আসলে অরকুট

দীপব্রত বন্দোপাধ্যায়


কত অচেনা রোদের মত মুখ ভেসে ওঠে এখন। কবে যেন দুয়েকটা কথা, আদানপ্রদান। মিশে যাওয়ার মত তরল ছিলামনা, সামনাসামনি। দরকার হত আড়াল। সেই আড়ালের নাম অরকুট। নস্টালজিয়া? কই, না তো। অরকুট যে আমার অচেনা রোদ্দুরভরা দিন। একটা যাপনের নাম।
শুধুই কবিতা তখন। প্রলাপের মত, পাগলের মত কবিতা। কমিউনিটি ফোরামে দৈববাণীর মত অমোঘ লেখা পোস্ট করে যায় কারা যেন। বড় আদরের মত সেসব লেখা।
অথচ সময়টা তখন অদ্ভুত। ভেসে যাওয়ার হাতছানি। আশেপাশের জীবনগুলো চৌকো খোপে ঢুকে পড়ছে, মধ্যবিত্ত স্বপ্ন দেখছে। আমার সেসব নাস্তি। প্রথম ব্যাথা তখনও লেগে মনের অলিগলিতে। ঘুম না আসা রাত লেগে বালিশের শুকনো ঢালে।
বাকিরা বলবে, কয়েকটা বছর। আমি জানি, একটা জীবন। তখন কুড়ি। কৈশোরের আকাশ থেকে ঘুড়িগুলো কেটে যাওয়ার শুরু। এক বন্ধুর উৎসাহে অরকুটে পা। একটা গোটা আকাশ। আমি, আমরা, আরো কয়েকজন। আকাশের নাম একদিন হয়ে গেল ছন্দবাণী। দিল্লী থেকে ভ্যাঙ্কুভার, গড়িয়া থেকে ব্যাঙ্গালোর – মিশে গেল। আমি অনেক, অনেকগুলো কবিতা লিখলাম, অনেকগুলো কবিতা পড়লাম। সেই আকাশটা একদিন ছাপার প্রেস ঘুরে ছন্দবাণী পত্রিকা হয়ে হাতে উঠে এল।
তার আগে চারপাশটা ছিল একইরকম। সবাই একই কথা বলে, একইরকম বেঁচে থাকে। চেনা ছকটা ভেঙ্গে দিল অরকুট। একের পর এক আশ্চর্য্য মানুষের সাথে আলাপ হতে লাগল। পার্ট টু পরীক্ষা দিতে বসে মাথায় কবিতার লাইন এসেছিল, মনে আছে।
সে এক আশ্চর্য্য ক্যালাইডোস্কোপ। রোদ্দুর, কত রঙের, কত উষ্ণতার। উত্তাপ ছিল বুকের বাঁদিকে। নিজেরা নিজেদের জাহির করতাম না। বাকিরা করে দিত। যারা এখন অনেক বড়, যারা অন্য কাজে, যারা ভীষণ ব্যস্ত, যারা আর খোঁজ নিতে পারেনা, কেমন আছি, তারা সবাই জানে, যেমনি হোক, যেখানে হোক, মানুষগুলো একই আছে।
আমিও জানি। সেইসব স্বপ্নের ভাঙাগড়া, আলতো ছুঁয়ে যাওয়া, অপ্রকট প্রেম, ঝগড়া, মন কষাকষি, সে সবই আসলে রয়ে গেছে ভিতরঘরে। অরকুটের আগে আমার একটা জীবন ছিল। অরকুটের পরে একেবারে অন্য আরেকটা।
সেই অন্য জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম ক্রমশ। ফেসবুক এল, কেরিয়ার এল, ব্যাস্ততা এল। শুধু সেই চিরকুটগুলো রয়ে গেল। কি ছিলনা সেই চিরকুটে। গোটা এক-একটা মানুষ চিরকুটগুলোতে মিশে ছিল। সেগুলো আর থাকবেনা সামনের মাস থেকে। স্মৃতি থাকবে কিন্তু ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য সেই ফিরে দেখাটা আর থাকবেনা। ফিরে দেখাটাও স্মৃতি হয়ে গেল।
এখন আমি জানি, চারপাশের সব অদ্ভুতুড়ে কান্ডকারখানা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় ছিল আমাদের কাছে অরকুট। আনাজের দাম বাড়া, চাকরী চলে যাওয়া, সম্পর্কের ওঠাপড়া, সব আমরা ভুলে যেতাম ওই যাপনটার মধ্যে। অরকুট না থাক, যাপনটা রয়ে গেল। আকাশটা রয়ে গেল। মানুষগুলো।
সময়টা হারাবেনা। সেই ছেলেটা হারাবেনা। সাইবার কাফেতে বসে, রোজ নিয়ম করে ছ ঘন্টা অরকুট করে। কেন করে জানেনা। ভালোলাগে। শুধু কবিতা পড়ে, লেখে, কাটে, ছেঁড়ে।
ছেলেটা হারাবেনা। থাকবে। হাসবে। অরকুটের মতই।

আপনার মতামত জানান