অর্কুট এক লুকনো আশা

নীতা মন্ডল


পি- এ- আর- এ- এম- এ, একটা একটা করে অক্ষর টাইপ করি আর আমার শরীরে শিহরণ জাগে সেই সতের বছর বয়েসের মতই। আমি অর্কুটে পরমাকে খুঁজছিলাম। দেখলাম পরমা সেন, কম করে পঞ্চাশ জন। বিরক্ত লেগেছিল আমার। কোথা থেকে খোঁজা শুরু করব? ওকে দেখলে যে আমার মনে হত ও অন্যরকম, ও অসাধারন, ওর সবকিছু আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। ওর নাক, চোখ, মুখ, ঝকঝকে দাঁতের সারি, ওর কথা বলার ভঙ্গী, ওর হাসি এমন কি নামটাও অনন্য। এই নামের মানুষ দুনিয়ায় এতজন! পরেরবার কি ওয়ার্ড লিখেছিলাম ‘পরমা সেন, রানাঘাট’। তাতেও কম করে পনের জন দেখা দিয়েছিল। এক, দুই, তিন করে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গিয়েছিলাম ছ নম্বরে।
তখন ২০০৬ এর মাঝামাঝি। বছর দুয়েকের প্রজেক্টে রুদ্রকে ওর কোম্পানি পুনে থেকে মেরিল্যান্ডে পাঠিয়েছিল। বিদেশ বিভূঁইয়ে একা, তাই রুদ্র তখন সকাল বিকেল ইমেল করে। আমিও রুদ্রর মত একা বসে আছি ব্যাঙ্গালোরে। কলেজের বন্ধুদের নিয়ে ওর সৃষ্টি করা গ্রুপমেলটা লুপ্তপ্রায়। যদিও আমাদের ব্যাচের অনেকেই কথা দিয়েছিল যোগাযোগ রাখবে তাই রুদ্র ওই গ্রুপটা বানিয়েছিল।
রুদ্র আমাকে চেপে ধরল অর্কুটে একটা প্রোফাইল খোলার জন্যে। সহকর্মীরা অনেকেই ঘন্টার পর ঘন্টা অর্কুটে কাটায় দেখে শুরু থেকেই এই সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটটার প্রতি আমার বেশ বিরাগ। একথা বলতেই রুদ্র আমাকে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিল। অনেককেই ও অর্কুটে নতুন করে আবিষ্কার করেছে। আমাদের ক্লাসে মাত্র পাঁচজন মেয়ে ছিল তার মধ্যে দেবলীনার প্রতি রুদ্রর ব্যথা ছিল। সেই দেবলীনার নাকি বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেই বিয়ের ঘটকও অর্কুট। অর্কুটেই আলাপ, অর্কুটেই প্রেম। তারপর ছেলে উড়ে এল লন্ডন থেকে, বিয়ে করে দেবুকে নিয়ে চলে গেল। মনামির নাকি যমজ বাচ্চা। শিঞ্জিনীর বিয়ের এক বছরের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে। সঞ্চিতা আমাদের পরের ব্যাচের তরুণকে বিয়ে করেছে আর নন্দিতা এখনও পড়েই চলেছে। রুদ্র আমাকে স্পেসিফিক্যালি সব কয়জন মেয়ের খবর দিল বলতেই বলল, ‘বাকি পঞ্চান্নজন ছেলের খবর দিতে গেলে ওটা আর ইমেল থাকবে না মহাভারত হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং তুই প্রোফাইল খুলে ফেল।’
আমি শেষ পর্যন্ত প্রোফাইল খুললাম। নেশায় ধরল আমাকে। আমি একএক করে পুরনো বন্ধুদের খুঁজে নিলাম। বেশিরভাগই রুদ্রর ফ্রেন্ডলিস্টে ছিল। সবার অ্যালবামও ঘেঁটে দেখা হয়ে গেল। কদিন ধরে একজনের প্রোফাইলে ঢুকি তারপর এদিক ওদিক আরও কতজনের প্রোফাইল ঘুরে আসি ঠিক নেই।
বন্ধু বানানো ছাড়াও অর্কুটে অনেক কিছু করা যায়। অনেক রকম কমিউনিটি আছে দেখে সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম। তারপর একদিন ‘বাংলা সাহিত্য’ কমিউনিটির মেম্বার হয়ে গেলাম। হঠাৎ সাহিত্য কেন? গল্পের বই পড়ার মত ধৈর্য নেই আমার, তবে? বিদ্যুৎ চমকের মত মনে পড়ে গেল তাকে। ধ্বক করে উঠল বুকের ভেতরে।
তখন আমি সতের। সেও সতের। আমি ছেলেদের স্কুলে পড়ি, ও মেয়েদের। আলাপ প্রভাতস্যারের ইংরাজির টিউশনে। কি করে যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল মনে নেই। কিন্তু হয়ে গেল। তারপর রোজ একসঙ্গে টিউশনে যাওয়া, পাশাপাশি সাইকেলে। স্কুল থেকে ফেরার পথে একঝলক দেখা, চোখে চোখে। দাঁড়িয়ে কথা বললে বন্ধুরা ছিঁড়ে খাবে তাই বন্ধুরা থাকলে ওই চোখের দেখাতেই দিন সার্থক।
মা’র কাছে একদিন গল্প করলাম, ‘খুব ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে, বাংলায় যেমন জ্ঞান ইংরাজিতেও তেমনি’ ইত্যাদি। মা বললেন, ‘তাহলে ওর ইংরাজির নোটগুলো ভালো করে দেখ নিস তোর কোথাও খামতি থাকছে কিনা বোঝা যাবে।’ এই সুযোগে আমি ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলাম। আমি যত বড় হয়েছি আমার মা তত আমাকে বন্ধুদের ব্যাপারে সাবধান করেছেন। বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে। আমার জীবনে একটাই লক্ষ, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। বাবাকে কোনও দিন মা’র অমতে চলতে দেখি নি তাই আমারও সাহস ছিল না মা’র কথার অবাধ্য হওয়ার। মা আমার যে কজন বন্ধুকে বাড়িতে ঢুকতে দেন, তারা সবাই পড়াশুনোয় আমার থেকে ভাল।
পরমার মাধ্যমিকের নম্বর শুনেই মা চুপ। আমার থেকে এগ্রিগেটে প্রায় একশ নম্বর বেশি। তাই ওর আমাদের বাড়িতে আসা আটকাল না। পরমাকে নিয়ে মার মনে শুধু একটাই বিরক্তি, এত ভাল মেয়েটা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন না দেখে কেবল বাংলা গল্পের বই কেন পড়ে! পরমা না এলে আমি কোনও না কোনও ছুতোয় ওদের বাড়িতে চলে যেতাম। ওকে একদিন দেখতে না পেলে আমার দিন কাটত না। উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার আগে পর্যন্ত আমি পুরোপুরি কুপোকাৎ। এমন অবস্থা থেকে আমাকে উদ্ধার করল পরমা স্বয়ং। তাতে আমিও নিশ্চিত হলাম যে পরমা আমারই। সেই আনন্দেই আমি সুস্থ ও ভালভাবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে জয়েন্ট পর্যন্ত এগোতে পারলাম।
আমি প্রপোজ করলাম জয়েন্ট দিয়ে এসেই। পরমা মুখের উপর ‘না’ বলে দিল। এত নিষ্ঠুর কেউ হয় নাকি? আমি তো ওর একজন ভাল বন্ধু। জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, ‘রাজি হতে পারি, তুই যদি ইঞ্জিনিয়ার না হোস। আমি বাংলা নিয়ে পড়ব, ভবিষ্যতে লেখালিখি করতে চাই আর তাই পশ্চিমবঙ্গেই থাকব। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আমি কোথাও যাব না। পারবি?’
ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে থাকার কি বিরোধ আমি বুঝতে পারলাম না। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ার প্রস্তাব আমার কাছে অবান্তর। মা আমাকে কেটেই ফেলবে একথা বললে। তাই আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গিয়েছিলাম জলপাইগুড়িতে। ও গিয়েছিল কলকাতায়, বাংলা অনার্স নিয়েছিল। বাড়ি গেলে দেখা করতে চাইত না। হোস্টেলের ঠিকানায় চিঠি দিতাম, উত্তর দিত না। ফোন করলে ধরত না। এত ভাবে অপমানিত হবার পরও আমার মন মানছিল না। আমি তখন ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু শ্রুতিকে ধরলাম, ‘এরকম কেন?’ শ্রুতি যা বলল তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। পরমাকে দিয়ে মা কবেই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন এরকম সম্ভবনা যেন না ঘটে। পরমা নাকি আমার মা’র মেয়ের মত। তাই আমরা ভাইবোন, ভাইবোনে কি এসব হয়? এতকিছু বলেও মার ভরসা হয় নি, আমাদের ঠাকুরঘরে, ঠাকুরের পায়ে হাত দিয়ে পরমা নাকি মাকে কথা দিয়েছিল, ‘হবে না।’
আমি জানতাম পরমা এসব মানে না। কিন্তু ওর মত অভিমানী মেয়ে কম আছে। যা বলে তা করেই ছাড়ে। আমি পরমাকে ভুলতে চেয়েছিলাম। নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিলাম কলেজের বন্ধুদের মধ্যে।
সেই ছ-নম্বর পরমার প্রোফাইল আমি ঘণ্টার পর ঘন্টা ঘেঁটে চলেছিলাম। আমার রাতের খাবার আসত বাইরে থেকে, হোম ডেলিভারি। সে ডাব্বা পড়েই ছিল, খোলার সময় পাই নি। আনন্দে উত্তেজনায় ও হতাশার মিশ্রনে রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। পরমা বিবাহিতা। পরমা এক মেয়ের মা। পরমা লেখিকা। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম সারির ম্যাগাজিনে ওর লেখা বের হয় নিয়মিত। ওর ফ্রেন্ডলিস্টে আমার ফ্রেন্ডলিস্টের তুলনায় দশগুন মানুষের ভিড়। ওর অনেক ফ্যান। প্রতিটা ছবিতে কত কত কমেন্ট! একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, ‘তুইই জিতে গিয়েছিস পরমা, আমি তো এক অখ্যাত কর্পোরেট লেবার। আমাকে চিনতে পারিস?’ তারপর আমার বন্ধুত্ব গ্রহণের জন্যে অনুরোধ পাঠিয়েছিলাম। এরপর দিন যায়, এক, দুই, তিন ...। অপেক্ষা আর শেষ হয় না আমার। মনে অবসাদ আসে। সাতদিনের মাথায় পরমা আমার বন্ধুত্ব গ্রহণ করে। আমাকে বলে, ‘তুই তো জন্মে থেকেই হেরো। কাকিমার কি খবর রে?’
আমি জানাই, ‘মা আর ধরাধামে নেই।’
বলেছিল, ‘তাই আজও তোর স্ট্যাটাস সিঙ্গল, কেউ ধরে বিয়ের পিঁড়িতে বসায় নি। বিয়েটা করে ফেল।’
আমি বিয়ে করে ফেল্লাম আমারই এক সহকর্মীকে। ছবি দিলাম অর্কুটে। পরমার দেখা নেই। বুঝতে পারি ওর প্রোফাইল অব্যবহৃত পড়ে আছে। ফোন নম্বর চাওয়া হয় নি। দেখা করার ইচ্ছেটাও কেন কে জানে একবারও হয় নি। পরমাও বলেনি দেখা করবে। শুধু মাঝে মাঝে চ্যাট হত। তাতেই আনন্দ। ওই মানুষটা আমার মনে সেই সতের-আঠার বছরের ছটফটে প্রাণবন্ত কিশোরী। আমি যেন ইচ্ছে করেই এই ধারনার বাইরে বেরোতে চাই নি। পরমা দ্বিতীয়বারের জন্য আবার হারিয়ে গেল।
পরের দিকে বন্ধুরা একেএকে ফেসবুকে চলে গিয়েছে। ২০০৯’র দিকে কেউই তেমন অর্কুটে আসে না। তাই দেরি করে হলেও আমারও ফেসবুকে একটা প্রোফাইল হল। অর্কুট থেকে গেল শুধু পরমার স্মৃতি নিয়ে। ফেসবুক খুঁজেখুঁজে হন্যে হয়ে গিয়েছি, ওর প্রোফাইল নেই। লেখিকা হিসেবে ওর আরও নাম হয়েছে। ও নিশ্চয় এখন খুব ব্যস্ত। ইচ্ছে হলে মাঝে মাঝে ওর অ্যালবাম দেখতাম, ওকেও দেখতাম অর্কুটে। ওর শেষ প্রোফাইল পিকচারটা আমাদের ছাদে আমারই তুলে দেওয়া একটা ছবি। স্ক্যান করে লাগিয়েছিল বলে অত স্পষ্ট নয়, কিন্তু স্মৃতিটা স্পষ্ট। এই তো সেদিনও দেখলাম ওই ছবিটাই আছে। কদিন আগে এক বন্ধুর ফেসবুক ওয়ালে দেখলাম এই বছর সেপ্টেম্বর থেকে অর্কুট বন্ধ হয়ে যাবে। একটু শূন্য লাগল। এরকম শূন্যতা আগে বোধ করি নি। প্রথমবারে আঘাত পেতে পেতে অসার হয়ে গিয়েছিল পরমার জায়গাটা। সেখানে প্রেম নয় প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে দিয়েছিল অর্কুট। মনে হল সেই প্রাণটুকু হারিয়ে যাবে!

আপনার মতামত জানান