অভীক দত্ত

আবুল বাশার
ফোনে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ করায় বলে দিলেন তার বাড়ির হদিশ। চলে গেলাম। আন্তরিক ভঙ্গিতে ডাকলেন যেন কতদিনের চেনা। বসিয়েই শোনালেন একটা উপন্যাস লিখছেন তার থেকে খানিকটা। সৃষ্টিশীল মানুষেরা যেরকম হয় সেরকমই। অহংশূন্য মানুষ বলতে যা বোঝায় একেবারে তাই।
তারপর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ধ্রুপদী লেখক আবুল বাশারের কাছে যখন আমরা প্রথম প্রশ্নগুলি পড়ে শোনাই তখন বেশ ভয় ভয় লাগছিল। ধীরে ধীরে ভয়টা যত কেটেছে আড্ডার মেজাজটা তত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আদরের নৌকার সম্পাদক অভীক দত্ত। প্রকাশিত হয়েছিল আদরের নৌকা বইমেলা সংখ্যা ২০০৮-এ।



অভীকঃ আপনার লেখালেখির উৎসাহদাতা কি আপনার পরিবার? না অন্য কেউ?

আবুল বাশারঃ পরিবারের উৎসাহ বলতে কি বলো তো, আমার ঠাকুরদা ছিলেন চাষি। আমি আদতে চাষি ঘরের ছেলে, ঠাকুরদা চাষ করতেন ধান ও পান। বাবা লেখাপড়ার জগতে চলে এসেছিলেন। রায়তের জীবন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন বাবা। গান বাজনা করতেন। বিভিন্ন ধরণের চাকরি করেছেন। কোয়েটা করাচীতে ছিলেন। পঞ্জাবে ছিলেন। সুতরাং বাবা যেহেতু নানা জায়গায় ঘোরা লোক, নানা কিছু দেখেছেন জীবনে, এবং গান বাজনা খুব পছন্দ করতেন একটা স্বাভাবিক কারণেই আমার মনে সাহিত্যপ্রীতি চলে এসেছিল ছোটবেলা থেকেই। মাত্র ষোল বছর বয়সে আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল। উনিশ বছর বয়সে কবিতার বই বেরিয়েছিল।

অভীকঃ সালটা বোধহয় ১৯৭১, বইয়ের নাম “জড় ওপড়ানো ডালপালা”। রাজনীতি আর কবিতা। একসাথে?

আবুল বাশারঃ হ্যাঁ , আমার জীবনের দুটো পর্যায়। একটা হল সক্রিয় রাজনীতিতে এসে পড়া আবার আগের একটা জীবন যখন অরাজনৈতিক আমি। রাজনীতি করার আগেই আমি কবিতা লিখছি। রাজনীতি আর কবিতা আমার জীবনে একসাথে ছিল, তবে সেই সময়টা খুব বেশি হবে না।

অভীকঃ সেই সময়ের রাজনীতি আর এই সময়ের রাজনীতি। তফাৎ কোথায়?

আবুল বাশারঃ আমি বামপন্থী রাজনীতি করা লোক। সেই সময়ে বামপন্থী রাজনীতি করা মানে মৃত্যুর টিকিট কেটে রাজনীতি করা। নকশাল রাজনীতিই নয়, বামপন্থী রাজনীতিই ছিল তখন বিপজ্জনক। এখন লোকে রাজনীতি করে রাজনীতি করে কিছু পাবার আশায়। সে সময়ের রাজনীতি চাওয়া পাওয়ার রাজনীতি ছিল না। সেটা ছিল আত্মত্যাগের রাজনীতি। আজকের প্রজন্ম সেটা ভাবতে কিংবা অনুভবও করতে পারবে না ঠিক কি ছিল সেটা। থিওরিটিক্যাল পলিটিক্স ছিল না সেটা আবার শৌখিন ছাত্র রাজনীতিও ছিল না। আমি ছাত্র রাজনীতিকে চিরকালই শৌখিন রাজনীতি মনে করি। যদিও তখন ছাত্র রাজনীতিও ভয়ংকর ছিল। তখন আমরা বামপন্থী রাজনীতি বলতে বুঝতাম রাজনীতি হয় চাষির সাথে থেকে অথবা শ্রমিকের সাথে থেকে করতে হবে। বামপন্থী রাজনীতির মূল যেটা। শ্রমিক কৃষক খেটে পাওয়া লোকেদের সাথে থেকে লড়াই করাই আসল রাজনীতি।

অভীকঃ তাহলে গদ্যে এলেন কিভাবে?

আবুল বাশারঃ এদেশে যখন জরুরি অবস্থা হল তখন অদ্ভুত সংকটে পড়লাম আমরা। মানুষের কোন স্বাধীনতা ছিল না। রাশিয়া ধীরে ধীরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে, শোধনবাদের পথ ধরছে। চীন তখনও সঠিক একথা মনে করা হচ্ছিল যদিও চীন সম্পর্কেও সংশয় দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও হাতে ছিল মন্ত্র মার্ক্সবাদ। এরই ভেতর দিয়ে মানুষকে যে জানার অভিজ্ঞতা হল সেটাই আমার জীবনের এক অন্যতম অভিজ্ঞতা। সেই সময়ে আমার রৌরবের বন্ধুরা বলল “বাশারদা এই কথাগুলো কবিতায় হবে না”। তা একজনের লেখা প্রবন্ধ পড়ছি তখন। একজন মার্ক্সবাদীরই লেখা পড়তে পড়তে এক জায়গায় ভদ্রলোক লিখেছেন যে কথাটা আমি আমার মত করে গ্রহণ করেছিলাম আমার ভাষায় তা হল কবিতায় জীবনের অনুরাগ থাকে কিন্তু ব্যাপ্তি থাকে না।
সেদিন একটা অনুষ্ঠানে গেছি। সেখানে আমার সম্পর্কে বলা হল “গ্রাম তার হাতের কররেখার মত”। কথাটা সত্যিই। গ্রামকে আমি নিজের হাতের তালুর মতোই দেখতে পাই। কিন্তু সেই দর্শনটা আমি কবিতায় আনতে পারছিলাম না। কবিতায় একটা অনুরাগ প্রকাশ পায়, জীবনের প্রতি নিবিড় ভালবাসা প্রকাশ পায় কিন্তু জীবনের সবটা পাচ্ছিল না। তারপর তো তোমায় বললামই রৌরবের বন্ধুরা বলল “বাশারদা আপনি গদ্য লিখুন”। তো সেই থেকেই গদ্য মানে গল্প লেখা শুরু করলাম। প্রবন্ধ ভাবনাও ছিল। বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছি। এই করতে করতে কবিতার প্রতি আমার একটা অবহেলাও চলে এল। কবিতা আমার দুয়োরানী হয়ে গেল। আমি কবিতাকে বলা যায় উপেক্ষাই করেছি। কিন্তু কাব্যকে উপেক্ষা করিনি। কবিত্ব আমার গদ্যে সঞ্চারিত হয়েছে।
এর মধ্যে চা চানাচুর রসগোল্লা এল। সেগুলির সদ্গতি করে আবার শুরু করলাম।

অভীকঃ “ফুলবউ” সম্পর্কে কিছু বলুন।

আবুল বাশারঃ ফুলবউ থেকেই সচেতন পাঠক আমাকে চিনেছে। অত্যন্ত বিতর্কিত উপন্যাস। ঐ উপন্যাসের জন্য আমার জীবন বিপন্নও হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে লিখেছিলাম ফুলবউ।

অভীকঃ এই উপন্যাসটি আপনাকে সাহিত্যের বৃহত্তর অঙ্গনে নিয়ে আসে। মুসলিম দাম্পত্য, যৌন সংস্কার, প্রেম অপ্রেম এই উপন্যাসে নতুনভাবে এসেছে। আবার মুসলিম সমাজে নারী স্বাধীনতার অভাব, বহু বিবাহ, তালাক এই বিষয়ের জটিলতর কথাগুলি ফুলবউ ছাড়াও আপনার অসংখ্য উপন্যাসে দেখি।

আবুল বাশারঃ তোমার এই কথাটা আমাকে সমরেশ বসুও বলেছিলেন, “বাশার একই কথা তো বারবার লিখছ”। আমার মনে হয় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের একটা প্রধান সমস্যা ছিল বৈধব্য সমস্যা। রবীন্দ্রনাথের “চোখের বালি”তেও কেন্দ্রীয় সমস্যা ছিল বৈধব্য সমস্যা। শরতসাহিত্যে বৈধব্য সমস্যাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁরা কি নিছক উপন্যাস লেখার জন্য এই বৈধব্য সমস্যার অবতারনা করেছিলেন। তোমার কি মনে হয়?

অভীকঃ হ্যাঁ সেটা তো মস্ত বড় একটা সমস্যা ছিল বটেই।

আবুল বাশারঃ তাহলে? নিশ্চয়ই সমস্যা একটা ছিল নইলে একজন সাহিত্য সম্রাট, একজন কথাশিল্পী আর একজন বাংলা সাহিত্যের সর্বস্ব কেন অকারণ এই সমস্যার অবতারনা করবেন। কথাটা এখানেই। সাবজেক্ট ম্যাটারটা এক। আমাকে কেউ নারীপ্রধান বললে আমি আপত্তি করব না। ধর্ম সমস্যা ভারতের অন্যতম সমস্যা। এই সমস্যা চিরন্তন। নারী জীবনের স্বাধীনতা কিছু নেই। তারা এখনও ভুগছে। এই প্রেরণা থেকেই বিভিন্ন রূপে তাদের প্রকাশ করেছি। তালাক একটা বিরাট সমস্যা। তালাক মানে বিচ্ছেদ। একটি নারীর সাথে পুরুষের বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদ আমাদের গ্রামবাংলাতেও যেমন একটি সমস্যা, পশ্চিমদেশেও এই সমস্যা আছে। আমি ফুলবউতে যেমন লিখেছি তেমনি অন্যান্য লেখাতেও দেখিয়েছি। নারী মানে কি? ফেলনা? একী? বোরখা নিয়েও সমস্যা। যেটা সত্য, সেটা মানুষকে বারবার বলতে হবে। নইলে মানুষ বুঝবে না। আমার কাছে অগ্রাধিকার পাঠকের। সেই পাঠক হিন্দু না মুসলিম আমার জানার দরকার নেই। পাঠককে ভাবিত করে না তুলতে পারলে একজন লেখক কখনই সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থাকে না। আমি এই সমস্যাটা তাই বিস্তৃতভাবে দেখাতে চেয়েছি, আমৃত্যু দেখিয়ে যাব। এই সমস্যাগুলি মুসলিম সমাজের অগ্রগতির পথ অবরোধ করে রেখেছে। ঐ তিন দিকপাল বিধবা সমস্যার কথা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তাঁরা তাঁদের একের পর এক উপন্যাসে সে কথা উল্লেখ করে গেছেন। এই জন্যই তাঁরা মহান। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে হলেও বলা হবে আবুল বাশার এই সমস্যার কথা বলে গিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারকের কাজই করে গেছেন। সমস্যাটা কিন্তু যাচ্ছে না। সমাজের বাকি অংশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাঙালী হিন্দু সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এরা মদের ঘোরে, ইন্টারনেটে ইমেল করে তালাক দিয়ে দিচ্ছে। এটা সমস্যা নয়? আর আবুল বাশার এটা নিয়ে না লিখে বসে থাকবে? এটা হয়?

অভীকঃ বেশ কিছুকাল আপনার লেখায় যৌনতার বাড়াবাড়ি পাঠকদের অভিযোগ। সাহিত্যের আড়ালে যৌনতার মোড়ক সস্তায় বাজিমাতের লক্ষণ। তাতে প্রকৃত সাহিত্যের স্বাদ ও মান দুইই খর্ব হয়। তাই কি?

আবুল বাশারঃ দেখো সময়ের সাথে যৌন মনস্তাত্ত্বিক ধারনা পাল্টাচ্ছে। যৌনতা কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যেমন ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বলতে পারি মন্দির মসজিদ কিংবা চার্চের নাম। এগুলো কিন্তু এক একটা ক্ষমতার কেন্দ্র। ভগবানের নাম করে কুমারী মেয়েদের ভোগ করার জন্য দেবদাসী বানানো হত। যৌনতা কেন্দ্রিক ক্ষমতা কেন্দ্র সমাজের বিশেষ বিশেষ শ্রেণী ব্যবহার করত। রাষ্ট্র যৌন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রন করে। রাষ্ট্র বলে দিল, আঠারো বছর ও একুশ বছরের আগে মেয়ে কিংবা ছেলের বিয়ে হবে না। যৌন ক্রিয়ায় কন্ডোম ব্যবহার কর নইলে থাপ্পড় মারব। নারী পুরুষের একান্ত যৌন মিলন তাতে থাবা বসাচ্ছে রাষ্ট্র। দুয়ের বেশি সন্তান হলে রাষ্ট্র রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে। আবার একটা মুসলিম চারটে বউ নিয়ে ঘর করছে। কে বাঁধা দেবে? সমাজ? রাষ্ট্র? কেউ বাঁধা দিতে পারবে না। একজন ভারতীয় বাড়িতে মোটামুটি হারেম খুলে চারটে বউ নিয়ে বাস করছে। সেই লাইসেন্সও সমাজই দিয়েছে। দুটি ধর্মের জন্য দুরকম নীতি। এগুলি আমি বলব। একশবার বলব। ক্ষমতার চেহারাকে দেখাব। যৌন ক্ষমতা মানুষের যৌনতা নয়! যৌনতা রাষ্ট্রের। এখন সমকামীরা বলছে তাদের লাইসেন্স চাই। তারা সামাজিক স্বীকৃতি চাইছে। এই যৌনতার ধারনা দিন দিন পালটাবে। সমস্ত কিছু পালটাবে সময়ের সাথে। আবার যৌনতা দেখিয়ে বই বিক্রি হয় না। তাহলে পথের পাঁচালীর থেকে বিবর বিক্রি হত বেশি।

অভীকঃ আপনার লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস বাশারদা?

আবুল বাশারঃ বাস্তব আর কল্পনার মিশেলে লেখা “অগ্নিবলাকা”। শুরুতেই বললাম রাজনীতির ভূমিকা আমার জীবনে প্রবল। বলতে পার রাজনীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কিংবা আমার জীবনের অভিজ্ঞতাই “অগ্নিবলাকা”য় প্রকাশ পেয়েছে।

অভীকঃ ফুলবউ বাদ দিয়ে একটা উপন্যাসের নাম বলুন যেটা না পড়লে আবুল বাশার পড়া বৃথা।

আবুল বাশারঃ মরুস্বর্গ।

অভীকঃ ছোটদের লেখায় ইদানীং সময় দিতে চাননা কেন? গোয়েন্দা কাহিনিতেই বা অনিহা কেন?

আবুল বাশারঃ সত্যিই কম লিখছি এখন ছোটদের জন্যে। এজন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়। একটা ভাল কাগজও নেই। গোয়েন্দা কাহিনী নিয়েও আমি অনেক ভেবেছি। হয়ত পরে লিখব।

অভীকঃ গদ্যে কাব্যের প্রভাব নিয়ে কিছু বলুন।

আবুল বাশারঃ এখন এ সংক্রান্ত একটা কথা আছে। কবিতাকে কিভাবে একজন গদ্যকার দেখেন। আমাদের সাহিত্যে অনেকেই গদ্য লিখেছেন। যেমন বিভূতিভূষণ। তিনি আসলে কবিই।মহাকবি। যেমন কমলকুমার। এঁদেরকে কিন্তু কেউ বাংলা সাহিত্যে স্বীকৃতি দেননি কিন্তু এঁরা আসলে কবি। স্বীকৃত কবিরা গদ্য লিখেছেন এবং সেই গদ্য পাঠকের কাছে চির সমাদৃত হয়েছে সে ঘটনা কম। এক রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। গল্পগুচ্ছ তো এক কবিরই লেখা। অদ্বৈত মল্লবর্মণ বা জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী যাদের কবিতা সমীহ জাগিয়ে তোলে। আরেকজন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্‌। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবার কবিত্বের মধ্যে চিত্রকলাবৃত্তি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র হচ্ছেন সেই ধরণের মানুষ যিনি চিত্রকর বৃত্তি আর কবিত্বকে খুব উৎকৃষ্ট একটা কাঠামোয় ধরতে পেরেছিলেন, এবং এক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র বারবার একটা বিষয়ে সাবধান করেছিলেন সেটা হল, উনি নবীন লেখকদের বলেছিলেন অজানা কবিত্ব চেষ্টা করিও না। কবিতা ভেতরে থাকলে আপনা হতেই আসবে। চেষ্টিত কবিত্ব লেখাকে নষ্ট করে দেবে। অনেকেই আজকাল লেখায় চেষ্টিত কবিত্ব এনে লেখার মান নামিয়ে ফেলেন। কবিত্ব এমন একটা বস্তু যা গদ্যকে লাবণ্য এনে দিতে পারে আবার মগজে চর্বিও এনে দিতে পারে। আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি আমার গদ্যে যখন কবিতা এসেছে আমি দমাইনি তবে যেখানে দরকার নেই সে জায়গা থেকে অতি সন্তর্পণে আমি কবিত্ব ছেঁটে বাদ দিয়ে দিয়েছি। গদ্য যেখানে এলায়িত হয়েছে যেখানে গদ্যের ক্ষতি হয়েছে সেখানে কবিতাকে আমি বাদ দিয়েছি।

অভীকঃ আপনার জীবনের পরম প্রাপ্তি বলে কি মনে করেন?

আবুল বাশারঃ এরকম পাঠক আছেন যারা আমারই লেখা পড়েন, যারা আবুল বাশার পেলে আর কিছু চান না, আমার লেখাই ধ্রুবতারার মত পড়েন সেই পাঠকেরাই আমার লেখক জীবনের পরম প্রাপ্তি।

অভীকঃ বাশারদা খুব ভাল লাগল আপনার সাথে কথা বলে, যাবার আগে আপনার একটা কবিতা যদি শোনান।

বাশারদা হাসলেন। তারপর উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করলেন তাঁর একটি কবিতা

এ কবিতা অমরতা চাহে না কিছুতে
যেভাবে অনন্ত কলসে চিরবিস্ময় জল
সেই জলের তন্ময়তা
শিল্পের সন্ন্যাসের মত সুগভীর
কলসের ভিতর আকাশ আলোর মত ধুলো
সেই ধুলো যুদ্ধপোড়া মাটির মতন
এলাহি এলাহি বলে কাঁদে।
সৃষ্টির কেরামতি আসলে তো মৌলিক বিষাদ
আর কলকাতার বর্ষার জুতোর ভিতরে
পিচ কাঁকড়ের সুক্ষ বালির ফোস্কা-তোলা বিশেষ জ্বলুনি
আর নাগরিক ধোঁয়ায় পত্রপুস্পে কালো ক্কাথ, বিষ-এনামেল
আর মৃত্যুর পরে ঝুলে থাকা আশ্চর্য বাদুড়
আর এই নীল ভোরে সবুজ টিয়ার ঠোঁটে
সূর্যের প্রথম আলোর ফলাফল।
এ কবিতা এর বেশি কিই বা চেয়েছে।
ফলত কিশোরীর বুকের কুঁড়িতে
এ কবিতা
যৌবনের প্রথম রক্তিমতা-
আর কী আশ্চর্য ভোলাবাবু,
এই কবিতাই ধর্ষিতার প্রথম চিৎকার!
অতএব এ কবিতা
কিছুতেই অমর হবে না।

অভীকঃ ভালো থাকুন বাশারদা।অনেক ভাল থাকুন।

আপনার মতামত জানান