স্মৃতির অর্কুট

সুস্মিতা মৈত্র


সকালে অফিসে এসে অরণি অন্য কোন কাজ শুরু করার আগে দুটো কাজ সেরে নেয়। সেই দুটো কাজ হল ওর ইমেল দেখা আর ফেসবুক দেখা। তারপর শুরু হয় ওর সারাদিনের প্রস্তুতি। ওর চাকরির ধরনটাই এমন যে এরপর সারাদিন কেটে যায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে। আজ ইমেল চেক করার পর ফেসবুক খুলে খবরটা দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক কথা হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল। আজকাল কাজের চাপে বন্ধুদের সঙ্গে খুব কমই যোগাযোগ করা হয়, আড্ডা তো দুরস্থান। অথচ এই বন্ধুরাই একসময় অরণির জীবনের একমাত্র বিনোদন ছিল।
‘অর্কুট? সেটা আবার কি?’ অরণি সুমনকে জিজ্ঞেস করে। সুমন অরণির আমেরিকা যাওয়ার মাস ছয় আগেই অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছে। ‘আরে, এটা একটা সাইট যেখানে তুই পুরনো বন্ধুদের সাথে আবার যোগাযোগ করতে পারবি, ওদের ছবি দেখতে পাবি, তোদের ছবি শেয়ার করতে পারবি’। এই ভাবেই অর্কুটের সাথে প্রথম পরিচয় হল অরণির।
সালটা ২০০৫। সোশিয়লজিতে পিএইচডি করতে সবেই আমেরিকায় গিয়েছে অরণি। পিএইচডির ক্লাস নিয়ে ব্যাস্ততার মধ্যেও বাড়ির জন্য মন কাঁদে। নতুন জায়গা। নতুন অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু সেখানে সবাইতো সদ্য পরিচিত। এই নির্বান্ধব প্রবাসে শুধু ফোনে কথা বলে অরণির মন ভরে না। ঠিক এই সময়ই সুমন অর্কুটের কথা বলল। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হবে শুনেই অরণি তক্ষুনি অর্কুটে একটা প্রোফাইল খুলে ফেলল। আর তারপরেই পুরনো বন্ধুদের নতুন হাওয়া অরণির প্রবাসের দিনগুলোর মন খারাপকে উড়িয়ে দিল।
নেশার মতো পুরনো বন্ধুদের নাম টাইপ করে এই আশায়, যে খুঁজে পেলে নতুন করে যোগাযোগ হবে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কত স্কুলবন্ধুর চেহারাই ভুলে গিয়েছিল। এখন অর্কুটের দৌলতে আবার তাদের নতুন চেহারায় দেখে অরণি আত্মহারা। মাত্রই ১২টা ছবি শেয়ার করা যায়, কিন্তু তাতেই পুরনো বন্ধুদের নতুন রূপ দেখে নেওয়া। কেউ নতুন বিয়ে করেছে। কেউ সদ্য বাবা/মা হয়েছে। কেউ নতুন চাকরি শুরু করেছে। কেউ অন্য কোথাও নতুন সংসার পেতেছে। কাকলির সপরিবার ছবি দেখে তো অবাক অরণি। তারপর তার দুই ছেলে আর তার সঙ্গে দারুণ ব্যাল্যান্স করে ওর চাকরি করার গল্প শুনে বলেই ফেলল ‘মহারানি তোমারে সেলাম’। তারপর অর্কুট এরও বিবর্তন হল। ৯৯৯টা ছবি দেওয়ার সুযোগ। একটা একটা করে নিজের ছবিও দিল অরণি। নানান সময়ের, নানান মুডের, নানান প্রাপ্তির। দেশে থাকার সময় বিদেশের দুর্গা পুজোর কথা গল্পে পড়েছে। এখন অরণি নিজেই সেই জীবনের অংশ। ওর অ্যালবামে এখন দুর্গা পুজোর ছবির সঙ্গে থ্যাংকস গিভিং এর ছবিও জায়গা পায়। কত নতুন বন্ধুর ছবিও যোগ হতে থাকল অরণির অ্যালবামে। অ্যালবাম গুলো যেন অরণির প্রবাস জীবনের ধারাবিবরণী হয়ে উঠল।
মা কোনদিন রান্নাঘরে ঢুকতে দেন নি। এখন প্রবাসে শুধু যে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয় তাই না, বাকি তিন রুমমেটের রান্নাও করতে হয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। অর্কুট থেকেই কত রান্না শিখে ফেলল অরণি। আর এখন তো শুধু নিজের জন্য নয়, ৩০ জনকে ডেকে খাইয়েও দিতে পারে। নিজের মত কত রেসিপি বানিয়েছে অরণি। যেগুলো কিনা আদতে ফাঁকিবাজি রেসিপি। সেই আনাড়ি রেসিপিও কত জন শিখে নিল আর বাহ বাহ বলল এই অর্কুটের দৌলতেই। বাংলা গল্পের বইএর নেশা ছিল অরণির। কটা বই-ই বা নিয়ে যেতে পেরেছিল? সেই অভাবও মিটল। বাংলা বইয়ের লিঙ্ক পেয়ে গেল অর্কুটের বাংলা সাহিত্য কমিউনিটি থেকে। হোক না সফট কপি। বাংলা গল্পের বই, বাঙালি রান্নার রেসিপি, পুরনো বন্ধু, অর্কুট খুব তাড়াতাড়ি অরণির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠল।
ধীরে ধীরে গবেষণার কাজে ব্যস্ততা বাড়লেও সারাদিনে কয়েকবার অর্কুট না দেখলে অরণির ভাত হজম হত না। কিন্তু পিএইচডি শেষে করে অনেকদিন পর দেশে ফিরে নতুন কাজে যোগ দিয়ে অরণি বেশ নাজেহাল। সময় নেই কাজের বাইরের আর কিছুর জন্যই। তাই অর্কুটে আর যাওয়া হয় না। সব যোগাযোগ, সব বন্ধুরা এখন ফেসবুকেই। কিন্তু ফেসবুক যেন ঠিক পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলন করাতে পারে নি। কেজো কারনেই ফেসবুক ব্যবহার করে অরণি। ওদের এন জি ও কি কি কাজ করে তার শোকেস হিসেবে আর বিদেশের ফান্ড আনার জন্যই বেশি ব্যবহৃত হয় ওর ফেসবুক প্রোফাইল।
আজ ফেসবুক খুলেই চোখে পড়ল এক বন্ধু অর্কুটের আসন্ন অবলুপ্তি সংবাদ জানিয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরণি। প্রথমে অর্কুট থেকে খুব বেশি আশা ছিল না। কিন্তু নির্বান্ধব নিস্তরঙ্গ দিনগুলোতে অর্কুট ওকে বন্ধুত্বর যে উষ্ণতা দিয়েছিল তা অরণি ভুলবে কি করে! আজ অনেক দিন পর অর্কুট খুলল অরণি। প্রোফাইল পিকচার দেখে একটা মুচকি হাসি খেলে গেল অরণির ঠোঁটে। প্রবাসে দোল খেলার সুখস্মৃতি। দেখল শেষ স্ক্র্যাপটা চার বছর আগে ওর বন্ধু চিন্তন কানাডা থেকে লিখেছিল। চিন্তন কানাডার নাগরিক এখন। কিন্তু অরণির ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় নেই। মনে পড়ল আরও কত বন্ধু এখন ফেসবুকে ওর বন্ধুর তালিকায় নেই। মনে হল এবার সময় নিয়ে একদিন সবাইকে খুঁজে আবার যোগাযোগ করতে হবে। নিজের অ্যালবাম গুলো খুলল অরণি। কত মুহূর্ত নিমেষে সজীব হয়ে উঠল।
মনে পরল কেমন তন্ময়ের সাথে তর্ক হয়েছিল আর সেই তর্কের মীমাংসা হয়েছিল অর্কুটে অরণির দেওয়া ছবি দেখে। অরণি সেবার বাড়ি ফেরার সময় লন্ডন হয়ে ফিরছিল। ১০ ঘণ্টার স্টপ ওভার ছিল। ও ঠিক করেছিল সেই সময়টুকু লন্ডনের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে নেবে। তন্ময় বলেছিল আগে থেকে ভিসা না নিয়ে রাখলে ও লন্ডনে বেরোতেই পারবে না এয়ারপোর্ট থেকে। আর অরণি বলেছিল যদি পারে অর্কুটে ছবি দেবে। আজ ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবে নাহ, ছবিগুলো হারিয়ে গেলে হবে না, অন্য কোথাও সরিয়ে রাখতে হবে। একটু আফসোস হল অরণির যে স্ক্র্যাপগুলো রাখা যাবে না। স্ক্র্যাপগুলো তো আর শুধু স্ক্র্যাপ নয়, ইতিহাস। বন্ধুত্বের ইতিহাস।
অর্কুট ওর বন্ধুহীন প্রবাসের দিনগুলোর একমাত্র বন্ধু ছিল। অনেক স্মৃতির দলিল অর্কুটের জন্য একটা মনভার করা অনুভূতি নিয়েই সারাদিনের জন্য ফাইলগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নিতে শুরু করল অরণি।

আপনার মতামত জানান