মৌসুমী করিডরে

সুবীর বোস
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, সন্ধে গড়িয়ে রাত্রি। কেউ মাত্রাবৃত্তের পাঁচের চালে জিজ্ঞেস করে, “অবনী বাড়ি আছ?” । আমি তো জলাশয় থেকে শিখছিলাম কীভাবে রাত গলে গলে পড়ে জলের নিশ্বাসে, কীভাবে শহুরে নিয়ন আলো চুমু খেয়ে যায় সান্ধ্যশহরে গাড়ির শরীরে। আমি কী করে বলব কবিতা আগে নাকি কবিটা আগে! আমার প্রাথমিক ছন্দ শিক্ষায় কৈশোরের স্মৃতি হাতড়ানো তর্জনী যখন খুঁজে পায় “এসেছে শরৎ হিমের পরশ” – যখন মননে উঁকি মারে এই ছ’য়ের চাল – আমি বুঝতে পারি দেরি হয়ে গেছে অনেক – দেরি হয়ে গেছে কবিতার সরল ঠোঁট বেয়ে নেমে আসা শরতের মেঠো আন্তরিক চিঠি পড়তে।

কেউ বলতেই পারেন, কেন কাশফুল তো ছিল আয়োজনে। তাকে কেন বলোনি তোমার আত্মার এ নতুন তর্জমার কথা? বলেছি তো, অনেকবার বলেছি। উত্তর এসেছে, পাঠক, পাঠক, তোমার কমণ্ডুল আছে জল কই? তোমার শব্দ আছে – ছন্দজ্ঞান কই? সে কথায় টের পেয়েছি, আমার তো “ঘরে” “ভ্রমর” এলেই তা অর্থবহ। কিন্তু তখনই রোদ পড়ে আসা উঠোন থেকে কে যেন আড়াল থেকে বলে গেছে, ওরে, আগে ছন্দশিক্ষা কর, তবে না বুঝবি কী অনায়াসে ছন্দের পাটাতন বেয়ে “গুনগুনিয়ে” ওঠে “ঘরেতে ভ্রমর”! মেঘবৃষ্টিহীন এইসব লাঙল পালনের দিনে কখনও কখনও বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়েছে, “বৃষ্টি নামল যখন আমি উঠোন পানে একা/ দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাব দেখা”। স্বরবৃত্তের এমন চলনে বহুবার বোঝবার চেষ্টা করেছি “বৃষ্টি নামল যখন আমি” আর “বৃষ্টি যখন নামল আমি” এই বাক্যবন্ধের ফারাক। এইসব, হ্যাঁ, এইসব পথের বাঁকে আমার দেওয়াল ঘড়িটার চোখগুলো খুব কোমল দেখায়। সে তখন তার সমস্ত বইখাতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঝাঁপ দিতে চায় কুয়াশার অস্ফুট পাঁজরে। ঘুম আসে না, আমার ঘুম আসে না! তবু সামান্য পুঁজিপাটা নিয়ে যখন কেঁপে ওঠে আমার চোখের পাতারা – ফের শুনতে পাই – কে যেন খুব কোমল গলায় গাইছেন, “খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো”...। আহ্‌ মাতৃস্পর্শ! মাত্রাবৃত্ত! হ্যাঁ, আবার সেই পাঁচের চাল!

উফ্‌, এই সব ভাবনার হেলান দিতে গিয়ে কত যে মোলায়েম পাখি এইভাবে চশমার বয়েসের ফাঁকে ঢুকে গেল কে জানে! কবিতার বিষণ্ণ বয়ঃসন্ধিকালে কেউ যেন বলেছিল, শোনো হে পাঠক, কিছু একটা আদিম চিহ্ন, একটা টলটলে গ্লাস, আর হ্যাঁ, অবশ্যই কিছু আনুগত্য – এগুলো রাতজাগা চিলেকোঠায় জমা করলেই দেখবে বদলে গেছে তোমার শীতের পোশাক আর তোমার কবিতার ভিটেতে মুঠো খুলে দিচ্ছে সাঁতারের অদেখা মলাট। তাঁকে বলা হয়নি, একটা নির্দিষ্ট ব্যথার দিনে আত্মহত্যারও জন্মের দাগ দেখা যায়। তাঁকে বলা হয়নি, কবিতার ভিড়ে ঠোক্কর খেতে খেতে ফুটপাথে নেমে এসে আমি দেখতে পেয়েছি পাখি ওড়ার শব্দে মিশে যাচ্ছে আঁতুড়ঘরের যন্ত্রণা! এ সময় কতবার ভেবেছি কৃতজ্ঞতাগুলোকে ফিরিয়ে দিয়ে আমি সূর্যাস্তের দিকে চলে যাব। হয়নি তা। হয় না তা। এখানেও পথ আগলে দাঁড়িয়েছে এক প্রিয় কবির কবিতার লাইন, “না উড়ে থেমছ পাখি, সমস্তটা ওড়ো”। হ্যাঁ, সমস্তটা – অক্ষরবৃত্তে!

আপনার মতামত জানান