সিরিয়াসলি সিরিয়াস

ইন্দ্রনীল বক্সী


আরে! বেশ সিরিয়াসলি অরকুট করেন দেখছি! – এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন বা অবাক হওয়ার সামনে বহুবার পড়তে হয়েছে । উত্তর - বেশিরভাগ সময় উত্তরে মুচকি হেসেছি, বা বলেছি ‘ওই আরকি, যতটুকু করি সিরিয়াসলি করি বলেই মনে হয় ”। অনেকের উপলব্ধির কথাও বলেছেন আমায় “ অরকুট সিরিয়াসলি করাই উচিত নয় , দুনিয়ার ভাটের ভিড় ”

মুশকিল হচ্ছে কে অরকুটে কিভাবে যুক্ত হবে বা কোনদিকে সে তার আগ্রহ খুঁজে পাবে সেটাই আসল প্রশ্ন । আমার মনে হয় অরকূট একটা জনবহুল শহর ,যা ১০০% কসমোপলিটান, যেখানে বিভিন্ন বিচিত্র পাড়া আছে, আছে বিচিত্রতর মানুষজন , বাজার আছে ক্রেতাও আছে , ভিড় আছে ,সেই ভিড়ের মধ্যে একাকীত্বও আছে প্রবলভাবে ।আছে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, পাড়ার ঠেক , তর্ক করার প্রচুর জায়গা , নিজের সৃষ্টি মেলে ধরার পরিসর-এবং সমালোচনার সুযোগ , অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞ না হয়েও ।আছে প্রজাপতির অফিস , আছে ভিক্টোরিয়া, টালা পার্ক বা সেন্ট্রাল পার্কের মতো প্রেম-পিরিত করার যায়গা। আছে রেড লাইট এরিয়াও ।
আমাদের জানা চেনা শহরের মতই এখানেও দিব্যি মুখোস পরে থাকা যায় , অনেকেই থাকেন , নিজের আসল চেহারা –আসল পরিচয় গোপন করার অধিকার এখানে দেওয়া হয়েছে বেশ ভালোভাবেই , এতে দোষের কিছু নেই যে মনে করবে আড়ালে থাকবে , যে মনে করবে থাকবেনা । ভালো লোক-মন্দ লোক এখানেও আছে বিস্তর । কি আশ্চর্যভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একজনের সঙ্গে গড়ে উঠতে পারে বন্ধুত্ব , আবার এক নিমেষে আঙুলের অল্প চাপে শুধু ‘রিমুভ’ করতে পারেন যথেচ্ছভাবে ,যেটা আমাদের সদাহ্রন জীবনে বোধহয় এভাবে সম্ভব নয় ।চাইলে একটু পরকীয়া করে ফেলা যায় দিব্যি , অনেকেই আসে এরকম উত্তেজনার আকর্ষনে , এখানে নিয়মিত এলে দেখা যায় মানুষের চরিত্রের এক ভিন্ন মাত্রা যা সাধারন জীবনের রোজনামচায় প্রকাশ পায়না ।সেই অর্থে একরকম মুক্তিই বলা যায় ,অনেক জড়তা থেকে ।সহজেই অনেক দুঃসাহসী হয়ে পরতে পারে –কারন যা কিছু হচ্ছে তা শুধুই তরঙ্গ-নির্ভর , যার সেই অর্থে কোনো পঞ্চভৌতিক কোনো অস্তিত্ব । কি মজা তাই না !!
আপনি কি সিরিয়াসলি অরকুট করেন? – এ প্রশ্নের সঠিক উদ্দেশ্য বুঝতে না পারলেও বলি –হ্যাঁ , আমি সিরিয়াসলিই অরকুট করি । দৈনন্দীন জীবনের রোজনামচায় কিছুটা সময় রাখা থাকে অরকূটের জন্য । অরকুটে আমার যাবতীয় নড়াচড়ার বেশীরভাগটাই
ছড়িয়ে থাকে লেখা-লিখি সংক্রান্ত ক্ষেত্রে , অরকুটে না এলে আমি আজ এত দুরের পাঠক-সমালোচক পেতামই না , সেই অর্থে আমার যতটুকু সৃষ্টির ক্ষমতা এবং তার যতটুকুই বিস্তার – তা অরকুটের সৌজন্যেই পৌছেছে অনেক দুরের কারো কাছে যার কাছে সাধারন ভাবে আমি পৌঁছতে পারতাম কিন সন্দেহ , তাই সেই অর্থে ‘অর্কুট সাহিত্যিক’ তকমার নাহলেও ,অরকুটে আসার বহু আগে থেকে লেখার অভ্যাসে থাকলেও, স্বীকার করতে কুন্ঠা নেই অরকুট থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি , এখান থেকেই পাই আমি আমার লেখার অমুল্য সমালোচনা ,এখান থেকেই হয়েছে আমার বিভিন্ন ই-ম্যাগাজিন গুলির সঙ্গে যোগা যোগ-যা কি না বর্তমান সাহিত্যচর্চার এক নতুন ও অপরিহার্য মাধ্যম । পরিচয় হয়েছে এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সাথে যাদের সঙ্গে আলাপ হওয়া আমার কাছে রীতিমত দুর্লভই ছিলো এতকাল । তাইতো আমি সিরিয়াসলি অরকুট করি !

অরকুটে এসে ভালোর সঙ্গে সঙ্গে মন্দ অনেক কিছুই দেখেছি। এই বিশাল , বিচিত্র মানুষের সমাবেশে প্রাচীন মানবীয় বৈশিষ্ট্যগুলি খুব প্রবলভাবে বর্তমান – তাহলো হিংসা, দ্বেষ, গোষ্ঠিতন্ত্রের জঘন্যতা যা থেকে এই ভার্চুয়াল মহানগরের পথ-ঘাটও মুক্ত নয় । মানুষের স্বভাবের অন্ধকার দিকটিও এখানে প্রবলভাবে উপস্থিত , বরং অনেক ক্ষেত্রে আরো জোড়ালোভাবে । কারন আড়ালে থেকে , পরিচয় গোপোন করে নির্দ্বিধায় আক্রমন করা যায় যে !
দেখেছি ভার্চুয়াল সম্পর্কে গদগদ বন্ধুত্ব নিমেষে মুছে যেতে শুধু একটু আঙুলের চাপে ! ভাবতে পারেন !! মনে হলো বন্ধু হলাম এক নিমেষে ! মনে হলো মুছে দিলাম এক নিমেষেই ! এ তাজ্জ্বব ব্যাপার শুধু এখানেই সম্ভব । মনে হয় এইসব ব্যাপারে প্রথম প্রথম অনেকে অরকুট করতে এসে অভিজ্ঞতা লাভ করে তাই তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে ওঠে – এটি একটি সময় কাটানোর তৃতীয়শ্রেনীর মজলিশ যাকে সিরিয়াসলি নেওয়া কখনই উচিত নয় । তাদের দোষ দিইনা । শুধু এটুকু বলি , শহর কলকাতায় টালা বা কেষ্টপুরের খালই শেষ কথা নয় , এখানে ময়দানও আছে , আছে বিচিত্র ভিড়ে ভরা বড়বাজারও , শুধু নয়ন ভরে দেখে যেতে চাই ।
আসুন অরকুট ‘সিরিয়াসলি’ করি , খুঁজে নিই হারিয়ে যাওয়া বাল্য বন্ধু, সঠিক যোগাযোগ ।এক নিমেষে ছড়িয়ে যাওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা , প্রান্ত থেকে প্রান্তে । নিজেকে মুক্ত করি বিশ্ব – জানালায় । ছুঁইয়ে যাই প্রবাসী কোনো মধ্য বয়স্কা মহিলার একাকীত্বকে শুধু কিছু আঙুলের সংলাপে ।
কিংবা তৈরী করি নিজের জন্য , হ্যাঁ একদম নিজের জন্য সোনালী সুযোগ , যা অভাবনীয় উপস্থাপনার প্রাচুর্য , যা বিস্তর পয়সা খরচ করেও পাওয়া সম্ভব নয় ।
আমি আমার সৃষ্টির দৈনিক কিছু পাঠক পাই – এটা কি কম প্রাপ্তি ! আমি আমার নগন্য সংকলনের জন্য পাই প্রকাশক – এটা ভাবা যায়!! আমি পাই কিছু এমন বন্ধু যারা এক এক সময় প্রচন্ড সমালোচক , এবং এক এক সময় এমন প্রসংসক –যা কিনা আমার নিজেরই ঠিক বিশ্বাস হয়না মনে “ধুর, গ্যাস খাওয়াচ্ছে” এবং আমি মিথ্যে বলবো না আমি বেশ পুলকিত হই ও গ্যাস খাই নিয়মিত , যা নিজেকে উস্কে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরী ।
তাই অর্কুট আমার কাছে বেশ ‘সিরিয়াস’ একটা ব্যাপার ও আমার অন্যতর মাত্রা , যা বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় আমায় রিদ্ধ করেছে । ভাবলেও অবাক লাগে এসবনাকি শুধুই বিদুৎবাহী !

**এই লেখাটি বহুদিন আগে প্রকাশিত ‘সাম্প্রতিক সময়’ নামে একটি সুন্দর পত্রিকায় ।কালের নিয়মে বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় যা এখন আর প্রকাশিত হচ্ছেনা । এই লেখাটির সময় ‘অর্কূট’ পুরোদমে চলছে ‘ফেসবুক’ ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ।

আপনার মতামত জানান