কবিতা..তুমি

ঈশানী রায়চৌধুরী
কবিতা , তোমাকে এভাবে চাই কেন ? কেন কবিতা পড়ি , কেন কবিতা ..তোমাতেই বুঁদ হয়ে থাকি, কেন ভাবি..তুমিই শেষ কথা?
যখন তোমাতে থাকি , জানো কবিতা , আমার সমস্ত শরীর হিমশীতল | কোনো আগুন আমায় উত্তপ্ত করতে পারে না | তুমি এক চন্দনের বন | যখন তোমার সঙ্গে আমার একান্ত সহবাস , আমার শরীর থেকে আমার যে কোনো প্রত্যঙ্গ বিচ্যুত হয়ে গেলেও মনে হয় কোনই বেদনা বোধ হবে না..কারণ আমি তখন এক অলীক সুখে নেশাগ্রস্ত | এ এক অন্য মাদক প্রভাব | আমার শরীর তোমাতে সাড়া দেয় , মন তোমাতে সাড়া দেয় | তুমি এক অচিন সুরে নিজে বাজো আর অবিরতই বাজিয়ে চল আমাকেও | আমি তখন তোমার হাতে খেলার পুতুল | সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে ? যাক ! ওতে আমার ভয় নেই | ওসব আমায় বিচলিত করে না | আমি উদাসীন অনাগ্রহে দেখি | কিন্তু তোমাকে ? তোমাকে আমি কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে যেতে পারি না | কারণ তুমি আমায় স্বস্থ করো , আবার তুমিই আমায় ওলটপালট করে দাও | তুমি এক রঙিন গ্রাফিটি , বিছিয়ে আছ আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে |
তোমাকে কেমন ভালবাসি , কবে থেকে, কতটা আর কেন..কিচ্ছুই জানি না আমি | কিচ্ছু না | শুধু জানি , ভালোবাসি | আর ভালোবাসি , কারণ ভালো না বেসে আমার সামনে আর দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই | কবিতা , তুমি আর আমি..আমি আর তুমি..আমরা এতই অবিচ্ছেদ্য যে তোমার হাত যখন আমার বুকে, তা যেন আমারই তপ্ত করতল আর তোমার চোখদু'টি যখন স্বপ্নে , তখন আমিও ঘুমে |
যে পথে সবাই হাঁটে , বেশিরভাগ সুখী মানুষ , সুখী পাঠক..গদ্যের পথ..আমি সে পথে হাঁটিনি | হাঁটতে চাইওনি কখনো | কারণ সহজ সুখে আমার তীব্র অরুচি | আমি খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম সেই অনন্ত রহস্যময়তা , অননুমেয়তা ..যা তুমি | তুমিই সেই বন্ধ দরজা , যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষাও যে কত মধুর , তা আমি বুঝি | দাঁড়িয়ে আছি আজীবন , কিন্তু একবারও সেভাবে চাইনি যে দরজাটা খুলে যাক | কারণ যা অলীক, তা অলীক থাকাই শ্রেয় |
কবিতা..তুমি আমার সেই রহস্যময়ী প্রেমিকা | সেই অধরা নারী | গদ্য অনেকটা পুরুষের রূপে আসে আমার কাছে | তেমন রহস্যময়তা নেই ; সব কিছু অনেক বেশি অকপট | অনেকটাই অনুমেয় |পাঠক আর লেখকের মধ্যে খুব একটা মননের কম্পাঙ্কের তারতম্য ঘটে না | ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুরণনেও অসুবিধা হয় না | হয় সঙ্গে সঙ্গেই একই তালে তাল মিলিয়ে একই সঙ্গে দুজনে সুরে বাজে অথবা পাঠক অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত সঙ্গে করে দু'পা এগিয়ে থাকে | তারপর অনুরণন হলে তো মিটেই গেল | নাহলে ? ক্ষতি নেই | হয় রোমাঞ্চ , নয় কিঞ্চিত হতাশা | ব্যস , ওইটুকুই |
কিন্তু কবিতা ..তোমার আমার আমার মধ্যে সব সময়েই রোমাঞ্চিত সংশয় | সুক্ষ্ম কম্পাঙ্কের প্রভেদ | মিলতে মিলতেও মিলছে না ! এ এক অন্য রকমের শীর্ষসুখ ! সব সময়েই আমি একটু পিছিয়ে | তোমাকে ক্রীতদাসের মতো আমার এই অনন্ত অনুসরণ | ছুঁতে চাইছি , কিন্তু ওই যে..চুলপরিমাণ ব্যবধান রয়েই যাচ্ছে ! আমার অবাধ্য জেদ..তোমাকে ছুঁতেই হবে | আমার অবুঝ রাগ..কেন আমি ব্রাত্য অকারণ অভিমান..কেন তুমি অধরা ? আবার অমোঘ আকর্ষণ | কারণ তুমি রহস্যময়ী | একবার যদি ছুঁয়ে ফেলতে পারি , জানি আনন্দ অপার ..কিন্তু এও বুঝি যে না ছুঁতে পারার আনন্দও কিছু কম নয় |তাই তোমায় না ছুঁতে পেরেও ছুঁয়ে থাকি., ছুঁয়ে যাই | কল্পনায় | এও কি খুব কম পাওয়া , কবিতা ?
কবিতা , তুমি যখন থাকো না , তখনও তোমার রঙেই আমি কথা বলি , ছবি আঁকি , লিখি , ভাবি, জাগি বা স্বপ্ন দেখি | আর তুমি যখন থাকো , তখন তোমারই হাত ধরে স্পর্শ করি নির্জনতা আর একাকীত্বের বর্ণবিলাস |
তুমি আমার নৈ:শব্দ্য আর অন্ধকারকে ভরিয়ে তোলো আলোয় |এক নতুন উদ্ভাসে | আমার সামনে এক অচেনা পায়ে -চলা পথ | তোমার হাত ধরে আমি এগিয়ে যাই এক অজানা জগতের দিকে | আমার সামনে সমুদ্রসৈকতে ঢেউ ভাঙে , আমার পারিপার্শ্বিকতায় কোনো রবাহুত বা অনাহুত অস্তিত্ব থাকে না | শুধু অনন্ত আকাশ থাকে , অশান্ত জলরাশি থাকে আর এক রুদ্ধসঙ্গীত ; যা আমার সমস্ত চেতনায় আছড়ে পড়ে প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়ে |

আপনার মতামত জানান