অর্কুটের দিনরাত্রি

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


‘অর্কুট’ এই শব্দটা শুনেই কেমন ভিনগ্রহী লেগেছিল! কি বস্তু, খায় না মাথায় দেয় তাই ঠিক করে বুঝিনি। আসলে, আমরা বোধহয় বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রজন্ম, যারা শুনেছিলাম কম্পিউটার বলে একটি জিনিস আছে কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে সময় লেগেছিল; যারা শুনেছিলাম ইন্টারনেট বলে একটি ইন্দ্রজালের মত ব্যাপার আছে, কিন্তু তার সুবিধে নিজের কাজে লাগাতে শিখেছি অনেক পরে; ঝটপট হাজার একটা কাজ অনলাইন করে ফেলা তো দূরের কথা, পদ্ধতি বুঝতেই সময় লাগত বেশ কিছুক্ষণ। অন্ততঃ আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যদি কেউ জানতে চায়, তো এই কম্পিউটারের ব্যবহার থেকে ব্যক্তিগত ইমেল আইডি তৈরী করা... সবটাই দায় পড়ে। তার সঙ্গে এই ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং’ ছিল ফাও। এই অর্কুট শব্দটা প্রথম শুনেছিলাম কলেজে বন্ধুদের মুখে। সদ্য ইয়াহুতে ই-মেল আইডি খুলেছি, যাতে কলেজের কিছু বিশেষ সাবজেক্ট- এর তথ্য তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় আর ডিপার্টমেণ্টের স্টাডি মেটারিয়াল সকলে একসাথে পেতে পারে। সত্যি বলতে এও বেশ রকমারি পদ্ধতি লেগেছিল তখন। জেরক্স না করে, ফাইল এর পর ফাইল ইমেল এ অ্যাটাচ হয়ে চলে আসছে! একের পর এক নতুন পদ্ধতিতে কম্পিউটারের ব্যবহার দিনে দিনে বেড়ে চলল, আর অবশেষে ঘরে এলো ডেস্কটপ কম্পিউটার। চারপাশের সব নিয়মই এমন ভাবে পালটে গেল দ্রুত, যে যোগাযোগের কথা বললেও ফোন নম্বরের সঙ্গে ইমেল আইডি দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে উঠল। টিভি বাক্স থেকে চোখটা ঘুরে গেল এই কম্পিউটার বাক্সর দিকে... বুঝতে পারলাম না কখন টিভির জায়গাটা আসতে আসতে এই কম্পিউটার নিয়ে নিয়েছে। সেই আগ্রাসী কম্পিউটার-ইন্টারনেট আক্রমনের যুগেই ২০০৬-৭ সাল নাগাদ ‘অর্কুট’ শব্দটি হঠাৎ কলেজে বন্ধুদের মুখে মুখে শুনতে লাগলাম।

খেলার মাঠে যারা সন্ধে হওয়া অবধি পড়ে থাকত, কলেজের ক্লাস না করে মাঠে যেতো ফুটবল ম্যাচের জন্য অথবা ক্রিকেট ম্যাচের জন্য প্র্যাকটিস্‌ করতে। সেইসব ছেলেরাও হঠাৎ তাড়াতাড়ি বাড়ির ফেরার কথা বলতে শুরু করল! একদিন কানে এলো ঠিক এইরকমই ‘মাঠ-প্রিয়’ একটি ছেলে বলছে, ‘এই তোরা খেল বুঝলি... আমাকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।’ শুনে পাশের ছেলেটি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘আবার ভাঁড়ামো করছিস! সেই তো অর্কুট খুলে বসবি!’ তার উত্তরে ছেলেটি মাঠের ঘাস ছেড়ে উঠে পিঠে ব্যাগ নিতে নিতে বলল “সবাই তোর মত ছকবাজ নয়... যে ঘরে ফিরেই এর-ওর স্ক্র্যাপ পড়তে বসবে!’ ‘অর্কুট’, ‘স্ক্র্যাপ’ এসব কিছুই আমার শব্দকোষের আওতায় পড়ত না। একজন কে জিজ্ঞেস করলাম এসব কি বস্তু। তার প্রতিক্রিয়ার সারমর্ম ছিল ‘তুই অর্কুটে নেই! বেঁচে আছিস কি করে?’ পড়ে জানলাম, ইতিমধ্যে আমাদের ডিপার্টমেণ্টের সকলেই নাকি অর্কুটে। সারাদিন সেখানেই নাকি কথা হয়। কলেজের বাইরের পুরোটা সময়, এমন কি গভীর রাত অবধি এই অর্কুট আর ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে গ্রুপ চ্যাট চলে। একরকম সামাজিক কর্তব্যবোধেই (যেভাবে ভোটার কার্ড, র‍্যাশন কার্ড করতে বাধ্য হই আমরা) অর্কুটে নিজেকে নথিভুক্ত করতে হ’ল। খুঁজে খুঁজে কিছু পরিচিত বন্ধুকে অর্কুটের বন্ধুতালিকায় ডেকে নিয়ে জগৎকে অবগত করলাম, আমারও অস্তিত্ব আছে অর্কুটে।

এখনও সেসব কথা মনে পড়লে ভাবি, কি অবাকই না লেগেছিল এইসব দেখে। ইমেল আইডি, ম্যাসেঞ্জার... এইসব দেখেই যথেষ্ট চমকে ছিলাম। কিন্তু এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর অবতার অর্কুট যেন একেবারে একটা অন্যরকম কিছু ব্যাপার। শুধু বন্ধু কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করাই নয়... তার সঙ্গে আরও অনেক কিছু। ছবির অ্যালবাম, কমিউনিটি, এটা-সেটা অ্যাপ্লিকেশন... সব ঘুরে ফিরে দেখতে দেখতেই সময় কেটে যেত। ক্রমে বুঝতে পেরেছিলাম, শুধু আমি নয়... আমার বন্ধুমহলে সকলের মাঝেই অর্কুট যেন একটা অপরিহার্য ব্যাপার, নেশার মতন! লোকে গান, নাচ, এইসব করার মতই ‘অর্কুট করে’। অর্কুট গুগ্‌লের, তা ‘Orkut Buyukkokten’ নামের কোনও ব্যক্তির আবিষ্কার (যার পদবীটির বাইককটেন না বায়োককটেন নাকি অন্যকিছু উচ্চারণ তা আজও ভাল বুঝি না) এইসব খোঁজ খবর কেউ কেউ মাতব্বরের মত শোনাতো। সেই জার্মান ব্যক্তির নাম অর্কুট না কি অর্কাট নাকি অর্কট বলতে হবে, সেই নিয়েও বিতর্ক হ’তে দেখেছি। এইসব কিছুর মধ্যেই কলেজ জীবনের সব কিছুর সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এই অর্কুট। বলা যায়, নিছক ফোনে বার্তা পাঠিয়েও যে কাজ হয়ে যায় তার জন্যেও অর্কুটের প্রবেশ করা জরুরি মনে হ’ত। তখনও রঙিন অত্যাধুনিক স্মার্ট ফোন আসে নি। এই অর্কুটের রঙচঙে ছবিতে জন্মদিন অথবা নববর্ষের শুভেচ্ছাও বেশ তাক-লাগানো ব্যবস্থা মনে হ’ত। এই অর্কুটের মাধ্যমেই যে কতজনের সম্পর্ক তৈরী হতে আর ভাঙতে দেখেছি, তার হিসেব নেই। এই ভার্চুয়াল আড্ডার প্রাঙ্গন অর্কুট রমরমে করে ২০০৬ থেকে ২০১০ জীবনের একটা অংশ হয়ে থেকেছে। তার এক একটা অ্যালবামে সেই সময়ে ধরা দেওয়া মুহূর্তগুলো সেই কথাই বলে। কেউ বলত সময়নষ্ট, কেউ বলত ‘অ্যাডিকশন’, কেউ বলত ‘অর্কুটের পোকা কুট কুট করে কামড়াচ্ছে’। কিন্তু ইন্টারনেট যোগাযোগ থাকলে, দিনে একবারও লগ-ইন করেনি... এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না।

যেভাবে একদিন কেউ হঠাৎ করে অর্কুটের কথা বলেছিল, সেইভাবে হঠাৎই একদিন কারও মুখে ফেসবুকেরও নাম শুনেছিলাম। দেখলাম হঠাৎ করেই সব বন্ধুরা ফেসবুক ফেসবুক করছে। কিন্তু অর্কুটের অভ্যস্থ আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে আবার একটা নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট-এ নথিভুক্ত হওয়ার কোনও মানেই পাইনি তখন। কেউ জানতে চাইলে বলতাম ‘দূর! দু’টো জায়গায় লগইন করে সময় কাটানোর সময় নেই আমার।’ তারপর ক্রমে দেখলাম, কোথায় কি... এক এক করে সব বন্ধুরাই অর্কুট থেকে ফেসবুকে চলে যাচ্ছে। যে আড্ডা একদিন অর্কুটে হ’ত এখন তা হয় ফেসবুকে। সব মনকাড়া বিষয়-বৈচিত্র নিয়ে ফেসবুক একেবারে দখল করে নিয়েছে অর্কুটের বাজার। পরিচিত মুখগুলো আর কেউ অর্কুটে নেই, সবাই ফেসবুকে। ভার্চুয়াল সামাজিকতার ডাকে ফেসবুক জিন্দাবাদ বলে আমিও নাম লেখালাম মুখবই-তে। তবু অর্কুটের সেই অ্যাকাউণ্টে তালা ঝুলিয়ে দিতে পারিনি। সেখানকার এখনও ধূলো পড়া কিছু বার্তায়, স্ক্র্যাপে, ছবির অ্যালবামে বেশ কিছু স্মৃতি থেকে গেছে। ২০১০ এর পর থেকে ফেসবুককেই বেশি সময় দিলো, হঠাৎ খেয়াল হলে একবার অর্কুটের পাড়ায় যেতাম, শুধু কেমন আছে সব কিছু দেখার জন্য। বুঝতে পারতাম, কেউ থাকে না সেখানে... খাঁ খাঁ করছে। বুঝতে পারতাম, অর্কুটের সে চাহিদা আর নেই। যতই নিজেকে পরিবর্তন করে অন্যদের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলার চেষ্টা করুক, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে উঠবে না। যেমন একজন সুপারস্টার কে মাথায় তুলে দর্শকরা লাফায়, আর নতুন তারকার উদয় হ’লে সেই পুরনো সুপারস্টারের পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার পড়ে যায়, সেই ভাবেই অর্কুট তখন পুরনো দিনের নায়ক। তাকে দেখার কেউ নেই। পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির মত কোনও এক আমলের সাক্ষ্য দেবে শুধু।

কিছু দিন আগে যখন হঠাৎ শুনলাম, গুগ্‌ল কর্তৃপক্ষ সেই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার যা আসবাব পড়ে আছে সেখানে এখনও, অনুরোধ করেছেন নিজের দায়িত্বে সব নিয়ে যেতে। আপাত ভাবে দেখলে এই সিদ্ধান্ত খুব ব্যতিক্রম বা আকস্মিক নয়, এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে অর্কুটের মত ‘অবসুলিট’ এবং দৃশ্যত ব্যর্থ জিনিসের জন্য ব্যয় করার ইচ্ছা কারও থাকবে না। ফেসবুক-টুইটারের যুগে অর্কুটের স্থান ম্লান হতে হতে শূন্য হয়ে গেছিল চার বছর আগেই। তবু কোথায় যেন একটা হারিয়ে যাওয়া থাকবে। এই অর্কুটই অনেক অন্তর্মুখী ছেলে-মেয়েকে (যারা ঠিক সব কথা বলে উঠতে পারে না) একটা নিজের ভাব প্রকাশের জায়গা করে দিয়েছিল। নিজের মত করে একটা ঘর সাজানো যাকে প্রোফাইল বলে, নিজের মত করে নিজেকে চেনানো, নিজের পছন্দের ছবি রাখা, পছন্দের বন্ধুদের দেখানো... এমন অনেক কিছুই। অর্কুটের সঙ্গে অনেক কিছুই চলে যাবে যা সেই অর্কুটের এখানে ওখানে একদিন সৃষ্টি হয়েছিল। অথবা অর্কুট বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অমোঘ সত্য আবার মনে করিয়ে দিয়ে গেল... যা চলে গেছে তা আর ফিরে আসে না। যা থাকে তা শুধুই স্মৃতি, তাও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে। ‘মরা হাতির প্রবাদটা কি তাহলে মিথ্যে?’ অদ্ভুত প্রশ্ন, তাই না?

আপনার মতামত জানান