একটি এলোমেলো স্মৃতিচারণ

আষিক


২০০৫ সালে প্রথম আলাপ অর্কুট এবং স্যোশাল নেটওয়ার্কিং-এর সাথে। অপ্রতুল ইন্টারনেট আর কলেজ পড়াকালীন হাতখরচ বাবদ বিশেষ পয়সাকড়ি না থাকায় (আমরা হচ্ছি শেষ জেনারেশন যারা ঝন্টুদার চায়ের দোকানে কে এফ সির থেকে বেশী সময় কাটিয়েছি) খুব বেশি অরকুটে আনাগোনা ছিল না। কলেজ থেকে বেড়িয়ে চাকরি জয়েন করার পর নিয়মিত ভাবে ইন্টারনেট পেলাম। তার সঙ্গে পেলাম একটি চমৎকার খারাপ খবর- আপিসে অর্কুট ব্লকড। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে ওয়ার্কঅ্যারাউন্ডের আরেক নাম, তাই প্রক্সি ব্যবহার করে কীভাবে আপিসেও অর্কুট করা যেতে পারে, এবং ম্যানেজার এসে পড়লে ঝড়ের গতিতে কীভাবে এম এস ডি এন খুলে ফেলে নিবিষ্ট মনে সি-শার্প শেখা যায় (এই ঝড়ের গতিতে অন্য একটি পেজ খুলে ফেলবার টেকনিকটি অন্য একটি বিশেষ প্রয়োজনে আমরা সবাই শিখে ফেলেছিলাম, আজকালকার ছেলেপুলেদেরও সেই কারণ আন্দাজ করতে অসুবিধা হবে না, তাই আর বিশদে বললাম না) সেসব আয়ত্ত হতে কয়েকদিনই লেগেছিল।

লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করবার মতো শুরু হয়ে গেল আপিসে লুকিয়ে লুকিয়ে অরকুট। সেই সময়ের অর্কুটে প্রাইভেসি বলে কিছু ছিল না। সবাই সবার স্ক্র্যাপ পড়তে পারত। দেখতে পেত অ্যালবাম। বন্ধুতার মতোই অর্কুটের প্রারম্ভিক জনপ্রিয়তার একটা বিরাট কারণ ছিল- এই প্রাইভেসি মডেল (বা প্রাইভেসি-হীন মডেল)। ডেটিং-সাইটের মতো সোচ্চার তাগিদ নেই, অথচ নির্লিপ্ত সামাজিক আদবকায়দা মেনেই মেয়েদের প্রোফাইলে ঘোরাঘুরি করে গার্লফ্রেন্ড যোগাড় করে ফেলবার এমন অভুতপূর্ব সুযোগ অর্কুটকে করে তুলেছিল এক অতি প্রয়োজনীয় মাধ্যম। অর্কুটে নানারকম দুষ্টুমির মধ্যে একটি বিশেষ করে মনে আছে। এক বান্ধবীর প্রোফাইলে তার আসল নাম ছিল না, আর সে তার নাম বলতে চাইছিল না। একটা পার্ল স্ক্রিপ্ট লিখে তার সব স্ক্র্যাপ ক্রল করেছিলাম। নিশ্চিত ছিলাম কেউ না কেউ ওকে জন্মদিনে উইশ করবে। আর অনেক শুভেচ্ছার মধ্যে "হ্যাপি বার্থডে অমুক" বলেও অন্তত একটা স্ক্র্যাপ থাকবে- আর ডাকনাম কী ভালোনাম কোনও একটা জেনে যাব! তা সেই সব জেনে-টেনে "তুমহারি নাম ক্যয়া হ্যয় বাসন্তি" মার্কা একখান ইমেইলও করেছিলাম। বরাত ভালো সেই মেয়ে ক্ষেপে-টেপে না গিয়ে দিব্য বন্ধু হয়ে গেছিল।

শুরুর দিকে যে কোনও লোকের প্রোফাইলে গেলেই অর্কুট দেখিয়ে দিত বন্ধুতার দুরত্ব। হাঙ্গারিয়ান সাহিত্যিক ক্যারিয়েন্তি ফ্রিগেশের "Six degrees of separation" থিওরীর আশ্চর্য সত্যতার সাক্ষী ছিলাম আমরা। যে কোনও লোক, মায় অর্কুট বুয়ুক্কোক্টেনও ছিল ছয় পা দূরে। কিছুদিন পরেই ভিড় বাড়তে থাকায় অর্কুট আর এই ফিচারটি রাখেনি। সেই ছিল আমাদের দেখা প্রথম 'পরিবর্তন'।

২৩-২৪ বছরে প্রথম বুঝতে পারি 'পরিবর্তন' একা একা আসে না। চাকরি ছেড়ে ভ্যাঙ্কুভারে পড়তে আসা, বন্ধুদের দিকবিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া- এসব বড়ো দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম অর্কুট কেবল বন্ধুদের লেখা টেস্টিমোনিয়াল, আর স্ক্র্যাপ-স্ক্র্যাপ খেলা থাকবে না। অর্কুট হয়ে উঠতে চলেছে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সূত্র। প্রথম প্রবাসে অর্কুটের কমিউনিটিগুলোর মাহাত্য বুঝতে পারি। লেখালেখির শখ ছিল অল্পবিস্তর, এক বন্ধু ছন্দবাণী কমিউনিটির খোঁজ দিয়েছিল। অর্কুট ফেসবুকের তুলনায় অনেক বেশী আন্তরিক ছিল। বহু খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকদেরও আনাগোনা ছিল অর্কুটে। প্রতিবাদী কবিতায় জয়দেব বসুর নিয়মিত আসাযাওয়া ছিল। জয়দেবদার কমেন্ট যে সব কবিরা পেয়েছেন সেইসব কমেন্ট নিশ্চয় তাদের অর্কুট যাপনের সেরা প্রাপ্তিগুলির একটি।

ছন্দবাণীর মডারেটর হিসেবে একঝাঁক সমবয়েসী কবিদের সঙ্গে আলাপ, বন্ধুতা আমার অর্কুটের সেরা পাওনা। রঙ্গীতের এস এম এস-এর আদলে টাইপ করা বাংলা কবিতা, ঋতমের লেখা পড়ে চমকে যাওয়া- দেবায়ুধের লেখা 'দেওয়াল-মানুষ' পড়ে আর ও তখনও স্কুলে পড়ে শুনে তাজ্জব বনে যাওয়া- এসব ছন্দবাণীতে ঘটেছিল। অনুরাধার 'পাতা ঝরার গতিবেগ'-এ পাতার পর পাতা ঝরে পড়েছিল কমেন্ট। আমার শুরুর দিকের কবিতাকে অনেক ভাবে পথ দেখিয়েছিলেন সুবীর-দা, অনির্বাণ দা (অনির্বাণ দা তখন জার্মানিতে)।
অর্কুটের দৌলতেই বাংলা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলা কবিতার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যেতে পেরেছিলাম। হেঁটে যেতে পেরেছিলাম অসামান্য কমিউনিটি "কবিতার গাছ"-এর জন্যও। বিদেশে বসে বাংলা কবিতা পড়ার এমন চমৎকার কমিউনিটি আর একটিও ছিল না।

কম্পিউটার সায়েন্সের জন্য অসম্ভব তথ্যপূর্ণ কমিউনিটি অ্যালগরিদম ছাড়াও আরও একটি কমিউনিটিতে প্রায়শই যেতাম- রজার ফেডেরারকে নিয়ে এই কমিউনিটিতে রাফায়েল নাদালকে নিয়ে তুলতাম তর্কের ঝড়। আজ গিয়ে দেখলাম উইম্বলডন ২০১৪ থ্রেডটায় ১৭৭২ টা কমেন্ট। অর্কুটের সেরা দিনে ওরকম একটা রোমহর্ষক ফাইনাল হলে হয় তো কমেন্ট ১০,০০০ ছাড়িয়ে যেত। এই কমিউনিটিতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ২০১৫-র কোনও থ্রেড থাকবে না ভাবতে খারাপ লাগছে। কিন্তু কেন? ফ্লপি থেকে সিডি থেকে পেন-ড্রাইভে চলে আসতে গিয়ে তো আমাদের মনখারাপ করেনি। রিডিফমেইল-এর অ্যাকাউন্ট কবে বন্ধ করে দিয়েছি, সে নিয়েও তো কোনওদিন আপশোষ করিনি। প্রযুক্তির এই বহতা চলন তো সহজ ও স্বাভাবিক, মেনে নিয়েছি। অর্কুট কেন আলাদা ?

অর্কুট আমাদের প্রথম সোশ্যালনেটওয়ার্কিং - এর হাতেখড়ি। ভ্যাঙ্কুভারের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র আষিকের সঙ্গে যে মুম্বই-এর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদস্থ কর্মচারি সৌগতর বন্ধুত্ব হতে পারে- সেই সম্ভাবনার প্রথম নাম অর্কুট। অর্কুট আমাদের দেখা প্রথম নেটসমাজের মৃত্যু। অর্কুট হচ্ছে সেই একমাত্র নাম যার জন্য কবি বলেছিলেন- "তোমার জন্যে ছাড়তে রাজি অর্কুট-ও"-

সেই অর্কুট ছেড়ে একদিন আমরা সবাই চলে এসেছি অন্য কোথাও যা একটি সুপারমডিউলার গেম ছাড়া কিছু না। একটি সুপারমডিউলার গেমে কোনও একটি বিশেষ স্ট্র্যাটেজি যত বেশী মানুষ নেবে, তত বেশী লাভজনক হয়ে উঠবে সেই স্ট্র্যাটেজি। উদাহরণস্বরূপ ধরুন পরমাণু গবেষনা। যত বেশী দেশ পরমাণু গবেষণা করবে- নিরাপত্তার স্বার্থে আপনার দেশের পক্ষেও পরমাণু গবেষণা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। তেমনি যত বেশি বন্ধুবান্ধব চলে এসেছে ফেসবুকে- তত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে ফেসবুক পাড়ি।

অর্কুট হচ্ছে সেইসময়ের কথা যখন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েনি টুইটার, রেডিট- সোশ্যাল ডেটা বলে কম্পিউটার সায়েন্সে কোনও টার্ম ছিল না। ছিল না লক্ষ লক্ষ নকল টুইট করে
প্রোমোশন- এবং সেইসব ধরে ফেলার জন্য গবেষণা। ছিল না নিউজফিড বদলে দিয়ে আমাদের আবেগ পাল্টে দেওয়া যায় কী না- সেই রকম ফেসবুক এক্সপেরিমেন্ট যা সাম্প্রতিক কালে তুলেছে বিতর্কের ঝড়। অর্কুট প্রথম ছিল- তার প্রথমসুলভ সারল্যটুকুই বোধহয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে- আজ থেকে কয়েক বছর পর যখন ফেসবুকের পাত্তাড়ি গুটিয়ে আমরা অন্য কোথাও যাব তখন হয় তো এত কিছু ভাবব না। তবে মুম্বইতে গিয়ে সৌগতদার বাড়িতে থাকাকালীন আড্ডায়, বা প্রদীপ্তর সঙ্গে হাসনাবাদে বেড়াতে গিয়ে "নো-ম্যানস ল্যাণ্ড" দেখতে যাওয়ায়, অথবা সহজিয়ার বিয়েতে গিয়ে পাতুড়ি খাওয়ার সময় খেয়াল ছিল না- আমাদের প্রথম আলাপ অর্কুটে হয়েছিল। সেই মুহূর্তগুলোই আমাকে বলছে অর্কুট কোথাও যাচ্ছে না।

আপনার মতামত জানান