অরকুটীয়

সুবীর বোস


সেবার বইমেলা সল্টলেক স্টেডিয়ামে। লিটল ম্যাগ প্যাভেলিয়নে মোটা ফ্রেমের চশমা পরা এক তরুণ বলল, সুবীরদা, এবারের সংখ্যায় তোমার একটা কবিতা আছে। বললাম, সেকি, আমি তো এবার কবিতা পাঠাইনি। “গতবারে দুটো দিয়েছিলে –তার একটা রেখে দিয়েছিলাম – সেটা এবার কাজে লেগেছে” – “মোটা ফ্রেম” একটুও না দমে বলল। নিলাম এক কপি। দাম দিতে গেলে ও পক্ষের জবাব, এটা তো সৌজন্য সংখ্যা। প্রায় জোর করেই টাকাটা হাতে গুঁজে দিয়ে “আদরের নৌকা” হাতে নিয়ে বেরনোর আগেই আরেক “মোটা ফ্রেম”, সুবীরদা, আমি রঙ্গীত, রঙ্গীত মিত্র। এর আগে ওদের দুজনের সঙ্গেই কী বোর্ডের সৌজন্যে কবিতালোচনা হলেও – মুখোমুখি সেদিনই প্রথম। সেদিনের প্রথম “মোটা ফ্রেম”, মানে অভীক দত্ত এবং রঙ্গীত মিত্র আজও আমার ভাতৃপ্রতিম বন্ধু। সৌজন্য অরকুট।

এভাবেই আরও বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, পরিচয় বেড়েছে এবং পরিচয় গাঢতর হয়েছে দিনের পর দিন। মনে আছে, সে সময় একবার দিন কয়েকের জন্য সপরিবারে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি একজনের অভিমানী স্ক্র্যাপ, এভাবে কোনও খবর নেই – উধাও হয়ে গেলে চলে! আমার বাংলাদেশী ভাতৃপ্রতিম বন্ধু জাভেদ আখতারের সেই স্ক্র্যাপ আজও বুক পকেটে - হৃদয়ের কাছাকাছি রাখা আছে।

বেশ সেজেগুজে একটা ছবি তুলে আপলোড করেছিলাম অরকুটে। ছবিটা দেখে কবি আন্দালীব প্রশ্ন করেছিল, ছবিটা কে তুলেছে। “আমার ছেলে” – উত্তর দিয়েছিলাম। ওহ্‌, আপনার ছেলে এমন ভুলটা কী করে যে করল, আন্দালীব ক্রমশ বিস্তারিত। বললাম, কেন কী হল আবার। “কী আবার হবে, বাবার অমন ছবি তুলে – ছেলে তো নিজের পায়েই কুড়ুল মারল”, আন্দালীবের সহাস্য জবাব। এমনটাই ছিল সেদিনের অরকুট!

অরকুটের বেশ কিছু কমিউনিটি সেদিনের এই উটকো কবিকে মডারেটরের সন্মান দিয়েছিল। প্রথমে কবিতা পোস্ট, তারপর আলোচনা, তীব্র বিতর্ক এবং শেষে একদিন ওই লেখালিখিগুলোর কাগুজে মুখ। এভাবেই “ছন্দবাণী”, “কবি সন্মেলন”, “সৃজন ও গুঞ্জন”এবং অবশ্যই “কুট সাহিত্য”র লেখালিখিগুলো ধীরে কিন্তু নিশ্চিন্তে কাগুজে পত্রিকায় জায়গা করে নিয়েছিল।

বইমেলায় আমাদের নিজস্ব কোনও স্টল ছিল না। ফলে অন্য কারও স্টলে বই রাখা। এমনই এক স্টল থেকে একদিনেই চোখের নিমেষে “ছন্দবাণী”র এতগুলো বই উধাও হয়ে যায় যে, স্টলের মালকিন আমাকে বলেই ফেলেন, কী ব্যাপার বলুন তো – দলে দলে লোক আসছে আর বই নিয়ে যাচ্ছে – এমনটা তো আগে দেখিনি। বলেছিলাম, সলতে পাকানোর পর্বটা আগেই চুকে-বুকে গেছে – এবার আগুন – এ তো প্রত্যাশিতই। ভদ্রমহিলা হেসেছিলেন। আমি নিশ্চিত সেদিনের “আগামি” তার চোখে তখনই জায়গা করে নিয়েছিল। সৌজন্য অরকুট।

পরের বই “কবিতায় বৃষ্টির ফোঁটা”। কমিউনিটি কবি সম্মেলন। ততদিনে আমরা আরও কিছু এগিয়েছি। ফলে গোড়াতেই কবিদের জিজ্ঞেস করে নেওয়া হল, কার ক’টা কপি লাগবে। ফলাফল, এক বৈকালিক আড্ডাতে (স্বভূমি) সমস্ত বই শেষ। কুট সাহিত্য প্রথমে “সোপান” ও পরে “উর্জা” নামে ছাপা হত এ রাজ্যের বাইরে থেকে। কপি পৌঁছত কুট সাহিত্যের ছড়িয়ে থাকা সদস্যদের কাছে। এভাবেই বইগুলো জায়গামতো পৌঁছে যেত। একবার আমার কাছে পঁচিশ কপি এসেছিল। মনে আছে, নিমেষেই সেগুলো উধাও। সৌজন্য অরকুট।

খুব পরিশ্রম করতে হয়েছিল সৃজন ও গুঞ্জন কমিউনিটির “আলপথ” বের করতে। সঙ্গী-সাথী যাঁরা ছিলেন (ইচ্ছে করেই নামগুলো দিলাম না – কেউ বাদ পড়ে যেতে পারে এই ভয়ে) তাঁরা যদি একজনও একটু হড়কাতেন তো সময়মতো বই হাজির করা সম্ভব হত না। “আলপথ”এর উদ্বোধন হয়ছিল দক্ষিণ কলকাতার এক মঞ্চ ভাড়া করে। ভাবা যায়! জমজমাট আসরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি কখন হয়েছিল – সত্যি বলছি আমরা টের পাইনি। প্রশ্ন করতে পারেন – এত আয়োজন – সময় মতো বই হাতে না পেলে...।
সোজা উত্তর, আমি নিরুদ্দেশ হতাম।
অন্যদের কথা বলতে পারব না। নিজের কথা বলি, আজ আমি যতটুকু লেখালিখি শিখেছি (যদি সত্যিই কিছু শিখে থাকি) – তাতে সব চেয়ে বেশি অবদান ছিল “মুক্তমঞ্চ”র – তারপর অরকুট, শুধুই অরকুট। সেই অরকুট ৩০শে সেপ্টেম্বরের পর থেকে থাকছে না শুনে ভিতরে ভিতরে প্রিয়জন হারানোর বেদনা অনুভব করছি এখন থেকেই। তবে অরকুটের এই চলে যাওয়ার দায় কিন্তু আমরা প্রায় কেউই এড়াতে পারি না। দিনের পর দিন কাহাতক আর ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা যায়!

লেখাটা আর বাড়াতে চাইছি না। অরকুট কর্তৃপক্ষ আজ আমার এই লেখা পড়ে একটু অন্য অর্থে বলতেই পারেন, “এতদিন কোথায় ছিলেন?”

আপনার মতামত জানান