যে জন ছিল নির্জনে, অপমানে

সরোজ দরবার


এ তুমি কেমন তুমি!
এতদিন ছিলে, অথচ কাউকে টেরই পেতে দিলে না। এ তোমার কেমন থাকা! যেন ছিলে, যেভাবে ভালোবাসার মানুষ থাকে অপমানে। এরকম করেও কি কাউকে থাকতে আছে? পোড়ো স্মৃতির মতো মাঝেমধ্যে হানা দিয়ে উঠতে তো পারতে আমাদের মুঠোভর্তি স্মার্টফোনে। তা নয়, আপনি তুমি রইলে দূরে...অভিমানে, নাকি আত্মাভিমানে? উত্তর তোমারও কাছে নেই, শুধু জানতে একদিন তোমার মগ্ন মাধবীবিতানে ছিল মুগ্ধ প্রণয়ীর ভিড়। যা ছিল কল্পমায়া, সে যদি কায়া ধরতে পারত তবে তা তোমারই দাক্ষিণ্যে। হায় সেই সোনাঝরা সন্ধ্যা...ডেকে যেত কত নিশিগন্ধা... কত পরীক্ষার পড়া, কত ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি তোমাতেই সঁপে দিত সঞ্চিত সময়ের গুপ্তধন। সেই তুমি কিনা একদিন সময়ের আবর্তে দুয়োরানি হয়ে গেলে।
ওই তো সেই আপনজনের গন্ধমাখা শেষ বিকেলের মফস্বল। ওই তো সেই ছোট লাইব্রেরির গেট। সব পাখি ঘরে তবু সব ‘লেডিবার্ড’ যে গান শিখে ঠিক সময়ে ফেরে না, দিন কয়েকের অভিজ্ঞতায় সে কথাই বুঝে যাচ্ছে অপেক্ষমান বয়ঃসন্ধি। ইতিহাসের পাতায় কত প্রবল প্রতাপাণ্বিত রাজা রাজড়াদের সন্ধি হয়, তবু মনের গ্রন্থি বাঁধা যা কী কষ্টকর...অচেনা কষ্ট, কী যাচ্ছেতাই...তার তুলনা আমরা খুঁজব না কোথাও। শুধু মনোকষ্টের আরও কিছু বসন্তবেলা পের হলে বুঝে যাব যে কথা গোপন থেকে গেল হাতের চিরকুটে, মুখফুটে তাই বলে ফেলা যাবে অর্কুটে। পাড়ার ভিতর সে এক গোপন পাড়া, সেইই করবে পাড়াছাড়া। ঘরের পাশে এমন এক আরশীনগর...সেথা যে এমন একঘর পড়শি বসত করে কে জানত!
সুতরাং সৈকতদার সাইবার ক্যাফেতেই খুঁজে পাওয়া গেল ভালো থাকার পাসোয়ার্ড। কাচের দরজায় অবশ্য প্রিন্ট আউটে লেখা ছিল তিন মাসে ওয়ার্ড – এক্সেল - পাওয়ার পয়েন্ট শেখা। কিন্তু প্রিন্ট করা সে কাগজ আউট হতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি। একখানা মোটা খাতায় নাম লিখিয়েই যে যার মতো ডুবে যেতে থাকল। ক্রমে ক্রমে আলাপ জমল অলীক পাড়ার অলীক বাবুদের সঙ্গে। উঁহু শুধু বাবু বলি কেন? এ যে তারে তারে ধরি ধরি মনে করি...ধরতে গিয়ে আর পেলাম না ব্যাপার। প্রোফাইলে নাম, ‘এবং আমি’...অথচ ওয়ার্ডের ভিতর দিয়ে স্পষ্ট একটা মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসত। সবুজ আলোর নেশা একটু একটু করে টেনে দিয়ে যেত কোন অন্তপুরে। নাহ কোন টহলদারি নেই। উঁকি ঝুঁকি নেই। এমনকি সামনাসামনি পড়ে গিয়ে তুতলে ওঠারও বালাই নেই। কথার টেক্কা এমনিই ছুটে যেত। আসলে সে তো এক আবিষ্কারের ইতিবৃত্ত। অন্যকে তো বটেই , তার থেকেও বেশি নিজেকে। যে বাঙ্গালির উত্তম রোমান্সের কিংবদন্তি নায়ক প্রণয়িণীর সামনে এসে সংকোচে হাত ঘষেছে কিংবা গাছের পাতা ছিঁড়েছে, আর মেস ভর্তি অবিবাহিত যুবককুল মেয়ে দেখতে গিয়ে সামনে পড়ে গিয়ে উলটে এ ওর গায়ে পড়েছে, কিংবা উলটো আয়নায় গোঁফ ছেটেছে সে কি করে জানবে ভিতরে একটুও না ঘেমে এতগুলো কথা বলে ফেলা যায়। কী করেই বা সে জানবে যে, তার ঘরে বসত করে কয়জনা, যদি না ঘর ছেড়ে এ পাড়ায় পা বাড়াত। মুখচোরা সব বিকেলে সে তো চাইত শহরের মতো এ মফস্বলেও তুমি নেমে এসো... সে তো চাইত, বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায়... তবু হাসনুহানা ফোটা আর হৃদয়ের দফতর না পালটানোর ভিতর কোথা যেন একটা দূরত্ব থেকে যেত। সেদিনের সেই সব হাতে হাতে ফোনহীন আনস্মার্ট দিনে, চিরকুট যা পারেনি তাই করে দিতে পারত অর্কুট...আমার মুশকিল রে...আসান করো রে...।আর এসবের ভিতর কখন যে আধঘণ্টার সীমা পেরিয়ে এক ঘণ্টার কাঁটায় দাঁড়িয়ে যেত হুঁশ নেই। সম্বিত ফিরলে মনে হত সেই চেনা পারফিউমের গন্ধটা যেন ফিকে লাগছে। আনচান মন এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারত ঠিক পাশের চেয়ার থেকেই উঠে গেছে সে। তবে কি তারই চুলের গন্ধ ভার্চুয়ালের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে গেল ঘণ্টাখানেকের অ্যাকচুয়ালকে? তবে তুমিই কে সেই, মেঘবালিকা, তুমিই কি সেই?
আজ আর আমরা তার উত্তর খুঁজি না। একটি সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থা অর্কুট নস্টালজিয়ার সেরা টুইটার বেছেছেন একটিকে, যেখানে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, অর্কুট চলে গেলে তিনি তাঁর সন্তানদের কাছে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন যে কোথায় তাদের মাকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন! আহা, এ যেন সেই কমলকুমারের ভাষায় কিছু মায়া রয়ে গেল। কিন্তু আমরা যারা জেনে গেছি, হয়তো তোমার দেশে আজ, এসেছে মাধবী রাতি, তুমি জোছনায় জাগিছ নিশি, সাথে লয়ে নুতন সাথী... তাদের আর টুইট করা হয়ে ওঠে না। শুধু একান্তে জ্বলে ওঠে স্মৃতি স্মৃতি মোমবাতি। সেই নরম আলোয় আমাদের চোখে পড়ে সময়ের দেওয়ালে জমে থাকা টেস্টিমোনিয়াল। কমিউনিটিগুলো উত্তর কলকাতার রকের মতো আজও প্রতীক্ষায় আছে, অথচ আড্ডা আর তার কাছে আসে না। সেই বাংলা গানের মতোই অর্কুটের কফি হাউসটা থেকে গেছে, সেখানে আর কেউ সন্ধেবেলায় টপিক দিতে আসে না। যে ছেলেটার হার্ট সার্জারি নিয়ে ক’দিন বন্ধুরা স্ক্র্যাপবুকে ফুটিয়ে তুলেছিল আন্তরিক ভাইফোঁটা, সে আজ কোথায় অন্তরীণ কে জানে। নতুন ফ্ল্যাটের সুযোগসুবিধা যেমন নাড়ি ছিঁড়ে পুরনো পাড়া থেকে উচ্ছেদ করে নিয়ে যায় জীবনযাপনকে, তেমনই আমরা ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়লাম অন্য সোস্যাল সাইটে। ছেঁড়াঘুড়ির মতো সার্ভারের জঙ্গলে আটকে থেকে গেল আমাদের ব্যক্তিগত প্রোফাই্লগুলো।
অর্কুট গেলে হাতে থাকল ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপ। আমাদের ব্যস্ততা আর অনলাইন সামাজিকতার বিরাম নেই। কিন্তু এইসব অবিরত লাইক, ডিসলাইক বাটনের মাঝখানে অলক্ষ্যে যে একখানা প্রশ্নচিহ্নের বাটনও জেগে আছে? তবে কি এভাবেই কি আমরা ছেড়ে ছেড়ে যাব আমাদের আবেগের সমীকরণগুলোকে? হলই বা ভার্চুয়াল, এতদিন তো তার দেওয়ালেই আমরা অনুবাদ করে দিতাম আমাদের অনুভূতিগুলোকে। এতদিন তো সেখানেই শব্দের ভিতর দিয়ে পেতাম বন্ধুদের হাসি-কান্না-স্বেদ গন্ধ। প্রজুক্তি আমাদের বলে এগিয়ে যাও, রোজ সকালে নতুন পণ্যের পসরা নিয়ে সে আমাদের বিছানার ঠিক পায়ের দিকে বসে থাকে। আমাদের চোখ পড়ে। আমরা তুলে নিই। আমাদের হাতে বদলে যায় সেলফোন। আমাদের ল্যাপটপে বদলে যায় অপারেটিং সফটওয়ার। তবে কি সেই সূচকেই বাঁধা পড়ে যাবে আমাদের যা কিছু আজ ব্যক্তিগত।ভার্চুয়ালক ে হারাতে হারাতে আমরা কি অ্যাকচুয়ালকেও হারিয়ে ফেলছি?
উত্তর মেলে না, শুধু অকারণ মনখারাপ এসে ঘিরে ধরে। আর টাইপ করে ফেলি বহুদিন অব্যবহৃত থাকা পাসওয়ার্ড। দেখি, সেখানে পড়ে আছে অনেক গোধুলীর পাখি, জেগে আছে ঘুম না আসা রাতের জোনাকীরা। দেখি, আমাদের গেছে যে দিন সে একেবারেই যায়নি। কী করে যেন থমকে গেছে আস্ত খানিকটা সময়। থেমে আছে চূড়ান্ত কর্পোরেট হয়ে যাওয়া বন্ধুর বোহেমিয়ানা। থমকে আছে বান্ধবীদের স্বপ্নভাসি সিঁথি। চলকে উঠে থেমে গেছে কবিতার পেয়ালা। গোটা পাড়টাই যেন এক ফিল্মমেকারের স্বপ্নের ফ্রিজ শট।
ভাগ্যিস থমকে গেছিল অর্কুট। নয়তো নিজেদের শরীর থেকে সময়ের শ্যাওলা সরিয়ে এভাবে হয়তো নিজেদের দিকে ফিরে তাকানো হত না। চোখ পড়তেই দেখি অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। যে বৃষ্টিতে আমরা ধরা পড়ে যাব ঠিক...ধুয়ে যাবে অভিমান...ধুয়ে যাবে সিঁদুররে টিপ...। সেই বৃষ্টিতে আমাদের মনে পড়ে যাবে সব কথা, কথা দিয়ে কথাটা না রাখা, ফেলে আসা চেনা চেনা ব্যাথা। অদূরে কোথাও রেডিও রাখা নেই, কোথাও বাজবে না পথ যেন না শেষ হয়...। পুরনো আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে আমরা দেখব পথ কোথাও একটা সত্যিই শেষ হয়।
একদিন হয়তো ভগ্নাংশের অঙ্ক কষতে কষতে আমরা ক্লান্ত হব। সব পাখি ঘরে ফেরে, তবু সব লিঙ্ককে আর পাওয়া যাবে না।কিন্তু সেদিন সে কথা আমরা কীসে জানাব কে জানে? অর্কুটের শোকপ্রস্তাব জানানো এই ফেসবুক-টুইটারও কি সেদিন সমাধিগাত্রে নাম লেখাবে? আমাদের এই অদম্য এগোনোর বাসনায় সমাধিফলককে, আমরা আর কত বড় করব? জানি না, শুধু সিঁড়িভাঙ্গা গণিতের ওঠানামায় জীবনের অঙ্ক খাতার পৃষ্ঠা মুড়ে রেখে সেদিনও হয়তো আমাদের মনে হবে, পুরনো পথের রেখা ক্ষয় হয়, তবু পুরনো প্রেমের রেখা নয়।
হে বন্ধু, বিদায়!

আপনার মতামত জানান