অভীক দত্ত

প্রথম পর্ব
১।
।।উপমন্যু।।
প্রতিটা প্রেমে আমার পুনর্জন্ম হয়। প্রথমে গাধা ছিলাম। তারপর পিউ আমার সাথে প্রেম করল। কয়েকদিন গাধা পিটানোর চেষ্টা করল সবরকমভাবে।
পারল না। রেগে মেগে ছেড়ে দিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পিউ যাবার পর দেখলাম আমি গাধা থেকে খানিকটা ঘোড়া হয়েছি। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল জানি না। হয়ত পার্কের কোণে টোনে মাঝে মাঝে চুম্মা চাটির ফল। আমি খেতাম না। ভয় লাগত। কেউ যদি দেখে ফেলে।
এসব ব্যাপারে পিউ অবশ্য খুব সাহসী। মেগান ফক্সের মত। ও হ্যাঁ, মেগান ফক্সকেও ওই চিনিয়েছিল আমায়। টানটান ফিগার। দেখার পরে প্রতি রাতে পিউর জায়গায় ওই স্বপ্নে আসত।
অবশ্য স্বপ্নে এসেই বা কি লাভ হত। সেখানেও তো কিছুই করতে পারতাম না আমি। পিউ যখন ঠোঁট ডোবাত আমার ঠোঁটে আমি সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাতাম। দেখতাম বাবার কোন মাসতুতো ভাই ঘোরাফেরা করছে না তো?
চুমুতে ওই জন্য সাড় থাকত না। আর সার না থাকার জন্য চুমুর পরবর্তী জমি উর্বর হত না। আর উর্বর জমিতে ওই জন্য কোন ফসল হল না। পিউ খুব খিস্তি টিস্তি করে আমাকে ছেড়ে চলে গেল।
চলে যাবার পর আমি দেখলাম আমার দুটো সুবিধা হল
১) আমার অনেক সময় বাঁচছে।
২) আমার অনেক টাকা বাঁচছে।
দুটোই আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। আমার বাপের প্রচুর টাকা ছিল, আছে, আমি তখন কলেজে পড়তাম, হাত খরচাও খারাপ পেতাম না, কিন্তু আমাকে টাকার পুরো হিসেব দিতে হত বাড়িতে। পিউর সাথে প্রেম করতে গিয়ে আমার কলেজের নোটের জেরক্সের বিলে ম্যানেজ করতে হত, বাইকের তেলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখাতে হত, রেফারেন্স বইয়ের লিস্টটাকেও বাড়াতে হয়েছিল ওই দু মাস।
তবে সময় বাঁচাটা আসলে আমার সুবিধা না অসুবিধা বুঝতে পারি নি। কোন কাজ ছিল না। সারাদিন অর্কুটে বসতাম। এর প্রোফাইলে উঁকি, ওটায় উঁকি, এসব করতে করতে পিউর সময়টা ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলল অর্কুট।
আর এই অর্কুট থেকেই দেবোপমার সাথে আমার পরিচয়। আমার বন্ধু নিশান আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছিল “ওরে কিছুতেই প্রোফাইল ফটোতে হিরোইন, কিংবা কিউট কিউট ফটো দেখে ভুলবি না। সব ব্রণ ভর্তি গাল আসলে”।
আমিও যেমন। পোস্ট পিউ সেশনে খা খা মরু হ্রদয় তখন আমার মন মরূদ্যান খুঁজে বেড়াচ্ছে। দিলাম ভিড়িয়ে দেবোপমার ঘাটে। অর্কুট থেকে ইয়াহু মেসেঞ্জার, সেখান থেকে ব্যাপক সেন্টু খাইয়ে ফোন নাম্বার জোগাড়, তারপর কি যে হল, শুরু করলাম দেখা করার জন্য ঘ্যানঘ্যানানি।
মেয়েটা কিছুতেই দেখা করবে না। আমিও নাছোড়বান্দা। দেখা করার জন্য দরবার করতে করতে মোবাইলে, নেটে, জুতোর সোলের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি করে দিলাম। অবশেষে একদিন শিকে ছিড়ল।
সেদিন প্রচুর চ্যাটিয়ে, প্রতি চ্যাটের মাঝে কুড়ি পঁচিশ মিনিট অন্তর একবার করে অনুনয় করে চলেছি। রাত বারোটা নাগাদ বাই টাই, সুইট ড্রিমস আরও কিসব কিসব বলে কম্পিউটার অফ করে ঘুমিয়ে পড়েছি। রাত দুটো নাগাদ মোবাইলটা দুবার বেজে বন্ধ হয়ে গেল। ও যতই জানুক আমি ঘুমিয়েছি, কিছুতেই ফুল রিং করবে না। পাছে ফোনটা ধরে ফেলি। খুব সেন্সিটিভ কিনা। আমার মেল ইগো হার্ট হয় যদি!
ঘুম চোখে কল ব্যাক করতে শুনি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা শুরু করেছে, ও নাকি খুব বাজে দেখতে, ওর লজ্জা করবে এভাবে আমার সামনে আসতে।
আমি হাই টাই তুলে বললাম, অত চাপের কি আছে। দেখাটাই কি সব নাকি। বললাম মানে এটা সারাংশ। ওকে বোঝাতে গিয়ে আমাকে ভাবসম্প্রসারণটা বলতে হয়েছিল।
এই সব সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্তহীনতায় রাত কেটে গেল। এবং ঠিক হল পরের দিন আমরা দেখা করছি।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দ নিয়ে ভোর পাঁচটায় আমি ঘুমোতে গেলাম।

দেবোপমা পরে বলেছিল ওই পাঁচটায় ঘুমিয়েও নাকি ওর ঘুম হয় নি, আমিও ওকে বলেছিলাম আমারও হয় নি, কিন্তু আমি আদ্যন্ত ঢপ মেরেছিলাম। আসলে ওকে বোঝাতে বোঝাতেও আমি ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। পুরো কনভারসেশনটাই হয়েছিল আমার ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে। যত জ্বলন্ত প্রেমই হোক, আমার ঘুম আসবেই, এবং আমার এক বিরল গুণ যে আমি ঘুমন্ত অবস্থাতেই কথা বলতে পারি।
সে রাতেই আমি ভেতর থেকে বুঝতে পেরেছিলাম পিউ কান্ডের পর আমি গাধা থেকে ঘোড়া হয়েছি। ঘোড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোতে পারে আর আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কথা বলতে পারি।
যাই হোক, গাধা ঘোড়ার চক্কর থেকে বেরিয়ে বলি,পরেরদিন আমার ঘুম ভাঙল দুপুর বারোটায়। আমার ঘুম কেউ ভাঙিয়ে দেয় না, আমার বাবা সকালে উঠে অফিসে চলে যায়, মাকে ঘুম থেকে উঠেই একগাদা ছাত্র ছাত্রীকে গান শেখাতে বসতে হয়, আর টাকা পয়সা বাদ দিলে আমি বাড়িতে বেশ ভালই স্বাধীনতা ভোগ করি।
দাঁত মাজার পর মোবাইল ঘেঁটে দেখি দেবোপমার তিনটে মিসড কল। বুঝে গেলাম আবার আমাকে ওকে বোঝানোর ক্লান্তিকর অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, তাই রিস্ক নিলাম না। আগে ব্রেকফাস্টটা করে নিলাম। নইলে খাওয়াও জুটবে না।
একটা নাগাদ ফোন করলাম আবার, ধরতেই বলল সল্টলেক সিটি সেন্টারে বিকেল পাঁচটার সময় ও আসছে। আমি নিশ্চিন্ত হলাম, যাক, খানিকটা টক টাইম বাঁচল তাহলে।
নিশান প্রেমের ক্ষেত্রে আমার টেকনিক্যাল অ্যাডভাইসর।ওকে ফোন করে ডিটেলস বলতে আমার কথা শুনে প্রথমেই মুখটা ভেটকে বলল “কিছু করার নেই ভাই, কাটিয়ে দে, নিশ্চয়ই ভুঁড়ি আছে কিংবা ব্রণ। আবে প্রোফাইল পিক না থাকলে কোনদিন সেটা ঠিক ঠাক হয় না। তোকে এত করে বললাম তাও ফেঁসে গেলি”?
আমি আমতা আমতা করে বললাম “ সে তো জানি, কিন্তু আই থিঙ্ক আমাদের ওয়েভলেন্থ ম্যাচ করে। অ্যাটলিস্ট অরকুটে তো করে”।
নিশান শুনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল “ব্যাস, তাহলে তো হয়েই গেল, ওয়েভলেন্থ ম্যাচ করে যখন তখন এবার সাউন্ড ওয়েভ তারপর লাইট ওয়েভ ম্যাচ করে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াও। শালা, ইয়ে”।
আমি ওকে থামানোর চেষ্টা করলাম “আরে তুই চাপ নিস না, তেমন হলে কাটিয়ে দেওয়া যাবে”।
নিশান খানিকটা ঘোঁত ঘোঁত করে ফোনটা রাখল।
#
বাবা বলে মাথায় জেল দিলে নাকি চুলের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটতে বেশি সময় লাগে না। বাবার যে মাথা জোড়া ইডেন গার্ডেনস সেটা নাকি কলেজ লাইফে ওই ব্রিল ক্রিম ইত্যাদি দেওয়ারই সাইড এফেক্ট। পিউর সাথে দেখা করার সময় আমি ব্রিল ক্রিম দিতাম। তবে খুব সাবধানে।
পিউর প্রচুর গন্ধ বাতিক ছিল। ঘামের গন্ধে ওর বমি আসে, একটু লাউড পারফিউমে মাথা ধরে, আমি শুনে একবার গম্ভীর মুখে বলেছিলাম “হ্যাঁ রে, তুই বাথরুম টাথরুম যাস তো? ওখানে তো...”
কথা শেষ করতে দেয় নি।
দেবোপমা কি টাইপ কথা বলে বুঝি নি অতটা। তবে দেখা হবার পরে আমি সত্যিই চমকালাম।
এবং মনে হচ্ছিল হাতের কাছে পেলে নিশানকে গুলি করে মারি। আমার অবচেতন যখন ভেবে নিয়েছিল দেবোপমা দেখতে খুব একটা ভাল হবে না সুতরাং ক্যাসুয়াল ড্রেসেই যাওয়া যাবে, আর সেই মতোই আমি গেছিলাম,ঠিক পাঁচটায় ওই খেলনা ট্রামের সামনেটায় এসে যেন মনে হয় আমি একটা ধাক্কা মত খেলাম। মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল নিজে থেকেই “মার গাড়িয়েছে”।
মেয়েটা দুর্ধর্ষ দেখতে। এক্কেবারে চেঙ্গিস খাঁ টাইপ মেয়ে। ডানাকাটা পরী টরি বলতে যা বোঝায় তাই।আর কি একটা ড্রেস পড়েছে কে জানে, ওখানকার অর্ধেক কাপল যারা বসেছিল, প্রত্যেকটা মেয়ের মনে আগুন জ্বলছিল যেন দেবোপমাকে দেখে কারণ বেশিরভাগ ছেলেই টেরিয়ে টেরিয়ে দেবোপমাকেই দেখছিল।
আমার হা-টা বন্ধ হচ্ছিল না। ওকেই বলে বসলাম “তুমি যে বলেছিলে তুমি বাজে দেখতে?” আর বলতে বলতে আমার সেই জিনিসটা হল। আমার মনে হচ্ছিল কথা বললেই আমার মুখ থেকে থুতু বেরিয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হয় প্যান্টের চেনটা খোলা আছে, দাঁতগুলি হলুদ লাগছে, মানে আমি ফুল ফুল চাপে পড়ে গেলাম। এতটা চাপে আমি পিউর সাথে প্রেমের সময় পড়িনি।
দেবোপমা আমাকে দেখে হেসে বলল “আমি ভাল দেখতে?”
আমি ক্যাবলার মত দাঁড়িয়ে রইলাম।

২।
।।পিঙ্গল।।
১ দিয়ে আমরা নাম্বারিং শুরু করি। কিন্তু ১ দিয়ে কোন কিছু শুরু হবার পরে দেখা যায় ০ তেও কিছু ছিল। যে শূন্যের কোন ভ্যালু নেই। কিন্তু আসলে অনেকটাই আছে। ভ্যালু ঠিক করার আমরা কে? ক্লাস সেভেনে বিপুল স্যার বলতেন। মাথার উপর হরলিক্সের কাঁচের মত চশমাটা তুলে দিয়ে। ওই একটা শূন্য অনেক কিছু ঠিক করে দেয়। শূন্য একা থাকলে কেউ দেখতে পায় না। তার সাথে কেউ জুড়ে গেলেই তার ভ্যালু অন্যরকম হয়ে যায়। আবার অনেক সময় আগে জোড়া বা পরে জোড়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন কোন সংখ্যার আগে যদি শূন্য বসে তবে সেই সংখ্যার ভ্যালু চেঞ্জ হয় না। ১ এর আগে ০ বসলে ০১ হয়। ১ আর ০১ একই। কিন্তু ১ এর পরে বসলে শূন্য বাদশা। ১০, ১০০, আর চলেই যাচ্ছে, শেষ নেই। কিন্তু একটা দশমিক বসিয়ে নাও। তখন আবার পরের শূন্যর কোন ভ্যালু নেই। .১০ ও যা, .১ ও তাই, কিন্তু .১ যা .০১ তাই না।
কি সব ভুলভাল বকছি শুরুতেই। আসলে ওকে নিয়ে বলতে গেলে আমার এরকমই অবস্থা হয়। ঘটনাটা হল ও আমাকে শূন্য দিয়ে গেছে, কিংবা শূন্য করে গেছে। অথচ কিছুই ছিল না তার সাথে। না প্রেম, না অন্য কিছু। ক্লাস সেভেনে এন সি স্যারের কোচিং থেকে একসাথে পড়ি। একটা লেডিবার্ড সাইকেল নিয়ে আসত। মাঝে মাঝে আমার পাশে বসত। ওর গা থেকে একটা আলগা গন্ধ আসত। গন্ধটা আমার ভাল লাগত ঠিকই, কিন্তু স্পেশাল কিছু ছিল না। মাঝে মাঝে ওর সাথে কথাও হত। ক্লাস নাইনে আমি ওদের সেকশনে এন্ট্রি পেলাম। তখনও ওর সাথে আমার বিরাট কিছু বন্ধুত্ব হয় নি। তবে আমাদের গ্রুপের মধ্যে ওও ছিল।
ঘটনাটা ঘটেছিল এক শুক্রবার দুপুরে।মাধ্যমিকের প্রি টেস্ট পরীক্ষার তিন দিন আগে। দিনটাও আমার পরিষ্কার মনে আছে। ডি এসের ব্যাচে পড়া, স্পেশাল সাজেশন দেবার কথা। আমি বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে বৃষ্টির খপ্পরে পড়ে গেলাম। সে কি বৃষ্টি। চারদিক সাদা হয়ে গেছে। দুপুর বলে দোকানপাট সব বন্ধ। সন্তোষপুরের যে বাড়িটায় আমরা পড়তে যেতাম, সেটা তখনও দু তিন কিলোমিটার দূরে হবে। উপায় না দেখে একটা বন্ধ দোকানের টিনের শেডের তলায় দাঁড়িয়েছি। যা ভিজেছিলাম তখন আমার আর সম্ভব ছিল না কোচিংয়ে যাবার। তখন মোবাইলও ছিল না যে স্যারকে ফোন করে জানাব। উপায় না দেখে অসহায়ের মত বৃষ্টি শেষ হবার জন্য দাঁড়িয়েছি।
হঠাৎ দেখি ও যাচ্ছে।ওর ছাতা ছিল কিন্তু ছাতায় কিছু হচ্ছে না। ভিজে কাই হয়ে গেছে।তবু মোহগ্রস্থের মত সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। আমি জোরে ডাকলাম ওকে। ও আমার দিকে তাকিয়ে চিনতে চেষ্টা করল। তারপর চিনতে পারল। সাইকেলটা রেখে শেডের তলায় এল। আমার পাশে দাঁড়াল। ও আমার মতোই পুরো ভিজে গেছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কোন কারণে ও প্রচন্ড শকড। ঘোরের মধ্যে আছে।
আমি বুঝতে না পেরে ক্যাবলার মত বললাম “কি বৃষ্টি বল? এত ভিজছি, আজ আর পড়তে যাওয়া হল না”।
ও হঠাৎ কেঁদে ফেলল। ওখানেই। আমি রীতিমত অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। ভাগ্যিস চারপাশে কেউ ছিল না সেদিন। বৃষ্টিতে সব বন্ধ। রাস্তাঘাটে মাঝে মাঝে দুয়েকটা গাড়ি যাচ্ছিল। আমি বললাম “কিরে, কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে বলবি তো?”
ও কিছুক্ষণ কেঁদে টেদে মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি আর কোন কথাও বললাম না। বৃষ্টি থামতে চুপচাপ সাইকেল নিয়ে ও চলে গেল। আমিও বাড়ি চলে এলাম। ওই দীর্ঘ আধঘণ্টা ও আমার সাথে একটাও কথা বলে নি। চুপচাপ শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি বাড়ি এলাম। কিন্তু মনটা ভীষণ খচখচ করতে লাগল। আমি ওকে ফোন না করে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড তনিমাকে ফোন করলাম, যেটা ঘটেছে সেটা বললাম, তনিমা পুরোটা শুনে যেটা বলল সেটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
কোথায় যেন শুনেছিলাম, বয়ঃসন্ধির পরে আমাদের বয়সী মেয়েরা মানসিক ভাবে আমাদের থেকে কম করে তিন থেকে চারবছর বড় হয়। সেদিন কথাটা বুঝতে পারলাম হঠাৎ করে।
আমি কিংবা আমাদের ব্যাচের ছেলেরা যখন খেলাধুলো, মারপিট, মাধ্যমিক ইত্যাদি নিয়ে এত ব্যস্ত, তখন ও একটা প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিল। ওর মিউজিক টিচারের। প্রায় তিন মাস ধরে সেই প্রেম চলে, এবং ওই বৃষ্টির দিনই ও জানতে পারে ওর মিউজিক টিচার বিবাহিত ছিল। গোটাটাই একটা শকের মত আসে ওর কাছে। সামনে মাধ্যমিক, এখন কি করে এসব সামলাবে ওই জানে
কিন্তু আমার এত ভাবার সময় ছিল না, উপপাদ্য, এক্সট্রা, পানিপথের যুদ্ধ, অ্যামিবার চলন, কেঁচোর গমন ভূমিকম্পের গতি প্রকৃতি মিক্স হয়ে মাথাটা এমন ঘুরপাক খাচ্ছিল যে আর কোন কথা মাথায় আসেনি। শুধু পরীক্ষার দিন ওর মুখটা দেখে ধাক্কা মত লেগেছিল। হঠাৎ মনে হয়েছিল, আমরা এসব নিয়ে তালগোল খাচ্ছি আর ওকে এগুলির সাথে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের মত ওই লোকটাও ওর প্রোগ্রামে ভাইরাসের মত ঢুকে পড়েছে, যেটা ওকে খুবলে খুবলে শেষ করে দিচ্ছে।
পরীক্ষার প্রতিটা দিন ও যখন হলে ঢুকত ওকে মরা মানুষের মত লাগত। চোখে সাড় নেই, কারও দিকে তাকায় না। নিজের মত সিটে গিয়ে বসত, পরীক্ষা দিয়ে একমিনিটও দাঁড়াত না, বরং কারও প্রশ্ন শোনার ভয়েই হয়ত পরীক্ষা শেষের পাঁচ মিনিট আগে খাতা জমা করে চলে যেত। তনিমার সাথে খুব বেশি কথা বলতে ওকে দেখি নি, বরং ওই সময়টা তনিমার সাথে আমার স্বাভাবিক একটা বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, ওর ব্যাপারে অনেক কথা হত আমাদের মধ্যে। তনিমা যে ওর কষ্ট দেখে ছটফট করছে সেটা বুঝতাম, কিন্তু ও এইসব ব্যাপারে একদম চুপ করে গেছিল। কারও সাথেই কোন কথা বলত না।
পরীক্ষার শেষ হবার সাত দিন পরে স্কুল শুরু হল। ও সেকেন্ড বেঞ্চে বসত চিরকাল। কিন্তু পরীক্ষার পর লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসত। ক্লাসের যারা যার ওর কেসটা জানত তা সবাই ওর এই পরিবর্তনে অবাক হয়েছিল। আমি আর তনিমা ওর পাশে গিয়ে বসলাম। ও চুপচাপ দেখল সেটা কিন্তু কোন কথা বলল না।

প্রি টেস্টের রেজাল্ট বেরল। ওর রেজাল্ট ভীষণ খারাপ হল। কিন্তু ওর মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না আমরা। কিন্তু ওর পাশে বসাটা ছাড়ি নি। তনিমা প্রায় রোজই চেষ্টা করত ওকে স্বাভাবিক করার, কিন্তু করা যেত না।
একদিন তনিমা আসে নি। সেদিনের এক সপ্তাহ পরে স্কুল বন্ধ হবার কথা। আমি যথারীতি ওর পাশে গিয়ে বসেছি। ফার্স্ট ক্লাসটা হয়ে গেছে। আর জি ম্যাম ক্লাস থেকে বেরিয়েছেন। ও হঠাৎ আমাকে বলল “তোর চেনাজানা এমন কেউ আছে যে টাকা নিয়ে লোককে মারধর করে আসতে পারে?”
আমি চমকে ওর দিকে তাকালাম। এই কথাটা আমার কাছে চূড়ান্ত অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি কোনদিন ভাবতে পারি নি ও এইরকম একটা কথা আমাকে বলতে পারে।

৩।
উপমন্যু
।।ইতিহাস মোড অফ।।
।।বর্তমান মোড অন।।
আমার মামাতো দাদা পিঙ্গল আমার খুব কাছের। ওকে নিয়ে আমাদের সবাই খুব চিন্তিত। আমার থেকে ও মাত্র তিন বছরের বড়। আর আমাদের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব। আমার প্রেম-পিরীতির ইতিহাস তো বলবই তার আগে ওর একটা ঘটনা শেয়ার করে রাখি। কারণ আমার মহাভারত আবার শুরু হলে বাকি ইলিয়াড-ওডিসিগুলি বহুত রেগে যেতে পারে।
পিঙ্গল একটা নামী এম এন সিতে চাকরি করে। মাঝে মাঝেই স্যুট টাই হাঁকিয়ে দেশ বিদেশ ঘুরে আসে। আর কিছুতেই বিয়ে করতে চায় না। ওর কেস কি, কোন প্রেম আছে নাকি, তা আমিও বের করতে পারি নি। ছোটবেলা থেকেই ব্যাটা এরকম। পেটে বোম মারলেও কথা বের করতে চায় না। আমাকে একটা বিরাট কেসে বাঁচিয়েছিল একবার। কিন্তু সেটাও পরে বলছি।
তা মামী আর দিদা খুব সেন্টু ফেন্টু খাইয়ে পিঙ্গলকে রাজি করাল এবার বিয়ের ব্যাপারে। কেউ কোন কথাই শুনতে চাইল না। পিঙ্গল না না করতে করতে শেষে হাল ছেড়ে দিল। বলে ফেলল ঠিক আছে তোমরা যা করার কর।
নিশান পিঙ্গলকে খুব হিংসা করে। প্রায়ই আমাকে বলে “তোর দাদার মত কেত পেলে শালা শারাপোভাকেও তুলে নিতাম। কি করে মালটা? জীবনে ওর এত ফ্রাস্ট্রু কেন? ধরে কেলাতে পারিস না?”
শুনে হাসলেও মাঝে মাঝে মনে হয় ব্যাটা ঠিকই বলে। এত হ্যান্ডু একটা ছেলে যে কি লেভেলে উদাসীন থাকতে পারে সেটা ওকে না দেখলে কে বুঝত! আমাদের ক্লাসের অলিভিয়ার ওর ওপর চরম চাপ ছিল। আমাকে জ্বালিয়ে খেত, প্লিজ একটু পিঙ্গলের সাথে ইন্ট্রো করিয়ে দে না।
তা করেও দিয়েছিলাম, আগে থেকে ফোনে বলে রেখেছিলাম, আমি আর পিঙ্গল সেদিন হাইল্যান্ড পার্ক গেছিলাম। ফুড কোর্টে ঢুকতেই অলিভিয়া এগিয়ে এল, “হাই, কিরে তুই এখানে?”ইত্যাদি দিয়ে শুরু করল। কিন্তু ওর অ্যাক্টিংটা এত বেশি হয়ে গেল, পিঙ্গল ধরে ফেলল কেসটা। আমাকে পরে খুব ঝেড়েছিল। এসব ঝাটু ব্যাপারে যেন ওকে না জড়াই ইত্যাদি বলে। আমি সেটা ট্রান্সফার করেছিলাম অলিভিয়াকে। শুনে খুব খচে ফচে বলল “তোর দাদার অত অ্যাটি কিসের রে? ও কি টম ক্রুজ নাকি?”
আমি আর উত্তর দিই নি, আমার আবার খুব নরম মন কিনা, মেয়েদের কষ্ট দিতে আমার খুব দুঃখ হয়।
যাক গে, আমি আবার বেলাইনে চলে যাচ্ছি। যেটা বলছিলাম, পিঙ্গলের জন্য মেয়ে দেখা হল। জীবনানন্দের বনলতা সেন টাইপ মেয়ে।হাটু পর্যন্ত চুল। ভিন্টেজ টাইপ আর কি। নাম তনুশ্রী। পিঙ্গল প্রথমে না, না করলেও দেখার পরে যখন কিছু বলল না তখন বুঝলাম ওরও পছন্দ হয়েছে। কলকাতারই মেয়ে। ইতিহাসে অনার্স করছে। ওই বাড়ি থেকে দেখতে এল। এই বাড়ি থেকেও যাওয়া হল। নাম্বার দেওয়া নেওয়াও হল। মাঝে মাঝে দেখি আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে পিঙ্গল হোয়াটস অ্যাপে তার সাথে কথা বলছে। বেশ মাখো মাখো ব্যাপার আর কি, আমরাও বুঝে গেলাম, যাক, এবার পিঙ্গল কি যেন বলে ওই বাংলা সিনেমা টাইপ সাত পাকে বাঁধা কিংবা পাঁকে পড়তে চলেছে। মামা মামী তাদের ভাবী পুত্রবধূর সাথে একদিন শপিং করে এল। মামী তো তনুশ্রী তনুশ্রী করে অজ্ঞান। মানে যাকে একদম টোটাল মাখো মাখো ব্যাপার বলে।
কিন্তু কপাল যাকে বলে।এক রবিবার। মামা মামীরা পুজো দিতে গেছে দক্ষিণেশ্বরে। পিঙ্গল আমাদের বাড়ি এসছে। নিশান এসছে। আমরা মেসি-নেইমার নিয়ে চরম ঝগড়া আরম্ভ করেছি, নিশান আবার বিরাট মেসি ভক্ত, একই সাথে সচিনেরও ভক্ত, হাত পা নাড়িয়ে বলা শুরু করেছে সচিন আর মেসি নাকি স্বর্গে একই কলোনিতে থাকে, ঠিক সেই সময় দেখি পিঙ্গলের একটা ফোন এল। পিঙ্গল ফোনটা ধরেছে কিন্তু তখনও নিশান বকবক করে যাচ্ছিল। পিঙ্গল নিশানকে একটা বিকট ধমক দিল। ধমক খেয়ে নিশান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ কথা বলল পিঙ্গল। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আবার কিছু একটা বাওয়াল হয়েছে। ফোনটা রাখার পর বসল। আমি বললাম “কি হল?”
পিঙ্গল ওই শকড অবস্থাতেই বলল “তনুশ্রীর নাম্বার থেকে একটা ছেলে ফোন করেছে। বলল ওদের নাকি অনেক দিনের রিলেশনশিপ, এই নিয়ে আমরা যেন আর না এগোই”।
আমি আর নিশান চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। নাও ঠ্যালা। যাও বা একটা কেস মিটছিল, আবার বাওয়াল।
মা কে ডাকলাম। সব বললাম। পিঙ্গল আর কিছু বলল না। মা অবাক হয়ে বলল “এ আবার কি রে? অদ্ভুত ব্যাপার তো? দাঁড়া আমি একবার তনুশ্রীকে ফোন করি”।
পিঙ্গল গোঁজ হয়ে থাকল। কোন কথা বলল না।
আমার ফোন থেকে মা তনুশ্রীকে ফোন করল। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে ফোনটা রেখে অবাক গলায় বলল “ও বলছে ওর বন্ধুরা নাকি এসছিল ওদের বাড়িতে। পিঙ্গলকে নিয়ে ইয়ার্কি মারছে। আমি আর কিছু বললাম না, কিন্তু এ কেমন ইয়ার্কি রে বাবা?”
পিঙ্গল মার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল, “না পিসি, ওটা ইয়ার্কির গলা হতে পারে না। এরকম গলা আমি খুব ভালভাবে চিনি”।

বাড়িতে মোটামুটি হুল স্থূল পড়ে গেল মামা মামী আসার পরে। ঠিক হল, পিঙ্গলের বাবা মা আর আমার বাবা মা আজকেই তনুশ্রীর বাড়ি যাবে। আমি যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে মা এমনভাবে তাকাল, আগেকার দিন হলে ভস্ম হয়ে যেতাম।
ওরা আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। মামা মামী বেশ চাপে পড়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছে। আমরাও সবাই কম বেশি চাপে পড়েছি। ব্যাটাকে অনেক কষ্ট করে বিয়ের জন্য রাজি করানো হয়েছিল। এখন যদি আবার এই বিয়েটাও ভাঙে তাহলে আবার সব কিছু রি সেট করে রি স্টার্ট করতে যে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হবে তা বলাই বাহুল্য।
পিঙ্গল এই সময়টা কোন কথা বলছিল না। মোবাইলটা খুট খুট করত অন্য সময়, সেটাও বন্ধ। আমি ইচ্ছা করেই ওর ফোকাসটা ঘোরাতে নিশানের সাথে ভাট তর্ক জুড়ে দিলাম “কিরে, ডি মারিয়া তো ফুটে গেল, এবার রবেন তো তোদের ছারখার করে দেবে”।
নিশান অনেকক্ষণ চাপে ছিল, সেই দুপুর থেকে ও এই সব দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। বাড়ি যাব যাব দুয়েকবার বলেছিল কিন্তু ওকে রাত্রে খেতে বলা আছে, চলে যেতে বললেও অভদ্রতা করা হয় বলে আমি আটকেছি। এখন এই বিতিকিচ্ছিরি সিচুয়েশন থেকে বের হতে আমার ওরই হেল্প দরকার মনে হচ্ছিল।
নিশান আমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে আরও কেলো করে ফেলল, বলল “সবই তো বুঝলাম কিন্তু পিঙ্গলদার কেসটা তো সেমসাইড হয়ে গেল মারসেলোর মত”।
আমার মুখে খিস্তি চলে এসছিল হঠাৎ দেখি পিঙ্গল নিশানের কথা শুনে হো হো করে হাসা শুরু করল। আমরা চাপ খেয়ে চাওয়া চাউয়ি করলাম। এ কি পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি?
#
রাত সাড়ে আটটা।
পিঙ্গল এদিকে পায়চারি শুরু করেছে আমাদের বাড়ির বারান্দায়। তনুশ্রী বার পাঁচেক পর পর ফোন করে থাকবে ওর মোবাইলে, ও ফোনটা তুলল না। আমি ঘর থেকেই চেঁচিয়ে বললাম “কিরে, কে ফোন করছে”?
পিঙ্গল ঘর ঢুকে মোবাইলটা টেবিলের উপর রেখে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল “চেঁচাস না, তনুশ্রী”।
আমি বললাম “তাহলে ধর, দেখ সমস্যাটা কি? ক্ষমা টমা চাইছে নাকি”।
পিঙ্গল ঠাণ্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “দোষ করেনি তো কোন, ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে?”
নিশান বলল “দোষ করেনি যখন ফোনটা ধরতে তোমার আপত্তি কোথায়?”
পিঙ্গল হাসল “আই হেট এক্সপ্ল্যানেশনস”।
নিশান মুখটা বাঁকাল পিঙ্গলকে আড়াল করে, যার মানে হয় ‘দেখ তোর দাদার কেত আবার শুরু হয়ে গেল”।
আমি পিঙ্গলকে বললাম “আমি কি একবার তনুশ্রীর সাথে কথা বলব? ও বাড়িতে ঠিক কি হচ্ছে জানা যেত”।
নিশানের মুখ দেখে মনে হল আমার কথাটা ওর বেশ পছন্দ হয়েছে। পিঙ্গল কাঁধ ঝাঁকাল, “তোর যা ইচ্ছা”।
আমি দেরী করলাম না, কৌতূহল হচ্ছিল প্রচুর। পিঙ্গলের ফোন থেকেই মিসড কল নাম্বারটায় কল ব্যাক করলাম।
একটা রিং হতে না হতেই তনুশ্রী ধরল “পিঙ্গল আমি এক্সট্রিমলি সরি”।
আমি বাঁধা দিলাম, বললাম “না না, আমি পিঙ্গল না, আমি ওর মামাতো ভাই, উপমন্যু”।
তনুশ্রী দু সেকেন্ড থমকালো, তারপর বলল “ও কি খুব রাগ করেছে?”
আমি আড়চোখে একবার পিঙ্গলের দিকে তাকালাম, খবরের কাগজটা খুলে নিবিষ্ট মনে বিশ্বকাপের খবর পড়ছে, যেন কি হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে ওর কোন আগ্রহই নেই।
আমি গলা খাকড়িয়ে বললাম “না না, রাগ করে নি, তবে আমরা একটু চিন্তায় পড়েছি এই আর কি। কে ছেলেটা? তোমার বি এফ?”
আমার সরাসরি প্রশ্নে ওপাশটা মনে হয় একটু চাপ খেল। আবার কয়েক সেকেন্ডের পজ, তারপর বলল “এটা একটু পার্সোনাল ব্যাপার। পিঙ্গলকেই বললে ভাল হত”।
আমার মধ্যে বরাবরই একটু জ্যাঠামো ভাবটা বেশি, বলে বসলাম “না সেটা বলতে ঠিক আছে, কিন্তু যদি তোমার বি এফ হয় ছেলেটা, বা বি এফ থেকে থাকে তোমার তাহলে পিঙ্গলের সাথে কথা বলার দরকার কি আছে,তোমরা বিয়েটা ভেঙে দিলেই পার। এ তো আর সিনেমা সিরিয়াল না, বিয়ে টিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আর এরকম উড়ো ফোন, তাও অন্য কোন ফোন থেকে হলে কথা ছিল, একেবারে তোমার ফোন থেকেই আসছে, এগুলি তো একেবারে আনএক্সপেকটেড তাই না?”
পিঙ্গল একটা পেপারওয়েট তুলে আমার দিকে তাক করেছে, মানে খচেছে ব্যাটা আমার কথা শুনে, আমি ভালমানুষের মত মুখ করে রইলাম।
তনুশ্রী ধরা গলায় বলল “ব্যাপারটা সেরকম না, আমার একটা অ্যাফেয়ার ছিল ঠিকই,ছেলেটা আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকে। কিন্তু সেটা কেটে গেছিল অলমোস্ট এক বছর আগে। আজ দুপুরে ও আমাদের বাড়িতে এসছিল কি একটা অজুহাতে, আমি তখন বসার ঘরে টিভি দেখছি। ও কিভাবে যেন আমার ফোনটা জোগাড় করে পিঙ্গলকে ফোন করে, আমিও ঠিক জানি না। কিছু পরে তোমাদের বাড়ি থেকে যখন ফোন আসে তখন আমি পুরো আকাশ থেকে পড়ি, কোনমতে ইয়ার্কি বলে ব্যাপারটা কাটাই। কিন্তু এখন তোমাদের বাড়ির লোকেরা এসেছ, বিয়েটা যদি ভেঙে যায়...” ও কথাটা শেষ করতে পারল না।
নাও, দ্যাটস আ ব্রেকিং নিউজ। পিঙ্গলের হবু বউয়ের এক্স বয়ফ্রেন্ড বিলা করেছে। আমার অবশ্য তাও হিসাব মিলছিল না, কিছু একটা অন্য গল্প আছে, পরিষ্কারই বুঝতে পারছিলাম। রবিবারের দুপুর বেলা পাশের বাড়ির এক্স প্রেমিক ঘরভর্তি লোকের সাথে কন্যার ফোন নিয়ে সে ফোন থেকে ফোন করে কন্যার হবু বরের মোবাইলে ফোন করে হুমকি দিয়ে চলে গেল আর সেই সময় কন্যা কি গাঁজা টানছিল?
পিঙ্গল আবার কাগজে মন দিয়েছে পেপারওয়েটে রেখে, আমি এবার একটু শক্ত গলাতেই বললাম জ্যাঠামশাই মোডে, “দেখ, এটা যেহেতু একটা রিলেশনের ব্যাপার, সো ইট ডিমান্ডস ট্রান্সপারেন্সি। আমার মতে পিঙ্গলের বাবা মার সামনে তুমি পুরো ব্যাপারটাই খুলে বল, আমাদের বাড়ির সবাই কিন্তু এই ব্যপারটা নিয়ে খুব আপসেট”।
পিঙ্গল হঠাৎ উঠে আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কেটে দিল ফোনটা। নিশান এতক্ষণ খুব চাপ নিয়ে আমার কথা শুনছিল। হঠাৎ এই কমার্শিয়াল ব্রেকে ওর মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে এল “যাহ্‌ শালা”।
#
রাত পৌনে দশটা নাগাদ ভগ্ন সৈনিকের মত সব এল। আমার আর নিশানের খাওয়া তখন শেষের দিকে। পিঙ্গল খেতে বসে নি, আমরাও আর জোরাজুরি করি নি। ওর যা মানসিক অবস্থা, তাতে বেশি টানাহ্যাঁচড়া করে লাভ নেই। খিদে পেলে আবার আমার মাথার ঠিক থাকে না। যখন তখন যাকে তাকে কামড়ে দিতে পারি। তাছাড়া আমি না বসলে নিশানের খাওয়াও হবে না। খামোখা ওকে দেরী করিয়ে লাভ নেই। পিঙ্গল অবশ্য আমাদের সাথেই এসেছিল ডাইনিং রুমে। কিছুক্ষণ টেবিলে বসে আবার টিভি দেখতে পাশের ঘরে চলে গেছে।
নিশান ফিসফিস করে বলল “তোর এই দাদা মালটা বেশি অ্যাটি নিতে গিয়ে টাইটানিক হল বুঝলি?”
আমি মুরগীর ঠ্যাংটা কায়দা করতে করতে বললাম “তুই ভাট বকা বন্ধ করে চুপচাপ খা তো, পিঙ্গলের কেস অনেক জটিল কেস। আমার একটা হালকা ডাউট আসছে, কিন্তু সেটা বলব না এখনই”।
নিশান উত্তেজিত হয়ে খাওয়া টাওয়া ফেলে প্রায় আমার ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল “কি সন্দেহ, মেয়েটা কি বলল একটু খোলসা করে বল তো গুরু”।
আমি মাথা নাড়লাম, “উহু মামা, এখনই না। ডাউট ক্লিয়ার না হলে কিচ্ছু বলে ফাউ বিলা করার রাস্তায় আমি নেই”।
নিশান আবার মুষড়ে বসে পড়ল। পাতে চাটনি পড়ল যখন তখনই মামা মামী, বাবা মা সব এল। আমি চাটনিটা কোন মতে খেয়েই বসার ঘরে দৌড়লাম, নিশান আটকাতে যাচ্ছিল বটে কিন্তু বললাম “তুই খা, অতিথি নারায়ণ বলে কতা! খেয়ে দেয়ে আয়”।
ও মুখটা ব্যাজার করল।
আমি হিসাব করে দেখে নিয়েছি এরপর মিস্টি আছে, ও পরে খেলেই হবে, আগে খবরটা নিয়ে আমার হিসাব মিলাতে হবে।
ওরা চারজনই চুপচাপ বসে রয়েছে টিভির ঘরে, পিঙ্গল নিবিষ্ট মনে টিভি দেখে যাচ্ছে। আমি ঢুকেই জিজ্ঞেস করলাম “কি হল? কেসটা কিছু বোঝা গেল?”
মামা আসলে মনে হয় পিঙ্গলকে শোনাবার উদ্দেশ্যেই গলা খাকারি দিয়ে বলল “তনুশ্রীদের বাড়িতে এ নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হল ওরা তো বলল এইসব বন্ধুদের মধ্যে হয়, তবে”...
-“তবে কি?” আমি আর উত্তেজনাটা চেপে রাখতে পারছিলাম না।
“ওই পাড়ায় আমার এক এক্স কলিগ থাকে, তার সাথে বেরনোর সময় হঠাৎ দেখা, আমাদের গাড়িটা যখন বেরচ্ছিল গলি থেকে তখনই আর কি। তা তিনি যা বললেন তাতে এই বিয়েটা আমি আর হবার কারণ দেখি না” মামা একবার আড়চোখে পিঙ্গলের দিকে তাকাল, পিঙ্গলের কোন নড়াচড়া নেই। কিছুক্ষণ থেমে মামা বলল “মেয়েটার পাশের বাড়ির এক ছেলে আছে। তার সাথে নাকি মেয়েটাকে প্রায়ই এপাড়া ওপাড়া ঘুরতে দেখা যায়। এটা শোনার পরে...”
মামী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল “কিন্তু ওদের বাড়ি গেলে কিন্তু এসব বোঝা যায় না, ওরা খুব আদর আপ্যায়ন করল। তনুশ্রীর মুখ দেখেও সেরকম কিছু বোঝা গেল না, ওরা বরং এই ঝামেলায় বেশ উদ্বিগ্ন”।
মা মাথা নাড়ল “না না বৌদি, আমার ঠিক সুবিধের লাগে নি কিছু একটা। তোমরা এটা নিয়ে এগোনর আগে ভাবে। আর যাই হোক, একটা বিয়ের ব্যাপার, সারাজীবন একসাথে থাকবে। তোকে কিছু বলেছে পরে মেয়েটা, বাবু”?
মা পিঙ্গলকে প্রশ্নটা করল। পিঙ্গল আমার দিকে দেখিয়ে দিল। সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, “হ্যাঁ, বলেছে তো, ওর মোবাইলে ফোন করেছিল, আমি কথা বলেছি, ওই একই পাশের বাড়ির ছেলের গল্প”।
নিশান খেয়ে এই ঘরে এল, ওকে দেখে সবাই একটু সামলে নিল, মা বলল “কিরে খেয়েছিস তো ঠিক মত?”
নিশান মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। আমি ওকে বাইরে ছাড়তে এলাম।
নিশান বেরিয়ে এল তাড়াতাড়ি। বাইকটা বের করছিল, আমার মাথায় একটা প্ল্যান এল। আমি বললাম “একটা কাজ করতে হবে বুঝলি? একটা ছোটখাট গোয়েন্দাগিরি। একজনকে ফলো করার ব্যাপার। তুই পারবি?”
নিশান আমার কথাটা শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আমি কি প্রাইভেট এজেন্সি খুলেছি নাকি বে? তাছাড়া ধরা পড়লে গণ ক্যালান খেলে কে বাঁচাবে আমাকে?আমি তো আর তাপস পাল নই যে পকেটে মাল নিয়ে... ” কিছুক্ষণ থমকে বলল “এই পিঙ্গলদার কেসটা নাকি?”
আমি আর কথা বাড়ালাম না, “ওকে তুই এখন যা, কাল আবার কথা বলব। আই নিড সাম হেল্প”।
“না না বল আগে, কেস কি? তুই হঠাৎ ফেলুদা হতে যাচ্ছিস, শিওর চাপের কেস। তখন থেকে এখানে বসে আমার ঝাঁট জ্বলেছে, কিছুই বুঝছি না তোরা কি করছিস না করছিস, এখন তো বল কিছু একটা”।
আমি পালালাম “কালকে কালকে, আমি যাব তোদের বাড়ি”।
“ধ্যাত, বল না প্লিজ”।
“বললাম তো কাল, তাছাড়া”, মুখটা গম্ভীর করলাম “এখন সিরিয়াস মিটিং চলছে, আমার থাকাটা জরুরি বুঝতেই পারছিস”।
নিশান রেগে মেগে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল।

আমি তাড়াতাড়ি ঘরে এলাম, এখন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছে, মিস করা যাবে না। দেখি বাবা উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলছে, “দেখ, আমাদের সময় এরকম পাশের বাড়ি যাতায়াতটা কোন ব্যাপার ছিল না, ইন ফ্যাক্ট আমাদের সবারই পাড়ায় বন্ধু বান্ধব ছিল, আমরা ছেলে মেয়ে এভাবে এত কিছু দেখি নি।এর বাড়ি তার বাড়ি যাওয়াটাও জলভাত ছিল। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগ। পাশের বাড়ির একটা ছেলে...”
আমি গম্ভীর গলায় বললাম “তাছাড়া তনুশ্রী তো স্বীকারই করে নিয়েছে ওর ওই ছেলেটার সাথে এককালে অ্যাফেয়ার ছিল”।
সবার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল আমার কথায়। যেন একটা ছোটখাট বোম মারলাম এই ঘরে। পিঙ্গল কিন্তু নির্বিকার, কোন সাড় নেই।
মা বলল “বলেছে? তাহলে?”
পিঙ্গল মার প্রশ্নটা শুনে টিভিটা বন্ধ করল। তারপর শান্ত গলায় বলল “আমি এখন আর এই ব্যাপারে আর কিছু বলব না, তোমরা এই বিয়েটা ঠিক করেছ, এখন তোমরা ঠিক কর যা করার। চল আমার খুব খিদে পেয়ে গেছে। খেয়ে নি”।
সবাই উদ্বিগ্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। আর আমার কোন একটা হিসেব কিছুতেই মিলছিল না। এখনই কি বলে দেব? নাহ। আগে নিশ্চিত হতে হবে আমাকে।

(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান