কবিতা-কবিতার জন্য

শ্রেয়া দলুই
সারা রাত ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি ...প্রোজেক্ট এর খাতা নিয়ে রাত গড়িয়েছে তিনটে ...বিছানা টা কেমন যেন আঁকড়ে ধরে আছে আমাকে...সকাল হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে...আড়মোড়া ভেঙ্গে জানালাটা খুললাম ... মেঘলা আকাশ ...পাশবালিসের ওই পার থেকে মোবাইল টা তুলে নিয়ে দেখি সাড়ে আটটা...ভাগ্যিস আজ রোববার...অ্যালার্ম টা বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই... ওটা টার্ন অফ করে ইন্টারনেট টা অন করলাম...ফেসবুকে নোটিফিকেশান গুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখ পড়লো কয়েকটা লাইন এ...
“ আজ অন্তত ঘড়ির দিকে তাকাস না
টুকরো করে উড়িয়ে দে সব সমস্যা
চিন্তা তোকে মানায় না
দেখ আকাশ লাল_____”
শ্রীজাতর লেখা... শেয়ার করেছে এক বন্ধু...আরে এটা কি কবিতা নাকি...এই কথাগুলো তো আমি ই ভাবছিলাম... এটা আবার কবিতা নাকি...

কবিতা আসলে কি? মাঝে মাঝেই ভাবি...কবিতা আসলে কেমন?? কেমন হাওয়া উচিত
কিছু প্রশ্ন - এলোমেলো কবিতা?? কবিতার সংজ্ঞা কি? কি তার আসল পরিচয়? কোথায় তার ঠিকানা? কি বা তার আশ্রয় ? কি তার রপ বৈশিষ্ট্য? কাব্য একধরনের শিল্প... কিন্তু নাচ, গান, ছবি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য কিংবা অন্যান্য সাহিত্য উপাদান যেমন নাটক ,গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সেও তো শিল্প...সেগুলো ও তো সৃষ্টির আনন্দ দেয়... তবে আর কবিতার আলাদা করে দরকার কি? আরও একটা কথা প্রায় ই মাথায় আসে যারা কবিতা লেখেন যে মুহূর্তে জন্ম হয় কবিতার সেই মুহূর্তে তাঁরা এত সব কথা ভাবেন? সে যাই হোক... আমার তো বেশ ব্যাপারটা জটিল মনে হয়... সৃষ্টিকে কারিগরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদের কৌশলী উপস্থাপনা ভাবতে গেলে সেই ভাবনাকেও আবার বেশ খানিক টা সময় দিতে হয়...

সে যাই হোক মোটের উপর কথা হল এত ভাবলে হবেনা...উত্তর খুঁজতে হবে... কিন্তু তার আগে চাই চা ... সকাল হয়েছে বলে বোঝা যাবে তারপর...চা বসিয়ে ব্রাশ করতে গেলাম...তারপর আয়েস করে উত্তর খোঁজার পালা.. আর সেই কাজ করতে গিয়ে কতক গুলো তথ্য জানা গেল যেগুলো তোমাদের সাথে না শেয়ার করে পারছিনা... আমাদের দেশের প্রাচীন আলংকারিকদের দেওয়া কিছু কাব্য সংজ্ঞা... ষষ্ঠ শতকে
কিছু তথ্য – প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আচার্য ভামহ বললেন “ শব্দারথউ সহিতউ কাব্যম ” । অর্থাৎ শব্দ ও অর্থ সহিত বা মিলিত হয়েই কাব্যের সৃষ্টি হয়...সাধারণ ভাবে আমরা সাহিত্য বলতে যা বুঝি তা হল ‘সহি –তত্ব’ অর্থাৎ সম্পর্ক বা মিলন... শব্দের সাথে চিন্তার__ চিন্তার সাথে জীবনের __জীবনের সাথে জীবনের __প্রকিতির__ পৃথিবীর যা কিছু বাস্তব, অবাস্তব , জীব, জড় , সুন্দর, অসুন্দর, সমাজ ,রীতি সবকিছুর মধ্যে সম্পর্কের গোপন রহস্য সন্ধান ই তো সাহিত্যের উপলক্ষ... কাব্য ও তার একটা অংশ ...
সপ্তদশ শতকে আচার্য জগন্নাথের কথার মধ্যে রসবাদ , ধ্বনি বাদ ও বক্রক্তিবাদের এক মিলিত
সংজ্ঞা পাওয়া যায় কাব্যের যেখানে তিনি বললেন “ রমনিয়ারথ প্রতিপাদকঃ শব্দঃ কাব্যম”..।অর্থাৎ রমণীয় অর্থ প্রতিপাদন করে যে শব্দ তাই হল কাব্য...আবার দশম শতকে আচার্য কুন্তক বললেন ...
“ শব্দারথউ সহিত বক্রকবি ব্যাপার শালিনি
বন্ধে ব্যাবস্থিতউ কাব্যং তদবিদাহলাদকারিনি ।”
অর্থাৎ মিলিত শব্দযুগল কাব্য গুনের অহ্লাদ জনক ও বক্রতাময় হয়ে কবির নিজস্ব রচনা বন্ধে বিন্যস্ত হলে কাব্য হয়ে ওঠে... কি কঠিন কঠিন বাপার...আমি তখন ভাবছি অন্য কবিতার কথা...জয় গোস্বামী...
পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।
যাই হোক প্রাচীন কাল থেকে আমাদের দেশের আলঙ্কারিক রা বহুভাবে কাব্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করবার প্রয়াস করেছেন নিজেদের মত করে... বহুলাংশেই বিগত দিনের ও আজকের কবিতার মধ্যেও তার রূপ , রীতি , বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়... সুতরাং তাদের ধারনার চিরন্তন বাস্তবতার দিকটি অগ্রাহ্য করলে চলেনা... এরপর আসি পাশ্চাত্তের কথায় ... খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় – চতুর্থ শতক থেকে প্লেটো , অ্যারিস্টটল প্রভৃতি দার্শনিকদের অনুকরনবাদের প্রভাব ই সাহিত্য ক্ষেত্রে সমাদৃত ছিল ...সপ্তদশ শতকে রেনেসাঁসের কালে দেখা গেল ডেকার্টে , লকস, হবস, ড্রাইডেন, বেকন প্রভৃতি ব্যক্তিরা কল্পনা বৃত্তির কথাটি বড় করে তুললেন...অষ্টাদশ শতকের গোরার দিকে ইংরেজ সমালোচক এদিসন Essay on the pleasure of imagination প্রবন্ধে সাহিত্যে ‘কল্পনার আনন্দ’ মতবাদ তুলে ধরলেন... ওয়ার্ডসওয়ার্থ কাব্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বললেন ‘ all good poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings’… সকল উৎকৃষ্ট কবিতাই শক্তি গর্ভ অনুভুতির স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছলন... উনিশ শতকে টলস্তয় শিল্পের বিশেষ লক্ষণ এর কথা What is Art গ্রন্থে বলেছিলেন Art is communication… পাঠক পাঠিকার মনে অনুভব সঞ্চারিত করে দেওয়াই শিল্পের কাজ...
ফরাসী বিপ্লবের পর ওখানে মানব মর্যাদা স্বীকৃতি পেতে শুরু করে... ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর বিপ্লবের ভাবধারা প্রবল হয়ে ওঠে ...সাহিত্যেও তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়... সাহিত্য যে জীবনেরই প্রকাশ, জীবনেরই সমালোচনা এই চিন্তার উদ্ভাবন হয় এই সময় থেকে... ইংরেজ সমালোচক ম্যাথু আর্নল্ড এর কবিতার সংজ্ঞায় পাওয়া যায় ______” poetry is at bottom a criticism of life; that greatness of a poet lies in his powerful and beautiful application of ideas to life__ to the question how to live.”
ফরাসী বিপ্লবের বার্থতা জাত নৈরাশ্য , আশাভঙ্গ ,ক্ষোভ প্রভৃতি শিল্পী সাহিত্যিক দের এক নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে ___ একেবারে নগ্ন বাস্তবকে , সত্যের উলঙ্গ মূর্তিকে শিল্পে সাহিত্যে উন্মুক্ত করার প্রবনতা থেকে জন্ম নেয় বস্তুবাদের ... আর এই বস্তুবাদের জন্মই আধুনিক কবিতার ধারাকে অন্যপথে চালিত করবার রসদ নিয়ে আসে... আমার মনে পড়লো রুপম ইসলাম ...
“এ বস্তুবাদের আবাদে তোমার পুনর্জন্ম হোক
পরে মৃত্যু পুরীতে তোমার হারানো পদক”...

সে যাই হোক ...এখন যেটা চাই সেটা হল আরেক কাপ চা ... সাথে দুটো ক্রিম ক্রাকার হলে মন্দ নয়... তারপর যেটা মনে হছে... কাব্যের জন্ম , জীবন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গুলি সংক্ষিপ্তসার
কিছু উত্তর – টুকরো টুকরো করলে যা দাঁড়াচ্ছে ______ কবিতা হল অর্থময় শব্দ গুচ্ছ বা

পদের সমষ্টি যা কবি মনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ কে অভীষ্ট অর্থে প্রকাশ করতে পারে... কবিতার ভিত্তি হল শব্দ ও ভাব...কবিতার মাধ্যম হল ভাসা...কবি নিজের অভিপ্রায় অনুযায়ী ইচ্ছে পূর্বক শব্দ নির্বাচন করেন ...কখনও তিনি সেগুলিকে অলংকৃত করেন... কখনও রসময় শব্দের রমণীয়তা আরোপ করে শব্দগুলি বিন্যস্ত করেন...কখন সুকৌশলে বক্রতা দান করেন...আর পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে তার অনুভূতির সাথে যোগসাধন করতে পারলেই কবিতা সার্থক হয়ে অথে...প্রকাশ ভঙ্গিমার ভিন্নতাই কবি মননের ভিন্ন জগতকে প্রতিষ্ঠা দান করে...

এবার আসি আধুনিক কবিতা প্রসঙ্গে... কবিতাকে কি সত্যি দিনকাল ভেদে ভাগ করা যায়? বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে যেটা লক্ষ্য করা যায় সেটা হল উনিশ শতকের প্রথম থেকেই নতুন বাংলা কবিতার বিবর্তন ভাবনা চিন্তা বাংলা কাব্যের আদর্শকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত করতে থাকে...অধ্যাপক আবু সায়িদ আইয়ুব তাঁর আধুনিক কবিতা সংকলনে বলেন ___ “ কালের দিক থেকে ,মহাযুদ্ধ পরবর্তী , এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত, অন্তত মুক্তি প্রয়াসী , কাব্যকেই আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করা হয়”... বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন যা পাওয়া গেছে চর্যাপদ ...তাও পদাবলী অর্থাৎ কাব্যের আঙিনাতেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়যাত্রা শুরু... পুরানো কাব্য ধারাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা কতক গুলো শাখা পাই যেমন _____ ভারত চন্দ্র অনুসারী কবি গোষ্ঠী , রামায়ণ মহাভারত ও কৃষ্ণ ভক্তিমূলক রচনার ধারা , উপাখ্যান ও আখ্যায়িকা , রামনিধি গুপ্ত ও অন্যান্য কবির রচিত আখড়াই গানের ধারা, কবি ওয়ালা , পাঁচালী , রাম প্রসাদের অনুসারী গোষ্ঠী প্রভৃতি ...
এর পরবর্তী কালে ঈশ্বর গুপ্ত , রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , মাইকেল মধুসূদন , হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় , নবীন চন্দ্র সেন , বিহারি লাল চক্রবর্তী , অক্ষয় কুমার বড়াল হয়ে দ্বিজেন্দ্র লাল রায় , কামিনী রায় , রবীন্দ্র নাথ প্রভৃতির হাত ধরে উনিশ শতকের কবিতার ক্রমবিবর্তন সংঘটিত হয় ... এর পরের পারিপার্শ্বিক ঘটনার সূত্রপাত টানলে দেখা যাবে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে ,স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভারতবাসীর মনে গনতান্ত্রিক চেতনাকে সংহত করেছে, রুশ বিপ্লবের সাফল্য বেশ কিছুটা বাস্তব দৃষ্টি খুলে দিয়েছে...শ্রম চেতনা , অবহেলিতের প্রতি সহমর্মিতা , সমাজ গঠনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে সাহিত্যের পাতায়... যতীন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত , প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রভৃতি র লেখনীতে নতুন মানবিকতার জয়গান শোনা যায় ... কল্লোল- কালি- কলম- প্রগতি ইত্যাদি কে কেন্দ্র করে যে কবিরা তাঁদের রচনা শুরু করেছিলেন তাঁরা আন্তরজাতিক ঐতিহ্য গুলির ( ফ্রয়ডীয় মনোবিকার পন্থা , ভিক্টোরিয়ান মরালীটি , ইউরোপিয়ান সিম্বলিস্ট কাব্য, ইমাজিস্ট, ও সমাজবাদী কাব্য সাহিত্যের ) অংশীদার হয়ে রবীন্দ্র বিরোধিতার বড়াই করে এগিয়ে যান ... মধ্য প্রাচ্য থেকে নজরুল নবজাগ্রত তুর্কীর উদ্যম কিছুটা দেখেছিলেন... বিশের দশকের নবজাগ্রত গনতান্ত্রিক চেতনা ও সাম্যবাদই নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিলো ...আন্দোলন ক্ষুব্ধ এই সময় যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল তাতে নজরুলের কবিতাই মুখ্য স্থান নিয়েছিল ...
এরপর বুদ্ধদেব বসু , সুধিন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাস, আমিয় চক্রবর্তী , বিষ্ণু দে, সমর সেন হয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় , সুকান্ত ভট্টাচার্যের আবির্ভাব পর্যন্ত বাংলা কবিতার আমুল পরিবর্তন হতে থাকে... যদিও পরিবর্তনশীলতাই একমাত্র নিয়ম... বিংশ শতাব্দীতে উনবিংশ শতাব্দীর মুল্যবোধ গুলির বিরুধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেল... আধুনিক কবিরা যে মুহূর্তে উচ্ছ্বাস , অতিকথন বর্জন করে সেই পরিবর্তিত মূল্যবোধকে তাঁদের অধীত জ্ঞানসম্ভারের অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি ও বহুপল্লবিত চিন্তাধারার নির্যাসের মাধ্যমে পাঠক কে পরিবেশন করলেন তখনি তা বোঝা হল সুকঠিন ... কবি শঙ্খ ঘোষের কয়েকটি লাইন মনে এলো ...

বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া
…. তোমার সাথে ওতপ্রত
নিয়ন আলোয় পণ্য হলো
যা কিছু আজ ব্যাক্তিগত।
আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উঠে এলো নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাত, ক্লান্তি, নৈরাশ বোধ, বস্তুবাদ, আত্ম বিরোধ , ঘরছাড়া মনভাব , বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের প্রতি সংশয় কবিতার মন – পরিবর্তন ও উদ্বেগ , প্রথাগত নীতি ধর্মে অবিশ্বাস , বাকরীতি ও কাব্য রীতির সংমিশ্রণ, দেহজ কামনা, বাসনা , প্রেমের শরীরী রূপকে প্রত্যক্ষ করা , শব্দ প্রয়োগ বা গঠনে মিতব্যয়ীতা ও অর্থ ঘনত্ব সৃষ্টির চেষ্টা, গদ্য ছন্দের ব্যবহার, অথবা একেবারে ছন্দ মুক্তি ইত্যাদি...বিংশ শতকের যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিস্কার মানুষের বাস্তব জীবনে ও মানসজগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে শুরু করল...
তারই রেশ ধরে একবিংশ শতকের মোবাইল দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরিস্থিতি , জীবন ,সম্পর্কের পরিবর্তন, বিশ্বায়ন , নেটওয়ার্কিং , তথ্য বিস্ফোরণ , দূষণ , বাজার অর্থনীতি র ক্রমবিকাশ ,মিশ্র সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দ্বিধা দ্বন্দ্ব, ক্রমাগত সাহিত্য শিল্প কাব্য যেকোনো সৃষ্টিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে... শক্তি চট্টোপাধ্যায় , নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , মল্লিকা সেন গুপ্ত , শুভ দাসগুপ্ত , শঙ্খ ঘোষ সবারি লেখায় উঠে এলো সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের ছবি , সম্পর্কের শৈথিল্য , মূল্যবোধের অধগতি, বেকারত্ব , স্বপ্নবিলাস , হতাশা , দুঃখ, ক্ষোভে ফুটে উঠলো ক্রমশ একা হয়ে যাওয়া মানব মনের জটিলতর অনুভবের কবিতার আজকে যেমন কথা... আর সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির সংকটের সাথে সাথে বাংলা ভাষার ও সংকট কাল উপস্থিত... আমাদের সময়কার বেশিরভাগ লেখাতেই কেমন একটা ইংরেজায়নের ছাপ লক্ষ্য করা যায়... বিশুদ্ধ বাংলা বলে যেন কিছুই নেই... শ্রীজাত , পৌলমি , রূপম , অনুপম সবার লেখাতেই ইংরেজি শব্দের বহুল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় .....কবিতার জন্য তা কতটা মঙ্গলের জানা নেই তবে বাংলা ভাষার জন্য বোধয় নয়...তবে হয়ত তাঁরা প্রকাশ মাধ্যমের উপর গুরুত্ব না দিয়ে বিষয় ও প্রকাশভঙ্গীকেই বেশি জরুরী মনে করেন... রবীন্দ্রনাথ তাঁর Religion of an Artist বইতে এক জায়গায় বলেছেন যে ঃ “No poet should borrow his medium ready made from some shop of orthodox respectability . He should not only have his own seeds but prepare his own soil.. Each poet has his distinct medium of language not because the whole language is of his own make, but because his individual use of it, having life’s magic touch, transforms it into a special vehicle of his own creation “..
যাই হোক , তবে আধুনিক প্রজুক্তিবিদ্যা ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বহু অনামি লেখক লেখিকা র ভাল লেখা পড়া ও পড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে......এবং পাঠক পাঠিকা দের সরাসরি মতামত দান ও গ্রহনের একটা ভাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে... যেগুলিকে সচেতন ভাবে কাজে লাগালে আখেরে বাংলা কবিতারি ভাল হবে...আরেকটা বিষয় আমাদের সকলেরি মনে রাখা দরকার বলে আমার মনে হয় সেটা হল একটা positive approach towards life রেখে যেতে হবে এই সময়ের লেখায়...আর সেটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই...তাদের জীবনযাপনের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে আমরা যেমন মানব সম্পদ উন্নয়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ , সাস্টেনেবেল ডেভেলপমেন্ট , শিশু কেন্দ্রিক শিক্ষা , প্রভৃতি র কথা আমরাই ভাবতে পেরেছি তেমনি তাদের মনন জগতের শক্তিরস জোগানোর চিন্তা আমাদেরকেই করতে হবে...মানসিক ধৈর্য , যুক্তি, বুদ্ধি , শুভ চেতনা ,ত্যাগের আদর্শ, শান্তি , সৌভাতৃত্ব , মানবিকতা ইত্যাদির মধ্যে যে এক শাশ্বত সত্য আছে সেই সত্যের প্রতি তাদের আস্থাশীল করবার দায়িত্ব , তাদের আত্ম চিন্তনকে উদ্বুদ্ধ করার কাজটাও সমান্তরাল ভাবে আমাদের চালিয়ে যেতে হবে... আবার সেই প্রাচীন শাস্ত্র বিদদের কাছেই ফিরে যাব শেষে “অগ্নিপুরাণে” ... যেখানে বলা হয়েছে...
অপারে কাব্য সংসারে কবিরেকঃ প্রজাপতি।
যথাস্মই রোচ্যতে বিশ্বং তথেদং পরিপরততে।।
অর্থাৎ অপার এই কাব্য রূপ সংসারে কবি ই হলেন প্রজাপতি। এ বিশ্ব তাঁর কাছে যেমন প্রীতিকর বলে মনে হয় তেমনি তা পরিকল্পিত হয়ে থাকে...।।

আপনার মতামত জানান