উত্তম দাশের কবিতা :‘ঈশ্বরও এক কবি’

ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়
[ষাটের কবি উত্তম দাশ (১৯৩৯-২০১৪)-এর আকস্মিক প্রয়াণে নিবেদিত শ্রদ্ধার্ঘ্য]

মুহূর্তে নির্বাক হয়ে যেতে হয় এমন হঠাৎ চলে যাওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে। গত ১৩জুন দূরভাষে বাবার কাছে শুনলাম এক মর্মান্তিক খবর, কবি-অধ্যাপক উত্তম দাশ আর নেই। বিশ্বাস করতে পারা যায় না, তবু নির্মম সত্য। আমার কবিতাচর্চা, ছন্দশিক্ষা, গবেষণা, স্থায়ী চাকরি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল অন্বেষণ এই সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষটি কিভাবে নেই হয়ে গেলেন এক লহমায়, বুঝতেই পারলাম না। কোনো কোনো শুভার্থী, গুণী মানুষ থাকেন যাঁরা কাজের মধ্যে বেঁচে থাকবেন জেনেও তাঁদের দৈহিক উপস্থিতি একান্ত জরুরি বলে মনে হয়। উত্তম দাশ আমার কাছে তেমনই একজন অভিভাবক-প্রতিম মানুষ। আমার জীবনে অনাগত সুদিনে তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আর আশীর্বাদ পাব না, ভাবলে মনটা হু হু করে উঠছে এখনো। কবিতার মহাদিগন্ত ছুঁয়ে ভ্রামণিক সহাস্য মানুষটি কোন শূন্যে বিলীন হয়ে গেলেন! ইত্যবসরে তাই আমার গবেষণাকর্মের নির্বাচিত অংশ বিনীত শ্রদ্ধায় তুলে ধরলাম।

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যের নাম লৌকিক অলৌকিক (১৯৭৫), যে নামকরণেই বোঝা যায় এই কবি পার্থিব জগতে থেকেই ঈশ্বরীয় বলয়-কে ছুঁয়ে থাকতে চান। কবিতা আর নারী তাঁর জীবনের মানে খোঁজবার মৌলিক আলম্বন। এই গবেষককে দেওয়া ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে তাঁর ঈশ্বর সম্পর্কিত চিন্তন এইভাবে ধরা পড়েছে :
প্রথাগত ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু এক জাগতিক শক্তির কথা আমি জানি, যা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, পথ নির্দেশ দেয়, দুঃখ ভুলিয়ে ভালোবাসায় আন্দোলিত করে। আমার কবিতায় ঈশ্বর হয়তো বা মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বিশেষ ভাবাবেগ।
আমাদের সময়টা অবিশ্বাসের আর অবক্ষয়ের। ঈশ্বর নামক কেউ এই দুরারোগ্য ব্যাধি দূর করতে পারবে না। একেবারে একালে ভোগবাদী সমাজে ঈশ্বর ভাবনার অবকাশই বা কোথায়? চূড়ান্ত মানবিক মূল্যবোধের বিনাশ না ঘটলে অস্তিবাদী দর্শন স্থির প্রত্যয়ে দাঁড়াতে পারে না। রবিশঙ্করজীর মতো শরীর ও মনের ব্যাধি দূর করবার ব্রত নিয়ে যাঁরা আসছেন, ক্ষীণ রশ্মির মতো তাঁরা মানবমনে সঞ্চার করছেন সেই বিশ্বাস যা আবেগে স্পন্দিত হয়ে নতুন ঈশ্বরের জন্ম দেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে। (১৫ অগাস্ট ২০০৭)

কবিতার ভিতর দিয়ে যখন আমরা ষাটের কবি উত্তম দাশের সেই ঈশ্বর-কে খুঁজে পাই তার মুখ একান্তই মানবিক :

প্রেমে ও স্বপ্নে সমান
উৎসাহ পাই। শান্তির ছলনা স্বভাব ;
সংস্কারী ঈশ্বরে আছে কিঞ্চিৎ অভাব
বিশ্বাসের। স্বকীয় সত্তাকে সমর্পণ
করি দেহ অবক্ষয়ী প্রপঞ্চ এ মন। (আলোর কুয়াশা শুধু / যখন গোধূলি )

আলো-অন্ধকারের চিরন্তন দ্বন্দ্ব এই কবিতায় রূপ নিয়েছে। যেখানে আছে নাস্তি আর অস্তির দ্বিধা, তবু আলোকের প্রতি আস্থা রেখে বাঁচা। বিশ্বভরা প্রাণের প্রতি বিশ্বাস হারানো যায় না কখনো, ঈশ্বরের সৃষ্টিকে স্বীকার করে নিয়ে তবেই আমাদের পথ চলা সম্ভব :

হে ঈশ্বর, তোমার চূর্ণিত স্বর্গে ক্ষণকাল করো
অধীশ্বর, উর্বশী মেনকা নয় মর্ত্যের অলকা
সঙ্গে থাকবে, চেয়ে দেখবে আনন্দের বিচ্ছুরিত শিখা
পূর্বাপরের আকাশে বাতাসে উদ্যত খরোখরো। (শিশু চিন্তা প্রৌঢ় হয়/ ঐ)

অর্থাৎ মর্ত্যমাধুরী ছুঁয়ে কবির ঈশ্বর ভাবনা নিত্য আনন্দের সঙ্গী হতে চায়। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ যে ‘মানবসত্য’-র কথা বলেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন বিশ্বমানবমনের বাইরে কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তিনি ভাবিত নন, এই ভাবনা তার থেকে নতুন কিছু নয়। তবে নতুন করে বলা। আসলে সব কবিতাই চেনা কথাকে নতুন ভাবে বলা, কারণ সাহিত্যের কেন্দ্রীয় সুর বাঁধা থাকে মানুষেই। উত্তম দাশ ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ করেন, জাগতিক রহস্যের অন্য নাম ঈশ্বর এই জেনে মহাপ্রভু চৈতন্যের চোখ দিয়ে তাকে মানবায়িত করেন এইভাবে :

তবে কি তাঁর ঈশ্বর কর্মহীন, মহাজাগতিক বিজ্ঞান
যখন ঝলসালো, বুঝলেন – তাঁর ঈশ্বর শৃঙ্খলায়
বদ্ধ, অবিশ্বাসীর পূজা নিতে অক্ষম, ডুকরে
উঠলেন তিনি, জগন্নাথদেবের ঐ নীল শরীরে
তাঁর কৃষ্ণ অনড় হয়ে আছেন, তাঁকে প্রেমে জাগাতে হবে।...
ত্রিভুবন জানে, নিমাই সন্ন্যাস নিয়েছেন
তারও নাম প্রেম – শুধু রাধাই বলেন অঙ্গরাগ,
যৌবনের সঙ্গে যা ধর্মকে জড়িয়ে রাখে, চিরদিন... (একালের মঙ্গলকাব্য : ৪৯)

প্রসঙ্গত, এক সাক্ষাৎকারে বলা কবির বক্তব্য : ‘উৎস বিচ্যুত মানুষের কৃত্য হলো পুনরায় উৎসে ফিরে যাবার সাধনা। আর এখান থেকেই যে ধারণার সৃষ্টি হলো তাকেই একালে চিহ্নিত করা হলো পোস্ট-মডার্ন বা উত্তর আধুনিক নামে’ ( উত্তম দাশ : মনে ও মননে / ২০০৯ : ২৯)- এই ভাবনা যা তাঁর কবিতায় ঈশ্বর-ভাবনার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বময় প্রস্থান।

।। ২।।

কে তুমি বাজাও বাঁশি, পরিপ্লুত সুরের সোহাগে
আমার গৃহস্থ ঘরে আকম্পিত আলোর সম্মোহ ;
বাজাও সুরের তূর্য, মুখরিত, সংহত আবেগে
পরিশ্রুত কর তবে অবিন্যস্ত বিপুল বিদ্রোহ।

বাড়াও সবল বাহু ঈশ্বরিত পবিত্র মহান,
আমার প্রাঙ্গণ ভ’রে পঙ্কিলতা সতত অস্থির,
প্রসন্ন পুষ্পের ঋতু সর্বদেহে রেখেছি নিশান
আমাকে উদ্ধার কর, আলোকিত কর এ মন্দির। (বাড়াও সবল বাহু / যখন গোধূলি )

কার উদ্দেশে এই প্রার্থনা কবির? রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যস্বরূপের হাতে জগৎ-কে বাঁশিরূপে দেখেছিলেন, বৈষ্ণবীয় দ্বৈতবাদ এর সঙ্গে যুক্ত হতেই পারে। উত্তম দাশের কবিজীবনের সূচনাপর্বে ‘ঈশ্বর’-এর এই প্রেমিক ও উদ্ধারক মূর্তিটি আমাদের নন্দিত করে। কিন্তু ‘দেবতা’ শব্দবন্ধে যখন তিনি ছিন্নমস্তা সভ্যতাকে দেখে হাহাকার করেন, তখন উচ্চারণের ভঙ্গিমা বদলে যায় :

আলোর ইঙ্গিত রাখো হে দেবতা
আশাবরী দেবতা আমার,
প্রসারিত করো বাহু – হে দেবতা এ কোন কুহক
এ কোন দেবতা তুমি দুর্মর ঘাতক !
কোথাও দেবতা নেই, প্রলয়ের রক্ত

মেঘ নিবলে দারুণ দীপ্তি, দেবতার
খোঁজে মন্দিরে মন্দিরে ভগ্ন উৎসাহের
কাঁধে হাত রেখে করেছি উদ্ধার
এখানে দেবতা নেই, বিশ্বাসের অথবা শ্রদ্ধার। (দুঃসহ সংকট বুকে / ঐ)

এই বেদনা অস্বীকৃতির যতটা তার থেকেও বেশি নৈরাশ্যের আর্তি এখানে মুদ্রিত। বস্তুনিষ্ঠ ভোগবাদী এই সমাজে মায়ায় আচ্ছন্ন যখন মানবচেতনা, ভেঙে যেতে থাকে মূল্যবোধ, কবি কখনো স্মৃতিকাতর হন, কখনো বা প্রকৃতির সুবিশাল আয়োজনে মুক্তি খোঁজেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে কবিচেতনা ঔপনিষদিক পূষণের কথা মনে করায় :

পৃথিবীর প্রতি স্পর্শে সর্ব অঙ্গে জাগায় পিপাসা
মেঘনার ভয়াল স্রোত জীবনের গানে উন্মুখর,
স্মৃতির প্রখর তাপে জ্বলে ওঠে দৃপ্ত ভালবাসা
আমার প্রবাসী আত্মা অনুরাগে যুক্ত পরস্পর। (লৌকিক অলৌকিক )
ভালোবাসা দিয়ে স্বর্গের দুয়ারে পৌঁছনো যাবে একদিন, এই আশা ধ্বনিত হয় এই উচ্চারণে। বিশ্বভুবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁর চেতনা চায় আত্মলীন স্বকীয় বিরোধ থেকে মুক্তি :

তোমার সাম্রাজ্যে আমি সর্বস্ব হারানো ক্রীতদাস
বন্ধক রেখেছি মুক্তি এ জন্মের দেনা করি শোধ
বন্দীর বন্দনা মন্ত্র উচ্চারিত তোমার উদ্দেশে,
অথচ ঘোচে না তবু আত্মলীন স্বকীয় বিরোধ
নিশ্চিত আমার তাই চিরন্তন কাঙ্ক্ষিত প্রয়াস
পূর্বাপরে যুক্ত হই প্রতিদিন বিদ্বেষে আশ্লেষে। (সমস্ত চেতনা ঘিরে / ঐ)

প্রেমের স্বরূপে জ্যোতিষ্মান শিল্পের বন্দনাগান রচনা করেন উত্তম দাশ। তাঁর সত্তায় প্রেমের ঐশ্বর্য তাঁকে সব মালিন্য থেকে, পার্থিব জটিলতা থেকে মুক্তি পাবার পথ বলে দেয়। ‘রুণুকে’ শীর্ষক প্রেমের কাব্যে কবি দেহগত প্রেমের অনুভবকে ঈশ্বরভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে নেন :

অমরনাথের শিবলিঙ্গে হাত বুলিয়ে কি খুঁজছিলে রুণু
তোমার শরীরের মসৃণতায় আমার হাতড়ানো
নাকি দেবতার শরীরের ঠাণ্ডা রহস্য?
বরফের মধ্যে দাঁড়ালে শরীর থেকে বাষ্প বের হয়
শরীর হলো আগুনের উৎস
মানুষ শুধু সেই উৎসের দিকে যায়
ঈশ্বর দাঁড়িয়ে আছেন মৃত্যুর মধ্যে
তুমি কার পক্ষে রুণু ঈশ্বর না আমার? (রুণুকে / ১)

দেহের ভিতরে খোঁজেন ঈশ্বরের অপূর্ব দান যৌনতাকে। তাঁর শিল্পিত উচ্চারণ :

অস্তিত্বহীন আমি কোনদিক থেকে
তোমাকে চিনতে শুরু করব রুণু
আমাকে জানতেই হবে
ঈশ্বর তোমার মধ্যে আর কি কি দিয়েছেন। (রুণুকে / ১৫)

উত্তম দাশের প্রেমিক সত্তার পাশাপাশি তাঁর ভ্রামণিক সত্তার পরিচয় পাই একাধিক কবিতায়। ‘ভারতবর্ষের একজন’ কাব্যে কেদারের মন্দির প্রদক্ষিণ করে তিনি পাপ ধুয়ে ফেলতে চান, কিন্তু মানবিক পাপের তো শেষ নেই। প্রকৃতির পুণ্যময় প্রতিবেশ ছেড়ে এলেই ঘিরে ধরে সংসারের গ্লানি :

একজন মানুষের সমস্ত পাপ চোখের সামনে পুড়তে থাকলে
ঈশ্বরের সমস্ত সঞ্চয় প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছে হয়
গেরুয়া রঙের জন্য আমাদের কোনো পক্ষপাত নেই
পুড়তে পুড়তে কিছু দুঃখ
ডিসটিল ওয়াটারের মতো ফোঁটায় ফোঁটায়
কাঁচপাত্রে জমা হচ্ছে। (তৃষ্ণা / ভারতবর্ষের একজন )

কিন্তু কাকে বলবো ‘পাপ’? খ্রিস্টীয় পুরাণে মানব-মানবীর যে আদিম পাপের কথা বলা হয় তা’ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে গিয়ে যৌনতাকে জানা। কিন্তু ভারতীয় কবির পাপের চেতনা সভ্যতার সংকট তথা মানুষের মানবিক মূল্যবোধ হারানোকেই বুঝিয়েছে। রামকৃষ্ণ ব্যঙ্গ করে বলতেন ‘লোক না পোক’, আর একালে উত্তম দাশ লেখেন :

শুধু মানুষের ছবি দেখতে গিয়ে
হঠাৎ বিভ্রম জেগেছিল
পৃথিবী জুড়ে এরা সত্যিই মানুষ তো
ঈশ্বর মশাই-র মতো চোখ
সংখ্যাতত্ত্বে বুঝিয়ে দিল
এরা মনুর বংশেই জন্মেছে
পৃথিবীর জল হাওয়ার যা কিছু পরিবর্তন
সে সবই মানুষেরই কল্যাণে,
বুকের ভিতরে আঠা নেই
কিন্তু কাজকর্ম করে ভালো
চোখের দৃষ্টিও পরিষ্কার
গাছকে গাছই দেখে
আকাশকে আকাশ। (চোখ / ভুল ভারতবর্ষ )

হৃদয়হীন এক ভয়ঙ্কর সভ্যতার ছবি আপাত কৌতুকী ঢঙে এঁকেছেন কবি। অথচ অমলিন প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার পথ যেন নেই আর। মানুষের ধর্ম মৃত্যুর তপস্যায় জয়ী হতে চাওয়া, যদিও বাঁচার স্পষ্ট কোনো অর্থ আজ নেই :

কিন্তু কে ফিরিয়ে নেবে কোথায় নেবে,
আমাদের জগতে এখন আর
কে বা কোথায় বলে কিছু নেই
শুধু একটা অবিশ্বাস আছে
তারই মধ্যে আমারা গড়ছি ভাঙছি
তার মধ্যে আমরা বাঁচতে চাইছি
কিন্তু বাঁচা শব্দের অর্থ কি
সব সুতো এমন জট পাকিয়ে আছে
ঘুড়িটার আর কোনো অবকাশ নেই
আকাশহীন একটা জগতে আমাদের ওড়া
আমাদের বাঁচার তপস্যা। (মৃত্যুর তপস্যা / ঐ)

এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার ছবি। মহাভারতের সেই স্বর্গের পথ আজ আরো দুর্গম। তবু কবি হার মানেন না, ঈশ্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্নাতুর হতে পারেন :

ঈশ্বরের কাছে গিয়ে বলবো
কেমন আছেন? আমি নাকি আপনারই অংশ,
তবে এমন নাকাল করলেন কেন
আপনার অনন্তকালের মধ্যে দু’একটি মুহূর্ত মাত্র
সবে জমে উঠেছিল ভালোবাসা,
মেয়েমানুষ যখন খোলে
আপনি তার মধ্যে কথা বলে ওঠেন,
পৃথিবীতে ঈশ্বর দর্শন কি পাপ?
তা হলে নরকের জ্বলন্ত লাভায়
ঝলসাতে থাকুন, ভেবেছিলাম বলব না,
কবিতা ও মেয়েমানুষ কোনটাই আমি ছাড়তে পারব না।
দু’জনেই ভেতর থেকে পোড়ায় বলে
স্বর্গের পথে আমার কোনো কষ্ট হয়নি। (স্বর্গে যাচ্ছি / ঐ)

দেহহীন চামেলির লাবণ্যবিলাস বা কৃত্রিম কৃচ্ছ্রসাধনে তাঁর সাধ নেই। ‘মোহমুদ্‌গর’-র ভোগবাদী কবি মোহিতলাল মজুমদারের উত্তরাধিকার এখানে যেন তিনি বহন করেছেন। পাঠ-অভিজ্ঞতায় জেনেছেন, একেক জনের এক এক ধরণের মুক্তি : কারো সংসার থেকে, কারো সন্ন্যাস থেকে,কারোর বা স্বর্গ থেকে :

তাহলে আমি কোন মুক্তি চাইব?
আমার কামুকতা আমার পাপ
হে ঈশ্বর আমি কোনোদিন
এ সবের ঊর্ধ্বে যেতে চাই না। (মুক্তি / ঐ)

মানুষ জন্মকে স্বীকার করার মধ্যেই রয়েছে অস্তিত্বের অহংকার। প্রেম-কাম-কবিতা আর প্রকৃতির রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ এসব নিয়েই তাঁর মানবিক জগৎ। সাক্ষাৎকারেও তাই মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা ঈশ্বরের কথা বলেন কবি,

যুবকের প্রতিচ্ছবি বুকে উঠে এলো
ঊরু জুড়ে ব্যাকুল যৌনতা
বুকের গচ্ছিত মাংস খাবলে তুলে নিয়ে
বললে বটে যজ্ঞের সমিধ,
দেবতার ধ্যান কিন্তু আগেই ভেঙেছে।

সব কিছু মানবিক – এ শরীর, রক্ত, মাংস,
নিজস্ব নির্মাণ, সব মহাকাল খাবে
তবু যেন একবার প্রতিরোধ
বুকের অঢেল রক্তে যুবক জেগেছে।
যুবকের রক্ত ঠিক দেবতার নয়
প্রাচীন স্থাপত্য ভেঙে সেই যে দাঁড়ালো
আর কারো উচ্ছিষ্ট সে কখনো ছোঁবে না। (যুবকের প্রতিচ্ছবি / নির্মাণে এসেছে )

এই কবিতায় সত্তার জাগরণকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যেন। যে যুবকসত্তা জাগ্রত মানবসত্তা, প্রেমে-কামে-যৌবনের উদ্দীপনায় যে অকৃত্রিম। দেবতার উচ্ছিষ্টভোগী সে নয়, তারও চাই আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার। ঈশ্বরের ঘুম ভেঙে গেলে যে রহস্যের দরজা খুলে যায় তার কেন্দ্রে থাকে নারী :

শেষ ছাই নিভে গেলে
নাভিমূল পড়ে থাকে
সমস্ত স্মৃতির কেন্দ্র
জটিল বপনকারী
ঈশ্বরের নিজস্ব অণু
কেন্দ্রে যার সেই নারী দাঁড়ায়ে রয়েছে। (শেষ ছাই / ঐ)

জীবনের প্রতি আসক্ত প্রেমিক কবি কখনো কখনো সন্ন্যাসের কথা ভেবেছেন। কিন্তু কেন? শুদ্ধ হতে চাওয়ার জন্য? তবে কি এই প্রেম আর পার্থিব রূপ-রস তাঁর কাঙ্ক্ষিত থাকে না সবসময়? আসলে মাঝে মাঝে বৈরাগ্যবোধও জীবনকে পুনর্নব করে তোলার রোম্যান্টিক প্রয়াস :

শব্দ নেই, প্রার্থনাও নেই
গুহার চাতালে দু’একটি ফল
জীবনের জন্য যেন স্বচ্ছ হয়ে আছে
অর্থাৎ জীবনই সব লুব্ধতা
সব অপেক্ষার রসায়ন।
এসব তত্ত্বের জন্য আমার জীবন নয়
সব প্রত্য্যাখ্যান নিয়ে
ঈশ্বর একবার আসবেন
মুখোশ খুলে রেখে
অন্তত একবার বলবো
আমায় স্মৃতিহীন
একটা পুনর্জন্ম দিন। (প্রার্থনা / ঐ)

বেঁচে থাকার অর্থই হলো মুখোশ পরে অভিনয় করে যাওয়া। মানব জীবনকে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে চলমান ছায়ামূর্তির সঙ্গে উপমিত করেছিলেন নাট্যকার শেক্সপীয়র; যার ভিতরে আছে মিথ্যা আড়ম্বর, আস্ফালন অথচ পরিণতি শূন্যতাবোধে। তাই নতুন জীবন পিপাসু কবি এই বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে পুনর্জন্ম চান। অগ্নির কাছে শুদ্ধতা চান। প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেন নতুন জীবন। নিছক দেবতার ধ্যানে মগ্ন জীবনের চেয়ে কবিত্ব ঢের শ্রেয়। কখনো বা গৌতম বুদ্ধের পোষাক পরে জাতকের মতো অহিংসার মন্ত্রকে শরণ্য করে নেন :

এসো , এই শমীবৃক্ষের ডালে
বুদ্ধের পোষাক পরে নিই, ছদ্মবেশ
খুলে রাখি বোধিমূলে, সুজাতার
প্রণাম থেকে মুদ্রা শিখে নিই। (পোষাক / রাত্রির স্থাপত্য )

জানেন হিংসা আর সন্ত্রাসের সময়ে বুদ্ধের বাণীই স্মৃতিধার্য করে নিতে হবে আমাদের। নকশাল আন্দোলন, উপসাগরীয় যুদ্ধ দেখেছেন এই কবি। দেশ-বিদেশে হিংসার করাল ছায়া তাঁকে এই উপলব্ধিতে উপনীত করে :

এই অংশে দেবতার উত্থান রয়েছে
এই অংশে মানুষ দেখেছে মুখ
এই অংশে শ্বাপদ জেগেছে –
এ ছবির বৃত্তে আর শ্রাবণের
মেঘকাতরতা নেই, খরা নেই
শীতের চাদরে ওড়ে লতাপাতা ফুল।

স্বর্গের রূপালি নদী পরীর শরীর আঁকে
জলের গোপন দাগ,
উৎস ভেঙে নিয়ে আসে
অরণ্যের ঘ্রাণ, আনে
শ্বাপদের গরম নিশ্বাস।

অন্ধকার, তুলে আনো
ঝরণার তল থেকে
ঈশ্বরীর থেৎলানো শরীর। (ভ্রম /ঐ)

ঈশ্বরী কি কোনো নির্যাতিতা নারী? নাকি সভ্যতার ধর্ষিতা প্রতিচ্ছবি? যজ্ঞবেদী থেকে কবি এক নারীর জন্ম প্রার্থনা করেন দেবতার কাছে। সে হয়তো এ যুগের দ্রৌপদী, যার সম্মান রক্ষার্থে এ পৃথিবীকে গ্লানিমুক্ত হতে হবে পুনর্বার। আবার ‘একালের মঙ্গলকাব্য’-এ ঘটিয়েছেন প্রাগাধুনিক বাংলাসাহিত্যের আধুনিক নির্মাণ। কৃষ্ণ, রাধা, চৈতন্যদেব, মঙ্গলকাব্যের দেব-দেবী, মানুষ-মানুষী সেখানে নিজের মতো কথা বলেছে। একটি দৃষ্টান্ত চয়ন করা যেতে পারে :

এর নাম কি সন্তান পিপাসা? কাঁপলেন মহাপ্রভু।
প্রিয়া, কৃষ্ণপ্রেমে আমরা সন্ন্যাস নিয়েছি
আমরা সবাই রাধা, পরম আরাধনায় তাঁকে পেতে চাই
তুমি আমার সঙ্গী হবে না?

ভুরুযুগল ঈষৎ কাঁপালেন বিষ্ণুপ্রিয়া,
ভীরু পুরুষ, তুমি শরীর জানো না,
রাধাতত্ত্ব তুমি কিভাবে জানবে? ( একালের মঙ্গলকাব্য : ৪১ )

দেহসাধনায় পুরুষকে দীক্ষা দিতে চাওয়াই রাধাতত্ত্ব। যে রাধা নিষ্ঠাবতী প্রেমিকা আর সন্তানধারণে অনিচ্ছুক নারী। একালের গবেষক শক্তিনাথ ঝা দেখিয়েছেন :

নারীকেন্দ্রিক বৈষ্ণবতন্ত্র-সাধনায় কোন একজনের কাছ থেকে তত্ত্ব ও সাধনা শিখতে হয়। একজন নারীর সঙ্গে এ সাধনা করতে হয়। সাধক বা সিদ্ধ স্তরে যুগলসাধনায় প্রেমের গুরু নারী, তার সহায়তায় ও দেহরসে পুরুষ-সাধক সিদ্ধ হয়। রাধা কৃষ্ণের গুরু, সাধনসঙ্গিনী ও সিদ্ধির কারণ।
(অন্য এক রাধা / ২০০৭ : ১১)

এছাড়াও মনসা, অন্নদা, কালিকা, জগন্নাথ প্রভৃতি দেব-দেবীর মানবায়ন এই কাব্যে যেভাবে ঘটেছে, তাতে অগ্রজ কবি তরুণ সান্যালের মনে হয়েছে :

আমাদের লৌকিক ভুবনে যে কালকেতু ফুল্লরা মধ্যসমাজে যে বেহুলা লক্ষ্মীন্দর চান আর অতি শিষ্ট সমাজে যে বিশ্বম্ভর-নিমাই আর সবাইকে জড়িয়ে যে রাধাকৃষ্ণ এ এক আশ্চর্য বাঙালি মানববিশ্বের আবিষ্কার তো এক মহাভক্তের কাজ, নাকি যুক্তির তত্ত্ব উত্তীর্ণ হয়ে এক সৃষ্টিশীল কবির ইতিহাস দর্শনের ভেতর দিয়ে মানুষের মুখ চিনতে ঈশ্বরদর্শন।’
( উত্তম দাশ : মনে ও মননে / ২০০৯ : ৪৮)

সাম্প্রতিক কালে ‘কেদার ভাদুড়ী : তোমার জন্য’ কাব্যে ঈশ্বরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সংলাপ কিংবা মহাদিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমার ঈশ্বরী’ কবিতা সিরিজ়ে তিনি নাতনী মারিষাকে নিয়ে স্নেহের জগৎ গড়ে তুলেছেন।


।। ৩।।

আসলে আমাদের সত্তার চূড়ান্ত উন্মীলনের মধ্যেই আমরা ঈশ্বরকে পাই। ‘আমার আমি’ কবিতায় উত্তম দাশ যে ‘দারুময় প্রজ্ঞার দিকে’ যেতে চেয়েছেন সে আসলে অন্তরতরকেই ছুঁতে চাওয়া। এবং এই অনুভবে পৌঁছে যাওয়া :

আত্মও দগ্ধ হোক যজ্ঞে, প্রজ্বলনের মধ্য থেকে
উঠে আসছে সেই দেহ, কাঁখে কুম্ভ নেই,
সমস্ত সম্ভাবনার মধ্য থেকে উঠে আসছে
দারুময় এক মানুষীর মূর্তি, সৃষ্টি ও স্রষ্টা
সেই একজনই এবং একজনই সব দহনের কেন্দ্র। ( রাত্রির স্থাপত্য )

দেবতা, ঈশ্বর এই সব অভিধা নিছক কথার কথা হয়ে থাকেনি তাঁর কবিতায়। ভারতীয় বেদে-পুরাণে মানুষ ও অসুরের মতোই দেবতা একটা শ্রেণি, যারা অতিরিক্ত সুবিধাপ্রাপ্ত। কিন্তু ‘ঈশ্বর’ একটা সর্বব্যাপী শক্তি, ব্রহ্ম হিসেবেও যাকে দেখা হয়েছে। আবার এমনও মনে করা হয়েছে আদি শক্তি নারী, কারণ সেই সৃষ্টির প্রধান ধাত্রী। শ্রীশ্রী মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর দেবীসূক্তে বলা হয়েছে ‘অহং রুদ্রের্ভি বসুর্ভিশ্চরাম্যহমাদি ত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ’। ঈশ্বরের পুরুষতান্ত্রিক রূপায়ণের বিপরীতে গিয়ে রচিত হয়েছে একাধিক শাস্ত্র। আসলে সাংখ্য দর্শনে পুরুষ জড়, নারী প্রকৃতি – সৃষ্টির এই আদি রহস্য-কে যেভাবে বোঝানো হয়েছে, ঈশ্বরের স্বরূপ সেখানেই নিহিত এমন ভাবলে ভুল হয় না। তবু আমাদের থেকে বড়ো কোনো শক্তির কাছে আমরা আশ্রয় চাই, যে শক্তি মানব-নিরপেক্ষ নয় কখনোই :

তিনি বাড়তে বাড়তে অনেক বড় হলেন
ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি ঈশ্বর।
আমি নামতে নামতে অনেক নেমে বললুম
এবার আমি তবে মানুষ হই। (ঈশ্বর / প্রকীর্ণ কবিতা )

ভারতীয় ঐতিহ্য-কে স্বীকরণ করে উত্তম দাশ ঈশ্বরের কথা বলেন বারংবার, চেতনার বিস্তার চান প্রেমে ও মানবিকতায়। আকাশ ও মাটির সংগমে যে যৌনতা সেখানেই সৃষ্টির আসল খেলা। ঈশ্বরকে ভালোবেসে বলেন,

সবে ভোর হয়েছে
আমি এখন বড়মার কোলে ঘাটে বসে
আম আর কাঁঠালের শিহরণে
আমার জগৎ সৃষ্টি করছি
ঈশ্বর তুমি আমাকে চুম্বন করবে না? (স্থাপত্য / ঐ)

‘বৌদ্ধিক স্থপতি’ রূপে ঈশ্বরের (Intellectual designer) যে ধারণা আধুনিক বিজ্ঞানী উইলিয়াম ডেম্বেসকি দিয়েছেন,

Intelligent design should be understood as the evidence that God has placed in nature to show that the physical world is the product of intelligence and not simply the result of mindless material forces.
(Intelligent Designer / Wikipedia)
ভোগবাদী অহং পেরিয়ে বিশুদ্ধভাবে আধ্যাত্মিক হওয়া হয়তো যায় না আর। বরং এক জাগতিক রহস্য হয়ে তাঁর ‘ঈশ্বর’ মানুষের হাত দিয়েই রচনা করে চলেন এই ত্রিলোক ত্রিস্তর, শিল্পের জ্যোতির্ময় ভুবন। জয়-পরাজয়ের মধ্যেও অবিরাম নির্মাণে থাকা যে ‘ঈশ্বরও এক কবি’, উত্তম দাশ তাঁরই কথা বলতে চান আমাদের।।

আপনার মতামত জানান