কোই লওটা দে মেরে টেস্টি অউর স্ক্র্যাপ

পিয়ালী চক্রবর্ত্তী


সালটা ২০০৫-০৬, গায়ে তখনও কলেজের গন্ধ। সাইবার ক্যাফের রমরমা তখন কলকাতা জুড়ে। একখানা ইয়াহু বা রেডিফ মেল না থাকলে যাকে বলে টোটাল ব্যাকডেটেড। আর ইয়াহু চ্যাট রুমে একবার উঁকি না মারলে তো, জীবন-যৌবন একেবারে বাসি ন্যাতানো তেলেভাজার ন্যায় বেকার। কলেজের ছেলে মেয়ে অনেকেই আবার শুকনো মুখে কলেজ আসে, কারণ অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যাবহারের ফলে ফোনের বিল আকাশ ছোঁয়া, বাবা কচাত করে কেটে দিয়েছে নেটের লাইন। বসন্তের কোকিলকে কুহু কুহু গান গাইতে না দিলে কি যে তার ব্যাথা, সে যদি কেউ বুঝত। কলকাতায় বসে কেরালার সাথে চ্যাট। আমার বয়স ২২, বাড়িতেই আছি, আমার বাড়ির পর্দার রঙ লাল। ওপাশের জবাব ‘হাউ কিউট’। পরের আব্দার, বাড়িতে ওয়েব ক্যাম নেই? এরপর ক্যামের খোঁজ। তা এহেন বসন্ত দিনে, দখিনা বাতাসের মত উদয় হল অর্কুট। একেবারে নিজের একটা পেজ, তাতে ফোটো লাগাও, এর ওর সংবাদ নাও, ফোটোয় কেমন লাগছে তা জানাতে লোকে তোমায় স্ক্র্যাপ করবে।

একেবারে নতুন আকর্ষন যাকে বলে। শুরু হল প্রোফাইল খোলার হিড়িক। অতি সাবধানী লোকজন অবশ্য কেউ তাজমহল, কেউ আইফেল টাওয়ার, কেউ সূর্যমুখীর ছবি লাগাত, আমি কত কচি বোঝাতে কেউ কেউ গুলু গুলু বাচ্চাদের ছবি, আবার আমি কেমন মাচো প্রমাণ করতে কেউ র‍্যাম্বো, রোবট, শোয়ারজেনেগারের শরণাপন্ন। আমার বয়ফ্রেন্ড দেখি শন কোনরির ছবি লাগিয়েছিল। আহা আসলে চিন্ময় রায়ের যুবক বয়সের মত চেহারা তো কি, নিজেকে তা বলে জেমস বন্ড ভাবা যাবে না? আর এইসব না গেলে কিসের অর্কুট, কিসের নিজের প্রোফাইল। আর যদি একখানা নিজের ছবি লাগান যায়, ব্যাস ফ্রেন্ড রেকোয়েস্টের ছড়াছড়ি। আমি অমুক পাড়ার তমুক, তোমার মাসতুতো দাদার ক্লাস টেনের বন্ধু। সারাদিন স্ক্র্যাপ, আচ্ছা আমরা কি বন্ধু হতে পারি? কেন পার না? কবিগুরু বলেছেন ‘পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার, দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’। আহা তাকে কি অমন যেতে দেওয়া যায়? তুর্কির এক ছেলে অর্কুট, স্ট্যান্ডফোর্ডে পড়াশুনা করত, তখন থেকেই তার নাকি এইসব বানানোর ইচ্ছা, পরে গুগুলে কাজ করতে করতে এই অর্কুট ডট কমের শুভ সূচনা। ভারতের মহামানব তো রাতারাতি অর্কুট গিলে নিল। আজ যেটা ফেসবুকের ওয়াল, সেদিন সেটা অর্কুটের দেওয়াল, সেখানে পোস্ট নয়, স্ক্র্যাপ হয়। সকাল সকাল গুড মর্নিং, বিকেলে অফিস কটায় ছুটি? সন্ধেতে কি করছ? রাতে ফের গুড নাইট। তবে সেগুলো সবই ছিল, বেশ একটা ওয়ান টু ওয়ান গল্প। সবকিছু এমন এত বেশি খোলাখুলি ছিল না। অর্কুটের চারপাশেও একটা স্বচ্ছ দেওয়াল ছিল। এখন ফ্লুরিজে বসে চা খাচ্ছি, বা টিভিতে শাপমোচন দেখছি, বা রবীন্দ্রসদনের সামনে ফুচকা, এইসব প্রতিমিনিটের ব্রেকিং নিউজের মত লোক জানানো বন্ধুত্ব ছিলনা অর্কুটে। অর্কুট থেকেও ভাল ভাল বন্ধু হয়েছে, তারা নিশ্চই ফ্লুরিজে বসে চাও খেয়েছে। বেড়াতে গিয়ে ছবিও লাগিয়েছে, কিন্তু সবটাই বেশ সাজান গোছান। আর একখানা মস্ত বাঁচোয়া ছিল, কেউ হয়ত কবিতা লিখল ‘এন্টেনায় কাক, আমি অবাক’ ব্যাস অমনি বাছা বাছা ৫০ জনকে ট্যাগ করে চরম বিরক্তি উতপাদন, যেটা কিনা ফেসবুকে নিত্যদিন হয়, অর্কুটে সেসব ছিল না। প্রাণের সুখে লেখাপত্তর লোকে ছবির মত আটকে রাখত। যার ইচ্ছে হল পড়ল, যার নয়, নয়। আর ছিল একটা জিনিষ, টেস্টিমোনিয়াল। একজন আর একজনের সম্পর্কে কি ভাবে। কেউ কেউ তো পাতি বাজার চলতি পিকচার মেসেজ পাঠাল, কেউ দুকলি মিষ্টি কথা লিখল। একবার এক কবি বন্ধুকে কত সাধ করে কবিতা লিখে টেস্টি করে পাঠালাম, সে ফোন করে বলল, ‘খাসা হয়েছে, তুই কি করছিস এখন?’ বললাম ‘বাসন মাজছি’। পরদিন টেস্টি এল আমার জন্য, মেয়েটা দারুণ বাসন মাজে। কিরকম বদমাইশি । আর বিভিন্ন রকম কম্যুনিটি। রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাহিত্য, কাব্য, আড্ডা, বিজ্ঞান, বাঙ্গাল, ঘটি, বাটি, প্রবাসী, গ্রামবাসী এমনকি পাসপোর্ট ভিসা অব্দি। এই এক সাহিত্য কম্যুনিটির মেম্বার হয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম কি আর হবে নেহাতই আঁতলামি। কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেই কম্যুনিটি হয়ে দাঁড়াল নেশার মত। অনবদ্য সব লেখা, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সব বাঙালী বন্ধু। কারুর কারুর সাথে সম্পর্ক পৌঁছে গেল অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বে। ফোন নম্বর আদান-প্রদান, নিত্য গল্প, কলকাতায় সুযোগ পেলেই গেট টুগেদার। এমনকি নিজেদের চেষ্টায় পত্রিকাও প্রকাশ। ঠিক যেন এক একটা দক্ষিণ খোলা ঘরের মত ছিল কম্যুনিটিগুলো। গুটিকয়েক বন্ধু, তর্ক, আড্ডা, ভাললাগাটুকু ভাগ করে নেওয়া। মাঝে মাঝে তুমুল ঝগড়াও। এই যেমন সকালবেলা অ্যালার্ম বাজা সত্ত্বেও শেষ মুহুর্তের একটা ঘুম লাগাচ্ছি, ফোন বেজে উঠল, ধরতেই এক দাদার হুঙ্কার, ‘শোন তুই যে কাল আমার কবিতাটার সমালোচনা করলি, ওটা কিন্তু আমি স্বরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের একটা কম্বিনেশন করার চেষ্টা করেছি। এই শুনে আমি তো খাট থেকে পড়ে যাই আর কি, ঘুমের ঘোরে বাসি মুখে, মাত্রাবৃত্তকে মাস্টারবৃত্ত শুনছি আর মনে হচ্ছে একি সেই উচ্চমাধ্যমিকের উপবৃত্ত, অধিবৃত্তের ইক্যুয়েশন, মাগো আমি কবিতা বুঝিনে মা, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কেমন সূচিপত্রের আকারে এক একটা টপিক খুঁজে পাওয়া যেত কম্যুনিটিতে, যেটা ইচ্ছে ক্লিক কর আর কমেন্ট কর। চাইকি অনেক পুরনো ঐশ্বর্য্যও খুঁজে বের করে পড়া যেত। ফেসবুকে সে মজা নেই মোটেই। এখানে ঝলক অনেক বেশি, মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে অনেক সুবিধা। কিন্তু ওই যে প্রাণের বন্ধুদের সাথে পা ছড়িয়ে বসে আড্ডা মারার যে মজাটা অর্কুটে ছিল, ফেসবুকে তা যেন বড্ড বেশি চাপা পড়ে যায়, এত হইচই, এত বেশি ভিড়। সেই আন্তরিকতাটার বড় অভাব।
যাক তবু কালের নিয়মে পুরোনকে সরে যেতে হয়, নতুনেরা আসে। অর্কুট ছেড়ে ২০১০ এই আমরা ফেসবুক পাড়ি দিয়েছিলাম, আজ আবার অর্কুটের বন্ধ হবার দুঃখে কেঁদে মরছি। তবে স্মৃতি সততই সুখের। অর্কুট ভাল থাক, সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাক, কষ্ট একটাই, তাও বা মাঝে মাঝে ৪০৪ এররের বাধা পেরিয়ে পৌঁছন যেত, জীর্ণ ঘরগুলোতে ঢুকে পুরোন আসবাবের গন্ধ নিয়ে আসতাম। তা আর হবে না। চিরতরে বন্ধ হবে দ্বার ৩০শে সেপ্টেম্বর।



আপনার মতামত জানান