। মাস্টারমশাইগিরি করা চলবে না।
যত সম্ভব ভালো কাগজ কেনা হত, উৎকৃষ্ট রং-কালি ব্যবহার হত, কত ভালোবাসা কত নিষ্ঠার সঙ্গে ছবি আঁকা হত; তারপর ব্লক যদি ভালো না হত, ছাপা যদি মনের মত না উঠত, তখুনি ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে করা হত। খরচের প্রশ্ন উঠতই না। বাস্তবিক লাভের কথা ভাবেনওনি কখনো, যেখানে অন্যলোকে হয়তো হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে, উপেন্দ্রকিশোর ভালো জিনিস তৈরী করেই সন্তুষ্ট থেকেছেন।
সে লেখার বেলাও যেমন, ছবির বেলাও তেমন। হাফটোন ব্লক তৈরির অমন যুগান্তকারী উন্নতি করে, তার ফল দান করে দিলেন পেনরোজ কোম্পানিকে অকাতরে। কিছু গোপন রাখলেন না। বিলেতে কতজনে লাখপতি হয়ে গেছেন, উপেন্দ্রকিশোরের সেদিকে ভ্রূক্ষেপও ছিল না। জিনিসটা তৈরি করেই খুশি, অন্যদের কাজে লাগছে বলেই কৃতার্থ হয়ে গেলেন।
এ-রকম মানুষ ব্যবসার জগতে বড় একটা দেখাই যায় না। শুধু বিলেতে কেন, কলকাতায়ও ইউ রায় অ্যাণ্ড সন্সের কাছে দীর্ঘকাল কাজ শিখে সব জেনে নিয়ে আরেকটা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসা খুলেছে লোকে এমনও দেখা গিয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোর তাতেও কাতর হয়ে পড়েননি।
আসলে লোকনাথের নাতির কাছে টাকার কোনো মূল্য ছিল না। জমিদারির উত্তরাধিকারী তবু বিলাস করেননি কখনো, কিন্তু গবেষণার জন্য, সরঞ্জামের জন্য যখনই টাকা দরকার হয়েছে, জমিদারি থেকে টাকা এসে গেছে। সহজে না এলে কিছু জমি বন্ধক রেখেও টাকার জোগাড় হয়েছে, এর কী ফল হতে পারে, উপেন্দ্রকিশোর সে-বিষয়ে একবারও চিন্তা করেন নি।

পুরোনো বানান অপরিবর্তিত।

আপনার মতামত জানান