মনে রেখো

সৌরাংশু


আরে কি বলছেন? অর্কুট সেপ্টেম্বরে বিদায় নেবে? তো আমি কি করব? সে তো আমিও পনেরো বছর আগে নিজের শহরের পাট চুকিয়ে বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপে এসে বসবাস করতে শুরু করলাম। তো আমি কি আর আমি নেই? ওহ ওই সব অর্কুট ফর্কুট অনেক দেখেছেন? শুনুন মশাই একটা সিধা কথা বলে রাখি, অর্কুট ছিল বলে এই যে আমার মতো নিজখ্যাত (নিজের কাছেই খ্যাত আর কি) লোকের গোদা অক্ষরে বাংলা লেখা আপনি ভাগ্যি করে পড়তে পারছেন।
সে সেই দু হাজার পাঁচ টাঁচ হবে, ওয়ানটুথ্রিইণ্ডিয়া, ইন্ডিয়াটাইমস পেরিয়ে এলাম গুগলের দরবারে। আরে কোন এক অর্কূট বুন্দিকুটকুটি না কে তার গার্লফ্রেন্ডকে খুঁজে পেয়েছে বলে গুগলকে এই চিন্তাভাবনাটা বেচে দিয়েছে। তা বেশ করেছে, আমার তো আর গার্লফ্রেন্ড হারায় নি যে তাকে নিশ্চিন্দিপুরে নোটিশ পাঠাতে হবে? তাইলে? তাইলে আর কি? বিদেশ বিভূঁইতে রাবণ বর্জিতভাবে বসে আচি একটু বন্দু টোন্দু হলে মন্দ হয় না? তা বেশ কথা দিল্লিতে বাঙালীদের মাছ খাবার আড্ডা থেকে শুরু করলাম অর্কূট যাত্রা। তা সে লেখা টেখা তখন কোথায়? তখন তো খালি আড্ডা আর মিট আর ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প শহর কাঁপিয়ে সমাজচর্চা। নোবেল পাবই পাবো!
যে ছেলেটা সেই রাজ্যপাটের মালিক ছিল (সবাই রাজার দেশে একলা রাজা হয় না, মালিক হয়) তার অদ্ভুতভাবে রোহণের সঙ্গে মৌখিক মিল। কিন্তু কাজে কম্মে তো সে রোহণ নয়, তাই ভাঙা গড়ার ভিতর দিয়েই এগিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ একটা ছেঁদো কবিতা লিকে ফেললাম! তা বাঙালী মাত্রেই ছেঁদো কবিতা লিখে নিজেকে জীবনানন্দের প্রপৌত্র হিসাবে দাবী করে, আর আমি পনেরো বছর দিল্লিতে থেকে আর বাঙালী নেই। কিন্তু কবিতাতে যে ফুটো হয়ে যায়, চল ভাই গল্প লিখি। এমন গল্প কেউ কোত্থাও লেখে নি। যে গল্প লিখলে কুড়ি বছর পরে আনন্দ পুরষ্কার একদম বাঁধা।
তাই ভাই এমন গল্প লিখব কোথায়? আরে কূট আছে না? অর্থাৎ কূট সাহিত্য? আরে মশাই হাতে লেখার হাতে খড়ি সেখানেই। ছিলও বটে লোকজন, একটু আন্টু বান্টু লেখা লিখলেই জেজে ট্যাগ ঝুলিয়ে দিত। ওহ জেজে জানেন না? ঝুলস্য ঝুল মহায়! তা মহায় দশটা লেখার মধ্যে নটা জেজে হলে একখান তো কুলস্য কুল হবে না কি? ধামাধরা পাঠক সমালোচকরা যে নাকে চশমা এঁটে বসে আছে। তো চালাও পানসি উত্তমাশা অন্তরীপ। বাংলালাইভ ছুঁয়ে এদিক ওদিক হয়ে ফিসফাস। আরে মশায় শুধু অনলাইন সাহিত্য চচ্চা কল্লেই চলবে? কে তুমি শিবাজী বাওয়া খোমা দেখাইবে নি?
চলল গেট টুগেদারের পালা আহা, এই তো সেই, মামণি টাইপের মেয়েগুলো হ্যাণ্ডসাম ছেলে দেখে চিল্লিয়ে ওঠে আর ছেলেগুলো মহা খচ্চর। তাদের গুণকাহিনী না হয় নাই বা বললাম। কিন্তু দাদা ম্যাগাজিনও তো প্রকাশ করে ফেললাম। করব কি? আরে করবে কি? গান পারলে গান কর কবিতায় কবিতা যদি পিয়ানো বা টেবিল টেনিস পারো তাহলে বাপু সে নিজের বাড়িতে কর।
এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আরে বাবা ফেসবুক না কি একটা আছে না? তার সঙ্গে নাকি অর্কুট টিকে উঠছে না। তা উঠছে না তো বেশ করছে। ফেসবুক যত অহমসর্বস্ব স্বার্থপরদের জায়গা। আড্ডা মারতে হলে অর্কুট। ফেসবুক হল ফ্ল্যাটবাড়ি যেখানে গ্রুপ বা পেজ খুলে তিন মিনিটের ফেম হয়, প্রেম হয় না। অর্কূট হল আমার দালানবাড়ি, মুড়ি চানাচুর লেবু চা সহযোগে বিন্দাস আড্ডা। সেখানে পাঁচটা ঘর সব সময় ওপর তলায় থাকে। ফেসবুকের মত গড়গড়িয়ে লিফট চড়ে নেমে পড়ে না। কালকের সুগন্ধি বেলফুলের ছোঁয়া আজকেও থেকে যায়। কিন্তু করবটা কি, যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতেই, পেলিং জলঢাকায় কেউ আর আসে না। এমন দিন এল, ব্রাউজারে অর্কুটকে উপরে রাখার জন্য অর্কূটেই বার চারেক ফালতুকা ক্লিক মেরে চলে আসতাম।
কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম আর আপনি বাঁচাই ধর্ম। আমিও চামড়া পালটে স্বার্থপর হয়ে গেলাম। গুগল প্লাসেও হয় না। ফেসবুকের মধ্যে নিজ গণ্ডিতেই আটক, নতুন পরিচিতি, প্রেম পথ চলা। তারপর দেখি ও মা, অর্কূটের সুবীরদা, বাসুদা, হরিদা, রাজা, নেপু, সোমা, পিউ, পুপুল, সঞ্জয়, লেলো, পাহাড়ি পানুদের সঙ্গে আরও অনেকে জুটে গেছে। আহা ঘর দিয়ে কি আর মানুষ গড়া যায়? মানুষ যেখানে যায় সেটাই তো আমার ঘর! আমি বিশ্বনাগরিক।
তাই আর কি, একটা রজনীগন্ধার মালা লটকে দিয়ে জমা রাখা পোস্ট, ছবি টবি সব ডাউনলোড করে ফেসবুকের পর্দায় মুখ দেখাতে থাকি। তবে কি না দিনগুলো বেশ ভাল ছিল গা? মানে আমি সবসময় এক পয়সার চাল আর পেলে মারাদোনা না করলেও অর্কূটটা ভোকাট্টা হবার সময় বুকের বাঁদিকে একটু গিটারের গৎ বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক পরিচিতি বাড়ায় কিন্তু অর্কূট তো পরিবার বাড়িয়েছিল। যার জোরে এখনও এখানে টিকে আছি, দ্বিতীয়-তৃতীয়- চতুর্থ পরিবার।
“যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায়...
তবু............”

আপনার মতামত জানান