অর্কুটের নতুন কবিতা

যশোধরা রায়চৌধুরী


(লেখাটি ২০০৯ এর লেখা, সেই সময় অর্কুটে কবিতা চর্চা নিয়ে কবির এই কবিতাবিষয়ক গদ্যটি পুনর্মুদ্রিত হল)

কবিতা আমাদের কাছে এক ভ্রমণ ঃ এক এক কবির কবিতা আমাদের কাছে এক নিজস্ব মহাদেশ। তার ভূগোল আর ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা আর নতুন বলেই, এই ভ্রমণ আমাদের কখনো ফুরায় না। নতুন কবিদের নতুন মহাদেশগুলিকে আমরা অপরিচিতদের চোখে দেখে বিস্ময়ভরা একরকমের আনন্দ পাই। পরিচিত, প্রিয় কবিদের কবিতা চেনা দেশের চেনা চেনা গন্ধ পেয়ে স্মৃতিভারাতুর হই, অ্যাট হোম ফিল করি। শৈশবে ফিরিয়ে দেয় আমাদের কোন কোন কবিতা। কেউ কেউ আবার আমাদের নিয়ে যায় মহাকাশযানের সওয়ারে, ফিউচারিস্টিক কোন অদ্ভুত গ্রহে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সাথেই কবিতা চলে কিন্তু ফাঁক তৈরী করতে থাকে ক্রমাগত। কবিতা আমাদের দিনগত পাপক্ষয়ের অনুভুতির হাঁপধরা টানটান অবস্থার মধ্যে এক একটা ছিদ্র। যা থেকে টেনশানের বাষ্প মুক্ত হয়। সেফটি ভালভের কাজ করে কবিতা। কালো অন্ধকার এই জীবন নামের সুড়ঙ্গটার মধ্যে দিয়ে কবিতাই আমাদের চলতে সাহায্য করে। কেননা হঠাৎ কবিতার ছিদ্র দিয়েই ঢুকে পড়ে একরাশ উজ্জ্বল আলো। অনেকটা বাতাস। আর সেই উজ্জ্বলতার দিকে তাকিয়ে সহসা চোখ ধাঁধিয়ে যায় আমাদের।

কবিতা একটা স্পর্ধা। সব আশেপাশের মধ্যে একটু অন্যরকম হবার, একটু নিজের মত হবার সাহস।

কবিতা এতসব আমাদের কাছে, আমার কাছে। আমার চেয়ে অনেক আগে এসেছেন, এমন অনেকের কাছেও কবিতা এইসব। কিন্তু পরবর্তীদের কাছে? তাহলে কি আমার পরে, আমার অনুজ, মানে প্রায় হাঁটুর বয়সী, এই ধরুন ১৮-২০ বছরের ছেলেমেয়েদের কাছেও কবিতা তাইই? তারা কি আজও উত্তেজিত হয় নতুন কবিতা লিখে ? তারা কি এখনো মনখারাপ হলে কাফে বা ক্যাণ্টিন থেকে গুটি গুটি পায়ে বাড়ি ফিরে কবিতার কাছে বসে? তারা কি এখনো নিজের কাছে নিজের কথা বলার পরিসর খোঁজে কবিতায় ? মাথা ঘামায় ছন্দ নিয়ে- লেখে আর কাটে, কাটে আর লেখে ... একটা শব্দের ব্যবহার নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে মাতে?

তারা কি এসবের সময় পায়, তাদের অনন্ত টিউশন, টাইট রুটিন, তুখোড় আড্ডা আর পরীক্ষার সিলেবাস সামলে?

আজকের দিনে, আপনি বলবেন কটা ছেলেমেয়েই বা কবিতা পড়ে? কজনের সময় আছে কবিতা লেখার মত চির-মূর্খ কাজ করবার। সব্বাই তো জানে, মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়, শঙ্খ ঘোষের সেই শ্লোগান ছেড়ে আজকের সেই ছেলেমেয়েরা আসলে সবাই বেজায় সামাজিক আর প্র্যাকটিক্যাল। তাছাড়া এস-এম-এস, ইণ্টারনেট আর আই-পডের পর, তাদের হাতে আর কতটাই বা সময় বাঁচে, যে সে কবিতা লিখবে, কবিতা পড়বে, কবিতা পত্রিকা বার করবে?

হুঁ হুঁ মশাই, আসলে হ্যারি পটারের যেমন মাগল, যাদুবিদ্যার কিছুই বোজে না, তেমনি এই নেট জমানার ক্ষেত্রেও আপনি তাহলে একজন বেজায় নভিস। খবরই রাখেন না এই জেনারেশন ওয়াই আর তার হাইপার রিয়েলিটি কবিতা নিয়ে কী কী করছে।

(২)

এখন জীবনে পাশাপাশি দুটো বাস্তবতা। হাইপার রিয়ালিটি আর ভার্চুয়াল রিয়ালিটি। এটা বলার কথা নেই আর। আমাদের ঘরের ভিতরে ঢুকে এসেছে। রাতবিরেতে শোবার ঘরে বসে পিসি বা ল্যাপটপে চ্যাট করছে এখনকার যুবক যুবতী। আর সেই ইণ্টারনেট বাস্তবতা, তার যাবতীয় অনিশ্চিতি, যাবতীয় উদ্ভট নতুন নিয়মকানুনসহ, আমাদের অধিগ্রহণ করছে, পরিচালনা করছে, আমাদের সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক দুর্ধর্ষ উত্তেজনাময় ভ্রমণে, যা আপাতভাবে আমাদেরই হাতের মুঠোয়, বলা চলে মাউজের ডগায়, কিন্তু আসলে আদৌ আমাদের আয়ত্তাধীন নয়।

প্রথমে ছিল ই-মেল নামক নিরীহ বস্ত, যা প্রায় বিনা খরচে চিঠি পাঠায়। যারা বলত, ফোন ও মোবাইল এসেছে তাই পত্রসাহিত্য একেবারে ব্রাত্য, তাদের নাকে ঝামা ঘষে দিয়ে ঐ জিনিসটি খানিকটা পত্রসাহিত্যের পুরনো মেজাজ ফিরিয়ে আনলো, যদিও তাকে তুমুল্ভাবে পরিবর্তিত করে।

তারপর এল চ্যাট। ইয়াহু ম্যাসেঞ্জার বা গুগল টক বা আরো আরো অনেক চ্যাট। যা কথোপকথনের তাতক্ষণিকতা কেও ফিরিয়ে দিল, আবার ই-মেলের সাথে যুক্ত রাখলো তাকে।

তারপর এল ব্লগ, যেখানে আপনি আপনার মনের কথা, লোককে জানবার কথা, কারুকে দেখাবার জন্য ছবি, এইসব কিছুই টাঙ্গিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখতে পারবেন, যেন আপনার ওয়ালপেপার। সেখানে অন্যেরা ঢুকে, সবকিছু পড়ে, মন্তব্যও লিখতে পারবে।

তারপর এলো ওয়েবজাইন। ইণ্টারনেটে পত্রিকা। সাহিত্যের হাটে, ইণ্টারনেট ঢুকে পড়ল রমরমিয়ে, তার নিজস্ব সুবিধা অসুবিধা নিয়ে। সুবিধা, একইসাথে, আপনার লেখা পৌঁছে যাবে পৃথিবীর ৮২ টি দেশের পাঠকের কাছে। ইংল্যাণ্ডের কণা আর থাইল্যাণ্ডের তনিমা একযোগে আপনার লেখা পড়বে, তার ওপর ফুটও কাটবে টিপ্পনী পৃষ্ঠায়। অসুবিধা, ওই পড়োতে পড়তে যদি চোখের বারোটা না বাজে তো বলেছি কি!

তারপর এলো এরও বেশী জমজমাট এক ব্যাপার। পুরনো গাঁয়ে-গঞ্জের গল্পে ঠাকুরদালান বা চণ্ডীমণ্ডপের কথা পড়েছেন তো? এ তারই এক নেট ভার্সান। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। ফেসবুক, অর্কুট, ইয়ারি, লিঙ্কড-ইন,স্কুস্ট, টুইটার, হ্যানোত্যানো। এখানে আপনি আপনার ছোটোখাটো দোকানটি খুলে বসুন। নিজের ছবি, আপনি কি খেতে ভালোবাসেন, কী গান ভালোবাসেন, কী কী বই পড়েছেন (অর্ধেক গুল মারলেও বলার কেউ নেই) সব রাখতে পারেন নিজের প্রোফাইলে। ফোটো অ্যালবামে নিজের ছবি, নিজের বউ, মেয়েবন্ধু, ভাই-ভাতিজার ছবি, নিজের বাড়ি, নিজের বিদেশভ্রমণ, নিজের ভালো লাগা হিরো-হিরোইনের ছবি সব রাখুন। সবাইকে দেখানোর জন্য নিজের ব্যক্তিগত কাম পাবলিক জীবনটাকে খুলে বিছিয়ে রাখুন।
তারপর বন্ধু-বান্ধব ডাকুন। তাদেরকে বসান, পাত পেড়ে দিন। তারাও ইতিমধ্যে তাদের প্রোফাইল খুলেছে।সবাই সবার হাঁড়ির খবর জেনেছেন। বা জেনেছেন বলে ভেবেছেন। এবার আড্ডা শুরু করুন। এ আড্ডা ওয়ান টু ওয়ান নয়, এ আড্ডা সবাই মিলে। চ্যাটের গোপনীয়তা এখানে নেই,সব খুল্লামখুল্লা। যে কেউ যে কারুর স্ক্র্যাপবুক পড়তে পারেন। যে কেউ যে কারুকে লেখা অন্যের বক্তব্য, সোজা বাংলায় স্ক্র্যাপ, পড়োতে পারেন। এই স্ক্র্যাপবুকে একজন আরেকজনকে নিয়ে টিপ্পুনি কাটতে কিন্তু একটু সাবধান, কারণ তৃতীয় ব্যাক্তি সেই টিপ্পুনি পড়ে ফেলবে, এবং তা আরো কারুকে জানিয়ে দেবে। অনেক বান্দাই এখানে এর ওর স্ক্র্যাপবুক পড়ে পড়ে বেড়ান, আর পড়বেনই না নিজের স্ক্র্যাপবুক থেকে অন্যের স্ক্র্যাপবুকই তো বেশী মুখরোচক। কানে অন্যের কথা গেলে কান তো খাড়া হবেই, আর সেখান থেকেই শুরু হবে আপনার চুকলি প্রবণতা, ‘আরে আরে কাল তুই সাদাকে বলেছিলি লাল’ প্রবণতা।

অর্কুট কিন্তু খুব নেশার জিনিস। অনেকসময় আপনাকে ঠেলে দেবে আত্মবিজ্ঞাপন, মিথ্যা ও চতুরতার দিকে। এখানে মানুষ নিজেকে মুখোশের সাথে, এবং মুখোশ নিজেকে মানুষের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। নিজের প্রোফাইলে আপনি নিজের নামে না থাকতে পারেন, আপনার নাম হতে পারে, রোদনভরা এ বসন্ত। আপনার নাম হতে পারে আরব গেরিলা। আপনার নাম হতে পারে বারান্দায় রোদ্দুর-ও। নিজের শহরকে কোলকাতা বা দুর্গাপুর না লিখে আপনি অনায়াসেই লিখতে পারেন টিমবাকটু বা বোম্বাগড়। এখানে একযোগে বহুজনের সাথে লাইন মারা যায়। একটি পুরুষ এখানে মেয়ের আই-ডি খুলে বসে একসাথে দশজন পুরুষের সাথে প্রেমালাপ, থুড়ি, প্রেম-স্ক্র্যাপ চালাতে পারে। এখানে অশ্লীল ভিডিও লেনদেন হতে পারে। একটি গুরুগম্ভীর ‘ব্যক্তিগত’ (?)
মনন ঋদ্ধ স্ক্র্যাপ লিখে সেটি একাধিক ব্যক্তিকে পাঠানো যায়। অন্যের স্ক্র্যাপবুক থেকে বেমালুম জিনিসপত্র টুকে দিয়ে নিজের বলে চালানো যায়। ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব নতুন নতুন রকমের ফেরেব্বাজির, উপর চালাকির এবং দু-নম্বরির ইতিহাস নিয়ে অনেক অনেক লেখাটেখা হবে।

তবে অর্কুটে সবই উন্নততর গসিপ বা গালগল্প কি? অন্তত প্রথমে তাই মনে হবে। তারপর দেখবেন, এই স্ক্র্যাপেরই কত সম্ভাবনা। এর মধ্য দিয়ে ছবিকে ছবি, কবিতাকে কবিতা, এমনকি আপনার প্রিয় গানের ভিডিও, এমনকি আপনার কোনো প্রিয় সাইট বা ব্লগের লিংকও চলে যাচ্ছে। অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। এরপর আপনি বানাতে শুরু করবেন কমিউনিটি। যেকোনো বিখ্যাত বিষয় নিয়ে কমিউনিটি বানান, তারপর সেখানে নেমন্তন্ন দিন লোকজনকে, তারপর বিষয়ভিত্তিক আলোচনা চালান। সবার সাথে ভাগ করে নিন আপনার মতামত।

আসলে একজন কবি- সে অর্থে একজন শিল্পী, একজন সিনেমাপ্রেমী, একজন গানপাগল প্রত্যেকেরই অর্কুট থেকে অনেক অনেককিছু পাবার আছে। অনেককিছু করতে পারা যায়, অনেকের সাথে মিলে এই নেট দুনিয়ায়। যেমন ধরুন আপনি আপনার প্রিয় গানের ছবির ভিডিও রাখলেন। আলোচনা করলেন সমমর্মীদের সাথে। আপনি একাধিক নতুন কাজ (আপনার আঁকা ছবি, তোলা ফটো বা আপনার কবিতার ছবিরূপ) অ্যালবামে তুললেন। আপনার বন্ধুরা সেটা দেখতে পেল। আপনার লেখা বা ছবি নিয়ে আলচনা বা কমেণ্ট হল। কখনো তা ছ্যাবলামো কখনো তা সত্যি সিরিয়াস। নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে, অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতা, প্রিয় কবিদের কবিতা, এসব অ্যালবামে রাখা ও শেয়ার করা, নিজেদের নিয়ে ঢক্কানিনাদ ও অন্যদের নিয়ে পরচর্চ্চা। এ তল্লাটে সবই সম্ভব।

একজন কবির পক্ষে, বিশেষত যিনি কফি হাউসের ধোঁয়া আর উঁচু ডেসিবেলের আওয়াজে অসুস্থ হয়ে পড়েন, এর চেয়ে ভালো শেয়ারিং আর আর আত্মপ্রসন্ন পরস্পরপিঠচুলকুনি, দুয়েরই জায়গা মেলা ভার। রবি ঠাকুর বেঁচে থাকলে অর্কুট করতেন কি? জানতে ইচ্ছা যায়। কেননা, যদ্দূর জানি ভদ্রলোক সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চাইতেন। আর, তাছাড়া কোনো কোনো নিন্দুকের মতে, লোকটির হাতে সময় ছিল প্রচুর। রুজিরুটির ধান্ধায় দিনাতিপাত করতে হত না তো !

কোনমতে জীবননির্বাহ করেও, আর হাতে একেবারেই সময় না থাকলেও, যেভাবে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকি, উনি না জানি কি করতেন।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এখন ভৌগোলিক দূরত্ব একটা কঠোর সত্য। সে দিক থেকে নেট জগৎ তো এমনিতেই আমাদের সকলের কাছে এক পরম নির্ভরযোগ্য রিয়ালিটি, যোগাযোগের মাধ্যমই বলুন আর নিজেকে সর্বদা ভাসিয়ে রাখার উপায় হিসেবেই বলুন।

এই জগতের কাছে একটাই চাহিদা আমাদের। প্রতিদিন নতুন নতুন কিছু উপাদান, মালমশলা সাপ্লাই করে চলুক এই জগৎ। কিন্তু অর্কুট থেকে সবচে বেশী করে যেটা পাওয়া গেছে সেতা বোধয় এই, যে এই অর্কুট আমাকে দিয়েছে একঝাঁক নতুন কবির সাথে পরিচিত হবার সুযোগ। এই ২০০৯ এ দাঁড়িয়ে যাদের বয়স ১৭ থেকে ২৮-২৯ এর মধ্যে। এই তরুণ তরুণীদের কবিতা আমার পক্ষে এভাবে, এত বেশি বেশি পরিমাণে, পড়া সম্ভব ছিল না অন্য কোনোভাবে। পত্র-পত্রিকায় এখনো এদের অনেকেই পা রাখেনি। এদের লেখালেখি অর্কুটের নানা কমিউনিটি বা নিজের অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ, ওই নেটজগতের আনাচে-কানাচে, কবিতা কার্ড ও ব্লগে-ই তারা শুধু পাবলিশড। কটা ওয়েবজিন, মানে ইণ্টারনেট ম্যাগাজিন সাকুল্যে বেরোয় জানেন বাংলা ভাষায়? তাদের সবকটার হিসেব আমি জানিনা মশাই, সত্যি জানিনা, তবে এটুকু বলতে পারি অর্কুটের মাধ্যমে আমার নজরে এসেছে মোট ১৫ থেকে ২০ টা ওয়েবজাইন। তার ভেতরে বাংলালাইভ বা পরবাসের মত প্রতিষ্ঠিত ই-পত্রিকাকে আমি মোটেই ধরছি না, ধরছি না চল্লিশ পেরনো আমেরিকাবাসী গৌতম দত্তের উড়ালপুলকেও। আরো ঢের ঢের কাগজ আছে, যা সম্পাদনা করে অনুর্দ্ধ ত্রিশ ছেলেপিলেরা, আর তারা কেউ যে আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার থাকে তাও নয়, ব্যাংগালুরু, হায়দ্রাবাদ, বা পশ্চিমবঙ্গেরই আশেপাশে নানান জায়গা থেকে তারা বার করে চলেছে মূলত কবিতা-কেন্দ্রিক নেট পত্রিকা, অভীক দত্তের আদরের নৌকা, শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের রোদরং, প্লাবন দাসের বাউণ্ডুলে, রোহণ কুদ্দুসের সৃষ্টি এগুলো তো আছেই, উঠে আসছে আরো অনেক কাগজ, তাদের কোন কোনটা আবার অর্কুটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেও ছাপছে হার্ডকপি কবিতাপত্রিকা, মানে সাদা বাংলায় কাগজে ছাপা পত্রিকা। কালবারণের হাত নিশপিশ, বা শ্রেয়সীদের এবড়োখেবড়ো রঙ ও কাকতাড়ুয়া এই দলের। কর্ণিকা, দলছুট, গল্প ও কবিতা, সৃজন ও গুঞ্জন, অনিকেত এমন হাজারো ই-পত্রিকা ও কমিউনিটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নিজেদের অস্তিত্বের অহংকারে, নিজেদের লেখা পড়ার ও পড়ানোর উৎসাহে। লেখা যেমনই হোক, রয়েছে তো !

(৩)
একঝাঁক নতুন লেখা, উড়ন্ত হরিণের সোনালী খুরে পাথরের উপর ধাক্কা লেগে ছিটকে ওঠা একরাশ জ্বলন্ত তারা। এসেই আমার আলাপ হয়েছে এইসব নতুন কবিদের সাথে। এক একটা লাইন তার তরতাজা ভাবে ও ভাষ্যে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একেবারে নতুন বলেই তারা সুন্দর। গ্রামার ও বাংলা কবিতা পড়ার দীর্ঘ চালচিত্রকে কখনো কখনো বা ছেড়ে দিতে হয়, দেখতে হয় আবার প্রথম থেকে, এখনকার ১৭-১৮ বছরের যুবক কি বলছে, কী ভাবছে, কী লিখছে। এখনকার যুবকেরা, যাদের বয়স আমার চাইতে অন্তত ২০ বছরেরও কম, তারা প্রেমে পড়লে কীরকম লেখে, প্রেম ভেঙ্গে গেলে? ব্যর্থ প্রেম থেকে উঠে?

প্রতিটি সময়েরই আছে নিজস্ব কণ্ঠ, লেখার মাধ্যমও হয়তো হয়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন, প্রজন্মগত তফাতে সেইসব কণ্ঠকে মনে হতে পারে অসংস্কৃত, এমনকি কখনো বা অশালীনও, কিন্তু এই নতুনদের হাতেই ত বাংলা কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার, তার বাচনকে পালটে নেবার ভার- তাই না ?

সেগুলো জানতে পারার মাধ্যম হিসেবে অর্কুট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সদ্য হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ করা একটি ছেলে যদি লেখেঃ

নির্জন কোনো নদীর নাম হলে
দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়

নির্জন কোনো নদীর নাম হলে খারাপ শোনাতো না
আমি তার চুল ছুঁয়ে খুঁজে আনতাম এ শতাব্দীর কোহিনূর
আর ঢেউ-এ আকাশ ও মেঘ ভিজিয়ে সূর্যাস্ত এনে
নির্জনের গা ঘেঁষে যেসব পাখি এসে বসত
একেক করে তাদের সকলের ঠোঁটে চুম্বন দিতাম
নির্জন আমাকে একাকীত্ব দেয়, আমি তাকে উলটে দিই সঙ্গ
আর বলি একা থাকলেও তো ভালোবাসা যায় অন্তত নিজেকে
আর নিজেকে নিস্বার্থ ভাবে ভালোবাসতে শেখাও কম কিছু নয়
যখন শিমূলেপলাশে একে একে ঝড়ে গেছে শতকের বহুপ্রিয় ফুল

নির্জন আমাকে বলে ‘ভালো থেকো’
ভালো থাকা সম্ভব যদি আবার করতে পারি
দোষ নয়, পাপ নয় শুধু কিছু ভুল...




প্রেমিক থেকে হারামি হবার পর
দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়

যখন ভালোবেসেছি... যখন নিজস্ব হৃদয় লোন দিইনি কাউকে তখন
ভালবাসা ফিরে না চাইলেও আমি চেয়েছিলাম কিছুটা আশ্রয়
কিছুটা স্রোতের শব্দ আমার বধির কানে
কয়েকটি দৃশ্যপট যেখানে আকাশের রঙ অনেকগুলো বিস্ফোরণের পর-ও
ধূসর নয়, নীল থাকে... পাহাড়ি নদীগুলো ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসেও
শুকিয়ে ফেনা হারায় না, সিক্ত করতে রাজি থাকে
আমি বৃষ্টি চাইনি, ঝড় চাইনি... আকাশ চেয়েছি... আকাশ
আসলে আকাশ বিশাল একটা শূণ্যতা বা ফাঁকি বলেই এত জৌলুস ওর,
এত মোহ, এত উদারতা... এত মেঘের আড়ম্বর আর বহর
আর তার বিনিময়ে সমস্ত কিছুই বিলীন করে দিতে দ্বিধাহ্নিত হইনি আমি
আমার আঙ্গুলগুলোকে পাঞ্জা থেকে আলাদা বলেছি ছুঁয়ে এসো স্রোতের চোখ
আর বাকি শরীরটাকে কাঁটার ওপর বিছিয়ে রক্তাক্ত করে ওকে আগলে রেখে বলেছি
স্রোতের যেন একফোটা আঁচড়ও না লাগে...
তবুও তারপর যখন ভর্তসনায় ফোন কেটে দেওয়া হয় আমি এইরকমভাবে চিল্লে উঠেছি
স্রোতের ঝাপটা আঘাত হানলেও আসলে তা ভীষণ সুন্দর

আসলে পাহাড়গুলো এত রুক্ষ ভয়াল বলেই তারা অসামান্য
আমি এই পাহাড়ের কোলে, সমুদ্রের অতলতায় তাই মার খেলেও
বিন্দুমাত্র ঘেন্না করতে পারি না তাদের

শুধু মাঝেমধ্যে... খুব খুব কম
যখন শুনতে পাই প্রেমিক থেকে বিনা কারণেই হারামি হয়ে গেছি
তখন দুঃখ হয় ... কিছুটা দুঃখ হয় ।।

তখন মনে একটা আশার সঞ্চার হয়। কারণ ভাষা তো জীবিতের। ভাষা তো পরম্পরারও। কারণ আজকের কবিরা কাল প্রাজ্ঞ ও বয়স্ক হবেন, এবং সময়ের নিয়মেই তাদের জায়গা নিতে হবে নতুন একদল কবিকে। সেটা না হলেই তো একটা ভাষার জন্য খুব ভয়ের কথা। অথচ এখানে আমরা দেখছি, না, মৃত্যুর কোনো লক্ষণ নেই বাংলা কবিতার। তা রীতিমত জীবিত এইসব তরুণের হাতে। যদিও এদের কারুর লেখাই প্রায় কোনো প্রকাশিত প্রিণ্ট মিডিয়ায় আপনি পাবেন না। যথেষ্ট পরিণত হয়েও এরা যথেষ্ট নতুন। এদের ডিকশন সম্পূর্ণ নিজস্ব না হতে পারে, ভাব একেবারেই অনুভূত। বানিয়ে কবিতা লিখতে এখনো শেখেনি হয়ত। তাই।

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবর্ষি সরকার বা চান্দ্রেয়ী দে-দের হাতেই তো আমাদের বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ রচিত হবে। রাকা দাশগুপ্ত বা দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়রাই তৈরি করে তুলবে বাংলা কবিতার নতুন ডিকশন। তা, শুনতে পাই, আজকের এই ওয়াই প্রজন্ম নাকি বইটই পরে না, লেখালিখির অভাবে বাংলা কবিতা নাকি মরে যাচ্ছে? তবে এগুলি কি? এইসব নতুন ও আশ্চর্যভাবে আবেগপ্রবণ কবিতা আবার বাংলা কবিতার শরীরে রক্ত মাংস ভরে দিচ্ছে না কি?

“সন্ধ্যেগুলোর বিরল ইঙ্গিতে
অলি-গলি দিয়ে বয়ে যায় মাটি-ধোয়া জল,
আর আমরা একমনে চিত্রকল্প এঁকে যাই...
নাকে টেনে নিই সলতে পোড়া গন্ধ,
কচি ভুট্টা সেঁকার মিষ্টি গন্ধ।
আমরা বিক্রি হয়ে যাই প্রকৃতির কাছে।
পরে অনেক রাতে,
যখন প্রকৃতি থেকে রাষ্ট্রের কাছে হাত-বদল হই,
রাতগুলো যখন অনন্ত লাগে, আর দিনগুলো অসহ্য...
বিবিধ তরল পদার্থকে অনুভব করতে করতে
তখন আমরাও ক্রমশ তরল হয়ে যাই।
আমাদেরকে তখন অনায়াসে বোতলে পুরে ফেলা যায়।

আমি এবং আমরা দিব্যি বুঝতে পারি,
চোখ বেঁধে রেখেও হলফ করে বলতে পারি,
হাতে হাত না রেখেও যায় বেশ কিছুটা পথ হাঁটা।
ঠোঁটে ঠোঁট না রেখেও বেশ কিছু কথা।
যদি জানতে চাও, বাদবাকি ধূসরতা?
তার জন্য ঠোঁটে ঠোঁট রাখাটা আবশ্যকতা।”
যে ছেলেটি এই কবিতাটি লিখেছে, তার বয়স তেইশ, সে রণজিৎ দাশের কবিতা পড়ে, পড়ে প্রনবেন্দুর কবিতাও। সে পড়ে আবার রাত জেগে গান শোনে, ইনটারনেটে, ডাউনলোড করে এই সময়ের ইংরিজি গান। সমর্থন জানায় লালগড়বাসীর প্রতিরোধকে, আবার চে গুয়েভারার ছবি আঁকা গেঞ্জিও পরে। তার নাম অরিত্র দে, তার আরেকটি প্রমের কবিতা এইরকমঃ
“যাও।
ঘুমন্ত মেয়েটিকে ডেকে তোলো।
তাকে বল, ভালোবাসি।
বারংবার চিৎকার করো।
হাহাকার করো।
গর্জিয়ে উঠে বলো, ভালোবাসি।
মিনতি করো।
হাঁটু গেঁড়ে বসে বলো, প্লীজ! প্লীজ! প্লীজ!
হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠো, ভালোবাসি।
শিরা কাটো।
অথবা জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা।
আকণ্ঠ মদ গেলো
আর অনুভব করো, আমরা কি ভয়ানক একা।
মনে করে দ্যাখো, কি দারুণ ঘুম এনে দেয় স্লিপিং পিল।
অনুভব করো, যা কিছু নীল-
ব্যথা, দৃশ্য, নেশা,
নষ্ট নারীর সাথে মেলামেশা...

সব-ই থাক।
শুধু তুমি যাও।
শুধু তাকে ডেকে তোলো।
আর বলো,
আজও আমরা সবকিছু ছাড়তে রাজি
যত অভিনয় আর ফ্লার্টবাজি।
যদি অস্ফুটেও বলে ওঠো, ভালোবাসি।
জেনো,
আমরা আজও ভালোবাসায় আছি।”

“এবার ওই ভেজা চোখের তরুণীটিকে এখান থেকে চলে যেতে বলো,
ভালোবাসা আমার কাছে আর অনিবার্য এক শব্দ নয়।”

“আমি এক দুর্বিনীত যুবক।
স্পর্ধিত, দম্ভিত, অহংকারী, নিষ্ঠুর তাই...
ট্রাম লাইনের তারে আটকে থাকা মেঘলা বিকেলগুলো আমার চাই।”

...
“আমি তাকে কষ্ট দেবো, কাঁদাবো, নিবিড় আদরে ভরাবো – আমি চাই।
ভালোবাসার কবিতাগুলো ঘৃণার আগুনে পোড়াবো – আমি চাই।

নীল ডানাওলা পরী, দেবদূত, নরকের নেমেসিস – আমি চাই।
সেই কিশোরীটির শরীরে ঢুকুক আমার চুম্বনের বিস – আমি চাই।”

এইসব লাইনের রচনাকালে, আমরা জিজ্ঞাসা করবো না, সে কোন কোন বিখ্যাত কবির কবিতার পঙক্তি চোখের সামনে নাচতে, ঘুরে ফিরে বেড়াতে দেখেছিল। ভাববো না, টার উদ্দীপনার বিষয়বস্তু কেবলি বড় কবিদের মতো লেখা, নাকি নিজেকে উন্মুক্ত করে, অথবা শুধুই কবিযশোপ্রার্থনা কিনা। তবে এটা ঠিক, এখনো কোনও প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় সে তার কবিতা ছাপেনি।

আমরা জানতে চাইব না, কেন তার লেখা এতো অসংস্কৃত ও দুর্বিনীত। অর্কুট থেকে পাওয়া এই কবিকে আমি শুধু পড়তে চাই আজকের সদ্য যুবকের অনুভূতির অথেনটিসিটি, তথা বাংলায় যাকে বলে সততা সেই জায়গা থেকেই। অনেক অনেক নন্দিত, চর্চিত লাইন যার কাছে হার মানে।
অভিষেক মুখোপাধ্যায়ের কবিতা আরও বেশী পরিশীলিত, ভাস্কর চক্রবর্তী প্রনবেন্দু দাশগুপ্তর ঘরানায় দীক্ষিত।
“দিনগুলি খুব স্বাভাবিক ভাবে কাটতে থাকে
অর্থাৎ কিছু দুর্লভ সমীকরণ পিছু ছাড়েনা।
এক অক্ষৌহিণী ইতিহাস
ঘূর্ণমান রোদের আকার নেয়।
উতল পারফিউম, অন্ধকার নাভি, সজীব স্তন...
চালচিত্রের মতো ভাঙতে থাকে
তর্কহীন ঠোঁটের কাঁচ।
নীল কাগজগুলো হয়ে ওঠে প্রতিষেধক
অথবা অন্তহীন আদিম পতঙ্গ।
কিছু ভ্রুহীন বৃষ্টি শাবক
ভাঙাচোরা ইঞ্জিনকে বাসা ভেবে বসে...”

রিতম সেন এক তুখোড় শব্দশিল্পী, কবিতার ভেতরে সে ভাষা ভাঙচুরের দিশা খোঁজে। ফলত তার কবিতা দাঁড়ায় এই রকমঃ

“বালিকা জলের ধারে মুখ দেখে বিন্দু বিন্দু চুল
পুরনো বাড়ির কোণে উড়ে যায় আদুড় পতাকা
নীলরঙা চাদরেরা ব্যথা পায় আঙুল বুলিয়ে
একঝাক রূপকথা অন্ধকারে ঘেঁষে বসে থাকে।
এরপর সন্ধে আসে ট্রামে চড়ে খাতার বাঁদিকে
আঁধার মার্জিন টেনে শুয়ে পরে ব্রিজের বাহার
টিপ টিপ করে তার মাথায় টিপের ঘুম ভাঙে
এবছর তাড়াতাড়ি শহরের শিলং পরে গ্যাল।

চন্দ্রেয়ী দে-র কলম এখনই আত্মবিশ্বাসী এবং সংযত। সে এক একটা শব্দের ভেতরে পুরে দিতে চায় একটা বিশ্ব, তাই তার হাত দিয়ে বেশি শব্দ বেরবেনা কিছুতেই।
সামান্য রাগ হয়ে আছে,
কানের পাশে মশা উড়ছে
রুমমেটের কাল পরীক্ষা
টপ টপ জল পড়ছে
বাথরুমে; মাথার ভেতর;

পড়ছে। কিন্তু গড়াচ্ছে না।

সেলফোন বন্ধ করে দিলাম,
দু-একটা মাছি উড়ছে, মাঝে মাঝে
ফোনের উপর বসছে,
ঘুমিয়ে পড়ছি...
পড়ছি। কিন্তু গড়াচ্ছি না।

এই অর্কুটই আমার আলাপ হয়েছে সঞ্জয় দত্তর সাথে, নিরিবিলি নির্জন কবিতায় সে পা রাখে। কোলাঘাটে এক কমপিউটার-জড়িত কর্মে সে পেশাগতভাবে জড়িত, কিন্তু তার লেখা নেট জমানার মতো উচ্চকিত নয়। সে নানা কবির কবিতার বই খুঁজে খুঁজে এনে পড়ে, এবং তার নিজস্ব গভীর পাঠে সেইসব কবির লাইনগুলিকেও উজ্জ্বল করে তোলে স্ক্র্যাপে স্ক্র্যাপে। একটা কবিতার বইয়ের জেরক্স কপি জোগাড় করে তার উল্লাসঃ দেখলাম, কবিতার কোনো জেরক্স হয় না।

রাকা দাশগুপ্ত লেখে নিজস্ব নির্মাণ সচেতনতায়। তার একটি শব্দকেও কাটা যাবে না, ফেলা যাবে না। রূপদক্ষ রাকার হাত অনেক প্রত্যাশা জাগায়। তার একটি কবিতা পড়াবার লোভ সামলানো কঠিন।

দামিনী দমকে সখি, ডর লাগে মোহে।

জানালার গ্রিল ধরে বসে আছি রেখাচিত্রবৎ।
অদূরে আকাশ কাঁপে। যেন কোন প্রাচীন ধ্রুপদ।
শত শত মেঘবর্ষ পার হয়ে নেমে আসছে মহাসমারোহ

ধুলোময় তানপুরা। বলো, আজ কোন স্বর লাগাবো আরোহে –

দেবর্ষি সরকারকে আবার এদের দলে ফেলা যায় না। সে ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, একটি বই বেরিয়েছে তার। তবু, তার সাথে হয় তো আমার আলাপ-ই হতো না, অর্কুট জগতে না এলে।

ভাঙা জাদুর আয়না, তার মধ্যে শুয়ে আছি
সাদা হাড়ের ওপরে কারুকাজ
মেঘের খুলি ছিটকে এসে পড়েছে লাল টুপির পাশে
তুমিও পথে নামলে মহারাজ!

চাঁদমারির নিশানা স্থির, তীরের ফলা-বোধি
রক্ত মেখে ছুটেছে তসবির
কে তাকে আজ প্যাথোস দিয়ে ধুয়েছে তার স্বভাব দোষে ?
বিশু পাগল, রক্তকরবীর ?

পন্থা থেকে হাত বিশেক দূরেই তবে পিলার গাঁথি
পালকহীন ডানায় বাঁধা শ্লোকে
অসংযত ভ্রমর তুমি কৌটো থেকে বেরিয়ে এসে
হুল বিঁধিয়ো অনুচ্চারিতকে

যেমন সৌভিক বন্দোপাধ্যায়। প্রায়শই ই-মেলে কবিতা পাঠায় এই কর্পোরেট কবি। নতুন বিষয় আর নতুন প্রকাশভঙ্গির গুণে কবিতাগুলি চমকপ্রদ।
একটা আইডিয়া এসেছে-
একটা বাল্ব জ্বলে উঠেছে কোথাও,
রোজ রোজ আসেনা,
আজকাল আর আসেই না, বলতে গেলে ।

আইডিয়ারা আসেনা তেমন এখন,
আজ শংকরপুরের বীচ- ফেসিং ঘরে
যে ভাবে ঢুকে পড়ে উতল হাওয়া,
সেভাবেই এসে গেছে একটা আইডিয়া।

ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে,
ছাড়া যাবে না এবার,
যা বলার বলে দেব,
কপিরাইট করিয়ে নেব।

তোমরা ওত পেতে বসে আছো জানি,
সুযোগ পেলেই, আইডিয়াকে
বাইকে বসিয়ে নিয়ে চলে যাবে বারিস্তা।
অনেকদিন পরে একটা আইডিয়া এসেছে,
একটা বাল্ব জ্বলে উঠেছে হাজার ওয়াটের,
ছাড়া যাবেনা,
কবে আবার আসবে, আসবে কী না,
কে জানে!

অনুরাধা বিশ্বাসঃ এর কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি এই অর্কুটে এসেই। এ বছর ‘কবিতা প্রতিমাসে’ কাগজটিতে তার একগুচ্ছ কবিতা বেরোল। এখানে এসেই প্রথম পেয়েছিলাম সম্রাজ্ঞী বন্দোপাধ্যায়ের খোঁজ। এখন তার কবিতা অনেকেই পড়ে। যে মেয়েটি তুলনামূলক সাহিত্যের ফার্স্ট বা সেকণ্ড ইয়ারে পড়ে, এবছর তার নতুন কবিতার বই বেরোচ্ছে, লেখে অন্যরকম এবং ভালো। কবিতা নিয়েই তার থাকা।
***********

অর্কুট বা কেবলই নেটদুনিয়া (ওয়েবজাইন ইত্যাদিসহ) – যে অসংখ্য কবির কবিতা আমাকে কখনো না কখনো মুগ্ধ করেছে, অবাক করেছে, তাদের মাত্র কয়েকজনের কথাই এই লেখায় বলতে পারলাম। আরো অনেকের কথাই বলা হল না। অনেকের লেখা পড়াতে চেয়েও জোগাড় করে ওঠা হল না।

বাদ পড়ে গেল বেশ কয়েকজন যথেষ্ট প্রতিভাবান কবি, হয়ত বা। কিন্তু এ কথা বলতেই হবে যে এই লেখায় আমি চেষ্টা করলাম একটু উদাহরণ ছুঁইয়ে রাখার। পাঠককে জানাতে চাইলাম, ওখানে গেলেও কিছু পাবেন।

অর্কুটের কবিতা নিয়ে লেখা কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না। একতা ওপেন এণ্ডেড অন্তহীন গল্পের উপসংহার টানার চেষ্টাটাই অপচেষ্টা বলে মনে হয়। আমার এইটুকু লেখার পরিসরে শুধু এটুকুই বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যে নেট দুনিয়া সম্বন্ধে, নেটের বাইরের শিক্ষিত, কবিতামনস্ক পাঠকবর্গ, লেখকবর্গের ধারণা ঠিক যতটাই কম, ততটাই নঞর্থক। অনেকেই বলেন এখানে মুড়ি-মিছরির এক দর। এখানে সব রকমের লেখাই তো ‘পাবলিশ’ করে ফেলা খুব সোজা। এটা ঘটনা যে টাইপ করে পেস্ট করে দিতে পারলেই নেটজগতে লেখালেখি করে ফেলা যায়। মান সচেতনতা না থাকলেও। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে প্রিণ্ট দুনিয়াতেও বেনোজলের কি কোনো অভাব ছিলো ? আসল কথা হল হাঁসের ধর্ম অবলম্বন করে জলমেশানো দুধ থেকে শুধু ক্ষীরটুকু শুষে নেওয়ার উপদেশ সেই পঞ্চতন্ত্রের কাল থেকে চলে আসছে। খুঁজে দেখলে অনেক তন্নিষ্ঠ, পরিশ্রমী এবং রীতিমত কবিতাসাধক ছেলেমেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাবে এই দুনিয়াতেও। আর, বলাই বাহুল্য, তাদের হাতে বাংলা ভাষা ও বাংলা কবিতাকে জীবন্ত দেখাটাই একটা বড় পাওয়া।




আপনার মতামত জানান